বাচ্চা শুধু চিপস-চকলেট খেতে চায়: জাঙ্ক ফুড কীভাবে কমাবেন
ছোট করে উত্তর
বাচ্চা জাঙ্ক ফুড খেতে চাইলে সাধারণত নিষেধের চেয়ে নিয়মিত রুটিন বেশি কাজে দেয়: খাবার আর নাশতা নির্দিষ্ট সময়ে, মজার খাবার আগে থেকে ঠিক করা দিনে, ঘরে অল্প প্যাকেট, আর বাসার সব বড়দের একই নিয়ম। শুরুতে একটু আপত্তি আসতে পারে। বাচ্চা যদি প্রায়ই লুকিয়ে খায় আর পরে মন খারাপ করে থাকে, বা নিজের শরীর নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করে, ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
লেখাটি শুনুন
১৬ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া
এক নজরে
- কাদের জন্য
- ৩–১৪ বছরের যে বাচ্চারা রোজ চিপস, চকলেট, কোমল পানীয় বা ইন্সট্যান্ট নুডলস চায়, তাদের বাবা-মা
- মূল কথা
- মিষ্টি, নোনতা আর মচমচে খাবার পছন্দ করা স্বাভাবিক; রোজকার জাঙ্ক ফুডের অভ্যাস সাধারণত তৈরি হয় হাতের কাছে পাওয়া, দুই বেলার মাঝে লম্বা বিরতি আর পুরস্কার হিসেবে মিষ্টি দেওয়া থেকে।
- পুরোপুরি নিষেধের চেয়ে আগে থেকে ঠিক করা মজার খাবারের দিন বেশি কাজে দেয়; নিষেধ করলে বাচ্চারা প্রায়ই আরও বেশি চায়, লুকিয়ে খায়।
- ঘরে কী রাখছেন, সেটাই সবচেয়ে জরুরি: ফল আর মুড়ি থাকুক চোখের সামনে, আর চিপস বা কোমল পানীয় রোজ ঘরে মজুত রাখবেন না।
- দাদা-দাদি, নানা-নানি, আত্মীয় আর গৃহকর্মী সবার সঙ্গে একটা নিয়মে একমত হোন, আর বাচ্চার সামনে কখনো ওজন বা ‘মোটা হয়ে যাচ্ছ’ নিয়ে কথা বলবেন না।
স্কুল থেকে ফিরেই চিপস, যে আত্মীয়ই আসেন তাঁর হাতে চকলেট, রাতের খাবারের সঙ্গে কোমল পানীয়, আর ভাতের বদলে ইন্সট্যান্ট নুডলস: বাচ্চা যদি শুধু জাঙ্ক ফুডই খেতে চায়, এই ছবিটা আপনার চেনা। অনেক বাবা-মায়ের মনে হয়, সব চেষ্টাই করে দেখেছেন। মিষ্টি, নোনতা আর মচমচে খাবারের দিকে টান বাচ্চাদের মধ্যে খুব স্বাভাবিক, আর রোজ ঝগড়াঝাঁটি ছাড়াই এই অভ্যাস বদলানো যায়।
বাচ্চা জাঙ্ক ফুড খেতে চাইলে কী করবেন? উত্তরটা সাধারণত নিষেধ নয়, বরং শান্ত একটা রুটিন: নিয়মিত খাবার, আগে থেকে ঠিক করা মজার খাবারের দিন, ঘরে হাতের কাছে ভালো নাশতা, আর বাসার সব বড়দের একই নিয়ম। নিচে পাবেন: বাচ্চা কেন জাঙ্ক ফুড চায়, বায়না করলে কী বলবেন, ঘরে কী রাখবেন, স্কুল আর আত্মীয়দের বেলায় কী করবেন, ৭ দিনের পরিকল্পনা, আর কখন সাহায্য নেবেন।
বাচ্চা কেন শুধু জাঙ্ক ফুড খেতে চায়? সাধারণ কারণগুলো
