অতিরিক্ত আদরে বাচ্চা নষ্ট হয় কি? আদর আর আস্কারার তফাত
ছোট করে উত্তর
না, অতিরিক্ত আদরে বাচ্চা নষ্ট হয় না। জড়িয়ে ধরা, সান্ত্বনা, সময় আর মনোযোগ কোনো বয়সেই বাচ্চার ক্ষতি করে না; বরং এতে সে নিজেকে নিরাপদ মনে করে। আচরণ কঠিন হতে পারে আদরের সঙ্গে সীমা না থাকলে: সব আবদার মেনে নেওয়া, কান্না থামাতে কিছু কিনে দেওয়া, আর ওর সব কাজ নিজে করে দেওয়া। আদর রাখুন, সঙ্গে যোগ করুন কয়েকটা শান্ত, স্থির নিয়ম।
লেখাটি শুনুন
১৭ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া
এক নজরে
- কাদের জন্য
- ২–১২ বছরের বাচ্চার বাবা-মা আর দাদা-দাদি, নানা-নানি, যাঁরা ভাবেন বেশি আদর, কোলে নেওয়া বা উপহারে বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কি না
- মূল কথা
- আদরে বাচ্চা নষ্ট হয় না: জড়িয়ে ধরা, সান্ত্বনা, সময় আর চেষ্টার প্রশংসা বাচ্চাকে নিরাপদ বোধ করায়, আর সীমা মেনে নিতেও সাহায্য করে।
- আচরণ কঠিন হতে পারে আস্কারায়: কান্নার পর ‘না’ বদলে ‘হ্যাঁ’ হয়ে যাওয়া, চোখের পানি থামাতে কিছু কিনে দেওয়া, আর যে কাজ বাচ্চা নিজেই পারে তা করে দেওয়া।
- কিছু জিনিসের বদলে সময় দিন: নতুন খেলনার চেয়ে একসঙ্গে ১০ মিনিট খেলা প্রায়ই বাচ্চার কাছে বেশি মূল্যবান।
- দাদা-দাদি আর বাসার অন্য বড়দের সঙ্গে জরুরি দু-তিনটা নিয়ম ঠিক করে নিন, আর বাকি অনেক কিছুতে তাঁদের নিজেদের ‘হ্যাঁ’ থাকুক।
অতিরিক্ত আদরে বাচ্চা নষ্ট হয় কি? অনেক বাবা-মা এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন, প্রায়ই আপনজনদের কথা শুনে: ‘কাঁদলেই কোলে নিয়ো না, কোলের অভ্যাস হয়ে যাবে’, বা ‘এত আদর দিয়ে তো ছেলেটাকে মাথায় তুলেছ’। স্বস্তির কথা হলো, আদর, সান্ত্বনা আর মনোযোগে কোনো বয়সেই বাচ্চা নষ্ট হয় না।
জীবন কঠিন করে তুলতে পারে সীমা ছাড়া আদর, যাকে আমরা বলি আস্কারা: সব আবদার মেনে নেওয়া, কান্না থামাতে কিছু কিনে দেওয়া, বাচ্চার সব কাজ নিজে করে দেওয়া। নিচে পাবেন আদর আর আস্কারার তফাত, কোন লক্ষণে খেয়াল রাখবেন, কাছের সম্পর্ক না হারিয়ে কীভাবে সীমা যোগ করবেন, দাদা-দাদির আদর আর উপহারের কথা, আর ৭ দিনের একটা পরিকল্পনা।
কোলে নেওয়া, সান্ত্বনা আর মনোযোগ: অতিরিক্ত আদরে বাচ্চা নষ্ট হয় কি?
