মূল কনটেন্টে যান

বয়স অনুযায়ী শিশুর বিকাশের ধাপ: ০ থেকে ১২ বছরে কী শেখে, কীভাবে পাশে থাকবেন

ছোট করে উত্তর

বয়স অনুযায়ী শিশুর বিকাশের ধাপ মোটামুটি এমন: ০–১ বছরে শিশু ভরসা করতে, নড়াচড়া করতে আর আধো বুলি বলতে শেখে; ১–৩ বছরে হাঁটে, কথা বলে, সব নিজে করতে চায়; ৩–৫ বছরে কল্পনার খেলা খেলে, ‘কেন’ জিজ্ঞেস করে, বন্ধু বানায়; ৬–১২ বছরে পড়তে, নিয়ম মানতে আর অনুভূতি সামলাতে শেখে। প্রত্যেক বাচ্চা নিজের গতিতে এগোয়; আগে পারত এমন দক্ষতা হারিয়ে গেলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।

ParentMind টিমের লেখা১৩ মিনিটের পড়া

লেখাটি শুনুন

১৮ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া

এক নজরে

কাদের জন্য
জন্ম থেকে ১২ বছর বয়সী বাচ্চার বাবা-মা, যাঁরা জানতে চান কোনটা স্বাভাবিক, কী সাহায্য করে আর কখন পরামর্শ নেবেন
মূল কথা
  • বাচ্চা একসঙ্গে পাঁচ দিকে বড় হয়: চলাফেরা, কথা ও ভাবনা, অন্যদের সঙ্গে খেলা, অনুভূতি, আর নিজের কাজ নিজে করা।
  • যে কোনো চার্টের বয়সগুলো মোটামুটি ধারণা। প্রত্যেক বাচ্চা নিজের গতিতে এগোয়; একটা দক্ষতা আগে আসতে পারে, আরেকটা পরে।
  • খেলা, কথা বলা, যথেষ্ট ঘুম আর আদর-ভালোবাসায় ভরা, মোটামুটি একই রুটিনে চলা একটা ঘর — প্রতিটি ধাপে এগুলো ক্লাস, ফ্ল্যাশকার্ড বা অ্যাপের চেয়ে বেশি সাহায্য করে।
  • আগে পারত এমন দক্ষতা হারিয়ে গেলে, সমবয়সী বেশির ভাগ বাচ্চা যা করে তার কয়েকটা না পারলে, বা শোনা, দেখা, কথা কিংবা অন্যদের সঙ্গে খেলা নিয়ে চিন্তা হলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।

বয়স অনুযায়ী শিশুর বিকাশের ধাপ জানা থাকলে শৈশবের একটা মোটামুটি মানচিত্র হাতে আসে: বেশির ভাগ বাচ্চা আগে কী শেখে, সাধারণত তারপর কী আসে, আর কখন একটু ভালো করে খেয়াল করা দরকার। আপনার বাচ্চা দেরিতে হেঁটেছে, চাচাতো ভাইয়ের চেয়ে কম কথা বলে, বা এখনো ঠিকমতো পেনসিল ধরতে পারে না? আপনি একা নন। বেশির ভাগ পার্থক্যের মানে শুধু এটুকু যে বাচ্চাটা নিজের গতিতে বড় হচ্ছে।

এই লেখা কোনো পরীক্ষা নয়, একটা গাইড। নিচে পাবেন জন্ম থেকে ১২ বছর পর্যন্ত একটা চার্ট, খেলা কেন এত জরুরি, প্রতিটি ধাপে কী সাহায্য করে, ৭ দিনের পরিকল্পনা, আর কোন লক্ষণে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলবেন।

শিশুর বিকাশের ধাপ কয়টি, আর কোনগুলো?