জাঙ্ক ফুড চাওয়া মানে লোভ বা খারাপ স্বভাব নয়। বাচ্চারা জন্ম থেকেই মিষ্টি স্বাদ বেশি পছন্দ করে, আর অনেক প্যাকেটের নাশতা এমনভাবে বানানো যে মচমচে, নোনতা, আর একবার শুরু করলে থামা কঠিন। বেশির ভাগ টানের পেছনে থাকে খুব সাধারণ কিছু কারণ:
- দুই বেলার মাঝে লম্বা বিরতি। স্কুল বা কোচিং থেকে খিদে নিয়ে ফেরা বাচ্চা হাতের কাছে সবচেয়ে তাড়াতাড়ি যা পায়, তা-ই চায়।
- হাতের কাছে পাওয়া। রান্নাঘরের তাকে চিপস, বিস্কুট আর কোমল পানীয় থাকলে, বা নিচেই মোড়ের দোকান থাকলে, এগুলো রোজকার খাবার হয়ে যায়।
- পুরস্কার বা সান্ত্বনা হিসেবে মিষ্টি। ‘হোমওয়ার্ক শেষ করলে চকলেট পাবে’ বললে বাচ্চা শেখে, মিষ্টিই আসল পুরস্কার।
- খাবার দিয়ে ভালোবাসা দেখানো। দাদা-দাদি, মামা-চাচা আর মেহমানরা প্রায়ই আদর দেখাতে চকলেট আর চিপস নিয়ে আসেন।
- বন্ধু, বিজ্ঞাপন আর স্ক্রিন। স্কুলে বন্ধুদের ভাগ করা নাশতা আর বিজ্ঞাপন কিছু খাবারকে খুব আকর্ষণীয় করে তোলে; আর স্ক্রিনের সামনে বসে খেলে টেরই পাওয়া যায় না কখন পুরো প্যাকেট শেষ।
- নিষেধ। একেবারে নিষিদ্ধ খাবারটাই প্রায়ই বাচ্চাদের সবচেয়ে বেশি চাওয়ার জিনিস হয়ে ওঠে।
| বয়স | যা সাধারণ | যা কাজে দেয় |
|---|---|---|
| ৩–৫ বছর | দোকানে মিষ্টির জন্য বায়না আর কান্না; মেহমান যা দেন তা-ই খায় | কী কেনা হবে, ঠিক করবেন আপনি; দুটো ভালো বিকল্প দিন; মজার খাবার চোখের আড়ালে রাখুন |
| ৬–৯ বছর | বন্ধুর চিপসের সঙ্গে টিফিন বদলায়; স্কুলের পরে চকলেট চায়; ক্লাসের অন্যদের যা আছে তা-ই চায় | পছন্দের টিফিন, স্কুলের পরে নির্দিষ্ট নাশতা, একসঙ্গে ঠিক করা মজার খাবারের দিন |
| ১০–১৪ বছর | হাতে টিফিনের টাকা থাকে; ক্যান্টিন, স্কুলের গেট বা বন্ধুদের সঙ্গে কিনে খায়; স্ক্রিন বা পড়ার সময় নাশতা চলে | সপ্তাহে নির্দিষ্ট টাকা, নিজের বানানো খরচের পরিকল্পনা, খিদের সময়ের জন্য ঘরে আসল খাবার |
বাচ্চা যদি পরিবারের বেশির ভাগ খাবারও খেতে না চায়, আগে দেখুন বাচ্চা খেতে না চাইলে কী করবেন: খাওয়ার সময় খিদে না থাকা আর মাঝের সময়ে জাঙ্ক ফুড প্রায়ই একই অভ্যাসের দুই দিক।
বাচ্চা জাঙ্ক ফুডের বায়না করলে কীভাবে ‘না’ বলবেন
বেশির ভাগ বায়না হয় চেনা কিছু সময়ে: দোকানের কাউন্টারে, স্কুল থেকে ফেরার পরপর, মেহমান এলে। এই মুহূর্তগুলোর জন্য আগে থেকে পরিকল্পনা থাকলে নরম অথচ দৃঢ় থাকা সহজ হয়।
- আগে দেখুন খিদে পেয়েছে কি না। নাশতার সময় কাছাকাছি হলে এখনই আসল নাশতা দিন: ফল, মুড়ি, সেদ্ধ ডিম বা রুটি।