বাচ্চাকে বেশি আদর দিলে কী হয়? সে নিজেকে নিরাপদ মনে করে; কোনো পরিমাণ আদরেই বাচ্চা নষ্ট হয় না। কোলের শিশু থেকে ১২ বছরের বাচ্চা, সব বয়সের বাচ্চাই ভালো থাকে, যখন তারা আদর, সান্ত্বনা আর মনোযোগ পায়। যে বাচ্চা জানে তাকে ভালোবাসা হয়, সে প্রায়ই সীমা সহজে মেনে নেয়, কারণ যে মানুষটা তাকে সত্যিই ভালোবাসেন, তাঁর মুখের ‘না’ তার কাছে কঠোর লাগে না, বরং ভরসার লাগে।
- কাঁদলে ছোট্ট শিশুকে কোলে নেওয়া আর শান্ত করা। শিশু কাঁদে তার কিছু দরকার বলে; সাড়া দিলে তৈরি হয় ভরসা, বদভ্যাস নয়।
- জড়িয়ে ধরা, চুমু, কোলে বসতে দেওয়া আর ‘তোমাকে ভালোবাসি’ বলা, প্রতিদিন, যে কোনো বয়সে।
- বাচ্চা ব্যথা পেলে, ভয় পেলে বা মন খারাপ হলে সান্ত্বনা দেওয়া, কারণটা আপনার কাছে ছোট মনে হলেও।
- সময় আর মনোযোগ: একসঙ্গে খেলা, কথা শোনা, গল্প পড়া, আর ওর দিনটা কেমন গেল জানতে চাওয়া।
- চেষ্টা আর ভালো ব্যবহারের নির্দিষ্ট প্রশংসা। বয়স অনুযায়ী উদাহরণ পাবেন সন্তানের প্রশংসা করার উপায় লেখায়।
তাই কেউ যদি বলেন বেশি কোলে নিলে বাচ্চা নষ্ট হয়, সোজা উত্তর হলো: না। বরং ভেবে দেখার মতো প্রশ্ন হলো, আদরের পাশাপাশি বাচ্চার জীবনে কয়েকটা স্পষ্ট সীমা আছে কি না, আর নিজের কাজ নিজে করার সুযোগ সে পাচ্ছে কি না।
তাহলে বাচ্চা নষ্ট হয় কিসে? আদর আর আস্কারার তফাত
আমরা যাকে ‘নষ্ট হয়ে যাওয়া’ বলি, তা সাধারণত বেশি আদরের ফল নয়, আস্কারার ফল। মাঝে মাঝে মেনে নেওয়া মানুষমাত্রই করে; আসল ব্যাপার হলো রোজকার ধরনটা, আর তা প্রায়ই গড়ে ওঠে এমন অভ্যাস থেকে, যার শুরু ভালোবাসা থেকেই:
- কোনো সীমা না থাকা, বা মেজাজের সঙ্গে সীমা বদলে যাওয়া: আজ ‘না’, কাল ‘হ্যাঁ’।
- সব আবদার মেনে নেওয়া, বিশেষ করে ঘ্যানঘ্যান বা কান্নার পর। বাচ্চা তাড়াতাড়িই শিখে যায়, কাঁদলে ‘না’ বদলে ‘হ্যাঁ’ হয়।
- কান্না থামাতে কিছু কিনে দেওয়া, বা হাতে মোবাইল ধরিয়ে দেওয়া। এক মিনিটের জন্য কাজ হয়, কিন্তু পরের বার কান্না প্রায়ই আরও জোরে হয়।
- যে কাজ বাচ্চা নিজেই পারে, তা-ও করে দেওয়া: জুতা পরানো, বোতাম লাগানো, স্কুলব্যাগ গোছানো, খাওয়ার পর প্লেট তোলা।
