শিশুর ঘুমের রুটিন ০–১২ মাস: কতটা ঘুম স্বাভাবিক, কীভাবে আলতো করে ঘুম পাড়াবেন
ছোট করে উত্তর
শিশুর ঘুমের রুটিন ০–১২ মাস বয়সে খুব দ্রুত বদলায়। নবজাতক ২৪ ঘণ্টায় ছোট ছোট ভাগে প্রায় ১৪–১৭ ঘণ্টা ঘুমায়, আর দিন-রাত খাওয়ার জন্য জাগে। ৪ থেকে ১২ মাসে বেশিরভাগ শিশু ২৪ ঘণ্টায় ১২–১৬ ঘণ্টা ঘুমায়; রাতের ঘুম লম্বা হয়, দিনে দুই-তিনবার ঘুমায়। প্রতিবার ঘুমের সময় শিশুকে চিত করে তার নিজের শক্ত ও সমান জায়গায় শোয়ান।
লেখাটি শুনুন
১৬ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া
এক নজরে
- কাদের জন্য
- জন্ম থেকে ১২ মাস বয়সী শিশুর বাবা-মা, যাঁরা শিশুর সঙ্গে এক বিছানায় বা এক ঘরে ঘুমান তাঁরাও
- মূল কথা
- নবজাতক ২৪ ঘণ্টায় ছোট ছোট ভাগে প্রায় ১৪–১৭ ঘণ্টা ঘুমায়; ৪ থেকে ১২ মাসে বেশিরভাগ শিশু দিনের ঘুমসহ ১২–১৬ ঘণ্টা ঘুমায়।
- রাতে খাওয়ার জন্য জাগা স্বাভাবিক, বিশেষ করে প্রথম কয়েক মাসে; আর সারারাত টানা ঘুমানোর কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই।
- দিনে-রাতে প্রতিবার: চিত করে, শিশুর নিজের শক্ত ও সমান জায়গায়, নরম কিছু ছাড়া; কখনো সোফা, চেয়ার বা ঝোলানো দোলনায় নয়।
- ঘুম পাড়ানোর জন্য কখনো ওষুধ, সিরাপ, গ্রাইপ ওয়াটার বা মধু দেবেন না; ৩ মাসের কম বয়সী শিশুর জ্বর হলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার দেখান।
রাত ৩টায়, ক্লান্ত চোখে, অনেক বাবা-মা মোবাইলে খোঁজেন: শিশুর ঘুমের রুটিন ০–১২ মাস বয়সে কেমন হয়? প্রায়ই কোলে এমন এক নবজাতক, যে সারাদিন ঘুমায় আর রাতে চোখ খুলে তাকিয়ে থাকে। এটা স্বাভাবিক। ছোট্ট শিশু এখনো দিন আর রাতের পার্থক্য বোঝে না, আর ছোট পেটে বারবার খিদে পায় বলে বারবার জাগে।
প্রথম বছরের মধ্যে ঘুম ধীরে ধীরে একটা ছন্দে আসে, আর আপনি আলতো করে তাতে সাহায্য করতে পারেন। নিচে পাবেন: মাস অনুযায়ী ঘুম, রাতের খাওয়ানো, আলতো করে ঘুম পাড়ানো, নিরাপদ ঘুম (এক বিছানায় ঘুমালেও), ৭ দিনের পরিকল্পনা, আর কখন সাহায্য নেবেন।
শিশুর ঘুমের রুটিন ০–১২ মাস: মাস অনুযায়ী কত ঘণ্টা ঘুম?
