দাদা-দাদির আদরে সন্তান নিয়ম মানে না? সম্মান রেখে নিয়ম ধরে রাখার উপায়
ছোট করে উত্তর
দাদা-দাদির আদরে সন্তান নিয়ম মানে না, এমন সমস্যা খুব সাধারণ, আর এর পেছনে সাধারণত থাকে ভালোবাসা। দুই-তিনটা জরুরি নিয়মে একমত হোন, যেমন ঘুম, নিরাপত্তা আর গায়ে হাত না তোলা; বাকিটা থাকুক তাঁদের বিশেষ আদর। আলাদা করে, আগে ধন্যবাদ দিয়ে, কারণ বুঝিয়ে কথা বলুন; বাচ্চার সামনে তর্ক নয়। কেউ বাচ্চার গায়ে হাত তুললে বা ভয় দেখালে সেদিনই থামান।
লেখাটি শুনুন
১৬ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া
এক নজরে
- কাদের জন্য
- যাদের সন্তান দাদা-দাদি বা নানা-নানির কাছে সময় কাটায়: একই বাসায়, দাদাবাড়ি-নানাবাড়িতে, বা প্রতিদিন অফিসের সময়টা
- মূল কথা
- বেশিরভাগ নিয়ম ভাঙার পেছনে থাকে ভালোবাসা আর নিজেদের সময়ের অভ্যাস, তাই দোষ দিয়ে নয়, ধন্যবাদ দিয়ে কথা শুরু করুন।
- কয়েকটা নিয়মে অটল থাকুন (নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, ঘুম আর গায়ে হাত না তোলা), আর ছোটখাটো আদর-আহ্লাদ থাকুক তাঁদের বিশেষ সম্পর্কের অংশ হয়ে।
- আলাদা করে কথা বলুন, আর পারলে যার বাবা-মা, তিনিই কথাটা তুলুন।
- দাদা-দাদি বা নানা-নানি বাচ্চার গায়ে হাত তুললে, ভয় দেখালে বা লজ্জা দিলে সেদিনই শান্তভাবে থামান।
রাতের খাবারের ঠিক আগে দাদির ঘর থেকে বাচ্চা চকলেট হাতে বেরোয়, কিংবা আপনি “না” বলতেই নানা নিজের মোবাইলটা ধরিয়ে দেন। দাদা-দাদির আদরে সন্তান নিয়ম মানে না, এটা অনেক পরিবারের খুব চেনা দুশ্চিন্তা, আবার খুব নাজুকও: আপনি তাঁদের ভালোবাসেন, তাঁরা আপনার সন্তানকে ভালোবাসেন, আর ঝগড়া কেউই চান না।
ভালো খবর হলো, বড়দের কাছে কিছু নিয়ম আলাদা হলে বাচ্চারা সাধারণত মানিয়ে নেয়, যদি নিরাপত্তা আর সুস্থতার নিয়মগুলো এক থাকে। সব লড়াইয়ে জিততে হবে না: দরকার ছোট একটা তালিকা, যা সবাই মানবে, আর সেটা চাওয়ার একটা নরম উপায়।
নিচে পাবেন: কোন নিয়মগুলো জরুরি, বড়দের কী বলবেন, মিষ্টি, মোবাইল আর ঘুমের সময়, গায়ে হাত তোলা আর লজ্জা দেওয়া, ৭ দিনের পরিকল্পনা, আর কখন সাহায্য নেবেন।
নানি-দাদি বাচ্চাকে বেশি আদর দেন কেন?