- প্রতিটা হতাশা থেকে বাঁচিয়ে দেওয়া, ফলে খেলায় হারা, ‘না’ শোনা বা অপেক্ষা করা বাচ্চা কখনো সামলাতে শেখে না।
- সময়ের বদলে জিনিস: লম্বা অফিস, বা দূরে থাকা বাবা-মায়ের অভাব উপহার দিয়ে পূরণ করার চেষ্টা।
‘আদর না শাসন?’ আমরা অনেকেই প্রশ্নটা এমনভাবে শুনে বড় হয়েছি, যেন যেকোনো একটা বেছে নিতে হবে। আসলে বাচ্চার দরকার দুটোই: অঢেল আদর, আর মারধর বা চিৎকার ছাড়া শান্ত, স্থির শাসন। মারধর আর চিৎকারে সময়ের সঙ্গে আচরণ সাধারণত আরও খারাপ হয়।
| আদর (নষ্ট করে না) | আস্কারা (কঠিন করতে পারে) |
|---|---|
| ‘না’ শুনে কাঁদলে জড়িয়ে ধরা | কান্না থামাতে ‘না’ বদলে ‘হ্যাঁ’ বলা |
| মোবাইল ছাড়া ১০ মিনিট একসঙ্গে খেলা | অপরাধবোধ হলেই নতুন একটা খেলনা |
| কঠিন ধাঁধা মেলাতে একটু সাহায্য করা | ওর হোমওয়ার্ক নিজে করে দেওয়া |
| ‘তুমি হাল ছাড়োনি। দারুণ!’ | ছোট ছোট সব কাজে মজার খাবার বা উপহার |
| নিয়ম নিয়ে ওর মনের কথা শোনা | তর্ক করলেই নিয়ম তুলে নেওয়া |
অতিরিক্ত আদুরে সন্তানের লক্ষণ: আসলে কী বোঝায়?
অনলাইনে ‘নষ্ট বাচ্চার লক্ষণ’-এর তালিকা দেখে অনেক স্নেহশীল বাবা-মায়ের মনে হয়, তাঁদের বিচার করা হচ্ছে। এর বেশির ভাগ আচরণ ২–৪ বছরে স্বাভাবিক, আর যে কোনো বয়সে এগুলো সাধারণত বোঝায় একটা দক্ষতা এখনো তৈরি হয়নি; বাচ্চা খারাপ বা আপনি ব্যর্থ, তা নয়। যেসব লক্ষণে বোঝা যায় বাচ্চার আরও দৃঢ় কিন্তু নরম সীমা দরকার:
- মোটামুটি ৫ বছরের পরও বেশির ভাগ ‘না’ শুনলেই অনেকক্ষণ কান্নাকাটি আর জেদ।
- নিজে যা পারে, তা-ও অন্যরা করে দেবে বলে ধরে নেয়, আর কেউ না করলে রেগে যায়।
- নতুন জিনিসে আনন্দ থাকে এক দিন, তারপরই ‘ভাল্লাগে না, আরেকটা কিনে দাও’।
- অপেক্ষা করা, ভাগ করে নেওয়া বা পালা করে খেলা ওর পক্ষে সমবয়সী অন্য বাচ্চাদের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
- যাঁরা ওকে সাহায্য করেন, তাঁদের সঙ্গে প্রায়ই খারাপ ব্যবহার করে: দাদা-দাদি, শিক্ষক বা গৃহকর্মী।
- এমন ভাব করে যেন নিয়ম শুধু অন্যদের জন্য: ‘আমি কেন করব?’