শিশুর ঘুম হিসাব করা হয় দিনের ঘুমসহ ২৪ ঘণ্টা ধরে, আর প্রতিটি শিশু একটা পরিসরের মধ্যে কোথাও থাকে। নিচের ঘণ্টার হিসাব আমাদের বয়স অনুযায়ী শিশুর ঘুম ছকের সঙ্গে মেলে; দিনের ঘুম আর জেগে থাকার সময়গুলো মোটামুটি ধারণা, কোনো লক্ষ্য নয়।
| বয়স | ২৪ ঘণ্টায় ঘুম | দিনের ঘুম ও জেগে থাকা | রাত |
|---|---|---|---|
| জন্ম থেকে ৩ মাস | ছোট ছোট ভাগে প্রায় ১৪–১৭ ঘণ্টা | সারাদিন একটু ঘুম, একটু জাগা; জাগার পর প্রায়ই এক ঘণ্টার মধ্যেই আবার ঘুম পায় | দিন-রাত কয়েক ঘণ্টা পরপর খাওয়ার জন্য জাগে |
| ৪–৬ মাস | ১২–১৬ ঘণ্টা | দিনে কয়েকবার, প্রায়ই তিনবার; একবারে প্রায় দেড় থেকে আড়াই ঘণ্টা জেগে থাকে | রাতের প্রথম ঘুমটা লম্বা হয়; অনেকে এখনো খাওয়ার জন্য জাগে |
| ৭–৯ মাস | ১২–১৬ ঘণ্টা | দিনে দুই-তিনবার, ধীরে ধীরে দুইবারে আসে; প্রায় ২–৩ ঘণ্টা জেগে থাকে | অনেকে রাতে এক-দুবার জাগে; কেউ কেউ টানা লম্বা ঘুম দেয় |
| ১০–১২ মাস | ১২–১৬ ঘণ্টা | সাধারণত দিনে দুইবার; প্রায় ৩–৪ ঘণ্টা জেগে থাকে | রাতের ঘুম আরও লম্বা, তবে কেউ কেউ এখনো খাওয়া বা আদরের জন্য জাগে |
ঘড়ির চেয়ে শিশুকেই দিকনির্দেশনা ধরুন: যে শিশু হাসিখুশি হয়ে জাগে, ভালোভাবে খায় আর জেগে থাকার সময় সজাগ থাকে, ঘণ্টার হিসাব ছকের চেয়ে একটু আলাদা হলেও সে সাধারণত যথেষ্ট ঘুমাচ্ছে।
ঘুমের মধ্যে নবজাতকের শ্বাস প্রায়ই অসমান হয়: কয়েকটা দ্রুত শ্বাস, তারপর কয়েক সেকেন্ডের ছোট বিরতি। শুধু এটুকু হলে সাধারণত স্বাভাবিক; হাত-পা একটু কেঁপে ওঠা, গোঁ গোঁ শব্দ বা ছোটখাটো আওয়াজও তাই। তবে শ্বাস অনেকক্ষণ থেমে থাকলে, ঠোঁট নীল বা ধূসর হয়ে গেলে, বা শ্বাস নিতে কষ্ট হলে ব্যাপারটা আলাদা: সঙ্গে সঙ্গে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
শিশু কবে সারারাত ঘুমাবে?
সারারাত টানা ঘুমানোর কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। প্রথম কয়েক মাসে সবচেয়ে লম্বা ঘুমটা ধীরে ধীরে বাড়ে, আর অনেক শিশু মোটামুটি ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে কোনো এক সময় রাতে একটানা কয়েক ঘণ্টা ঘুমাতে শুরু করে। আবার অনেকে প্রথম জন্মদিন পর্যন্ত, এমনকি তার পরেও, রাতে এক-দুবার জাগে; সেটাও স্বাভাবিক।
ছোট্ট শিশুর ঘুমের সঙ্গে রাতের খাওয়া জড়িয়ে আছে: ছোট পেটের জন্য দিনের মতো রাতেও দুধ লাগে। কেউ ‘এতদিনে তো অভ্যাস হয়ে যাওয়ার কথা’ বললেই রাতের খাওয়া বন্ধ করবেন না; কখন আর দরকার নেই, তা ডাক্তার বা নার্স বলে দিতে পারেন।
বড় কোনো পরিবর্তনের সময় কিছুদিন শিশু বেশি জাগতে পারে: গড়াগড়ি দেওয়া বা বসতে শেখা, নতুন দাঁত, সর্দি, কিংবা দাদাবাড়ি বা নানাবাড়ি বেড়াতে যাওয়া। রুটিন ফিরলে এমন সময়গুলো প্রায়ই এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে কেটে যায়।
বাচ্চা দিনে ঘুমায়, রাতে জাগে: কী করবেন?
