মোবাইল দেখলে কি বাচ্চা দেরিতে কথা বলে? কতটা সত্যি, আর কী করবেন
ছোট করে উত্তর
মোবাইল দেখলে কি বাচ্চা দেরিতে কথা বলে, তার সৎ উত্তর: শুধু স্ক্রিনের কারণে কথা দেরিতে আসে, এমনটা জানা নেই; তবে ছোট বাচ্চার অনেক বেশি স্ক্রিন দেখার সঙ্গে দেরিতে কথা বলার সম্পর্ক দেখা যায়, সম্ভবত কারণ স্ক্রিন সেই আদান-প্রদানের কথাবার্তার সময় কেড়ে নেয়, যা থেকে বাচ্চা শব্দ শেখে। ১৮ মাসের কম বয়সে শুধু ভিডিও কল, আর ২–৫ বছরে দিনে বড়জোর ১ ঘণ্টা। মোটামুটি ১৬ মাসেও কোনো শব্দ না বললে দেখিয়ে নিন।
লেখাটি শুনুন
১৪ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া
এক নজরে
- কাদের জন্য
- ০–৪ বছরের বাচ্চার বাবা-মা, বিশেষ করে যে বাচ্চা প্রায় প্রতিদিন স্ক্রিন দেখে বা প্রত্যাশার চেয়ে কম কথা বলে
- মূল কথা
- ছোট বাচ্চার অনেক বেশি স্ক্রিন দেখার সঙ্গে দেরিতে কথা বলার সম্পর্ক দেখা যায়, মূলত কারণ স্ক্রিন সেই আদান-প্রদানের কথাবার্তার জায়গা নিয়ে নিতে পারে, যা থেকে বাচ্চা শব্দ শেখে।
- দেরিতে কথা বলার পেছনে স্ক্রিন খুব কমই একমাত্র কারণ, তাই সতর্কতার লক্ষণ থাকলে স্ক্রিন টাইম যা-ই হোক, দেখিয়ে নিন।
- ১৮ মাসের কম বয়সে পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কল ছাড়া কোনো স্ক্রিন নয়; ১৮–২৪ মাসে শুধু ভালো মানের কনটেন্ট, বড় কারও সঙ্গে বসে; ২–৫ বছরে দিনে বড়জোর ১ ঘণ্টা।
- স্ক্রিনের সময়গুলো কথা, বই আর খেলা দিয়ে বদলে দিলে প্রায়ই কাজে দেয়; আজ থেকেই শুরু করুন, দেখানোর অপেক্ষায় থাকলেও।
মোবাইল দেখলে কি বাচ্চা দেরিতে কথা বলে? আপনার ২ বছরের বাচ্চা যদি হাতে গোনা কয়েকটা শব্দ বলে আর প্রতিদিন ফোনে কার্টুন দেখে, এই প্রশ্ন মনে আসা স্বাভাবিক; আত্মীয়রাও হয়তো এর মধ্যেই মোবাইলকে দোষ দিয়েছেন। অনেক বাবা-মা এখানে এসে অপরাধবোধে ভোগেন। অপরাধবোধে বাচ্চার মুখে কথা ফোটে না, কিন্তু আজ থেকে কয়েকটা ছোট পরিবর্তন কাজে দিতে পারে।
সত্যিকারের উত্তরটা মাঝামাঝি। বেশি স্ক্রিন দেখার সঙ্গে দেরিতে কথা বলার সম্পর্ক দেখা যায়, কিন্তু স্ক্রিন খুব কমই পুরো গল্প; আর স্ক্রিন যে সময়টা নেয়, তা কথা, বই পড়া আর খেলায় ফিরিয়ে দেওয়া যায়। নিচে পাবেন: কী জানা আছে আর কী নেই, ছোট বাচ্চা কেন মানুষের কাছ থেকে শব্দ শেখে, কতটা স্ক্রিন ঠিক, স্ক্রিনের বদলে কী করবেন, ৭ দিনের পরিকল্পনা, আর কোন লক্ষণ দেখলে এখনই দেখাবেন।
মোবাইল দেখলে কি বাচ্চা দেরিতে কথা বলে? কী জানা আছে, কী নেই
স্ক্রিন আর কথা বলা নিয়ে শিশু-বিকাশ বিশেষজ্ঞরা কিছু ব্যাপারে মোটামুটি একমত, আর কিছু ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত নন। বাবা-মায়েরা প্রায়ই যা শোনেন, আর আসলে যা জানা আছে, তা পাশাপাশি রাখা হলো নিচের টেবিলে:
| যা শোনেন | আসলে যা জানা |
|---|---|