কোনো বাচ্চা জন্ম থেকে এমন হয় না। প্রতিটা আচরণই বদলাতে পারে একই দুটো উপাদানে: প্রচুর আদর, আর এমন সীমা, যা টলে না।
আদর না কমিয়ে আস্কারা কমাবেন যেভাবে
যদি মনে হয় অনেক বেশি মেনে নিচ্ছেন, তাহলে আদর কমাতে বা রাতারাতি কড়া হতে হবে না। এই ধাপগুলোতে উষ্ণতা থাকে, সঙ্গে যোগ হয় সীমা:
- সব আদর রাখুন। শাস্তি হিসেবে বা সমস্যা সামলাতে কখনো আদর বন্ধ করবেন না; আপনার আদরই সীমাকে বাচ্চার কাছে নিরাপদ করে তোলে।
- সবচেয়ে জরুরি তিনটা নিয়ম বেছে নিন, যেমন দোকানের কাউন্টারে কিছু কেনা হবে না, কান্না থামাতে মোবাইল দেওয়া হবে না, আর নিজের জুতা নিজে পরবে। নিয়ম কম হলে রাখা সহজ।
- উত্তর দেওয়ার আগে ঠিক করুন, তারপর নরমভাবে অটল থাকুন। একবার ‘না’ বলুন, কান্নার সময় পাশে থাকুন, কিন্তু কান্নার কারণে উত্তর বদলাবেন না। ধাপে ধাপে কী বলবেন, আছে বাচ্চা বায়না করলে কী করবেন লেখায়।
- কিছু জিনিসের বদলে সময় দিন। দিনে ১০ মিনিট মোবাইল ছাড়া খেলা, যেখানে খেলা বাছবে বাচ্চা, প্রায়ই সেই ফাঁক পূরণ করে, যা উপহার দিয়ে পূরণ করার চেষ্টা হয়; দেখুন সন্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার উপায়।
- ছোট কাজগুলো বাচ্চাকে ফিরিয়ে দিন। বয়স অনুযায়ী যা পারে তা নিজেকে করতে দিন, ধীরে হলেও: জুতা পরা, স্কুলব্যাগ গোছানো, নিজের প্লেট নিয়ে যাওয়া। বয়স অনুযায়ী কাজের তালিকা আছে বাচ্চাকে নিজের কাজ নিজে করতে শেখানো লেখায়।
- ছোটখাটো হতাশা আসতে দিন। লুডুতে হারা বা শুক্রবারের জন্য অপেক্ষা করার মধ্য দিয়েই বাচ্চা মানিয়ে নেওয়া অনুশীলন করে; সমাধান করে না দিয়ে পাশে থাকুন।
- ধন্যবাদ দেওয়া আর অন্যকে দেওয়া অনুশীলন করুন। খাওয়ার সময় একটা ধন্যবাদ, প্রতিবেশীকে একটু সাহায্য, বা ছোট হয়ে যাওয়া জামা দরকারি কাউকে দিয়ে দেওয়া, এগুলো ‘সব আমার পাওনা’ মনোভাবের উল্টোটা তৈরি করে।
যা বলতে পারেন
- তোমাকে অনেক ভালোবাসি, তবু উত্তরটা ‘না’।
- তোমার মন খারাপ, বুঝতে পারছি। আমি পাশেই আছি। তবু আজ এটা কিনব না।
- আদর যখন খুশি, যতবার খুশি। খেলনা আসবে জন্মদিনে আর ঈদে।
- বোতামগুলো তুমি নিজেই লাগাতে পারবে। আমি অপেক্ষা করছি।
- চলো, এটা তোমার ইচ্ছের তালিকায় লিখে রাখি।
- প্লেটটা নিয়ে যাওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমার খুব সুবিধা হলো।
আদরে বাচ্চা নষ্ট হয় না। সীমা ছাড়া আদর বড় হওয়াটাকে কঠিন করে তুলতে পারে।
২ থেকে ১২ বছর: কোন বয়সে আদর আর সীমা কেমন হবে?