অনেক নবজাতক দিনে লম্বা ঘুম দেয় আর রাতে জেগে থাকে, কারণ তার শরীরের ঘড়ি এখনো ঠিক হয়নি। প্রথম কয়েক মাসে এটা সাধারণত নিজে থেকেই ঠিক হয়ে আসে, আর কয়েকটা ছোট অভ্যাস তাতে সাহায্য করে:
- দিনে: পর্দা সরিয়ে দিন, বাসার স্বাভাবিক শব্দ চলতে দিন, আর খাওয়ানোর সময় কথা বলুন, খেলুন।
- রাতে: আলো কম, গলা নিচু; খাওয়ান আর ডায়াপার বদলান, কিন্তু খেলা নয়।
- সকালে আলো ঝলমলে জানালার পাশে একটু দিনের আলো শরীরের ঘড়ি ঠিক হতে সাহায্য করতে পারে।
- রাতে ভালো ঘুমাবে ভেবে দিনে জোর করে জাগিয়ে রাখবেন না: বেশি ক্লান্ত শিশু প্রায়ই আরও খারাপ ঘুমায়, ভালো নয়।
শিশুকে ঘুম পাড়ানোর উপায়: আলতো করে, ধাপে ধাপে
আলতো করে ঘুম পাড়ানো মানে আপনার গলার স্বর, আপনার ছোঁয়া আর শান্ত একটা রুটিন দিয়ে শিশুকে ঘুমাতে সাহায্য করা, আর কাঁদলে সাড়া দেওয়া। কঠোর কোনো পদ্ধতির দরকার নেই, আর ছোট্ট শিশুকে আদর করে শান্ত করলে সে ‘নষ্ট’ হয়ে যায় না; বিস্তারিত পড়ুন অতিরিক্ত আদরে বাচ্চা নষ্ট হয় কি লেখায়।
- ঘুমের লক্ষণ খেয়াল করুন: হাই তোলা, চোখ ডলা, মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, খুঁতখুঁত করা বা উদাস চোখে তাকিয়ে থাকা। শিশু বেশি ক্লান্ত হওয়ার আগেই, তখনই ঘুম পাড়ানো শুরু করুন।
- কয়েক সপ্তাহ বয়স থেকেই প্রতি সন্ধ্যায় একই ছোট রুটিন: পরিষ্কার ডায়াপার, খাওয়ানো, হাত-মুখ মুছে দেওয়া, একটা গান বা আপনার পরিবারে প্রচলিত থাকলে ছোট একটা দোয়া, তারপর আলো কমিয়ে দেওয়া।
- শিশুকে চিত করে তার নিজের ছোট খাটে শোয়ান; মাঝে মাঝে ঘুম ঘুম ভাব থাকতেই, পুরো ঘুমিয়ে পড়ার আগে, যাতে সেখানে ঘুমিয়ে পড়ায় অভ্যস্ত হয়। অনেকবার কোলে ঘুমিয়ে পড়লেও কোনো সমস্যা নেই।
- কোলে তোলার আগে অন্যভাবে শান্ত করুন: পেটের ওপর আলতো করে হাত রাখা, আস্তে আস্তে চাপড়ানো, নরম গলায় ‘শ্শ্’, বা ফ্যানের একটানা শব্দ।
- কান্না বাড়তে থাকলে কোলে তুলে শান্ত করুন, তারপর আবার চেষ্টা করুন। ছোট্ট শিশুকে কখনো অনেকক্ষণ একা কাঁদতে ফেলে রাখবেন না, আর কখনো শিশুকে ঝাঁকাবেন না।
- রাতে কম আলোয়, কম কথায় খাওয়ান আর ডায়াপার বদলান, তারপর সঙ্গে সঙ্গে আবার চিত করে শুইয়ে দিন।
মোটামুটি ৬ মাস থেকে, চাইলে, কয়েক সপ্তাহ ধরে একটু একটু করে সাহায্য কমাতে পারেন: আগের চেয়ে একটু কম চাপড়ানো, তারপর খাট থেকে একটু দূরে বসা। শিশুর গতিতে এগোন; কোনো তাড়া নেই।
যা বলতে পারেন: শিশুকে, আর পরিবারের মানুষদের
- শ্শ্... আম্মু আছি তো। এখন ঘুমের সময়, সোনা।
- আম্মা, বালিশ ছাড়াই বাচ্চা সবচেয়ে নিরাপদে ঘুমায়। ওর বিছানাটা সমান রাখি।
- দোলনায় না দিয়ে কোলে দোল দিই, ঘুমিয়ে গেলে ওর নিজের খাটে শুইয়ে দেব।
- ঘুমের জন্য ওকে গ্রাইপ ওয়াটার বা সিরাপ দেবেন না। চিন্তা হলে আমরা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করব।