শিশুর বিকাশ মানে জন্মের পর থেকে বাচ্চার শরীর, মন আর মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক যেভাবে বেড়ে ওঠে। বেশির ভাগ গাইড শৈশবকে কয়েকটা বড় ধাপে ভাগ করে, আর প্রতিটি ধাপের নিজস্ব একটা বড় কাজ থাকে:

  • কোলের শিশু (০–১ বছর): যাঁরা যত্ন নেন তাঁদের কাছে নিরাপদ বোধ করা, আর নড়াচড়া ও আওয়াজ করতে শেখা।
  • ছোট বাচ্চা বা টডলার (১–৩ বছর): হাঁটা, প্রথম শব্দ, আর সব কিছু নিজে করার প্রবল ইচ্ছা।
  • প্রি-স্কুল বয়স (৩–৫ বছর): কল্পনার খেলা, অফুরন্ত প্রশ্ন আর প্রথম বন্ধুত্ব।
  • স্কুলের শুরুর বছরগুলো (৬–৮ বছর): পড়া, লেখা, নিয়ম আর ন্যায়-অন্যায়ের তীক্ষ্ণ বোধ।
  • প্রি-টিন (৯–১২ বছর): বড় পরিসরে ভাবা, গভীর বন্ধুত্ব, আর অনেকের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধির প্রথম লক্ষণ।

প্রতিটি ধাপে বাচ্চা একসঙ্গে পাঁচ দিকে বড় হয়: চলাফেরা, কথা ও ভাবনা, খেলা ও বন্ধু, অনুভূতি, আর নিজের কাজ নিজে করা। অনেকে ‘শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশ’ একসঙ্গে বলেন, তবে দুটো আলাদা জিনিস: শারীরিক বৃদ্ধি মানে আকার, যেমন উচ্চতা আর ওজন; বিকাশ মানে দক্ষতা। একটা বাচ্চা ছোটখাটো হয়েও ঠিকঠাক এগোতে পারে, আবার লম্বা হয়েও কথা খুঁজে পেতে সময় নিতে পারে।

বয়স অনুযায়ী শিশুর বিকাশের ধাপ: ০ থেকে ১২ বছরের চার্ট

কোন বয়সে বাচ্চা কী শেখে, তার বেশির ভাগ তালিকা ৫ বছরে, স্কুল শুরু হলেই থেমে যায়; এই চার্ট চলে ১২ বছর পর্যন্ত। প্রতিটি ঘরে লেখা আছে, ওই ধাপের আশপাশে বেশির ভাগ বাচ্চা যা করে। এটা পাস করার মতো কোনো চেকলিস্ট নয়।