| বয়স | যে আদর কাজে দেয় | যে সীমা কাজে দেয় |
|---|---|---|
| ২–৩ বছর | প্রচুর কোলে নেওয়া, প্রতিটা মন খারাপে সান্ত্বনা, একসঙ্গে সহজ খেলা | অল্প কয়েকটা সহজ নিয়ম, মন অন্যদিকে ঘোরানো, রোজকার রুটিন; জেদের কাছে হার না মানা |
| ৪–৬ বছর | গল্প, আলাদা করে দেওয়া সময়, চেষ্টা খেয়াল করা | ‘আগে এটা, তারপর ওটা’ (‘আগে খেলনা তোলো, তারপর কার্টুন’), ছোট কাজ, অল্প সময় অপেক্ষা, ধন্যবাদ বলা |
| ৭–৯ বছর | মন দিয়ে শোনা, বাবা আর মা দুজনের সঙ্গেই আলাদা সময়, হাসিঠাট্টা আর খেলা | রোজকার ঘরের কাজ, ইচ্ছের তালিকা বা টাকা জমানোর কৌটা, নিজের ছোট ভুল নিজে ঠিক করতে দেওয়া |
| ১০–১২ বছর | ওর জগৎ নিয়ে আগ্রহ, বিশ্বাস, স্কুলে যাওয়ার পথে গল্প | স্ক্রিন আর টাকা নিয়ে একসঙ্গে ঠিক করা নিয়ম, ঘরের কাজে সত্যিকারের সাহায্য, বোঝার মতো পরিণতি |
‘আদুরে বাচ্চা’ বলতে আসলে বোঝায় এমন ছোট বাচ্চা, যে এখনো অপেক্ষা করতে শেখেনি, আর ২ বছরে কোনো বাচ্চাই তা শেখে না। ধৈর্য, পালা করে খেলা আর ‘না’ মেনে নেওয়া ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে প্রাইমারি স্কুলের বছরগুলো জুড়ে, শান্তভাবে বারবার অনুশীলনের মধ্য দিয়ে।
আমাদের বাসায়: দাদা-দাদির আদর, উপহার আর অনেক হাতের যত্ন
আমাদের অনেক পরিবারে একটা বাচ্চাকে একসঙ্গে অনেক মানুষ ভালোবাসেন: বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-খালা, আর প্রায়ই গৃহকর্মী। এই আন্তরিকতা সত্যিকারের শক্তি। ‘অতিরিক্ত আদরে বাচ্চা নষ্ট হয় কি’, এই প্রশ্ন সাধারণত ওঠে তখনই, যখন এই আদরের মানুষগুলো আলাদা আলাদা নিয়ম মানেন। ‘আস্কারা দিলে বাচ্চা মাথায় ওঠে’, এই কথাটাও আসলে আদর নিয়ে নয়, নিয়ম না থাকা নিয়ে।
দাদা-দাদি, নানা-নানির আদর
দাদা-দাদি বা নানা-নানির ‘হ্যাঁ’ প্রায় সবসময় আসে গভীর ভালোবাসা থেকে, আর এতদিনে প্রাণ খুলে দিতে পারার আনন্দ থেকে। আলাদা করে কথা বলুন, বাচ্চার সামনে কখনো নয়; তাঁদের ধন্যবাদ দিন, আর শুধু দু-তিনটা নিয়মে সাহায্য চান, যেমন খাওয়ার আগে মিষ্টি আর ঘুমের সময় মোবাইল। মজার খাবার আর নিজেদের কিছু ‘হ্যাঁ’ তাঁদের হাতেই থাকুক। এ নিয়ে কীভাবে কথা বলবেন, বিস্তারিত আছে দাদা-দাদির আদর আর বাবা-মায়ের নিয়ম লেখায়।
সবার ছোট বাচ্চা আর প্রথম নাতি-নাতনি
সবার ছোট বাচ্চা, প্রথম নাতি-নাতনি, বা অনেক অপেক্ষার পর আসা সন্তান প্রায়ই সবচেয়ে বেশি আদর পায়, আর তাতে দোষ নেই। শুধু দুটো জিনিস খেয়াল রাখুন: নিয়ম যেন ওর জন্য বেঁকে না যায়, অথচ ভাইবোনের জন্য ঠিক থাকে; আর ভাইবোনেরা যেন নিজেদের কম ভালোবাসার মানুষ মনে না করে। বাচ্চাদের কাছে সমান উপহারের চেয়ে ন্যায্য আচরণই সাধারণত বেশি জরুরি।
