মূল কনটেন্টে যান

দুই ভাষায় সন্তান বড় করা: বাংলা আর ইংরেজি দুটোই মজবুত রাখার উপায়

ছোট করে উত্তর

দুই ভাষায় সন্তান বড় করা সবচেয়ে ভালো চলে, যখন প্রতিটা ভাষায় প্রতিদিন প্রচুর আদরমাখা কথা হয়। দুই ভাষার কারণে কথা দেরিতে আসে না, আর শব্দ মিশিয়ে বলা স্বাভাবিক। এমন একটা নিয়ম বেছে নিন যা টেকানো যায়, যেমন বাসায় বাংলা আর স্কুলে ইংরেজি; দুই ভাষাতেই পড়ে শোনান, আর দুই ভাষাতেই সতর্কতার লক্ষণ দেখা দিলে দেখিয়ে নিন।

ParentMind টিমের লেখা১১ মিনিটের পড়া

লেখাটি শুনুন

১৫ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া

এক নজরে

কাদের জন্য
২–১২ বছর বয়সী সন্তানের বাবা-মা, যাদের সন্তান বাংলা, ইংরেজি, আঞ্চলিক ভাষা বা তিনটার সঙ্গেই বড় হচ্ছে, দেশে বা বিদেশে
মূল কথা
  • দুই ভাষার কারণে কথা দেরিতে আসে না, আর এক বাক্যে দুই ভাষা মেশানো দুটো ভাষা শেখারই স্বাভাবিক অংশ।
  • বাচ্চার শব্দ গুনুন সব ভাষা মিলিয়ে, শুধু একটা ভাষায় নয়।
  • যে ভাষা কাজে লাগে আর যেটা ভালো লাগে, বাচ্চারা সাধারণত সেটাই ধরে রাখে: কথা, গল্প, গান, আর এমন মানুষ যাঁরা শুধু সেই ভাষাতেই কথা বলেন।
  • দুই ভাষাতেই সতর্কতার লক্ষণ দেখা দিলে অন্য যেকোনো বাচ্চার মতোই দেখিয়ে নিন।

আপনার মেয়ে নানুর সঙ্গে বাংলায় গল্প করে, স্কুলের ইংরেজি ছড়া গায়, আর রাতে খেতে বসে এক বাক্যেই দুটো মিশিয়ে বলে: “আম্মু, I want more পানি।” দুই ভাষায় সন্তান বড় করা নিয়ে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তাগুলো প্রায় একই রকম। মেয়েটা কি গুলিয়ে ফেলছে? ইংরেজির চাপে কি বাংলা হারিয়ে যাবে? দুই ভাষার কারণে কি কথা বলতে দেরি হবে?

দুই ভাষার সঙ্গে বড় হওয়া সারা পৃথিবীর বহু বাচ্চার কাছে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার, আর এটা সত্যিই একটা উপহার: এতে বাচ্চা দাদা-দাদি, নানা-নানুর সঙ্গে, স্কুলের সঙ্গে আর বড় দুনিয়ার সঙ্গে জুড়ে থাকতে পারে। যা সাধারণত কাজে দেয় তা নিখুঁত নিয়ম নয়, বরং প্রতিটা ভাষায় প্রতিদিনের প্রচুর আদরমাখা কথা, আর বাসায় এমন একটা নিয়ম যা আপনার পরিবার সত্যিই মেনে চলতে পারে।

নিচে পাবেন: দেরিতে কথা বলা নিয়ে ভুল ধারণা, কোন বয়সে কী স্বাভাবিক, বাসার চার রকম নিয়ম, ইংরেজি স্কুলে পড়েও বাংলা বাঁচিয়ে রাখা, দুই ভাষায় পড়া, আঞ্চলিক ভাষা আর দাদা-দাদি, আমাদের বাসার বাস্তবতা, ৭ দিনের পরিকল্পনা, আর কখন দেখাবেন।

দুই ভাষা শিখলে কি বাচ্চা দেরিতে কথা বলে?