- একবার, অল্প কথায়, নরম গলায় ‘না’ বলুন। স্বাস্থ্য নিয়ে লম্বা উপদেশ বাদ দিন; লম্বা বক্তৃতা লম্বা তর্ক ডেকে আনে।
- ইচ্ছাটা আর পরিকল্পনাটা মুখে বলুন: ‘তোমার খুব চিপস খেতে ইচ্ছা করছে। চিপস তো শুক্রবারের জন্য।’
- আপনার কাছে ঠিক মনে হয় এমন দুটো বিকল্প দিন, যাতে বাচ্চাও কিছু একটা বেছে নিতে পারে।
- আপত্তি আর কান্নার মধ্যেও শান্ত থাকুন, কাঁদার পরে মত বদলাবেন না। কাঁদলে উত্তর বদলায়, এটা শিখে গেলে বাচ্চা প্রায়ই আরও বেশিক্ষণ কাঁদে।
- দোকানে ঢোকার আগেই বলে রাখুন: ‘আজ আমরা ডিম আর চাল কিনব, নাশতা নয়।’ বাচ্চা ক্লান্ত থাকলে বা খিদে নিয়ে থাকলে, সম্ভব হলে নাশতার তাক এড়িয়ে চলুন।
- পরে, সবাই শান্ত হলে, সামলে নেওয়াটা খেয়াল করে বলুন: ‘চিপস না পেয়ে তোমার রাগ হয়েছিল, তবু তুমি সামলে নিয়েছ।’
যা বলতে পারেন
- জানি, তোমার খুব খেতে ইচ্ছা করছে। তবু আজকে না।
- চিপস তো শুক্রবারের জন্য। আজ মুড়ি আছে, কলাও আছে। কোনটা খাবে?
- মন খারাপ হতেই পারে। কিন্তু আমি কথা বদলাব না।
- চলো, এটা মজার খাবারের দিনের তালিকায় লিখে রাখি।
- নানু চকলেট এনেছেন! দুপুরের খাবারের পরে একটা খাব, কেমন?
- এটা তোমার টিফিনের টাকা। এই সপ্তাহে কীভাবে খরচ করবে, ঠিক করেছ?
নাশতার বায়না এক ধরনের দাবি মাত্র। সব রকম বায়না আর ঘ্যানঘ্যান সামলাতে দেখুন বাচ্চাকে ‘না’ বলা আর সীমা ঠিক করা।
নিষেধ না করে মিষ্টি খাওয়া কমানোর উপায়
পুরোপুরি নিষেধ সাধারণত উল্টো ফল দেয়। যে বাচ্চাকে কখনো মিষ্টি খেতে দেওয়া হয় না, সে প্রায়ই মিষ্টি নিয়ে আরও বেশি ভাবে, সুযোগ পেলেই তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলে, বা বন্ধুর বাসায় লুকিয়ে খায়। আগে থেকে ঠিক করা, অল্প আর সাধারণ মজার খাবার সাধারণত এই টান কমিয়ে দেয়।
- মজার খাবারের সময় একসঙ্গে ঠিক করুন: যেমন শুক্রবার চিপস, ছুটির দিনে দুপুরের খাবারের পরে একটা মিষ্টি, পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে গেলে আইসক্রিম।
- মজার খাবার দিন খাবারের সঙ্গে বা পরে, বসে, প্যাকেট থেকে নয়, বাটিতে ঢেলে।
- ফাস্ট ফুডকে রোজকার অভ্যাস নয়, পরিবারের বেড়ানোর অংশ করুন: কেউ চাইলেই অর্ডার নয়, মাঝে মাঝে সবাই মিলে বাইরে বার্গার বা ফ্রায়েড চিকেন।
- সবজি, হোমওয়ার্ক বা ভালো আচরণের পুরস্কার হিসেবে, বা কান্না থামাতে মিষ্টি দেবেন না। প্রশংসা, একটু আদর বা একসঙ্গে একটা খেলা বেশি কাজে দেয়।