নাতি-নাতনিকে দাদা-দাদির বাড়তি আদর পরিবারের মতোই পুরোনো। এর বেশিরভাগটাই ভালোবাসা, যেখানে সময় বেশি আর চাপ কম: স্কুলে পাঠানো, হোমওয়ার্ক আর ঘুম পাড়ানোর দায় এখন আর তাঁদের নয়। এর সঙ্গে প্রায়ই আরও কিছু কারণ থাকে:
- তাঁরা সন্তান মানুষ করেছেন অন্য এক সময়ে, যখন চড়-থাপ্পড়, কান্না থামাতে মিষ্টি, বা নবজাতকের মুখে একটু মধু দেওয়াটা স্বাভাবিক মনে হতো।
- অনেক বড় মানুষের কাছে “হ্যাঁ” বলাটাই ভালোবাসা দেখানোর উপায়। মিষ্টি দিতে না দিলে তাঁদের মনে হতে পারে, আদর করতেই দেওয়া হচ্ছে না।
- তাঁরা নিজেদের অবহেলিত ভাবতে পারেন। কমবয়সী বাবা-মায়ের নতুন নিয়ম শুনে মনে হতে পারে, “আমরা তাহলে ভুল করেছি”, যদিও কেউ তা বলেননি।
- বাচ্চারা খুব তাড়াতাড়ি শেখে। “দাদি তো দেয়!” একটা চালাক চাল, আর বড়রা যখন বাচ্চার সামনেই দ্বিমত করেন, তখন এটা সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
এর পেছনের ভালোবাসাটা দেখতে পেলে পরের ধাপ সহজ হয়। আপনি তাঁদের কম ভালোবাসতে বলছেন না; শুধু কয়েকটা ব্যাপারে আপনার মতো করে সাহায্য চাইছেন।
দাদা-দাদির আদরে সন্তান নিয়ম মানে না: কোন নিয়মগুলো সত্যিই জরুরি?
সব আত্মীয়ের কাছে সব নিয়ম ধরে রাখা যায় না, আর চেষ্টা করলে সাধারণত ঝগড়াই বাধে। বেছে নিন সেই কয়েকটা, যা বাচ্চার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য আর ঘুম রক্ষা করে; বাকিগুলো থাকুক দাদা-দাদির সঙ্গে কাটানো সময়ের বিশেষ ছাড় হয়ে।
| বিষয় | অটল থাকুন | ছাড় দেওয়া যায় |
|---|---|---|
| মারধর, ভয় দেখানো আর লজ্জা দেওয়া | কারও কাছ থেকেই নয়, “একটু আধটু চড়”-ও নয় | কখনো নয় |
| বাসার নিরাপত্তা | ছোট বাচ্চার বারান্দায় খেলা নয়; পানি, সিঁড়ি আর চুলার কাছে সবসময় একজন বড় মানুষের নজর | কখনো নয় |
| ওষুধ আর টোটকা | শুধু যেটায় আপনি সম্মতি দিয়েছেন; প্রথম জন্মদিনের আগে একফোঁটাও মধু নয় | তাঁদের হাতের স্বাস্থ্যকর ঘরের রান্না |
| ঘুম | স্কুলের রাতে স্বাভাবিক ঘুমের সময় | সাপ্তাহিক ছুটির দিনে, ঈদে আর স্কুল ছুটিতে একটু রাত জাগা |
| মোবাইল-টিভি | ১৮ মাসের কম বয়সে ভিডিও কল ছাড়া কিছু নয়; খাওয়ার সময় মোবাইল নয় | দৈনিক সীমার মধ্যে পাশে বসে ছোট একটা কার্টুন বা অনুষ্ঠান |
| মিষ্টি-চকলেট | খাবারের বদলে নয়, কান্না থামাতেও নয় | খাবারের পর একটু, বা বিশেষ বেড়ানোর দিনে |
বড়দের সঙ্গে নিয়ম নিয়ে কথা বলার উপায়: মনে কষ্ট না দিয়ে
দাদা-দাদির আদরে সন্তান নিয়ম মানে না, আর সেটা যখন রোজকার ব্যাপার, তখন অনেকগুলো ছোট ঝগড়ার চেয়ে একটা শান্ত আলাপ সাধারণত বেশি কাজে দেয়। বেশিরভাগ পরিবারে এই ধাপগুলো কাজে দেয়:
- আগে স্বামী-স্ত্রী দুজনে একমত হোন। আপনাদের মধ্যে ফাঁক থাকলে দাদা-দাদি সেটা সঙ্গে সঙ্গে টের পান; কীভাবে এক হবেন, পাবেন সন্তান পালনে বাবা-মায়ের মতের অমিল লেখায়।
- পারলে যার বাবা-মা, তিনিই কথা বলুন। বেশিরভাগ বড় মানুষ নিজের ছেলে বা মেয়ের মুখ থেকে অনুরোধটা সহজে নেন।
- শান্ত, একান্ত একটা সময় বেছে নিন, যেমন চায়ের টেবিলে; বাচ্চার সামনে বা তর্কের মাঝখানে কখনো নয়।
- শুরু করুন ধন্যবাদ দিয়ে, মন থেকে: তাঁরা বাচ্চার জন্য যা করেন, তার একটা কথা বলুন।
- একবারে এক-দুটো জিনিস চান, সঙ্গে কারণটাও: “রাতের খাবারের আগে মিষ্টি খেলে ও ভাত খায় না, তারপর রাতে খিদেয় ঘুম ভেঙে যায়।”
- শুধু “না”-এর তালিকা নয়, একটা ভূমিকা দিন: ঘুমের আগের গল্প, বিকেলের হাঁটা, একটা দোয়া বা ছড়া শেখানো।
- কোনগুলোয় ছাড় চলবে, তা-ও ঠিক করে নিন, তারপর এক-দুই সপ্তাহ পর নরমভাবে আবার কথা বলুন।
দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে যা বলতে পারেন
- আম্মা, ও আপনাকে পেয়ে কত ভাগ্যবান। একটা ব্যাপারে আপনার একটু সাহায্য চাই?