না। বাসায় দুই ভাষা, যেমন বাংলা আর ইংরেজি, থাকলে কথা দেরিতে আসে না; সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষা থাকলেও না। দুই ভাষার বাচ্চা প্রতিটা ভাষায় হয়তো এক ভাষার বাচ্চার চেয়ে কম শব্দ জানে, কিন্তু দুটো মিলিয়ে মোট শব্দ সাধারণত কাছাকাছিই থাকে। দুই ভাষার কোনো বাচ্চার যদি সত্যিই কথা দেরিতে আসে, সেটা দুই ভাষাতেই দেখা যায়, শুধু একটায় নয়।

  • ভুল ধারণা: “দুই ভাষা শিখলে বাচ্চা গুলিয়ে ফেলে।” কোন মানুষ আর কোন জায়গার সঙ্গে কোন শব্দ, বাচ্চারা তা শিখে ফেলে, প্রায়ই অবাক করার মতো তাড়াতাড়ি।
  • ভুল ধারণা: “ভাষা মিশিয়ে বলা মানে কোনো সমস্যা।” মিশিয়ে বলা স্বাভাবিক, আর দুটো ভাষা যত বাড়ে, সাধারণত ততই গুছিয়ে আসে।
  • ভুল ধারণা: “ইংরেজি এগোতে হলে বাংলা বাদ দাও।” প্রথম ভাষা মজবুত থাকলে প্রায়ই দ্বিতীয় ভাষা শেখা সহজ হয়, আর বাংলা বাদ দিলে বাচ্চা পরিবারের মানুষদের থেকেও দূরে সরে যেতে পারে।
  • ভুল ধারণা: “ইংরেজি কার্টুন দেখলেই বাচ্চা কথা শিখবে।” ছোট বাচ্চারা ভাষা শেখে মূলত সেই মানুষদের কাছ থেকে, যাঁরা ওর সঙ্গে কথা বলেন; দেখুন স্ক্রিন আর বাচ্চার কথা বলা।

ভাষা যেটাই হোক, কোন বয়সে কী দেখবেন তা পাবেন বাচ্চা দেরিতে কথা বললে কী করবেন লেখায়।

দুই ভাষার বাচ্চার কোন বয়সে কী স্বাভাবিক?

বাংলা আর ইংরেজি শেখা: কোন বয়সে কী দেখা যায় (মোটামুটি ধারণা)
বয়সযা প্রায়ই দেখা যায়যা কাজে দেয়
২–৩ বছরএক বাক্যে দুই ভাষার শব্দ মেশায়; একটা ভাষার ওপর বেশি ভর দেয়; যতটা বলে, বোঝে তার চেয়ে বেশিদুই ভাষাতেই কথা বলা, জিনিসের নাম বলা, ছড়া গাওয়া; মেশানো উত্তর মেনে নিয়ে পুরো বাক্যে ফিরিয়ে বলা
৩–৫ বছরমানুষ বুঝে ভাষা বদলাতে শুরু করে: দাদুর সঙ্গে বাংলা, টিচারের সঙ্গে ইংরেজি; স্কুলের নতুন ভাষায় কিছুদিন চুপচাপ থাকতে পারেপ্রতিটা ভাষায় খেলা আর গল্প; প্রতিটা ভাষায় কথা বলার মতো আত্মীয় বা বন্ধু
৫–৮ বছরপড়তে শেখে, প্রায়ই দুই রকম বর্ণমালায়; একটা ভাষা এগিয়ে যায়, সাধারণত স্কুলের ভাষাটাপ্রতিদিন একটু বাংলার সময়; দুই ভাষাতেই জোরে পড়ে শোনানো; বাংলাকে কখনো শাস্তি না বানানো
৮–১২ বছরবাংলায় জিজ্ঞেস করলেও ইংরেজিতে উত্তর দিতে পারে, বিশেষ করে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়লেবাংলাকে সত্যিকারের একটা কাজ দেওয়া: আত্মীয়দের সঙ্গে ফোনে কথা, পরিবারের গল্প, গান, একসঙ্গে বাংলা সিনেমা

ইংরেজি স্কুলে শুরু করার পর নতুন ভাষায় কিছুদিন চুপচাপ থাকা খুব সাধারণ। বাচ্চা মানিয়ে নিলে সাধারণত এটা কেটে যায়, আর এর মধ্যেও বাসার ভাষাটা বাড়তেই থাকে।

দুই ভাষায় সন্তান বড় করা: আপনার বাসায় কোন নিয়মটা মানাবে?