- এক ঘণ্টা ওকে একটু রাখবেন? আমি একটু ঘুমিয়ে নিই, রাতে আমিই খাওয়াব।
শিশুর নিরাপদ ঘুম: চিত হয়ে, সমান জায়গায়, নরম কিছু ছাড়া
ছোট্ট শিশুর বেলায় কত ঘণ্টা ঘুমাল, তার মতোই জরুরি কোথায় আর কীভাবে ঘুমাল। শিশু সবচেয়ে নিরাপদে ঘুমায় চিত হয়ে, নিজের আলাদা শক্ত ও সমান জায়গায়, যেমন আপনার খাটের পাশে একটা ছোট খাটে। সেখানে নরম বা ঢিলেঢালা কিছুই রাখবেন না: বালিশ, কোলবালিশ, লেপ-কাঁথা বা নরম খেলনা — কিছুই না। দিনে-রাতে প্রতিবার ঘুমের সময় এটা মেনে চলুন।
- দিনে-রাতে প্রতিবার ঘুমের সময়, দুপুরের ঘুমেও, চিত করে শোয়ান।
- অন্তত প্রথম ৬ মাস শিশুর খাটটা আপনার ঘরে, আপনার খাটের পাশে রাখুন।
- কোনো রকম বালিশ নয়, ছোট বালিশ বা সরিষার বালিশও নয়: শিশুর মাথার নিচে কিছুই লাগে না।
- লেপ-কাঁথা দিয়ে না ঢেকে আবহাওয়া বুঝে জামা পরান, আর মাথা ও মুখ খোলা রাখুন।
- ঝোলানো দোলনা ঘুমানোর নিরাপদ জায়গা নয়। দোলনায়, কাপড়ের ঝোলায়, গাড়ির সিটে বা কোলে ঘুমিয়ে পড়লে শিশুকে তার নিজের ছোট খাটে চিত করে শুইয়ে দিন।
- শিশুর কাছে ধূমপান নয়; ঘরে কয়েল না জ্বালিয়ে খাটের ওপর মশারি টানান।
- বড়দের খাটে বা সোফায় শিশুকে এক মিনিটের জন্যও একা রেখে যাবেন না: গড়িয়ে পড়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশে অনেক পরিবারেই শিশু বাবা-মায়ের সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমায়। আপনার শিশু যদি আপনার বিছানায় ঘুমায়, এগুলো মেনে চললে ঝুঁকি কমে:
- শিশুকে চিত করে শক্ত তোশকের ওপর শোয়ান; বালিশ, লেপ-কাঁথা, কোলবালিশ আর এমন যেকোনো ফাঁক থেকে দূরে, যেখানে পিছলে পড়ে যেতে বা আটকে যেতে পারে।
- শিশুকে একজন বাবা বা মায়ের পাশে রাখুন; দুজন বড় মানুষের মাঝখানে বা বড় ভাইবোনের পাশে নয়।
- সোফা বা চেয়ারে শিশুকে নিয়ে কখনো ঘুমিয়ে পড়বেন না।
- আপনি বা আপনার সঙ্গী ধূমপান করলে, অ্যালকোহল বা ঝিমুনি আনে এমন কোনো ওষুধ খেয়ে থাকলে, এত ক্লান্ত থাকলে যে খুব গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে পারেন, অথবা শিশু সময়ের আগে বা খুব ছোট হয়ে জন্মালে তাকে নিয়ে এক বিছানায় ঘুমাবেন না।
আমাদের বাসায় শিশুর ঘুম: পরিবারের খাট, গরম আর নানা পরামর্শ
আমাদের দেশে শিশু প্রায়ই পরিবারের মাঝখানেই ঘুমায়: দাদি বা নানি গুনগুন করছেন, পাশে ভাইবোন, মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে। এই কাছে থাকাটা একটা শক্তি। শুধু কয়েকটা অভ্যাস একটু বদলালে ঘুমটা নিরাপদ থাকে:
- সরিষার বালিশ: অনেক পরিবার ভালোবেসে, মাথার গড়ন সুন্দর হবে ভেবে, শিশুকে সরিষার বালিশে শোয়ান। কিন্তু ঘুমের জায়গায় যেকোনো বালিশ শিশুর মুখে চেপে বসে শ্বাস নেওয়া কঠিন করে দিতে পারে, তাই ঘুমের সময় এটা ব্যবহার করবেন না। মাথার পেছন চ্যাপ্টা হওয়ার চিন্তা থাকলে জেগে থাকার সময় চোখের সামনে রেখে কিছুক্ষণ উপুড় করে খেলতে দিন, আর খাটে শিশুর মুখ কোন দিকে থাকবে তা মাঝে মাঝে বদলে দিন।
- কোলবালিশের দেয়াল: শিশু যেন খাট থেকে গড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য অনেক পরিবারে চারপাশে কোলবালিশ বা বালিশ দিয়ে ঘের দেওয়া হয়। এগুলো মুখের ওপর পড়ে যেতে পারে, বা শিশু গড়িয়ে গিয়ে এর গায়ে মুখ চেপে আটকে যেতে পারে, তাই শিশুর জায়গা থেকে দূরে রাখুন। পড়ে যাওয়া ঠেকাতে আপনার খাটের পাশে শিশুর নিজের ছোট খাটই বেশি নিরাপদ।
- কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা: নবজাতককে মুড়িয়ে রাখলে একটা পাতলা সুতির কাপড় ব্যবহার করুন; কাঁধের ওপরে নয়, আর কোমরের কাছে ঢিলা, যাতে পা দুটো ভাঁজ হয়ে দুই দিকে ছড়াতে পারে। শিশুকে সবসময় চিত করে শোয়ান। শিশু গড়াতে চেষ্টা শুরু করলেই মোড়ানো বন্ধ করুন, আর খেয়াল রাখুন মোড়ানো শিশু যেন কখনো বেশি গরম না হয়: গরমের রাতে মোড়ানোর বদলে একটা হালকা সুতির জামাই প্রায়ই বেশি নিরাপদ।
- গরম: ঘরে ফ্যান চলুক, তবে বাতাস যেন সরাসরি শিশুর গায়ে না লাগে; একটা হালকা সুতির জামা, ঘরের ভেতরে টুপি নয়। ঘাড়ের পেছন গরম বা ঘামে ভেজা লাগলে একটা কাপড় খুলে দিন; বিস্তারিত: গরমে বাচ্চা ঘুমাতে পারে না।
- মশারি: তোশকের নিচে চারদিকে ভালো করে গুঁজে দিন, যাতে ঝুলে শিশুর মুখের ওপর না পড়ে। লোডশেডিংয়ের জন্য চার্জার লাইট রাখুন; বিছানা বা মশারির কাছে কখনো মোমবাতি নয়।
- বড় ভাইবোন: ছোট একটা বাচ্চা ঘুমন্ত শিশুকে নিরাপদে রাখতে পারে না। শিশু ঘুমিয়ে থাকলেও ছোট বাচ্চার কাছে তাকে একা রেখে যাবেন না।
শিশুর শান্ত ঘুমের জন্য ৭ দিনের পরিকল্পনা
একবারে একটা পরিবর্তন বেছে নিন, আর প্রতিদিন এক লাইন লিখে রাখুন: শিশু কখন ঘুমাল, কখন জাগল, কখন খেল। এক সপ্তাহ পরে এমন ধরন চোখে পড়বে, যা একটা কঠিন রাত দেখে বোঝা যায় না।
- দিন ১: কিছুই বদলাবেন না। ২৪ ঘণ্টা ধরে প্রতিটা ঘুম, জাগা আর খাওয়ার সময় লিখে রাখুন, আর ঘুমের জায়গাটা দেখে নিন: চিত হয়ে, সমান জায়গায়, নরম কিছু ছাড়া।
- দিন ২: দিন আর রাত আলাদা করুন: দিনে আলো, কথা আর খেলা; রাতে আলো কম, সব চুপচাপ।
- দিন ৩: ঘুমের আগের ছোট একটা রুটিন ঠিক করুন (ডায়াপার, খাওয়ানো, হাত-মুখ মোছা, গান বা দোয়া, আলো কমানো), আর আজ রাতে একই ক্রমে করুন।
- দিন ৪: ঘুমের লক্ষণ খেয়াল করুন; প্রথম হাই বা চোখ ডলাতেই ঘুম পাড়ানো শুরু করুন।
- দিন ৫: আজ অন্তত একবার ঘুম ঘুম ভাব থাকতেই শিশুকে শুইয়ে দিন, আর পেটের ওপর হাত রেখে শান্ত করুন।
- দিন ৬: রাতের খাওয়ানো কম আলোয়, চুপচাপ করুন; খেলা নয়, কথাও কম।