বয়স অনুযায়ী বাচ্চার বিকাশের চার্ট: প্রতিটি ধাপের আশপাশে বেশির ভাগ বাচ্চা যা করে (মোটামুটি ধারণা; প্রত্যেক বাচ্চা নিজের গতিতে এগোয়)
ধাপচলাফেরাকথা ও ভাবনাখেলা ও বন্ধুঅনুভূতিনিজের কাজ নিজে
০–১ বছরমাথা তুলে রাখে, গড়ায়, বসে, তারপর হামাগুড়ি দেয় বা বসে বসে ঘষটে এগোয়; অনেকে ১২ মাসের কাছাকাছি কিছু ধরে দাঁড়ায়আওয়াজ করে, তারপর ‘বা-বা’ বলে আধো বুলি; কারও গলা শুনলে সেদিকে ফেরে; অনেকে ১২ মাসের আশপাশে প্রথম শব্দ বলেকেউ হাসলে পাল্টা হাসে, টুকি খেলা ভালোবাসে, চেনা মানুষ চেনেকেঁদে প্রয়োজন জানায়; বছরের দ্বিতীয় ভাগে অচেনা মানুষ দেখে ভয় পেতে পারেখাবার হাতে ধরে, আঙুল দিয়ে নিজে খাওয়া শুরু করে
১–২ বছরবেশির ভাগ মোটামুটি ১৮ মাসের মধ্যে হাঁটে; বেয়ে ওঠে, ঠেলে, জিনিস বয়ে নিয়ে যায়আঙুল দিয়ে জিনিস দেখায়; ২ বছরের মধ্যে অনেকে প্রায় ৫০টি শব্দ বলেবড়দের নকল করে, যেমন ঝাড়ু দেওয়া; অন্য বাচ্চার সঙ্গে নয়, পাশাপাশি বেশি খেলেকাছের মানুষের প্রতি গভীর টান; হঠাৎ, ছোট ছোট জেদ; আপনি চলে গেলে অস্থির হয়চামচ দিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করে, জুতা খুলে ফেলে, বলে ‘আমি করব’
২–৩ বছরদৌড়ায়, বলে লাথি মারে, দুই পায়ে লাফায়, সিঁড়ি বেয়ে ওঠেদুটো শব্দ জুড়ে বলে, তারপর ছোট বাক্য; ৩ বছরের মধ্যে পরিবারের লোকজন বেশির ভাগ কথা বোঝেসহজ কল্পনার খেলা, যেমন পুতুলকে খাওয়ানো; অল্প সময়ের জন্য একসঙ্গে খেলাঅনেকের ‘না!’ আর জেদ এই সময় সবচেয়ে বেশি; অনুভূতির নাম বলতে শুরু করেসাহায্য নিয়ে হাত ধোয়; অনেকে টয়লেট ব্যবহার শিখতে শুরু করে
৩–৫ বছরএক পায়ে লাফায়, তিন চাকার সাইকেল চালায়, বড় বল ধরে, সহজ একটা মানুষ আঁকেছোট গল্প বলে, অবিরাম ‘কেন?’ জিজ্ঞেস করে; ৪ বছরের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষ তার কথা বোঝেকে কী সাজবে ঠিক করে কল্পনার খেলা, পালা করে খেলা, প্রথম সত্যিকারের বন্ধুজেদ কমে আসে; অন্ধকার বা ‘ভূতের’ ভয় খুব সাধারণঅল্প সাহায্যে জামা পরে, টয়লেট ব্যবহার করে, চামচে বা হাতে নিজে খায়
৬–৮ বছরসাইকেল চালায়, লাফিয়ে লাফিয়ে ছোটে, খেলাধুলায় দক্ষ হয়; হাতের লেখা গোছানো হয়পড়তে ও লিখতে শেখে; কৌতুক আর ধাঁধা উপভোগ করে; আরও যুক্তি দিয়ে ভাবেনিয়মের খেলা; প্রিয় বন্ধু; ন্যায্যতা আর জেতা নিয়ে খুব মাথা ঘামায়অনুভূতি নিয়ে কথা বলে; সমালোচনায় সহজে কষ্ট পায়; স্কুল নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে পারেমনে করিয়ে দিলে নিজে গোসল করে, জামা পরে, স্কুলব্যাগ গোছায়; ছোট ছোট ঘরের কাজ
৯–১২ বছরশক্তি আর ভারসাম্য বাড়ে; অনেকে হঠাৎ লম্বা হয়, বয়ঃসন্ধির প্রথম লক্ষণ দেখা দেয়, মেয়েদের প্রায়ই আগেজানার জন্য পড়ে, যুক্তি দিয়ে তর্ক করে, আগে থেকে পরিকল্পনা করে, অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝেবন্ধু আর দলে মানিয়ে চলা আরও জরুরি হয়; ঘনিষ্ঠ প্রিয় বন্ধু; গ্রুপ চ্যাট শুরু হয়মেজাজ ওঠানামা করতে পারে; নিজের একটু আলাদা জায়গা আর গোপনীয়তা চায়; শরীর আর চেহারা নিয়ে সচেতন হয়কম সাহায্যে হোমওয়ার্ক আর রুটিন সামলায়; সিদ্ধান্তে নিজের মতামত চায়

প্রতিটি সারি একটা দিক-নির্দেশনা, কোনো সময়সীমা নয়। যে বাচ্চা দেরিতে হাঁটে, সে হয়তো আগে কথা বলে। সবচেয়ে জরুরি হলো মাসের পর মাস ধীরে ধীরে এগোনো, আর যা পারে তা ধরে রাখা। যে কোনো বয়সে আগে পারত এমন দক্ষতা হারিয়ে গেলে দেরি না করে দেখিয়ে নিন।

১ থেকে ৩ বছর: ছোট বাচ্চার বিকাশে কী কী বদলায়?