পরিবারগুলো সাধারণত কয়েকটা চেনা নিয়ম মেনে চলে। কোনোটাই নিখুঁত নয়, আর অনেক বাসায় একাধিকটা মিলিয়ে চলে; নামের চেয়ে বেশি জরুরি নিয়মিত, আদরমাখা কথা।

দুই ভাষায় সন্তান বড় করা: বাসার চার রকম নিয়মের তুলনা
নিয়মকীভাবে চলেভালো চলে যখনখেয়াল রাখুন
এক মানুষ, এক ভাষামা-বাবা প্রত্যেকে মূলত একটা ভাষায় কথা বলেন, যেমন আম্মু বাংলায় আর আব্বু ইংরেজিতেপ্রত্যেকে নিজের ভাষায় স্বচ্ছন্দবাচ্চা হয়তো সবার সঙ্গে শক্তিশালী ভাষাটাতেই উত্তর দেবে; ব্যাপারটা হালকা রাখুন, পাহারা নয়
বাসায় বাংলা, স্কুলে ইংরেজিপরিবারে সবাই বাসায় বাংলা বলে; ইংরেজি আসে স্কুল, বই আর বন্ধুদের কাছ থেকেস্কুলের পড়া ইংরেজিতে, যেমন ইংলিশ মিডিয়াম বা ইংলিশ ভার্সনইংরেজি হোমওয়ার্কই যেন একসঙ্গে কথা বলার একমাত্র সময় না হয়ে যায়
সময় আর জায়গা ধরেনির্দিষ্ট সময় বা জায়গায় একটা ভাষা, যেমন খাওয়ার টেবিলে বাংলা আর হোমওয়ার্কে ইংরেজিমা-বাবা দুই ভাষাতেই স্বচ্ছন্দনিয়মগুলো কৃত্রিম লাগতে পারে; হালকা আর মজার রাখুন
মেশানো, বেশির ভাগ বাসার মতোদুই ভাষাই, প্রায়ই একই বাক্যেবাসার সবাই দুটো ভাষাই বলেনপ্রতিটা ভাষাকে কিছু পুরো বাক্য, গল্প আর গান দিন, শুধু টুকরো শব্দ নয়

ইংলিশ মিডিয়ামের বাচ্চা বাংলা বলে না? বাংলা বাঁচিয়ে রাখার উপায়

‘বাচ্চা বাংলা বলতে চায় না’, এটা অনেক বাবা-মায়ের চেনা দুশ্চিন্তা। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া অনেক বাচ্চা বাংলায় কথা বলা মা-বাবাকেও ইংরেজিতে উত্তর দিতে শুরু করে, প্রায়ই কারণ ইংরেজিটা সহজ বা একটু ‘বড়দের মতো’ মনে হয়। বকাঝকা করলে বাংলা সাধারণত একটা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। যা সাধারণত কাজে দেয় তা হলো প্রতিদিনের জীবনে বাংলার জন্য সত্যিকারের একটা জায়গা রাখা:

  1. বাচ্চা ইংরেজিতে উত্তর দিলেও আপনি বাংলাতেই কথা চালিয়ে যান। আগে আসে বোঝা, বলাটা প্রায়ই তার পরে আসে।
  2. বাংলার সত্যিকারের দরকার তৈরি করুন: দাদা-দাদি, নানা-নানু বা এমন আত্মীয়দের সঙ্গে সময়, যাঁরা শুধু বাংলাই বলেন, আর পরিবারের সঙ্গে লম্বা ফোনালাপ।
  3. মজার করে তুলুন: বাংলা ছড়া, গান, ধাঁধা, রূপকথা, আর পরিবারের পুরোনো রেসিপি দেখে একসঙ্গে রান্না।
  4. বেশির ভাগ দিন বাংলায় জোরে পড়ে শোনান, কয়েক পাতা হলেও; বইটা বাচ্চাকেই বেছে নিতে দিন।
  5. বাচ্চার কথাটা বাংলায় ফিরিয়ে বলুন, আবার বলতে বাধ্য না করে: বাচ্চা যদি বলে “I want water”, আপনি বলুন, “পানি খাবে? এই নাও, পানি।”
  6. বাংলায় বলার প্রতিটা চেষ্টার প্রশংসা করুন; উচ্চারণ বা ভুল নিয়ে কখনো ঠাট্টা নয়, আর কোনো আত্মীয় খোঁচা দিলে নরমভাবে থামিয়ে দিন।

যা বলতে পারেন

  • যে ভাষায় খুশি বলো। আমি কিন্তু বাংলায় উত্তর দেব।
  • আজ রাতে নানুকে স্কুলের গল্পটা বাংলায় বলবে?
  • কী সুন্দর করে বললে! তুমি তো দুটো ভাষাই জানো।
  • মিশিয়ে বললেও সমস্যা নেই। চলো, বাংলা শব্দটা একসঙ্গে খুঁজি।
  • এই পাতাটা তুমি বাংলায় পড়ে শোনাও, পরেরটা আমি পড়ব।

বাংলা আর ইংরেজি, দুই ভাষাতেই পড়ার অভ্যাস গড়বেন যেভাবে

দুই ভাষায় পড়া প্রায়ই শুরু হয় শোনা দিয়ে। যে বাচ্চা দুই ভাষাতেই গল্প শোনে, সে বোঝে বই দুটো ভাষারই, আর বাংলা বর্ণমালাও তখন আর শুধু হোমওয়ার্ক মনে হয় না।

  • দুই ভাষাতেই জোরে পড়ে শোনান, দরকার হলে আলাদা সময়ে: ঘুমের আগে বাংলা, স্কুলের পরে ইংরেজি।
  • খেলতে খেলতে বাংলা বর্ণ চেনান: অক্ষরের কার্ড, দোকানের সাইনবোর্ডে অক্ষর খোঁজা, চক দিয়ে লেখা।
  • বাংলা বই, ছড়ার বই আর কমিকস বাচ্চার হাতের নাগালে রাখুন, আর বেছে নিতে দিন।
  • গল্প নিয়ে যেকোনো ভাষায় কথা বলুন; কোন ভাষায় আলোচনা হলো তার চেয়ে গল্পটা বোঝাই বেশি জরুরি।
  • দুই বর্ণমালায় পড়ার গতি তুলনা করবেন না; একটা ভাষা সাধারণত কিছুদিন এগিয়ে থাকে।

বইকে প্রতিদিনের অভ্যাস বানানোর রুটিন পাবেন বাচ্চার বই পড়ার অভ্যাস লেখায়।

আঞ্চলিক ভাষা, দাদা-দাদি আর আত্মীয়রা: আরেকটা ভাষা, কোনো সমস্যা নয়

দুই ভাষায় সন্তান বড় করা মানে প্রায়ই তৃতীয় একটা ভাষাও: অনেক বাংলাদেশি বাচ্চা দাদা-দাদি বা নানা-নানুর মুখে আঞ্চলিক ভাষাও শোনে, যেমন সিলেটি, চাটগাঁইয়া বা নোয়াখাইল্যা। আঞ্চলিক ভাষা ভালোবাসা আর শিকড়ের ভাষা; এতে প্রমিত বাংলা নষ্ট হয় না। ইংরেজির বেলায় যেমন, তেমনি বাচ্চারা এখানেও মানুষ বুঝে ভাষা বদলাতে শিখে যায়।