| “মোবাইলের কারণেই বাচ্চার কথা দেরিতে আসছে।” | বেশি স্ক্রিন দেখার সঙ্গে দেরিতে কথা বলার সম্পর্ক আছে, মূলত কারণ স্ক্রিন কথা আর খেলার সময় নিয়ে নেয়। তবে এটা খুব কমই একমাত্র কারণ, তাই দেরিতে কথা বললে দেখিয়ে নেওয়া দরকারই। |
| “শিক্ষামূলক ভিডিও দেখলেই বাচ্চা কথা শিখবে।” | মোটামুটি ২ বছরের কম বয়সে বাচ্চা স্ক্রিনের চেয়ে মানুষের কাছ থেকে অনেক ভালো শব্দ শেখে, শব্দগুলো একই হলেও। একসাথে বসে দেখা আর সেটা নিয়ে কথা বলা বেশি কাজে দেয়। |
| “কেউ না দেখলে পেছনে টিভি চললে সমস্যা নেই।” | টিভি চলতে থাকলে বড়রা বাচ্চার সঙ্গে কম কথা বলেন, আর খেলাও ছোট হয়ে যায়। এটাও হিসাবের মধ্যে। |
| “ইংরেজি বা হিন্দি কার্টুন দেখলে তাড়াতাড়ি কথা বলবে।” | কার্টুন থেকে বাচ্চা কিছু শব্দ বা গান নকল করতে পারে, কিন্তু আসল কথা বলা গড়ে ওঠে কথোপকথন থেকে। নিজের ভাষায় প্রাণ খুলে, বেশি বেশি কথা বলুন। |
| “বেশি মোবাইল দেখলে অটিজম হয়।” | স্ক্রিনের কারণে অটিজম হয়, এমনটা জানা নেই। তবে খুব কম শব্দ, নাম ধরে ডাকলে কমই সাড়া দেওয়া, বা কিছু দেখাতে কমই আপনার দিকে তাকানো থাকলে স্ক্রিন টাইম যা-ই হোক, বিকাশ ঠিক আছে কি না দেখিয়ে নিন। |
| “ভিডিও কলও তো স্ক্রিন টাইম।” | পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কল সত্যিকারের কথোপকথন, যে কোনো বয়সেই ঠিক আছে। |
| “স্ক্রিন বন্ধ করলেই বাচ্চা কথা বলবে।” | স্ক্রিনের সময় কথা আর খেলায় বদলে দিলে প্রায়ই কাজে দেয়, তবে এটা চিকিৎসা নয়। সতর্কতার লক্ষণ থাকলে এখনই দেখানোর ব্যবস্থা করুন, আর অপেক্ষার সময়ে পরিবর্তনগুলো চালিয়ে যান। |
কোনটা আগে, তা বোঝাও কঠিন: যে বাচ্চার কথা বলতে কষ্ট হয়, তার হাতে হয়তো বেশি বেশি ফোন দেওয়া হয়; তাই সম্পর্কটা দুই দিক থেকেই হতে পারে। যেটা নিয়ে সন্দেহ নেই: ছোট বাচ্চার মানুষের সঙ্গে অনেক কথা দরকার, আর স্ক্রিন সেই সময়ে ভাগ বসায়।
স্ক্রিন টাইম ও শিশুর ভাষার বিকাশ: বাচ্চা কেন মানুষের কাছ থেকে কথা শেখে
ছোট বাচ্চা ভাষা শেখে আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে: বাচ্চা আধো আধো কিছু বলে বা আঙুল দিয়ে দেখায়, আপনি উত্তর দেন, ও আবার চেষ্টা করে। এই ছোট ছোট আদান-প্রদানকে স্পিচ থেরাপিস্টরা প্রায়ই ‘টার্ন’ বা পালা বলেন, আর ছোট বাচ্চার প্রতিদিন এমন অনেক অনেক পালা দরকার। স্ক্রিন এতে অংশ নিতে পারে না:
- স্ক্রিন বাচ্চার পালার জন্য অপেক্ষা করে না, ওর আধো বুলির উত্তরও দেয় না; নিজের মতো চলতেই থাকে।
- বাচ্চা কোন দিকে তাকিয়ে আছে, স্ক্রিন তা বোঝে না; আপনি যেমন ওর সদ্য দেখা পাখিটার নাম বলে দেন।
- দ্রুতগতির কার্টুনে মুখ দেখে শব্দ বলার ধরন নকল করার সময় খুব কম থাকে।
- পেছনে টিভি চললে বড়দের মনোযোগও সেদিকে যায়, ফলে ঘরের বাচ্চার সঙ্গে কথা কম হয়।