- ভাত খাওয়ার পরে একটু মিষ্টি দিলে সমস্যা নেই। খাওয়ার আগে দিলে ও আর ভাত খায় না।
- দুষ্টুমি করলে ওকে আমার কাছে পাঠিয়ে দেবেন। ওটা আমি সামলাব, আপনি শুধু ওকে আদর করবেন।
- ঘুমের আগের গল্পটা কি আপনার বিশেষ দায়িত্ব হতে পারে? ও আমার চেয়ে আপনার কথা বেশি শোনে।
মিষ্টি, মোবাইল আর রাত জাগা: তিনটা চেনা সমস্যা
দাদি-নানি যখন মিষ্টি-চকলেট দেন
মিষ্টি-চকলেট নিয়েই সবচেয়ে বেশি অভিযোগ, আবার সমাধানও সবচেয়ে সহজ: একটা সময় আর জায়গা ঠিক করে দিন। মিষ্টি আসবে খাবারের পরে; খাবারের আগে নয়, কান্না থামাতেও নয়। তাঁদের হাতে দেওয়ার জন্য একটা ফলের ঝুড়ি বা ঘরে বানানো নাশতার কৌটা রাখুন। আরও উপায় পাবেন বাচ্চার জাঙ্ক ফুড আর মিষ্টি কমানোর উপায় লেখায়।
দাদা-দাদি আর মোবাইল
অনেক দাদা-দাদি বাচ্চাকে খাওয়াতে বা চুপ করাতে মোবাইল ধরিয়ে দেন, কারণ এতে কাজ দ্রুত হয়। বাসার নিয়মগুলোই ধরে রাখুন: ১৮ মাসের কম বয়সে কোনো স্ক্রিন নয়, শুধু পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কল চলবে (দাদা-দাদির সঙ্গে ভিডিও কল ঠিক এমন ভালো স্ক্রিন টাইম), আর খাওয়ার সময় মোবাইল নয়। দাদির কোলে মোবাইল দিয়ে খাওয়ানো যদি অভ্যাস হয়ে যায়, তা ছাড়ানোর সহজ পরিকল্পনা, যা দাদা-দাদিও মানতে পারবেন, পাবেন মোবাইল দেখিয়ে খাওয়ানো লেখায়।
রাত জাগা আর ঘুমের সময়
দাদা-দাদি অনেক সময় দেরিতে ঘুমান, আর রাতের খবর বা সিরিয়ালের সঙ্গে বাচ্চাকেও জাগিয়ে রাখেন। আসল কথা হলো ঘুম যেন যথেষ্ট হয়: ৩–৫ বছরের বাচ্চার ২৪ ঘণ্টায় মোটামুটি ১০–১৩ ঘণ্টা আর ৬–১২ বছরের বাচ্চার ৯–১২ ঘণ্টা ঘুম দরকার। স্কুলের রাতে স্বাভাবিক ঘুমের সময় আর ঘুমের আগের এক ঘণ্টা স্ক্রিন ছাড়া শান্ত সময় চেয়ে নিন। ভালো ঘুমায় এমন বড় বাচ্চা দাদির বিছানায় ঘুমালে সমস্যা নেই, কিন্তু কোলের শিশু সবসময় ঘুমাবে চিত হয়ে, শক্ত আর ফাঁকা জায়গায়, নিজের ছোট খাটে বা বাবা কিংবা মায়ের পাশে, বালিশ আর লেপ-কাঁথা থেকে দূরে।
দাদা-দাদি বা নানা-নানি বাচ্চার গায়ে হাত তুললে বা লজ্জা দিলে
অনেক দাদা-দাদি নিজেরা বড় হয়েছেন মার আর কড়া কথার মধ্যে: গ্লাস ভাঙলে চড়, “ছি, এত বড় ছেলে কাঁদে!”, কিংবা ভূত বা পুলিশের ভয় দেখানো। মারধর আর লজ্জা দেওয়া সময়ের সঙ্গে আচরণ সাধারণত আরও খারাপ করে, আর বাচ্চাকে শেখায় ভয় পেতে, শিখতে নয়। এই নিয়মে ছাড় নেই, কিন্তু সেটা ধরে রাখা যায় নরমভাবে।
- ঘটনার সময় শান্তভাবে এগিয়ে গিয়ে বাচ্চাকে নিজের কাছে নিয়ে আসুন; বাচ্চার সামনে দাদা-দাদিকে বকাবকি করবেন না।