  • দাদা-দাদি যেভাবে কথা বলেন, সেভাবেই বলতে দিন; তাঁদের গল্প আর গান পরিবারের সম্পদ।
  • আঞ্চলিক ভাষা বা উচ্চারণ নিয়ে কখনো ঠাট্টা নয়, বাসায়ও না, অন্যদের সামনেও না।
  • কোনো আত্মীয় বাচ্চার বাংলা বা ইংরেজি নিয়ে খোঁচা দিলে নরমভাবে বলুন: “ও দুটো ভাষা শিখছে, আমরা ওকে নিয়ে খুব গর্বিত।”
  • বিদেশে থাকলে ভিডিও কলের দাদা-দাদিই হয়তো বাংলার সবচেয়ে বড় উৎস, তাই ওই কলগুলোকে গুরুত্ব দিন।

বাংলাদেশি পরিবারে দুই ভাষা: ইংলিশ মিডিয়াম, বাংলা মিডিয়াম আর প্রবাস

  • ইংলিশ মিডিয়াম আর ইংলিশ ভার্সন: অনেক বাচ্চা সারাদিন বেশির ভাগ সময় ইংরেজি বলে, আর বাংলায় আত্মবিশ্বাস হারায়। বাংলাকে শুধু পরীক্ষার বিষয় নয়, বাসার জীবন আর আনন্দের ভাষা হিসেবে রাখুন। স্কুল বেছে নেওয়ার পর্যায়ে থাকলে দেখুন ইংলিশ মিডিয়াম না বাংলা মিডিয়াম।
  • বাংলা মিডিয়াম: ইংরেজি হয়তো আসে মূলত পাঠ্যবই আর কোচিং থেকে। বাসায় চাপ ছাড়া সহজ ইংরেজি যোগ করুন, যেমন ছবির বই, গান আর ছোট ছোট গল্পগুজব।
  • স্ট্যাটাসের ইংরেজি: কোনো কোনো পরিবার ছোট বাচ্চার সঙ্গে শুধু ইংরেজি বলে, যাতে সে এগিয়ে থাকে। ইংরেজিতে আপনি স্বচ্ছন্দ না হলে বাসায় প্রাণখোলা বাংলাই যথেষ্ট; ইংরেজি তো স্কুলেই যোগ হয়।
  • হিন্দি আর ইংরেজি কার্টুন: বাচ্চারা পুরো লাইন হুবহু বলতে পারে। উপভোগ করুন, তবে ভাষা বেশি গড়ে ওঠে মানুষের সঙ্গে সত্যিকারের কথাবার্তায়।
  • কুরআন শেখার আরবি: অনেক বাচ্চা তৃতীয় একটা বর্ণমালাও শেখে। বাচ্চারা একাধিক বর্ণমালা সামলাতে পারে; প্রতিটার বেলায় ছোট, আনন্দের অনুশীলনই সাধারণত সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
  • একুশে ফেব্রুয়ারি আর পহেলা বৈশাখ: গান, কবিতা আর উৎসব সারা বছর বাংলাকে কাছে আনার আনন্দের উপায়।
  • প্রবাসে সন্তানকে বাংলা শেখানো: যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা বা যেখানেই থাকুন, স্কুল শুরু হলে বাংলা দ্রুত ফিকে হয়ে যেতে পারে। প্রতিদিন কিছুটা শুধু-বাংলার সময়, যেখানে আছে সেখানে সাপ্তাহিক বাংলা ক্লাস, আর পরিবারের সঙ্গে লম্বা ফোনালাপ প্রায়ই কাজে দেয়।