- মজার খাবারটা অপরাধবোধ ছাড়া উপভোগ করতে দিন। ‘বিষ’ বা ‘জঘন্য’ জাতীয় শব্দে খাবারটা হয় ভয়ের জিনিস হয়ে ওঠে, নয়তো আরও লোভনীয়।
- নিজেও একইভাবে খান। প্রতি বেলায় বাবা-মায়ের হাতে কোমল পানীয় থাকলে, সেটা যেকোনো নিয়মের চেয়ে বড় শিক্ষা।
চিপসের বদলে কী দেবেন: ঘরে কী রাখবেন
দুই বেলার মাঝে বাচ্চা কী খাবে, তার বেশির ভাগটাই ঠিক হয় ঘরে কী আছে তা দিয়ে। আলাদা কোনো দামি জিনিস লাগে না। প্যাকেট কম রাখুন, আর সহজ, পেট ভরার মতো খাবার রাখুন বাচ্চার চোখের সামনে, হাতের নাগালে।
| বাচ্চা যদি চায় | ঘরে যা দিতে পারেন |
|---|---|
| চিপস | টমেটো আর পেঁয়াজকুচি দিয়ে মুড়ি, চিড়া ভাজা, বা ঘরে বানানো আলুর টুকরো ভাজা |
| কোমল পানীয় আর জুসের প্যাকেট | লেবুর টুকরো দেওয়া ঠান্ডা পানি, কম চিনি দিয়ে ঘরে বানানো লেবুর শরবত, চিনি ছাড়া লাচ্ছি বা মাঠা, বা গোটা মৌসুমি ফল |
| ইন্সট্যান্ট নুডলস | ডিম, সবজি আর অর্ধেক মসলা দিয়ে রান্না করা নুডলস, খিচুড়ি, বা রুটির রোল |
| চকলেট আর মিষ্টি | কলা, পেয়ারা, পেঁপে, মৌসুমে আম, বিচি ফেলে দেওয়া খেজুর, বা খাবারের পরে ছোট এক টুকরো চকলেট |
| বার্গার আর ফ্রায়েড চিকেন | ঘরে রান্না করা মুরগির সঙ্গে রুটি, ডিমের স্যান্ডউইচ, বা ঘরে বানানো চিকেন রোল |
| আইসক্রিম | ফ্রিজে জমানো কলা বা আমের টুকরো, বা দই দিয়ে ঘরে বানানো ফলের কাঠি আইসক্রিম |
- টেবিলে ফলের ঝুড়ি আর মুড়ি বা চিড়ার কৌটা রাখুন, বাচ্চার চোখের সমান উচ্চতায়।
- মজার খাবারের দিনের জন্য বড় প্যাকেট নয়, ছোট প্যাকেট কিনুন, আর চোখের আড়ালে রাখুন।
- রোজকার পানীয় হোক পানি: স্কুলব্যাগে একটা বোতল, টেবিলে একটা জগ। বাচ্চার কতটা পানি দরকার আর প্যাকেটের লেবেলে চিনি কীভাবে বুঝবেন, দেখুন আমাদের শিশুর খাবার ও পুষ্টি গাইডে।
- মোটামুটি ৫ বছরের কম বয়সী বাচ্চাকে শক্ত লজেন্স, ললিপপ, চুইংগাম, পপকর্ন আর আস্ত বাদাম দেবেন না: এগুলো সহজেই গলায় আটকে যেতে পারে।
স্কুলের ক্যান্টিন, টিফিনের টাকা আর স্কুলের সামনের দোকান
অনেক বাচ্চা প্রথম নিজে খাবার কেনে স্কুলেই। গেটের সামনে ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, আইসক্রিম, চিপস আর জুসের প্যাকেট স্কুলজীবনেরই অংশ, আর পুরোপুরি নিষেধ করে রাখা কঠিন। একসঙ্গে ঠিক করা কয়েকটা নিয়ম সাধারণত বেশি কাজে দেয়।
- এমন টিফিন দিন যা বাচ্চা সত্যিই খায়, যাতে স্কুলের গেটে গিয়ে খিদে না লাগে। ঘরের রান্নাঘর থেকে ঝটপট আইডিয়া পাবেন বাচ্চার স্কুলের টিফিনে কী দেবেন লেখায়।