- দিন ৭: দিন ১-এর লেখার সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন: ঘুম পাড়াতে কত সময় লাগল, সবচেয়ে লম্বা ঘুম কতক্ষণ, শিশুর মেজাজ কেমন। যা কাজে দিয়েছে রাখুন, আর পরের ছোট পরিবর্তনটা বেছে নিন।
প্রথম জন্মদিনের পর ঘুম আবার বদলায়। তখন রাতে জাগা নিয়ে পড়ুন বাচ্চা রাতে বারবার জেগে ওঠে; গড়াগড়ি, বসা আর সামনে কী আসছে, তা দেখুন বয়স অনুযায়ী শিশুর বিকাশ লেখায়।
শিশুর ঘুম নিয়ে কখন সাহায্য নেবেন
বেশিরভাগ শিশুর ঘুমের সমস্যা সময়, ঠিকমতো খাওয়ানো আর নিয়মিত রুটিনে কমে আসে। তবে কিছু লক্ষণে ডাক্তার দেখাতে হয়, আর কয়েকটায় ৯৯৯:
এসব হলে ডাক্তার দেখান, বা ৯৯৯-এ ফোন করুন
- শিশুর বয়স ৩ মাসের কম আর জ্বর এসেছে (তাপমাত্রা ৩৮° সেলসিয়াস, অর্থাৎ ১০০.৪° ফারেনহাইট, বা তার বেশি): অন্য সব ঠিক দেখালেও সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার দেখান।
- শিশু অস্বাভাবিক ঝিমিয়ে থাকে, খাওয়ানোর জন্য জাগানো কঠিন হয়, বা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম খায়: সেদিনই ডাক্তার দেখান।
- বেশিরভাগ রাতে জোরে নাক ডাকে, বা ঘুমের মধ্যে প্রায়ই মুখ দিয়ে শ্বাস নেয় বা ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ করে: ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
- বেশিরভাগ দিন মন খারাপ লাগে বা ভীষণ ক্লান্ত লাগে: ডাক্তারকে জানান। সাহায্য বাবা-মায়েরও প্রাপ্য।
- কখনো মনে হয় শিশুকে আঘাত করে ফেলতে পারেন: তাকে চিত করে তার খাটে শুইয়ে কয়েক মিনিটের জন্য অন্য ঘরে যান, আর সেদিনই সাহায্য নিন; এই মুহূর্তে কারও বিপদ হলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
- শিশুর শ্বাস অনেকক্ষণ থেমে থাকলে, শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, ঠোঁট নীল বা ধূসর হয়ে গেলে, অথবা শরীর নেতিয়ে পড়লে, জাগানো খুব কঠিন হলে বা কিছুতেই না জাগলে সঙ্গে সঙ্গে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
রাত ৩টায় নয়, এক সপ্তাহের লেখা দেখলেই শিশুর ঘুমের রুটিন ০–১২ মাস বয়সে কেমন চলছে তা ভালো বোঝা যায়। ParentMind আপনাকে প্রতিদিন কী হলো তা নোট করতে, বারবার যা হচ্ছে তা দেখতে আর গাইড পেতে সাহায্য করে: ParentMind কীভাবে কাজ করে।
বাবা-মায়েরা যা জানতে চান
নবজাতকের ঘুম: দিনে-রাতে কত ঘণ্টা ঘুমানো স্বাভাবিক?
নবজাতক ২৪ ঘণ্টায় ছোট ছোট ভাগে প্রায় ১৪–১৭ ঘণ্টা ঘুমায়, আর দিন-রাত কয়েক ঘণ্টা পরপর খাওয়ার জন্য জাগে। কেউ একটু বেশি, কেউ একটু কম ঘুমায়। খাওয়ানোর জন্য জাগানো খুব কঠিন হলে, বা শিশু স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম খেলে সেদিনই ডাক্তার দেখান।
৯ মাসের শিশু সারারাত ঘুমায় না, রাতে জেগে ওঠে: এটা কি স্বাভাবিক?