এই দুই বছরে বিকাশ যত দ্রুত হয়, প্রায় আর কখনো তত দ্রুত হয় না; তাই এই সময়েই বাবা-মা সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা আর তুলনা করেন। চারটি বড় পরিবর্তন খেয়াল করলে এই সময়টা বোঝা সহজ হয়:

  • হাঁটা আর বেয়ে ওঠা। বেশির ভাগ বাচ্চা মোটামুটি ১৮ মাসের মধ্যে হাঁটে, তারপর দৌড়ায়, আসবাবে চড়ে, লাফায়। আটকে না রেখে ফ্ল্যাটটা নিরাপদ করুন: চেয়ার-টুল জানালা আর বারান্দার গ্রিল থেকে দূরে রাখুন।
  • শব্দ। অনেক বাচ্চা ১২ মাসের আশপাশে প্রথম শব্দ বলে, ২ বছরের মধ্যে প্রায় ৫০টি শব্দ বলে আর দুটো শব্দ জুড়ে বলে। বাসায় যত ভাষা বলা হয়, সব ভাষার শব্দ মিলিয়ে গুনুন। কথা আসতে দেরি হলে দেখুন বাচ্চা দেরিতে কথা বললে কী করবেন।
  • নিজে করা আর ‘না!’। নিজে করার ইচ্ছা যত দ্রুত বাড়ে, শব্দ আর ধৈর্য তত দ্রুত বাড়ে না; তাই জেদ খুব সাধারণ। এই সময়টা বুঝতে পড়ুন ২ বছরের বাচ্চার জেদ ও আচরণ।
  • টয়লেট শেখা। বেশির ভাগ বাচ্চা কোনো নির্দিষ্ট বয়সে নয়, মোটামুটি ১৮ মাস থেকে ৩ বছরের মধ্যে কোনো এক সময় তৈরি হওয়ার লক্ষণ দেখায়; দেখুন বাচ্চার টয়লেট ট্রেনিং।

খেলা কেন শিশুর বিকাশের আসল চালিকাশক্তি?

চার্টের প্রতিটি দক্ষতা বাচ্চা চর্চা করে খেলার মধ্য দিয়ে। টুকি খেলা থেকে শিশু শেখে, মানুষ চোখের আড়াল হলেও আবার ফিরে আসে। ব্লক দিয়ে টাওয়ার বানাতে হাত আর ধৈর্য দুটোই লাগে। রান্নাবাটির মতো কল্পনার খেলায় শব্দ বাড়ে, অন্যের চোখ দিয়ে দেখার ক্ষমতা তৈরি হয়; আর নিয়মের খেলা শেখায় পালা করা, হেরে যাওয়া আর ন্যায্যতা।

খেলার সবচেয়ে ভালো জিনিসগুলো বেশির ভাগই বিনা খরচে: হাঁড়ি-চামচ, কার্ডবোর্ডের বাক্স, করিডরে একটা বল, বড় কারও সঙ্গে ছাদে চক দিয়ে আঁকা, আর বড় কেউ ঠিক পাশে বসে থাকলে অগভীর গামলায় পানি। খেলনার চেয়ে আপনার মনোযোগ বেশি জরুরি। মোবাইল দূরে রেখে দিনে ১০ মিনিট, যেখানে বাচ্চা খেলা ঠিক করে আর আপনি তার সঙ্গে তাল মেলান, প্রায়ই এক ঘণ্টার ‘শিক্ষামূলক’ ভিডিওর চেয়ে বেশি কাজে দেয়।

খেলার সময় যা বলতে পারেন

  • আম্মু কোথায়? টুকি! এই যে আমি!
  • তুমি পানি ঢালছ। আস্তে, আস্তে... থামো!
  • তোমার পুতুল আজ রাতে কী খেতে চায়, বলো তো?
  • ধাঁধাটা কঠিন ছিল। প্রথমে কী করে দেখেছিলে?
  • খেলাটা আমাকে শিখিয়ে দেবে? আমিও শিখতে চাই।
  • মনে হচ্ছে তোমার মন খারাপ। জড়িয়ে ধরব, নাকি একটু চুপচাপ বসবে?

প্রতিটি ধাপে বাবা-মা কী করতে পারেন?