- ছোট বাচ্চা, মোটামুটি ৮ বছরের কম: রোজ হাতে টাকা নয়। সপ্তাহে একদিন স্কুলের গেটের একটা মজার খাবার, আপনার সঙ্গে কিনে।
- বড় বাচ্চা: টিফিনের জন্য সপ্তাহে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা, আর কীভাবে খরচ করবে তা ওকেই ঠিক করতে দিন। মঙ্গলবারের মধ্যেই সব টাকা চিপসে চলে গেলেও ঘরের টিফিন ঠিকই ব্যাগে যাবে; এটা একটা শিক্ষা, বিপদ নয়।
- রাস্তার খাবারের বেলায় পরিষ্কার দেখায় এমন দোকান বেছে নিন, আর চোখের সামনে গরম গরম রান্না হয় এমন খাবার নিন; খোলা পানি, শরবত আর বরফ এড়িয়ে চলুন, এতে পেটের সমস্যা হতে পারে।
- কোচিংয়ের দিনে বাড়তি একটা নাশতা আর পানিভরা বোতল দিন, যাতে সন্ধ্যাটা দোকানের প্যাকেট দিয়ে না কাটে।
- স্কুলের ক্যান্টিনে কী বিক্রি হয়, জেনে নিন। কয়েকজন অভিভাবক মিলে ফল আর পানি রাখার অনুরোধ করলে প্রায়ই একজনের চেয়ে বেশি কাজ হয়।
বাংলাদেশি পরিবারে: আত্মীয়, মেহমান আর মিষ্টিতে ভালোবাসা
অনেক বাংলাদেশি পরিবারে ভালোবাসা দেখানো হয় খাবার দিয়ে। দাদা-দাদি আসেন চকলেট নিয়ে, মামা আনেন চিপস, প্রত্যেক মেহমানের সামনে বিস্কুট আর চানাচুরের প্লেট, আর মিষ্টি ছাড়া কোনো উৎসবই পূর্ণ হয় না। এর কোনোটাই বন্ধ করার দরকার নেই। শুধু বাচ্চার রোজকার রুটিনের সঙ্গে এগুলো কীভাবে মেলাবেন, তা ঠিক করে নিলে সুবিধা হয়।
দাদা-দাদি, নানা-নানি বা আত্মীয়রা যখন চকলেট আনেন
- বাচ্চার সামনে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ দিন, তারপর উপহারটা একটা ‘মজার খাবারের বাক্সে’ রেখে দিন; খাবারের পরে সেখান থেকে একটা করে খাওয়া হবে।
- বাচ্চার সামনে নয়, আলাদা করে দাদা-দাদি বা নানা-নানির সঙ্গে কথা বলুন: ‘আম্মা, আপনি কিছু আনলে ও খুব খুশি হয়। মাঝে মাঝে ফল বা একটা গল্পের বই আনবেন? চকলেটটা না হয় শুধু শুক্রবারের জন্য থাক।’
- একই নিয়ম জানিয়ে রাখুন গৃহকর্মী আর ড্রাইভারকেও, কারণ বাচ্চা চাইলে তাঁরা প্রায়ই নাশতা কিনে দেন; আর বাচ্চা যদি মোড়ের দোকান থেকে বাকিতে কেনে, দোকানদারকেও।
বিয়ে, দাওয়াত, ঈদ আর রমজান
উৎসব মানেই মিষ্টি, ফিরনি, সেমাই আর ভাজাপোড়া, আর বাচ্চারাও সবার সঙ্গে মজা করে খেতে পারে। রমজানে ইফতারে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় থাকে বেগুনি, পেঁয়াজু আর জিলাপি: বাচ্চাকে পরিবারের সঙ্গে ইফতারে বসতে দিন, পাশে রাখুন ফল আর পানি, আর ওর রাতের খাবার আর ঘুমের সময় যতটা পারা যায় ঠিক রাখুন। পরের সাধারণ দিনে কোনো মন্তব্য ছাড়াই আবার চেনা রুটিন।