বাসায় দুই ভাষা: ৭ দিনের পরিকল্পনা

  1. দিন ১: কিছুই বদলাবেন না। লিখে রাখুন বাচ্চা কার সঙ্গে কোন ভাষায় কথা বলে, আর মোটামুটি কতটা বাংলা আর কতটা ইংরেজি শোনে।
  2. দিন ২: বাসার নিয়মটা বেছে নিন, বা অন্তত ঠিক করুন কোন ভাষা কখন সুযোগ পাবে।
  3. দিন ৩: প্রতিদিন অল্প একটু বাংলার সময় শুরু করুন, যেমন ঘুমের আগে একটা গল্প, গান বা খেলা।
  4. দিন ৪: দুই ভাষাতেই জোরে পড়ে শোনান, আর একটা বই বাচ্চাকে বেছে নিতে দিন।
  5. দিন ৫: বাংলাকে একটা সত্যিকারের কাজ দিন: দাদা-দাদি বা নানা-নানুর সঙ্গে ফোনে কথা, বা একসঙ্গে পরিবারের কোনো রেসিপি রান্না।
  6. দিন ৬: বাংলায় বলার প্রতিটা চেষ্টা খেয়াল করুন আর প্রশংসা করুন; কেউ খোঁচা দিলে নরমভাবে থামান।
  7. দিন ৭: দিন ১-এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন: কোন ভাষা সহজে এল, আর কোন ভাষায় কথা বলার সময় বাচ্চাকে সবচেয়ে খুশি দেখাল? যা কাজে দিয়েছে তা রাখুন।

দুই ভাষার বাচ্চার কথা কখন দেখিয়ে নেবেন

দুই ভাষা শেখার কারণে কথা দেরিতে আসে না, তাই সতর্কতার লক্ষণও অন্য যেকোনো বাচ্চার মতোই। সব ভাষার শব্দ মিলিয়ে গুনুন, আর এমন হলে দেখিয়ে নিন:

এমন হলে দেখিয়ে নিন

  • দুই ভাষা মিলিয়েও মোটামুটি ১৬ মাসে একটা শব্দও নেই, বা মোটামুটি ২ বছরেও দুটো শব্দ জুড়ে বলে না।
  • মোটামুটি ১৮ মাসেও কোনো ভাষাতেই সহজ শব্দ বা ছোট নির্দেশ বোঝে বলে মনে হয় না, বা মোটামুটি ৩ বছরেও পরিবারের লোকজন ওর কথা খুব কম বোঝেন।
  • যেকোনো বয়সে নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না, বা আপনার কথা শুনতে পায় না বলে মনে হয়।
  • যেকোনো বয়সে আগে বলা শব্দ বা পারা দক্ষতা হারিয়ে যায়। এটা দেরি না করে দেখিয়ে নিন।
  • বাসায় দিব্যি কথা বলে, কিন্তু নতুন স্কুলে প্রথম মাস বা তার কাছাকাছি সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো ভাষাতেই একটা কথাও বলে না।
  • কথা বলা নিয়ে বাচ্চা কষ্ট পায়, কথা বলা এড়িয়ে চলে, বা কয়েক সপ্তাহ ধরে এ নিয়ে খোঁচা শুনছে: টিচার আর ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।

দুই ভাষায় সন্তান বড় করতে লাগে সময়, কথা আর ধৈর্য। ParentMind আপনাকে প্রতিদিন কী হলো, যেমন নতুন শব্দ, পড়া গল্প আর বাচ্চা কোন ভাষা বেছে নিল, তা নোট করতে, বারবার যা হচ্ছে তা দেখতে আর গাইড পেতে সাহায্য করে: ParentMind কীভাবে কাজ করে।

বাবা-মায়েরা যা জানতে চান

ছোট বাচ্চার সঙ্গে দুই ভাষায় কথা বলা কি খারাপ?

না। ছোট বাচ্চার সঙ্গে বাংলা আর ইংরেজি বলা ক্ষতিকর নয়, আর এতে কথা দেরিতে আসে না। ছোটরা প্রায়ই শব্দ মিশিয়ে বলে, বা কিছুদিন একটা ভাষার ওপর বেশি ভর দেয়; এটা স্বাভাবিক। সবচেয়ে জরুরি হলো সেই ভাষাগুলোয় প্রচুর আদরমাখা কথা, গল্প আর গান, যেগুলোয় আপনার পরিবার স্বচ্ছন্দে কথা বলে।

বাচ্চা বাংলা বোঝে, কিন্তু ইংরেজিতে উত্তর দেয় কেন?