ঈদের সালামি আর বিদেশ থেকে আসা উপহার
বিদেশে থাকা আত্মীয়রা আর ঈদ অনেক সময় একসঙ্গে অনেক উপহার আর টাকা নিয়ে আসে। আত্মীয়দের নরমভাবে বলুন, অনেকগুলোর বদলে একটা জিনিস পাঠাতে। আর ঈদের সালামি নিয়ে বাচ্চাকেই ঠিক করতে দিন: কিছুটা খরচ, কিছুটা মাটির ব্যাংকে জমা, কিছুটা কাউকে দেওয়া।
গৃহকর্মী আর অনেক হাতের সাহায্য
গৃহকর্মী বা আত্মীয়রা বাচ্চার সব কাজ করে দিলে বাচ্চা নিজে করার বদলে হুকুম দিতে শিখতে পারে। যাঁরা সাহায্য করেন, সবাইকে বলুন বাচ্চার ছোট কাজগুলো ওকেই করতে দিতে; আর বাসার সবার সঙ্গে, যাঁরা এখানে কাজ করেন তাঁদের সঙ্গেও, ‘প্লিজ’ আর ‘ধন্যবাদ’ বলা আশা করুন।
দাদা-দাদি আর আত্মীয়দের জন্য কথা
- আব্বা, আপনার আদরই ওর সবচেয়ে বড় পাওয়া। শুধু একটা নিয়মে একটু সাহায্য করবেন? কাঁদলে মোবাইল দেওয়া হবে না।
- খালামণি, এই ঈদে পাঁচটার বদলে একটা উপহার পাঠাবে? একটা পেলে ও সেটা অনেক যত্নে রাখবে।
- ব্যাগটা ওকেই নিতে দিন, প্লিজ। নিজে করলে ও খুব খুশি হয়।
৭ দিনের পরিকল্পনা: আদর থাকুক, সঙ্গে আসুক সীমা
- দিন ১: খেয়াল করুন। যতবার মেনে নিয়েছেন, কান্না থামাতে কিছু কিনে দিয়েছেন, বা বাচ্চা নিজে পারে এমন কাজ করে দিয়েছেন, লিখে রাখুন, আর ঠিক আগে কী হয়েছিল তা-ও। এখনই কিছু বদলাবেন না।
- দিন ২: আপনার তিনটা নিয়ম বেছে নিন, আর প্রতিদিন আদর বা গল্পের একটা সময় ঠিক করুন, যা কখনো কেড়ে নেওয়া হবে না।
- দিন ৩: মোবাইল ছাড়া ১০ মিনিটের বিশেষ সময় শুরু করুন, যেখানে খেলা বাছবে বাচ্চা।
- দিন ৪: রোজকার একটা ছোট কাজ বাচ্চাকে ফিরিয়ে দিন, যেমন জুতা পরা, স্কুলব্যাগ গোছানো বা প্লেট তোলা, আর এর জন্য ধন্যবাদ দিন।
- দিন ৫: একসঙ্গে ইচ্ছের তালিকা বা টাকা জমানোর কৌটা শুরু করুন, আর পরের বার কিছু চাইলে সেটাই কাজে লাগান।
- দিন ৬: দাদা-দাদি, আত্মীয় বা গৃহকর্মীর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলুন: আপনার তিনটা নিয়ম, আর সবাই কোন কথাগুলো বলবেন।
- দিন ৭: দিন ১-এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন: কতবার মেনে নিলেন, প্রতিবাদ কতক্ষণ চলল, বাচ্চা নিজের কাজটা কেমন সামলাল। যা কাজে দিয়েছে তা রাখুন, আর একটা জিনিস বদলান।
আবদার আর জেদ নিয়ে কখন সাহায্য নেবেন
আদর আর সীমা একসঙ্গে এলে অনেক বাচ্চাই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মানিয়ে নেয়। তবে নিচের কোনোটি দেখলে বাচ্চার ডাক্তার, শিশু-মনোবিজ্ঞানী বা স্কুলের সঙ্গে কথা বলুন:
এমন হলে সাহায্য নিন
- ৫ বছরের পরেও প্রায় প্রতিদিন ‘না’ শুনলেই অনেকক্ষণ জেদ আর কান্না চলে, আর কয়েক সপ্তাহ স্থির, নরম সীমার পরও তা আরও লম্বা বা ঘনঘন হচ্ছে।