বাচ্চার সামনে ওজন নিয়ে কোনো কথা নয়
আত্মীয়রা হয়তো বলেন ‘মেয়েটা তো মোটা হয়ে যাচ্ছে’ বা ‘ছেলেটা এত শুকনা, বেশি করে মিষ্টি খাওয়াও’। শরীর নিয়ে এমন মন্তব্য বাচ্চার মনে বহু বছর থেকে যেতে পারে, আর খাবারকে লজ্জার বিষয় বানিয়ে দিতে পারে। নরমভাবে থামান: ‘আমাদের পরিবারে আমরা কারও শরীর নিয়ে মন্তব্য করি না।’ বাসায় কথা বলুন শক্তি আর মজবুত দাঁত নিয়ে, ওজন বা চেহারা নিয়ে কখনো নয়।
জাঙ্ক ফুড কমানোর ৭ দিনের পরিকল্পনা
দিনে একটা করে ছোট বদল আনুন, প্রতিদিন কী হলো লিখে রাখুন, আর এক সপ্তাহ পরে মিলিয়ে দেখুন।
- দিন ১: খেয়াল করুন। প্রতিটা নাশতা আর পানীয় লিখে রাখুন: কখন খেল, কে দিল; আত্মীয়, দোকান আর স্কুলসহ।
- দিন ২: দিনের ছন্দ ঠিক করুন: মোটামুটি একই সময়ে তিন বেলা খাবার আর দুবার নাশতা, মাঝে শুধু পানি।
- দিন ৩: বাচ্চার সঙ্গে বসে মজার খাবারের দিনগুলো ঠিক করুন, আর একটা কাগজে লিখে ফ্রিজে লাগিয়ে দিন।
- দিন ৪: বাজারের তালিকা বদলান। প্যাকেট কম কিনুন, আর ফল, মুড়ি, চিড়া রাখুন বাচ্চার হাতের নাগালে।
- দিন ৫: দাদা-দাদি, নানা-নানি, গৃহকর্মী আর যাঁরা বাচ্চাকে খাবার দেন, সবার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলুন, আর একটা নিয়মে একমত হোন।
- দিন ৬: একসঙ্গে ঘরে একটা বিকল্প বানান, যেমন ডিম আর সবজি দিয়ে নুডলস, বা ফ্রিজে জমানো আমের টুকরো।
- দিন ৭: প্রথম দিনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন: বাচ্চা কতবার চেয়েছে, কতবার তর্ক হয়েছে, কোন সময়গুলো সবচেয়ে কঠিন ছিল। যা কাজে দিয়েছে রাখুন, আর একটা জিনিস বদলে দেখুন।
বাচ্চার খাওয়া নিয়ে কখন সাহায্য নেবেন
বেশির ভাগ বাচ্চার কাছে চিপস আর মিষ্টির প্রতি টান ছোটবেলারই অংশ। তবে কয়েকটা লক্ষণ দেখলে শুধু নতুন রুটিনে চলবে না:
এমন হলে সাহায্য নিন
- দাঁতে ব্যথা, দাঁতে কালো দাগ বা গর্ত, বা মাড়ি ফুলে থাকলে: দেরি না করে দাঁতের ডাক্তার দেখান।
- বাচ্চা হাতে গোনা কয়েকটা খাবার ছাড়া কিছু খায় না, তালিকাটা আরও ছোট হচ্ছে, বা বেশির ভাগ নতুন খাবারে ওয়াক করে: ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
- প্রায় প্রতি সপ্তাহে খাবার লুকিয়ে রাখে বা লুকিয়ে অনেকটা খেয়ে ফেলে, বিশেষ করে পরে মন খারাপ করে থাকে বা লজ্জা পায়: ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