এটা খুব সাধারণ, বিশেষ করে স্কুলের পড়া ইংরেজিতে হলে। বোঝা সাধারণত বলার আগে আসে, আর বাচ্চারা উত্তর দেয় সেই ভাষায়, যেটা সবচেয়ে সহজ লাগে। আপনি বাংলাতেই কথা চালিয়ে যান, বাংলার সত্যিকারের দরকার তৈরি করুন, যেমন শুধু বাংলা বলেন এমন দাদা-দাদির সঙ্গে সময়, আর প্রতিটা বাংলা শব্দের প্রশংসা করুন। বকাঝকা করলে বাংলা একটা বোঝা মনে হতে পারে।

বাচ্চা দুই ভাষা মিশিয়ে কথা বললে কি সেটা স্বাভাবিক?

হ্যাঁ। এক বাক্যে বাংলা আর ইংরেজি মেশানো দুই ভাষা শেখার স্বাভাবিক অংশ; এর মানে এই নয় যে বাচ্চা গুলিয়ে ফেলছে। বাংলাদেশে দুই ভাষা জানা অনেক বড় মানুষও মিশিয়েই বলেন। স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিন, আর কথা, গল্প ও গানের মধ্য দিয়ে প্রতিটা ভাষাকে কিছু পুরো বাক্য দিন।

ইংলিশ মিডিয়ামে ভালো করার জন্য কি বাসায় শুধু ইংরেজি বলা উচিত?

সাধারণত দরকার নেই। অনেক বাচ্চা বাসায় বাংলা বলেও ইংলিশ মিডিয়ামে ভালো করে, আর বাসার ভাষা মজবুত থাকলে প্রায়ই ইংরেজি শেখাও সহজ হয়। ইংরেজিতে আপনি স্বচ্ছন্দ হলে বলুন; না হলে আড়ষ্ট ইংরেজির চেয়ে প্রাণখোলা বাংলাই ভালো। ইংরেজি যোগ করুন বই, গান আর খেলার মধ্য দিয়ে।

‘এক মানুষ, এক ভাষা’ পদ্ধতি কী?

‘এক মানুষ, এক ভাষা’ মানে মা-বাবা প্রত্যেকে বাচ্চার সঙ্গে মূলত একটা ভাষায় কথা বলেন, যেমন আম্মু বাংলায় আর আব্বু ইংরেজিতে। প্রত্যেকে নিজের ভাষায় স্বচ্ছন্দ হলে এটা ভালো কাজ করতে পারে। ব্যাপারটা হালকা রাখুন: বাচ্চারা প্রায়ই নিজের শক্তিশালী ভাষাতেই উত্তর দেয়, আর সেটাও ঠিক আছে।

প্রবাসে সন্তানকে বাংলা শেখাব কীভাবে?

বাংলাকে শুধু পড়ার বিষয় নয়, প্রতিদিনের জীবনের অংশ করুন: রোজ কিছুটা শুধু-বাংলার সময়, গল্প আর গান, দাদা-দাদির সঙ্গে ভিডিও কল, আর একসঙ্গে রান্না। যেখানে আছে, সেখানে সাপ্তাহিক বাংলা ক্লাস পড়া আর লেখা যোগ করতে পারে। চেষ্টার প্রশংসা করুন, ভুল নিয়ে কখনো ঠাট্টা নয়, আর ব্যাপারটা আনন্দের রাখুন, কারণ যে ভাষা ভালো লাগে আর কাজে লাগে, বাচ্চারা সাধারণত সেটাই ধরে রাখে।

এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।

নিজের সন্তানের সাথে চেষ্টা করে দেখুন

ParentMind প্রতিদিনের একটি ছোট নোট রাখে আর দেখায় — আপনার সন্তানের নিজের সংখ্যায় — একটি পরিবর্তন কাজে লাগছে কি না।

বিনামূল্যে নাম লিখুন। ক্রেডিট কার্ড লাগবে না। আপনার তথ্য গোপন থাকবে।