বিকাশের ধাপ যা-ই হোক, মূল বিষয়গুলো একই থাকে: কথা বলা, খেলা, বই পড়া, যথেষ্ট ঘুম আর আদর-ভালোবাসায় ভরা, মোটামুটি একই রুটিনে চলা একটা ঘর। বদলায় শুধু এগুলোর চেহারা:

  • কোলের শিশু (০–১): কান্নায় সাড়া দিন, সারাদিন কথা বলুন আর গান শোনান, জেগে থাকার সময় মেঝেতে খেলতে আর উপুড় হয়ে থাকতে দিন, আর পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কল ছাড়া স্ক্রিন দূরে রাখুন।
  • ছোট বাচ্চা (১–৩): সব কিছুর নাম বলুন, ছোট বিষয়ে বেছে নিতে দিন, নিজে করার চেষ্টা করতে দিন (পড়ুক, ছড়াক), প্রতিদিনের রুটিন মোটামুটি একই রাখুন, আর সারাদিন ‘না’ বলার বদলে ঘরটা নিরাপদ করুন।
  • প্রি-স্কুল (৩–৫): কল্পনার খেলা, ছবির বই, দৌড়ঝাঁপ, আর থালা সাজানোর মতো ছোট কাজ। অক্ষর শিখুক খেলার ছলে, লম্বা হাতের লেখার অনুশীলনে নয়। আরও পড়ুন ৫ বছরের বাচ্চার বিকাশ ও আচরণ।
  • স্কুলের শুরুর বছর (৬–৮): প্রতিদিন একসঙ্গে পড়ুন, হোমওয়ার্ক ছোট আর শান্ত রাখুন, দৌড়ঝাঁপের সময় বাঁচিয়ে রাখুন, আর নম্বরের চেয়ে চেষ্টার প্রশংসা বেশি করুন। দেখুন ৬ বছরের বাচ্চার বিকাশ ও আচরণ।
  • প্রি-টিন (৯–১২): প্রতিদিন অল্প সময়ের গল্প, সিদ্ধান্তে তাদের মতামত, পরিষ্কার মোবাইলের নিয়ম, আর শরীরের পরিবর্তন শুরুর আগেই সে বিষয়ে কথা। দেখুন প্রি-টিন বয়সী সন্তানের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করবেন।

প্রতিটি ধাপে ঘুম আর স্ক্রিন গুরুত্বপূর্ণ। দুপুরের ঘুমসহ ২৪ ঘণ্টায় বেশির ভাগ বাচ্চার দরকার: ৪–১২ মাসে ১২–১৬ ঘণ্টা, ১–২ বছরে ১১–১৪ ঘণ্টা, ৩–৫ বছরে ১০–১৩ ঘণ্টা, আর ৬–১২ বছরে ৯–১২ ঘণ্টা; দেখুন বয়স অনুযায়ী শিশুর ঘুম। স্ক্রিনের ব্যাপারে শিশু-স্বাস্থ্য নির্দেশনা বলে, ১৮ মাসের কম বয়সে পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কল ছাড়া কোনো স্ক্রিন নয়, ১৮–২৪ মাসে শুধু ভালো মানের কিছু, বড় কারও সঙ্গে বসে, ২–৫ বছরে দিনে বড়জোর ১ ঘণ্টা ভালো মানের কিছু, আর ৬ বছর থেকে ঘুম আর খেলাধুলা বাঁচিয়ে নিয়মিত একটা সীমা; দেখুন বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন টাইম।

শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ কীভাবে বুঝবেন?

মাইলফলকের চেকলিস্ট মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য কাজের, নম্বর দেওয়ার জন্য নয়। কোনো একটা তালিকার চেয়ে এই ধাপগুলো বেশি ন্যায্য ছবি দেয়:

  1. পুরো বাচ্চাকে দেখুন। শুধু যে বিষয়টা নিয়ে চিন্তা সেটা নয়, পাঁচটা দিকই খেয়াল করুন।
  2. বাচ্চাকে তুলনা করুন তার নিজের সঙ্গেই। তিন মাস আগের চেয়ে এগিয়েছে কি না, সেটা চাচাতো ভাইয়ের দক্ষতার চেয়ে অনেক বেশি কিছু বলে।
  3. চার্টে বাচ্চার সারির আগের আর পরের সারিও পড়ুন। দুই সারির মাঝামাঝি থাকা স্বাভাবিক, কারণ দক্ষতাগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা মিশে থাকে।
  4. যাঁরা বাচ্চাকে ভালো চেনেন, যেমন শিক্ষক, দাদা-দাদি বা গৃহকর্মী, তাঁরা কী খেয়াল করেন জিজ্ঞেস করুন, আর সব কথা চেকআপে নিয়ে যান।