- চাওয়া না মিটলে বাচ্চা প্রায়ই মানুষ বা প্রাণীকে আঘাত করে, বা জিনিস ভাঙে।
- আবদারের সঙ্গে মন খারাপ: দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে বেশির ভাগ দিন দুঃখী, খিটখিটে বা কান্নাভেজা, বা আগের পছন্দের কাজেও আর আনন্দ নেই।
- হঠাৎ পরিবর্তন: একটু বড় বাচ্চা হঠাৎ আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা বা জিনিস চাইছে, বাসা থেকে জিনিস হারাচ্ছে, বা ভীত কিংবা চুপচাপ হয়ে গেছে। কেউ হয়তো ওকে চাপ দিচ্ছে: আলতো করে জিজ্ঞেস করুন, বাচ্চার কথা বিশ্বাস করুন, সেদিনই ব্যবস্থা নিন, আর এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
- বাচ্চাকে নিয়ে বাসার বড়দের মতের অমিল প্রায় প্রতি সপ্তাহে চিৎকার-চেঁচামেচিতে গড়ায়: একজন পারিবারিক কাউন্সেলর সবাইকে এক পরিকল্পনায় আনতে সাহায্য করতে পারেন।
- মনে হচ্ছে বাচ্চাকে আঘাত করে ফেলতে পারেন: বাচ্চা নিরাপদে আছে কি না নিশ্চিত করুন, সরে যান, আর সেদিনই সাহায্য নিন। কেউ বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
তাহলে অতিরিক্ত আদরে বাচ্চা নষ্ট হয় কি? না, আর আদর মেপে দেওয়ারও দরকার নেই। ParentMind আপনাকে প্রতিদিন কী হলো তা নোট করতে সাহায্য করে, যেমন কখন আবদার সবচেয়ে বেশি হয় আর কী কাজে দিল, যাতে ধরনগুলো সহজে চোখে পড়ে; ParentMind কীভাবে কাজ করে দেখুন।
বাবা-মায়েরা যা জানতে চান
বেশি কোলে নিলে কি শিশুর কোলের অভ্যাস হয়ে যায়?
না। শিশু কাঁদে তার কিছু দরকার বলে; কোলে নেওয়া, খাওয়ানো আর শান্ত করায় তৈরি হয় ভরসা, বদভ্যাস নয়। কাঁদলে যে শিশু তাড়াতাড়ি সান্ত্বনা পায়, সে প্রায়ই বড় হয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে চারপাশ ঘুরে দেখে। খুব ক্লান্ত লাগলে আর শিশু কোলে ঘুমিয়ে পড়লে তাকে চিত করে শুইয়ে দিন তার নিজের আলাদা শক্ত ও সমান জায়গায়, যেখানে নরম বা ঢিলেঢালা কিছু নেই; সোফা বা চেয়ারে শিশুকে নিয়ে কখনো ঘুমিয়ে পড়বেন না।
আদুরে বাচ্চার লক্ষণ কী, কীভাবে বুঝব?
মানুষ সাধারণত যে লক্ষণগুলোর কথা বলেন: মোটামুটি ৫ বছরের পরও বেশির ভাগ ‘না’ শুনলেই অনেকক্ষণ জেদ, নিজে পারে এমন কাজও অন্যরা করে দেবে বলে আশা করা, নতুন জিনিসে তাড়াতাড়ি আগ্রহ হারানো, আর যাঁরা সাহায্য করেন তাঁদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার। এগুলো সাধারণত বোঝায় একটা দক্ষতা এখনো শেখা হয়নি, যেমন অপেক্ষা করা বা ‘না’ মেনে নেওয়া। স্থির সীমা আর প্রচুর আদরে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এগুলো কমে আসতে পারে।
দাদা-দাদির আদরে কি বাচ্চা নষ্ট হয়?