- বাচ্চাকে সান্ত্বনা দিন আর সহজ করে বলুন: “ব্যথা লেগেছে, না? আমাদের বাসায় কেউ কাউকে মারে না।”
- পরে আলাদা করে নিয়মটা আর তার কারণ বুঝিয়ে বলুন, আর বিকল্পটাও বলে দিন: আপনাকে ডাকা, বা বাচ্চাকে একপাশে নিয়ে একটু অপেক্ষা করা।
- আপনার কাছে যা কাজ করে, তা ভাগ করে নিন, যেমন দৃঢ় কিন্তু শান্ত সীমা, আর বাচ্চা থিতু না হওয়া পর্যন্ত কাছে বসে থাকা; ধাপগুলো পাবেন মারধর ছাড়া বাচ্চাকে শাসন করার উপায় লেখায়।
- বলার পরেও আবার ঘটলে, যতদিন না বন্ধ হয়, ততদিন বাচ্চাকে ওই মানুষের কাছে একা রাখবেন না।
ঘটনার সময় আর পরে যা বলতে পারেন
- আব্বা, ওকে আমার কাছে দিন। আমি দেখছি।
- জানি, আপনি চান ও ভালো হয়ে চলুক। আমরা দেখেছি, মারলে ও আরও জেদি হয়, কমে না।
- ওকে মোটা বা কালো বলবেন না, প্লিজ। ও সব শোনে, আর কথাগুলো ওর মনে থেকে যায়।
- বাচ্চাকে: তুমি নিরাপদ। আমাদের বাসায় কেউ কাউকে মারে না, আর আমি তোমার পাশেই আছি।
লজ্জা দেওয়ার আরও নীরব রূপ আছে: কাজিনদের সঙ্গে তুলনা, ওজন বা গায়ের রং নিয়ে খোঁচা, কিংবা “লোকে কী বলবে?”। সঙ্গে সঙ্গে নরম গলায় “থাক, ওদের তুলনা না করি” বলা, আর পরে আলাদা করে কথা বলা, কাউকে ছোট না করেই বাচ্চাকে আগলে রাখে।
দাদা-দাদির বিশেষ জায়গাটা কীভাবে ধরে রাখবেন
দাদা-দাদি, নানা-নানি বাচ্চাকে যা দেন, কোনো নিয়মের বই তা দিতে পারে না: পরিবারের গল্প, ছড়া-গান, দোয়া, রান্নার রেসিপি, ধৈর্য, আর সবসময় খালি থাকা একটা কোল। অনেক বড় মানুষের ভালোবাসা পাওয়া বাচ্চা প্রায়ই নিজেকে বেশি নিরাপদ বোধ করে। লক্ষ্য দাদা-দাদিকে নিয়মের পাহারাদার বানানো নয়; লক্ষ্য হলো কয়েকটা নিরাপদ নিয়ম রাখা, যাতে বাকি সবটা হতে পারে শুধু আদর।
- তাঁদের নিজস্ব কিছু রীতি দিন: শুক্রবার দুপুরের খাবারের পর মিষ্টি, ঘুমের আগের গল্প, একসঙ্গে বাজারে যাওয়া।
- বাচ্চা যেন দেখে আপনি তাঁদের সম্মান করেন: সালাম দিন, পরামর্শ চান, বাচ্চার সামনে ধন্যবাদ দিন।
- তাঁদের কিছু “হ্যাঁ”-তে আপনিও হ্যাঁ বলুন। বেড়াতে গিয়ে একটু বাড়তি আদর নাতি-নাতনি হওয়ারই অংশ।
যে কয়েকটা নিয়ম বাচ্চাকে নিরাপদ আর সুস্থ রাখে, সেগুলো ধরে রাখুন। বাকিটা থাকুক ভালোবাসা।
আমাদের বাসায়: দাদাবাড়ি, নানাবাড়ি আর এক ছাদের নিচে