বাচ্চাকে তুলনা করুন তিন মাস আগের সে নিজের সঙ্গে, পাশের বাসার বাচ্চার সঙ্গে নয়।

— ParentMind-এর একটি নীতি

বাংলাদেশি পরিবারে বিকাশ: তুলনা, আগেভাগে লেখা আর অনেকের আদর

‘তোমার চাচাতো বোন তো এখনই পড়তে পারে’

আত্মীয়রা প্রায় প্রতিবার বেড়াতে এসে বাচ্চাদের তুলনা করেন, সাধারণত ভালোবাসা থেকেই। কিন্তু বারবার এটা শুনে বাচ্চা শেখে সে পিছিয়ে আছে, শেখে না যে সে বড় হচ্ছে। নরমভাবে বলতে পারেন: ‘প্রত্যেক বাচ্চার নিজের সময় আছে। ও নিজের গতিতে খুব ভালো করছে।’

হাত তৈরি হওয়ার আগেই লেখা

অনেক ৩–৪ বছরের বাচ্চাকে কেজিতে ভর্তির জন্য অক্ষর লিখতে বলা হয়, কখনো একসঙ্গে বাংলা, ইংরেজি আর আরবি। ছোট হাত প্রায়ই তখনো লম্বা লেখার জন্য তৈরি থাকে না। খেলার মধ্যেই আঙুলের জোর তৈরি হয়: আটা দিয়ে বানানো খেলার মাটি, কাগজ ছেঁড়া, পুঁতি গাঁথা, চক দিয়ে আঁকা। পাতার পর পাতা দাগ টানার চেয়ে ছোট, আনন্দের অনুশীলন সাধারণত বেশি কাজে দেয়।

দাদা-দাদি, গৃহকর্মী আর সব করে দেওয়া

অনেক বাসায় আদরের বড়রা বাচ্চাকে খাইয়ে দেন, জামা পরিয়ে দেন, কোলে নিয়ে ঘোরেন, বাচ্চা নিজে পারার অনেক পরেও। যে ৫ বছরের বাচ্চাকে প্রতিবেলা মুখে তুলে খাইয়ে দেওয়া হয়, সে প্রতিদিন নিজে করার চর্চাটা হারায়। এক-দুটো কাজ ঠিক করুন যা বাচ্চা নিজে করবে, যেমন হাত দিয়ে নিজে খাওয়া বা স্যান্ডেল পরা, আর বাসার সব বড়দের অনুরোধ করুন একটু অপেক্ষা করে ওকে চেষ্টা করতে দিতে।

ছোট ফ্ল্যাট আর দৌড়ঝাঁপ

৩–৪ বছরের বাচ্চার দিনে অন্তত ১৮০ মিনিট নড়াচড়া দরকার, আর ৫ বছর থেকে দিনে অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে জোরালো খেলাধুলা; কাছে মাঠ না থাকা ফ্ল্যাটে এটা কঠিন। বড় কারও সঙ্গে ছাদ, করিডর, শুক্রবারে পার্ক আর ঘরে নাচ কাজে লাগান; বারান্দার দরজা বন্ধ রাখুন।

বাচ্চার বিকাশ আরও পরিষ্কার বুঝতে ৭ দিনের পরিকল্পনা

ওপরের চার্টটা হাতের কাছে রাখুন। যে দিকটা নিয়ে আপনার মনে প্রশ্ন, সেটা বেছে নিন; প্রতিদিন কী হচ্ছে লিখে রাখুন, আর এক সপ্তাহ পরে মিলিয়ে দেখুন।