- বড়দের ফোনও হিসাবের মধ্যে: আমরা যখন স্ক্রল করি, বাচ্চা কম শব্দ শোনে। এটা অপরাধবোধের কারণ নয়, বরং সময় ফিরিয়ে আনার সহজ একটা জায়গা।
ভিডিও কল আলাদা, কারণ কলে দাদা-দাদি বা নানা-নানি বাচ্চার কথার উত্তর দেন, ওর নাম ধরে ডাকেন, অপেক্ষা করেন। এটা সত্যিকারের কথোপকথন, আর এ কারণেই পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কল যে কোনো বয়সেই ঠিক আছে।
ছোট বাচ্চার জন্য কতটুকু স্ক্রিন ঠিক?
ঠিক কত ঘণ্টা টিভি বা মোবাইল দেখলে কথা দেরিতে আসে, এমন কোনো সংখ্যা জানা নেই। সবচেয়ে ভালো দিকনির্দেশনা হলো বেশির ভাগ শিশু-স্বাস্থ্য নির্দেশনার সীমা, যা কথা বলার সময়টাও রক্ষা করে:
| বয়স | নির্দেশনা | কথা বলার জন্য, সঙ্গে |
|---|---|---|
| ১৮ মাসের কম | পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কল ছাড়া কোনো স্ক্রিন নয় | পেছনে টিভি নয়; সারাদিন কথা, গান আর বই |
| ১৮–২৪ মাস | শুধু ভালো মানের কনটেন্ট, বড় কারও সঙ্গে বসে দেখা | যা দেখছেন তার নাম বলুন, প্রশ্ন করুন, উত্তরের অপেক্ষা করুন |
| ২–৫ বছর | দিনে বড়জোর ১ ঘণ্টা ভালো মানের কনটেন্ট, সম্ভব হলে একসাথে বসে | খাওয়ার সময় আর ঘুমের ঠিক আগে স্ক্রিন নয় |
১৮ বছর পর্যন্ত পুরো টেবিল আছে বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন টাইম লেখায়। কী দেখছে, সেটাও জরুরি: গান আর গল্পসহ ধীর, শান্ত অনুষ্ঠানে কথা বলার সুযোগ বেশি থাকে; একটার পর একটা চলা দ্রুত ক্লিপে থাকে কম।
স্ক্রিনের বদলে কথা: কঠিন মুহূর্তগুলোয় কী করবেন
স্ক্রিন সাধারণত প্রতিদিন একই কয়েকটা মুহূর্তে হাতে আসে। আগে সেই মুহূর্তগুলো বদলান; পুরো দিন একবারে স্ক্রিনমুক্ত করার দরকার নেই।
| কখন | বদলে যা করবেন |
|---|---|
| খাওয়ার সময় | একসাথে বসে খাবারের নাম বলুন: “গরম ভাত! হলুদ ডাল। আরও খাবে?” দেখুন মোবাইল ছাড়া খাওয়ানোর উপায়। |
| রান্নার সময় | চুলা আর গরম হাঁড়ি থেকে দূরে, উঁচু চেয়ারে বা রান্নাঘরের দরজার কাছে, চোখের সামনে একটা বাটি আর চামচ, আর আপনি কী করছেন তা বলতে থাকুন |
| ডাক্তারের চেম্বারে, জ্যামে বা রিকশায় অপেক্ষা | আঙুল দিয়ে দেখিয়ে রিকশা, বাস আর রঙের নাম বলুন, একসাথে ছড়া বলুন, লাল গাড়ি গুনুন |
| মেহমান এলে | ছবির বই আর একটা খেলনা ফোনের ছোট ঝুড়ি, ফোন-ফোন খেলার জন্য |
| বাচ্চা কান্নাকাটি করলে | কোলে নিন, অনুভূতির নাম বলুন, আস্তে গান করুন; স্ক্রিন তাড়াতাড়ি শান্ত করে, কিন্তু আদর আর কথাই শান্ত হওয়া শেখায় |
| ঘুমের আগে | একটা ছবির বই আর একটা ছড়া, প্রতি রাতে একই |
যখন স্ক্রিন চালাবেন
- চালানোর আগেই ধীরগতির একটা অনুষ্ঠান বেছে নিন, আর অটোপ্লে বন্ধ রাখুন।
- বাচ্চার পাশে বসে একসাথে দেখুন, বিশেষ করে ২ বছরের কম বয়সে।
- যা দেখছেন তার নাম বলুন, সহজ প্রশ্ন করুন: “বিড়ালটা কোথায়?”