আমাদের অনেক পরিবারে দাদা-দাদি বা নানা-নানি অতিথি নন: তাঁরা একই বাসায় থাকেন, আপনি অফিসে গেলে বাচ্চা দেখেন, কিংবা ঈদে কয়েক সপ্তাহ নাতি-নাতনিকে নিজেদের কাছে রাখেন। বড়দের সম্মান করা আমাদের গভীর মূল্যবোধ। এটা একটা শক্তি, তবে এর কারণে কমবয়সী বাবা-মা অনেক সময় কিছুই বলতে পারেন না। কয়েকটা জিনিস কাজে দেয়:
- এক বাসায় থাকলে: দাদা-দাদি যদি রোজ বাচ্চা দেখেন, পরিকল্পনাটা সবচেয়ে বেশি দরকার তাঁদেরই। একসঙ্গে বসে কয়েকটা নিয়ম কাগজে লিখে ফ্রিজের পাশে লাগিয়ে দিন। পুরো সংসারের কথা পাবেন যৌথ পরিবারে সন্তান লালন-পালন লেখায়।
- বউ-শাশুড়ি: শাশুড়ির সঙ্গে সন্তান লালন নিয়ে মতবিরোধ খুব সাধারণ ব্যাপার, এতে কারও দোষ নেই। স্বামী নিজের মাকে অনুরোধটা পৌঁছে দিতে পারেন, যাতে স্ত্রীকে একা তর্ক করতে না হয়।
- ঈদ বা ছুটিতে দাদাবাড়ি-নানাবাড়ি: আগেই ঠিক করুন কোন নিয়ম ঢিলা হবে (রাত জাগা, একটু বেশি মিষ্টি) আর কোনগুলো সঙ্গে যাবে (নিরাপত্তা, গায়ে হাত না তোলা, যে ওষুধে একমত হয়েছেন শুধু সেটাই)।
- পুরোনো টোটকা: নবজাতকের মুখে মধু, নাকে-কানে তেল। এর পেছনের মমতাটুকু সম্মান করুন, কিন্তু একটা সীমা রাখুন: আপনার সম্মতি ছাড়া শিশুর মুখে, নাকে বা কানে কিছু দেওয়া যাবে না, আর প্রথম জন্মদিনের আগে মধু নয়।
- “আমরা তো এভাবেই তোমাদের মানুষ করেছি, খারাপ হয়েছ?” এমন কথার উত্তরে উষ্ণ গলায় বলা যায়: “না, আপনারা ভালোই করেছেন, আমরা আপনাদের কাছ থেকে অনেক শিখেছি। এখন আমরা কয়েকটা নতুন জিনিসও চেষ্টা করছি।”
সবাইকে এক নিয়মে আনার ৭ দিনের পরিকল্পনা
সাধারণ একটা সপ্তাহ বেছে নিন, ঈদ বা বিয়েবাড়ির সপ্তাহ নয়। প্রতি সন্ধ্যায় লিখে রাখুন, জরুরি নিয়মগুলো নিয়ে কী ঘটল, আর বাচ্চার ঘুম, খাওয়া আর আচরণ কেমন ছিল।
- দিন ১: দাদা-দাদির কাছে যে যে নিয়ম চান, সব লিখে ফেলুন। তারপর সবচেয়ে জরুরি দুই-তিনটায় দাগ দিন।
- দিন ২: স্বামী-স্ত্রী মিলে ছোট তালিকাটা ঠিক করুন, আর কে কোন দাদা-দাদি বা নানা-নানির সঙ্গে কথা বলবেন।
- দিন ৩: খেয়াল করুন আর ধন্যবাদ দিন। প্রত্যেককে বলুন, বাচ্চার জন্য তাঁর কোন একটা কাজ আপনার খুব ভালো লাগে।
- দিন ৪: চায়ের টেবিলে, আলাদা করে, শান্ত আলাপটা করুন। কারণসহ এক-দুটো জিনিস চান।
- দিন ৫: বদলে কী দেবেন, তা হাতে তুলে দিন: চকলেটের বদলে ফলের কৌটা, মোবাইলের বদলে গল্প, নিয়মের বদলে একটা দায়িত্ব।
- দিন ৬: বাচ্চাকে সহজ করে বলুন, কোন নিয়মগুলো সব জায়গায় একই।
- দিন ৭: নোটগুলো পড়ুন। কী বদলাল? যা ভালো গেছে, তার একটার জন্য দাদা-দাদিকে ধন্যবাদ দিন, আর পরের ছোট ধাপটা ঠিক করুন।
কখন এটা শুধু পারিবারিক মতভেদ নয়?