  1. দিন ১: একটা দিক বেছে নিন (চলাফেরা, কথা, খেলা, অনুভূতি বা নিজের কাজ) আর আজ বাচ্চা কী কী করল লিখে রাখুন।
  2. দিন ২: চার্টে বাচ্চার বয়সের সারি আর তার আগের সারি পড়ুন; যা যা আগেই দেখেছেন চিহ্ন দিন।
  3. দিন ৩: দিনে ১০ মিনিট খেলা যোগ করুন, যেখানে বাচ্চা ঠিক করবে কী খেলবে; আপনার মোবাইল থাকবে দূরে।
  4. দিন ৪: একটা ছোট কাজ বাচ্চার হাতে দিন, যা সে নিজে চেষ্টা করতে পারে; সাহায্য করার আগে একটু অপেক্ষা করুন।
  5. দিন ৫: শিক্ষক, দাদা-দাদি বা যিনি দেখাশোনা করেন, তাঁর কাছে জানতে চান ওই একই দিকে তিনি কী খেয়াল করেন।
  6. দিন ৬: বাচ্চার খেলা বা কথা বলার একটা ছোট ভিডিও করে রাখুন; চেকআপে কাজে লাগবে।
  7. দিন ৭: প্রথম দিনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। নিচের তালিকার কিছু মিলে গেলে দেখানোর ব্যবস্থা করুন; না মিললে নতুন অভ্যাসগুলো চালিয়ে যান, এক মাস পরে আবার দেখুন।

কখন বিকাশ নিয়ে চিন্তা করবেন, ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলবেন

প্রত্যেক বাচ্চা বিকাশের ধাপগুলো পার হয় নিজের গতিতে, আর বেশির ভাগ পার্থক্য সময়ের সঙ্গে মিটে যায়। তবে কিছু লক্ষণ দেখলে ‘দেখি আরেকটু’ না ভেবে এখনই বাচ্চার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন:

এমন হলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন

  • যে কোনো বয়সে আগে পারত এমন দক্ষতা হারিয়ে ফেলে, যেমন শব্দ, হাঁটা বা খেলা: দেরি না করে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন, আর হঠাৎ এমন হলে সেদিনই। সঙ্গে খিঁচুনি, অস্বাভাবিক ঝিমুনি বা শরীরের এক পাশে দুর্বলতা থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
  • চার্টে সমবয়সী বেশির ভাগ বাচ্চা যা করে, তার কয়েকটা পারে না, বিশেষ করে একাধিক দিকে।
  • শোনা নিয়ে চিন্তা: শিশু জোরে আওয়াজে চমকায় না বা কণ্ঠ শুনে ফেরে না, কিংবা বাচ্চাকে দেখে প্রায়ই মনে হয় আপনার কথা শুনতে পাচ্ছে না।
  • দেখা নিয়ে চিন্তা: প্রথম কয়েক মাসের পরেও চোখ ভেতরে বা বাইরে বেঁকে যায়, চোখ কুঁচকে তাকায়, বা দেখার জন্য জিনিস খুব কাছে ধরে।
  • কথা নিয়ে চিন্তা: মোটামুটি ১৬ মাসেও কোনো শব্দ নেই, ২ বছরেও দুটো শব্দ জুড়ে বলে না, বা ৩ বছরেও পরিবারের লোকজন তার কথা খুব কম বোঝে।
  • খেলা নিয়ে চিন্তা: মানুষ বা অন্যদের সঙ্গে খেলায় আগ্রহ কম, কিছু দেখাতে খুব কমই আঙুল তোলে, বা নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না।

দেখানোর সময় সাধারণত প্রথমে কিছু প্রশ্ন করা হয় আর বাচ্চার খেলা দেখা হয়; প্রায়ই কানে শোনা আর চোখের পরীক্ষাও হয়। সাহায্য দরকার হলে, যত আগে শুরু হয় সাধারণত তত বেশি কাজে দেয়।

ParentMind-এ প্রতিদিন বাচ্চা কী করল তা ছোট করে লিখে রাখতে পারেন, যাতে সপ্তাহের পর সপ্তাহের ধারা চোখে পড়ে আর চেকআপে একটা পরিষ্কার হিসাব নিয়ে যেতে পারেন; ParentMind কীভাবে কাজ করে দেখুন।

বাবা-মায়েরা যা জানতে চান

শিশুর বিকাশের ৫টি ধাপ কী কী?

অনেক গাইডে পাঁচটি বড় ধাপ ধরা হয়: কোলের শিশু (০–১ বছর), ছোট বাচ্চা বা টডলার (১–৩), প্রি-স্কুল (৩–৫), স্কুলবয়সী (৬–১২) আর কৈশোর (১৩–১৮)। কেউ কেউ স্কুলবয়সকে স্কুলের শুরুর বছর আর প্রি-টিন বয়সে ভাগ করেন। প্রতিটি ধাপে বাচ্চা নিজের গতিতে চলাফেরা, কথা ও ভাবনা, অন্যদের সঙ্গে খেলা, অনুভূতি আর নিজের কাজ নিজে করায় এগোয়।

১ থেকে ৩ বছরের বাচ্চা সাধারণত কী কী পারে?