হ্যাঁ। ৯ মাসে অনেক শিশু এখনো রাতে এক-দুবার জাগে: খাওয়ার জন্য, আদরের জন্য, বা হামাগুড়ি দেওয়া, দাঁড়াতে শেখার মতো নতুন কিছু শেখার সময়। মোটামুটি তাড়াতাড়ি আবার ঘুমিয়ে পড়লে আর দিনে হাসিখুশি থাকলে সাধারণত চিন্তার কিছু নেই। নিয়মিত ঘুমের রুটিন আর কম আলোয় চুপচাপ রাতের খাওয়ানো অনেক শিশুকে লম্বা সময় ঘুমাতে সাহায্য করে।
৬ মাসের বাচ্চার ঘুম: দিনে কতবার ঘুমায়?
৬ মাসের বেশিরভাগ শিশু দিনে দুই-তিনবার ঘুমায়, প্রায়ই অল্প সময়ের জন্য; সব মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টায় ১২–১৬ ঘণ্টা। অনেকে প্রায় ২ ঘণ্টা জেগে থাকার পর আবার ঘুমাতে চায়। ঘড়ির চেয়ে হাই তোলা আর চোখ ডলা খেয়াল করুন; সামনের কয়েক মাসে দিনের ঘুম সাধারণত দুইবারে এসে দাঁড়ায়।
শিশুকে কি কাঁদতে দিয়ে নিজে নিজে ঘুমাতে শেখানো উচিত?
দরকার নেই। ছোট্ট শিশু কাঁদে কিছু একটা দরকার বলে, আর তাকে আদর করে শান্ত করলে সে নষ্ট হয় না। মোটামুটি ৬ মাস থেকে, চাইলে, ধীরে ধীরে এগোনো যায়: পাশে থেকেই কয়েক সপ্তাহ ধরে একটু একটু করে সাহায্য কমান। শিশুকে কখনো অনেকক্ষণ একা কাঁদতে দেবেন না, আর কখনো ঝাঁকাবেন না।
শিশু কি উপুড় হয়ে বা কাত হয়ে ঘুমাতে পারে?
না। প্রথম বছরে প্রতিবার ঘুমের সময় শিশুকে চিত করে শোয়ান: এটাই সবচেয়ে নিরাপদ। শিশু নিজে নিজে দুই দিকেই গড়াতে শিখলে ঘুমের মধ্যে সে যেভাবে থাকে সেভাবেই থাকতে দিতে পারেন, তবে শোয়ানোর সময় সবসময় চিত করে। উপুড় করে খেলা শুধু জেগে থাকার সময়, চোখের সামনে।
শিশুকে নিজের বিছানায় নিয়ে ঘুমানো কি নিরাপদ?
সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা আপনার খাটের পাশে শিশুর নিজের ছোট খাট। আপনার বিছানায় ঘুমালে শিশুকে চিত করে শক্ত তোশকে, একজন বাবা বা মায়ের পাশে শোয়ান, কাছে কোনো বালিশ, লেপ-কাঁথা বা কোলবালিশ নয়। বাবা বা মা ধূমপান করলে, অ্যালকোহল বা ঝিমুনি আনা ওষুধ খেলে, ভীষণ ক্লান্ত থাকলে, অথবা শিশু সময়ের আগে বা ছোট হয়ে জন্মালে এক বিছানায় ঘুমাবেন না। সোফা বা চেয়ারে শিশুকে নিয়ে কখনো ঘুমাবেন না।
ঘুমের জন্য কি শিশুকে গ্রাইপ ওয়াটার বা সিরাপ দেওয়া যায়?
না, ডাক্তার শিশুকে দেখে লিখে না দিলে নয়। সুস্থ শিশুর ঘুমের ওষুধ, গ্রাইপ ওয়াটার, সিরাপ বা ঘরোয়া টোটকা লাগে না, আর প্রথম জন্মদিনের আগে মধু একদমই দেওয়া যাবে না। শিশুর ঘুম নিয়ে চিন্তা হলে ডাক্তার দেখে কারণ খুঁজে দিতে পারেন।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।