দাদা-দাদির আদরে সন্তান নিয়ম মানে না, এমন বেশিরভাগ সমস্যা ধৈর্য আর কয়েকটা শান্ত আলাপে কমে আসে। এসব দেখলে সাহায্য নিন, পারিবারিক কাউন্সেলর, বাচ্চার ডাক্তার বা ভরসার কারও কাছ থেকে:
এসব দেখলে সাহায্য নিন
- বলার পরেও দাদা-দাদি বা নানা-নানি বাচ্চাকে বারবার মারছেন, হুমকি দিচ্ছেন বা ভয় দেখাচ্ছেন।
- বাচ্চা হঠাৎ নির্দিষ্ট কোনো আত্মীয়কে বা কোনো জায়গায় থাকতে ভয় পাচ্ছে, কিংবা এমন আঘাত আছে যার ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারছে না। বাচ্চার কথা বিশ্বাস করুন, ওকে সেই মানুষটার কাছ থেকে দূরে রাখুন, আর সেদিনই ব্যবস্থা নিন। স্থানীয় থানায় জানাতে পারেন; বাচ্চা এখনই বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
- স্বাস্থ্যের নিয়ম এমনভাবে ভাঙা হচ্ছে যে বাচ্চা ঝুঁকিতে পড়ছে: না জিজ্ঞেস করে ওষুধ দেওয়া, কোলের শিশুকে মধু খাওয়ানো, কিংবা ছোট বাচ্চাকে পানি, সিঁড়ি বা বারান্দার কাছে একা রাখা।
- বাসায় টানাপোড়েন কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে, আর বাচ্চার ঘুম, খাওয়া খারাপ হচ্ছে বা বেশিরভাগ দিন ওকে দুশ্চিন্তায় দেখাচ্ছে।
- বেশিরভাগ দিন আপনার নিজেরই মন খারাপ থাকে, নিজেকে আটকে পড়া মনে হয়, বা বাসায় ভয় লাগে। আপনারও সাহায্য পাওয়ার অধিকার আছে। বাসায় কেউ আপনাকে আঘাত করলে বা হুমকি দিলে স্থানীয় থানায় জানাতে পারেন; বাসার কেউ এখনই বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
দাদা-দাদি আর বাবা-মা সাধারণত একই জিনিস চান: একটা হাসিখুশি, সুস্থ সন্তান। ধন্যবাদ দিয়ে চাওয়া কয়েকটা অভিন্ন নিয়ম সবাইকে সেই সন্তানকে আরও উপভোগ করতে দেয়। ParentMind আপনাকে প্রতিদিন কী হলো তা নোট করতে, বারবার যা ঘটছে তা দেখতে আর গাইড পেতে সাহায্য করে: ParentMind কীভাবে কাজ করে দেখে নিন।
বাবা-মায়েরা যা জানতে চান
দাদা-দাদি বা নানা-নানির বাড়তি আদর কি স্বাভাবিক?