- থামুন, আর কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করুন, যাতে বাচ্চা আঙুল তুলে দেখায় বা কিছু বলে।
- একসাথে গান আর অঙ্গভঙ্গি নকল করুন, তারপর বন্ধ করে খেলাটা স্ক্রিনের বাইরে চালিয়ে যান।
- প্রতিবার একইভাবে শেষ করুন: “টা-টা টিভি!”, তারপর সোজা খেলা বা বইয়ে।
যা বলতে পারেন
- দেখো, গরু! হাম্বা! গরু বলে হাম্বা।
- তুমি বলটা দেখাচ্ছ। বল! বড় বল।
- টা-টা টিভি! এবার বই, না ব্লক?
- গরম ভাত। ফুঁ, ফুঁ। এবার খাও!
- বাবা কোথায়? ওই তো বাবা! হ্যালো বাবা!
- আমি শসা কাটছি। কুচ, কুচ, কুচ।
বাংলাদেশের বাসায় স্ক্রিন আর কথা: খাওয়া, মুরুব্বি আর কার্টুন
- খাওয়ার সময় মোবাইল। কার্টুন চালিয়ে খাওয়ানো খুব সাধারণ, আর এতে চুপচাপ দিনের সবচেয়ে ভালো গল্পের সময়গুলোর একটা হারিয়ে যায়। আগে এক বেলা বদলান, সাধারণত যে বেলাটা সবচেয়ে শান্ত।
- দাদা-দাদি, নানা-নানি আর গৃহকর্মী। অন্য কেউ লম্বা সময় বাচ্চাকে দেখলে তাঁদের দুই-তিনটা বদল শিখিয়ে দিন, যেমন ভিডিওর বদলে ছড়া, আর ধন্যবাদ দিন; তাঁরা প্রায়ই এমন গান জানেন, যা বাচ্চার খুব পছন্দ হবে।
- হিন্দি আর ইংরেজি কার্টুন। কিছু বাচ্চা কার্টুনের শব্দ বা পুরো লাইন হুবহু বলে, যা দেখে মনে হতে পারে তাড়াতাড়ি কথা শিখছে। উপভোগ করুন, তবে খেয়াল করুন বাচ্চা কিছু চাইতে বা আপনার কথার উত্তর দিতেও শব্দ ব্যবহার করে কি না; না করলে দেখানোর সময় বলুন।
- সারা সন্ধ্যা টিভি চলা। ছোট ফ্ল্যাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিরিয়াল বা খবর চললে সবচেয়ে ছোটটার জন্য সেটা পেছনে চলা টিভি। রাতের খাবারের পর এক ঘণ্টা টিভি বন্ধ রাখার চেষ্টা করুন।
- বিদেশে থাকা বাবা বা মা। ভিডিও কল কথা বলার ভালো সময়: বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বসুন, হাত নাড়তে আর খেলনা দেখাতে সাহায্য করুন, আর কল ছোট ও আনন্দের রাখুন।
- লোডশেডিংয়ের সন্ধ্যা। বিদ্যুৎ চলে গেলে চুপচাপ সময়টা রিচার্জেবল লাইটের আলোয় ছড়া আর গল্পের সময় হয়ে উঠতে পারে।
স্ক্রিনের বদলে কথার সময়: ৭ দিনের পরিকল্পনা
একবারে একটা মুহূর্ত বদলান, নতুন শব্দ আর দিনটা কেমন গেল লিখে রাখুন, আর এক সপ্তাহ পরে মিলিয়ে দেখুন।
- দিন ১: কখন স্ক্রিন চলে, কতক্ষণ, আর বাচ্চা কী কী শব্দ বা ইশারা ব্যবহার করে, লিখে রাখুন।
- দিন ২: সারাদিন পেছনে টিভি বন্ধ রাখুন, আর খেয়াল করুন কথা কতটা বাড়ল।
- দিন ৩: এক বেলার খাওয়ায় স্ক্রিনের বদলে একসাথে খাবারের নাম বলুন।