বেশির ভাগ বাচ্চা মোটামুটি ১৮ মাসের মধ্যে হাঁটে, তারপর দৌড়ায়, বেয়ে ওঠে, লাফায়। অনেকে ১২ মাসের আশপাশে প্রথম শব্দ বলে, ২ বছরের মধ্যে প্রায় ৫০টি শব্দ বলে ও দুটো শব্দ জুড়ে বলে, আর ৩ বছরের মধ্যে ছোট বাক্যে কথা বলে। বড়দের নকল করে, সহজ কল্পনার খেলা শুরু করে, আর সব নিজে করতে চায়; তাই জেদও আসে।

বাচ্চার বিকাশ দেরিতে হচ্ছে কি না, কখন চিন্তা করব?

আগে পারত এমন দক্ষতা হারিয়ে গেলে, সমবয়সী বেশির ভাগ বাচ্চা যা করে তার কয়েকটা না পারলে, বা শোনা, দেখা, কথা কিংবা অন্যদের সঙ্গে খেলা নিয়ে চিন্তা হলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। পরের জন্মদিনের অপেক্ষা করবেন না: দেখানো সহজ, আর সাহায্য দরকার হলে আগে শুরু করাই সাধারণত সবচেয়ে ভালো কাজ করে।

আমার বাচ্চা চাচাতো ভাইয়ের চেয়ে পিছিয়ে — এটা কি স্বাভাবিক?

সাধারণত হ্যাঁ। একই বয়সের দুজন সুস্থ বাচ্চার মধ্যে হাঁটা, কথা বলা বা লেখায় কয়েক মাসের পার্থক্য থাকতে পারে, আর যে এক দিকে পিছিয়ে, সে প্রায়ই আরেক দিকে এগিয়ে। বাচ্চাকে তুলনা করুন তিন মাস আগের তার নিজের সঙ্গে। একাধিক দিকে পিছিয়ে থাকলে, বা দক্ষতা হারিয়ে ফেললে দেখিয়ে নিন।

শুধু মাইলফলকের চেকলিস্ট দেখে কি বোঝা যায় বাচ্চা ঠিক আছে?

মাইলফলকের চেকলিস্ট মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ভালো, কিন্তু এটা কোনো পরীক্ষা নয়, এ দিয়ে রোগ নির্ণয়ও হয় না। এর সঙ্গে মেলান কয়েক সপ্তাহ ধরে আপনি কী দেখছেন, শিক্ষক আর দেখাশোনার মানুষেরা কী খেয়াল করছেন, আর নিয়মিত চেকআপ। নোট আর প্রশ্নগুলো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান, বিশেষ করে সতর্কতার কোনো লক্ষণ মিলে গেলে।

ঘরে বাচ্চার বিকাশে কীভাবে সাহায্য করব?

বাচ্চার সঙ্গে বেশি বেশি কথা বলুন, প্রতিদিন একসঙ্গে বই পড়ুন, মেঝেতে বসে এমন খেলা খেলুন যেখানে বাচ্চা নেতৃত্ব দেয়, আর ছোট ছোট কাজ নিজে করার সুযোগ দিন। যথেষ্ট ঘুমসহ রুটিন মোটামুটি একই রাখুন, আর দৌড়ঝাঁপের সময় বাঁচিয়ে রাখুন। মোবাইল দূরে রেখে মন দিয়ে দেওয়া ১০ মিনিট সাধারণত দামি খেলনা, ক্লাস বা অ্যাপের চেয়ে বেশি কাজে দেয়।

এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।

নিজের সন্তানের সাথে চেষ্টা করে দেখুন

ParentMind প্রতিদিনের একটি ছোট নোট রাখে আর দেখায় — আপনার সন্তানের নিজের সংখ্যায় — একটি পরিবর্তন কাজে লাগছে কি না।

বিনামূল্যে নাম লিখুন। ক্রেডিট কার্ড লাগবে না। আপনার তথ্য গোপন থাকবে।