তাঁদের আদরে নয়; কাছের দাদা-দাদি, নানা-নানির কাছ থেকে বাচ্চা অনেক কিছু পায়। সমস্যা সাধারণত হয় তখনই, যখন আপনার জরুরি নিয়মগুলো তাঁদের ‘হ্যাঁ’-তে নিয়মিত ভেঙে যায়, আর বাচ্চা শেখে যে ‘হ্যাঁ’ বলেন তাঁর কাছে যেতে হয়। আলাদা করে আন্তরিকভাবে কথা বলুন, একসঙ্গে দু-তিনটা নিয়ম ঠিক করুন, আর মজার খাবার আর নিজেদের অনেক ‘হ্যাঁ’ তাঁদের হাতেই রাখুন।
বাচ্চার সব আবদার মেটানো উচিত কি?
না, আর এ নিয়ে অপরাধবোধেরও দরকার নেই। মাঝে মাঝে ‘না’ শোনা আর কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করার মধ্য দিয়েই বাচ্চা ধৈর্য আর হতাশা সামলানো শেখে। যেসব ছোট জিনিসে কিছু আসে-যায় না, সেখানে সহজে ‘হ্যাঁ’ বলুন; জরুরি অল্প কয়েকটার জন্য শান্ত ‘না’ রাখুন; আর জন্মদিন আর ঈদের জন্য একটা ইচ্ছের তালিকা রাখুন, যাতে বাচ্চা বোঝে আপনি শুনেছেন।
অনেক আস্কারা দিয়ে ফেলেছি, এখন কি আর বদলানো যাবে?
যাবে। যে কোনো বয়সের বাচ্চা নতুন সীমার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, বিশেষ করে আদর যখন আগের মতোই থাকে। একটু বড় বাচ্চাকে পরিবর্তনটা একবার বুঝিয়ে বলুন (‘আমরা ঠিক করেছি যে...’), দু-তিনটা নিয়ম দিয়ে শুরু করুন, আর থিতু হওয়ার আগে এক-দুই সপ্তাহ বেশি প্রতিবাদ হবে, এটা ধরে নিন। কোনো একটা নিয়মের চেয়ে বেশি জরুরি হলো প্রতিবার, নরমভাবে, কথা রাখা।
একমাত্র সন্তান কি বেশি আদুরে হয়?
একমাত্র সন্তান বলেই নয়। সব বাচ্চার আচরণ গড়ে ওঠে একই জিনিসে: আদর, কয়েকটা স্থির সীমা, ছোট ছোট কাজ, আর ভাগ করা ও অপেক্ষা করার সুযোগ। একমাত্র সন্তান বাসায় হয়তো ভাগ করা বা পালা করে খেলার সুযোগ একটু কম পায়, তাই কাজিন, প্রতিবেশী আর সহপাঠীদের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটানো কাজে দিতে পারে। অনেক একমাত্র সন্তান বড় হয় উদার, ধৈর্যশীল আর দয়ালু মানুষ হয়ে।
আদর আর আস্কারার মধ্যে তফাত কী?
আদর মানে স্নেহ, সান্ত্বনা, সময় আর মনোযোগ; এর কোনো ‘বেশি’ নেই। আস্কারা মানে সীমা তুলে নেওয়া: সব আবদার মেনে নেওয়া, কান্নার কারণে ‘না’ বদলে ফেলা, বা বাচ্চার সব কাজ করে দেওয়া। আদরে বাচ্চা নিরাপদ বোধ করে; সারাক্ষণ আস্কারা পেলে অপেক্ষা করা, ভাগ করা আর ‘না’ মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে। চেষ্টা করুন প্রথমটা প্রচুর, দ্বিতীয়টা কম দিতে।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।