- দিন ৪: দিনে ১০ মিনিট মেঝেতে খেলা যোগ করুন, যেখানে বাচ্চা ঠিক করবে কী খেলবে, আর ওর শব্দের সঙ্গে একটা শব্দ যোগ করুন।
- দিন ৫: একসাথে একটা ছবির বই পড়ুন, আঙুল দিয়ে দেখিয়ে নাম বলে, আর হাত নেড়ে একটা ছড়া বলুন।
- দিন ৬: দাদা-দাদি, নানা-নানি, গৃহকর্মী আর যাঁরা বাচ্চাকে দেখেন, সবাইকে এই বদলগুলো জানিয়ে দিন।
- দিন ৭: প্রথম দিনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন: স্ক্রিনের মিনিট, নতুন শব্দ, মেজাজ। যা আপনার দিনের সঙ্গে মিলেছে তা রাখুন, আর নিচের কোনো লক্ষণ থাকলে দেখানোর ব্যবস্থা করুন।
স্ক্রিন টাইম যা-ই হোক, কখন কথা বলা দেখিয়ে নেবেন
‘স্ক্রিন কমিয়ে আগে দেখি কাজ হয় কি না’ — এভাবে অপেক্ষা করবেন না; দুটোই একসাথে করুন। নিচের কোনোটা মিলে গেলে কানে শোনার পরীক্ষাসহ শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখান:
এমন হলে দেখিয়ে নিন
- মোটামুটি ১২ মাসেও আধো আধো বুলি নেই, বা আঙুল দিয়ে দেখানো বা হাত নাড়া নেই।
- মোটামুটি ১৬ মাসেও একটা শব্দও বলে না।
- মোটামুটি ২ বছরেও ‘আরো দুধ’-এর মতো দুটো শব্দ জুড়ে বলে না।
- যে কোনো বয়সে নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না, বা মনে হয় আপনার কথা শুনতে পায় না।
- মোটামুটি ১৮ মাসেও সহজ শব্দ বা কথা বোঝে বলে মনে হয় না, বা ৩ বছরেও পরিবারের লোকজন তার কথা খুব কম বোঝে।
- যে কোনো বয়সে, আগে বলত এমন শব্দ বা পারত এমন দক্ষতা হারিয়ে ফেলে। এমন হলে দেরি না করে দেখান।
৭ দিনের পরিকল্পনার নোট আর বাসায় বাচ্চার একটা ছোট ভিডিও সঙ্গে নিন। কোন বয়সে কী স্বাভাবিক, আর দেখাতে গেলে কী হয়, তা আছে বাচ্চা দেরিতে কথা বলে কী করবেন লেখায়।
ParentMind-এ নতুন শব্দ, স্ক্রিন টাইম আর দিনটা কেমন গেল, তা লিখে রাখতে পারেন, যাতে ধরন চোখে পড়ে আর চেকআপে একটা পরিষ্কার হিসাব নিয়ে যেতে পারেন। ParentMind কীভাবে কাজ করে দেখুন।
বাবা-মায়েরা যা জানতে চান
মোবাইলের কারণে কি শিশু কথা বলতে দেরি করে?
ভূমিকা থাকতে পারে। যে ছোট বাচ্চা দিনে অনেক ঘণ্টা কার্টুন দেখে, তার দেরিতে কথা বলার সম্ভাবনা বেশি, মূলত কারণ সেই সময়টা মানুষের সঙ্গে কথা আর খেলার জায়গা নিয়ে নেয়। তবে দেরিতে কথা বলার পেছনে সাধারণত একাধিক কারণ থাকে, তাই সতর্কতার লক্ষণ থাকলে স্ক্রিন কমানোর পাশাপাশি কানে শোনার পরীক্ষাসহ দেখিয়ে নিন।
২ বছরের বাচ্চা দিনে কতক্ষণ টিভি দেখতে পারে?