হ্যাঁ। মিষ্টি, সময় আর সহজে “হ্যাঁ” বলা দিয়ে নাতি-নাতনিকে আদর করা বেশিরভাগ পরিবারেই স্বাভাবিক, আর দাদা-দাদি বা নানা-নানির কাছে কিছু নিয়ম আলাদা হলে বাচ্চারা সাধারণত মানিয়ে নেয়। কথা বলা দরকার শুধু তখন, যখন এতে মূল বিষয়গুলোয় টান পড়ে: নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, ঘুম, খাওয়া, বা বাচ্চাকে কীভাবে শাসন করা হয়।
শাশুড়িকে কীভাবে বলব বাচ্চাকে এত মিষ্টি না দিতে?
স্বামীকে বলুন তাঁর মায়ের সঙ্গে কথাটা তুলতে, নয়তো নিজেই আলাদা করে, আগে ধন্যবাদ দিয়ে বলুন। পুরো নিষেধ নয়, একটা সময় চান: মিষ্টি খাবারের পরে, খাবারের আগে নয়, কান্না থামাতেও নয়। সহজ একটা বিকল্প দিন, যেমন ফলের একটা কৌটা, যাতে তিনি নিজ হাতে কিছু দেওয়ার আনন্দটা পান।
দাদির কাছে আলাদা নিয়ম হলে কি বাচ্চা বিভ্রান্ত হয়?
সাধারণত না, যদি পার্থক্যগুলো ছোট হয় আর বড়রা বাচ্চার সামনে এ নিয়ে তর্ক না করেন। বাচ্চারা ছোটবেলাতেই শেখে যে স্কুল, বাসা আর দাদির কাছের নিয়ম আলাদা হতে পারে। বিভ্রান্তি সাধারণত তখনই হয়, যখন নিরাপত্তা বা শাসনের নিয়ম মানুষ বদলালেই বদলে যায়, কিংবা কেউ বলেন, “তোর মা তো জানবে না।”
দাদা-দাদি কি বাচ্চাকে শাসন করতে পারবেন?
তাঁরা পথ দেখাতে আর শুধরে দিতে পারেন, আপনার মতোই শান্তভাবে: দৃঢ় একটা “না”, খেলনা কিছুক্ষণের জন্য সরিয়ে রাখা, বা বাচ্চাকে আপনার কাছে নিয়ে আসা। মারধর, ভয় দেখানো আর লজ্জা দেওয়া কোনো বড় মানুষের জন্যই চলবে না। কথাটা খোলাখুলি ঠিক করে নিন, যাতে তাঁরা জানেন কী করতে পারবেন, শুধু কী পারবেন না তা নয়।
দাদা-দাদির কাছে সন্তান রাখলে কোন নিয়মগুলো মানা দরকার?
তালিকা ছোট রাখুন: খাওয়া আর ঘুমের স্বাভাবিক সময়, খাওয়ার সময় মোবাইল নয়, আপনার সম্মতি ছাড়া কোনো ওষুধ নয়, পানি, সিঁড়ি আর চুলার কাছে সবসময় একজন বড় মানুষের নজর, ছোট বাচ্চার বারান্দায় খেলা নয়, আর গায়ে হাত তোলা নয়। আপনার নম্বর, একজন প্রতিবেশীর নম্বর আর ৯৯৯ লিখে দরজার পাশে লাগিয়ে রাখুন।
শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ম না মানলে স্বামীকে কীভাবে বলব?
শান্ত একটা সময় বেছে নিন, আর কথা বলুন বাচ্চাকে নিয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ির দোষ নিয়ে নয়: কী ঘটছে, তাতে ঘুম, খাওয়া বা আচরণে কী প্রভাব পড়ছে, আর কোন এক-দুটো জিনিস বদলাতে চান। তাঁকেই অনুরোধ করুন নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে। আগে দুজনে মিলে পরিকল্পনা ঠিক করুন, যাতে এক দল হয়ে কথা বলতে পারেন।
দাদি-নানি কি শিশুকে মধু বা ঘরোয়া টোটকা দিতে পারেন?
মধু নয়: প্রথম জন্মদিনের আগে শিশুকে একফোঁটা মধুও দেওয়া যাবে না, বরকতের জন্যও নয়; দোয়াটা মধু ছাড়াই পড়া যায়। অন্য যেকোনো টোটকা বা ওষুধের ব্যাপারে অনুরোধ করুন, আপনার সম্মতি ছাড়া যেন কিছু না দেওয়া হয়; নিশ্চিত না হলে বাচ্চার ডাক্তারের কাছে জেনে নিন।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।