বেশির ভাগ শিশু-স্বাস্থ্য নির্দেশনা বলে, ২ থেকে ৫ বছরের বাচ্চার জন্য দিনে বড়জোর ১ ঘণ্টা ভালো মানের কনটেন্ট, সম্ভব হলে একসাথে বসে, আর খাওয়ার সময় বা ঘুমের ঠিক আগে নয়। ঠিক কত ঘণ্টায় কথা দেরিতে আসে, এমন কোনো সংখ্যা জানা নেই, তবে এই সীমার মধ্যে থাকলে কথা আর খেলার সময়টা রক্ষা পায়, যা থেকে বাচ্চা শব্দ শেখে।
বাচ্চা সারাদিন টিভি দেখে আর কথা বলে না, কী করব?
একসাথে দুটো কাজ করুন। কানে শোনার পরীক্ষাসহ বাচ্চার ডাক্তারকে দেখানোর ব্যবস্থা করুন, আর ধাপে ধাপে স্ক্রিন কমানো শুরু করুন: আগে পেছনে চলা টিভি বন্ধ, তারপর স্ক্রিন ছাড়া খাওয়া, তারপর দিনে একটা নির্দিষ্ট সময়। ফাঁকা সময়টা ভরুন মুখোমুখি কথা, বই আর মেঝেতে খেলায়। কথা বলার সময় বাড়লে অনেক বাচ্চা বেশি শব্দ বলতে শুরু করে।
স্ক্রিন বন্ধ করলে কি বাচ্চা কথা বলা শুরু করবে?
স্ক্রিন কমিয়ে কথা আর খেলার সময় বাড়ালে প্রায়ই বাচ্চার কথা বাড়ে, তবে শুধু স্ক্রিন বন্ধ করাটা চিকিৎসা নয়। কিছু বাচ্চা দেরিতে কথা বলে কানে শোনা, বিকাশ বা অন্য কারণে, যার ব্যাখ্যা স্ক্রিন দিয়ে হয় না। পরিবর্তনগুলো করুন, কয়েক সপ্তাহ সময় দিন, আর কোনো সতর্কতার লক্ষণ থাকলে এখনই দেখিয়ে নিন।
বেশি মোবাইল দেখলে কি অটিজম হয়?
স্ক্রিনের কারণে অটিজম হয়, এমনটা জানা নেই, আর ‘ভার্চুয়াল অটিজম’ কোনো চিকিৎসাগত রোগনির্ণয় নয়। তবে কিছু লক্ষণে মনোযোগ দেওয়া দরকার: খুব কম শব্দ, নাম ধরে ডাকলে কমই সাড়া দেওয়া, কিছু দেখাতে কমই আঙুল তোলা বা আপনার দিকে তাকানো। স্ক্রিন টাইম যা-ই হোক, এসব থাকলে বিকাশ দেখিয়ে নিন; অপেক্ষার সময়েও স্ক্রিন কমানো ভালো।
দাদা-দাদির সঙ্গে ভিডিও কল কি শিশুর কথা শেখার ক্ষতি করে?
না। ভিডিও কলকে সব বয়সেই অন্য স্ক্রিন টাইম থেকে আলাদা ধরা হয়, কারণ কলের মানুষটি বাচ্চার কথার উত্তর দেন, নাম ধরে ডাকেন, অপেক্ষা করেন। বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বসুন, হাত নাড়তে বা খেলনা দেখাতে সাহায্য করুন, আর কল ছোট ও আনন্দের রাখুন, বিশেষ করে বিদেশে থাকা বাবা বা মায়ের সঙ্গে।
১ বছরের বাচ্চাকে শিক্ষামূলক ভিডিও দেখানো কি ঠিক?
বেশির ভাগ শিশু-স্বাস্থ্য নির্দেশনা বলে, ১৮ মাসের কম বয়সে পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কল ছাড়া কোনো স্ক্রিন নয়, শিক্ষামূলক ভিডিওও না। এই বয়সে বাচ্চা স্ক্রিনের চেয়ে আপনার কাছ থেকে অনেক ভালো শব্দ শেখে, তাই সারাদিন জিনিসের নাম বলুন, ছবির বই পড়ুন, ছড়া বলুন। ১৮ মাস থেকে চাইলে আপনার সঙ্গে বসে ছোট, ভালো মানের একটা অনুষ্ঠান দেখা যায়।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।