- ওজন বা চেহারা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা, বা শরীর বদলাতে খাবার বাদ দেওয়া: দেরি না করে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। শরীর নিয়ে কেউ খেপালে বা বুলিং করলে বাচ্চার কথা বিশ্বাস করুন, সেদিনই ব্যবস্থা নিন, আর বাচ্চা বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
- বাচ্চা যা-ই খাক না কেন, হঠাৎ খুব পিপাসা পেলে, অনেক বেশি বার প্রস্রাব করলে, অস্বাভাবিক ক্লান্ত থাকলে বা ওজন কমে যেতে থাকলে সেদিনই ডাক্তার দেখান।
- বাচ্চার গলায় কিছু আটকে শ্বাস নিতে, কাশতে বা কাঁদতে পারছে না: ৯৯৯-এ ফোন করুন, আর জানা থাকলে গলায় খাবার আটকানোর প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করুন।
ParentMind-এ প্রতিদিন বাচ্চা কী খেল আর কী চাইল তা লিখে রাখতে পারেন, যাতে ধরনটা চোখে পড়ে: স্কুলের পরে, কোচিংয়ের দিনে, নাকি আত্মীয়রা এলে। ParentMind কীভাবে কাজ করে দেখুন।
বাবা-মায়েরা যা জানতে চান
বাচ্চাকে মাঝে মাঝে জাঙ্ক ফুড দেওয়া কি ঠিক?
হ্যাঁ। নিয়মিত রুটিনের মধ্যে মাঝে মাঝে মজার খাবার ঠিক আছে, আর পুরোপুরি নিষেধের চেয়ে আগে থেকে ঠিক করা মজার খাবার সাধারণত বেশি কাজে দেয়; নিষেধ করলে বাচ্চারা প্রায়ই আরও বেশি চায়। অনেক পরিবার সপ্তাহে এক-দুই দিন মজার খাবারের দিন রাখে, খাবারের সঙ্গে বা পরে দেয়, আর পরিমাণ অল্প রাখে। সবচেয়ে জরুরি হলো সাধারণ দিনগুলোতে বাচ্চা কী খায়।
বাচ্চা চকলেট ছাড়া থাকতে পারে না, এটা কি আসক্তি?
এমন মনে হতেই পারে, কিন্তু মিষ্টির প্রতি জোরালো টান বাচ্চাদের মধ্যে স্বাভাবিক। রোজকার এই টান সাধারণত আসে অভ্যাস, হাতের কাছে পাওয়া, দুই বেলার মাঝে লম্বা বিরতি আর পুরস্কার হিসেবে মিষ্টি দেওয়া থেকে। ‘আসক্তি’ বললে খাবারটা লড়াইয়ের বিষয় হয়ে যায়; আগে থেকে ঠিক করা মজার খাবারসহ একটা নিয়মিত রুটিন প্রায়ই কয়েক সপ্তাহে বায়না কমিয়ে আনে।
বাচ্চা রোজ ইন্সট্যান্ট নুডলস খায়, কীভাবে কমাব?
নুডলস বাদ দেবেন না, বরং রোজকার অভ্যাস থেকে সরিয়ে নির্দিষ্ট দিনের খাবার বানান। ডিম আর সবজি দিয়ে রান্না করুন, মসলার প্যাকেটের অর্ধেক দিন, আর টেবিলে বসে খেতে দিন। ঘরে কম প্যাকেট রাখুন, আর খিদের মুহূর্তের জন্য আরেকটা ঝটপট প্রিয় খাবার তৈরি রাখুন, যেমন খিচুড়ি, ডিম দিয়ে রুটি বা ঘরে বানানো নুডলস।
চিপসের বদলে বাচ্চাকে কী দেব?
ঘরের রান্নাঘর থেকেই মচমচে, নোনতা কিছু দিন: টমেটো আর পেঁয়াজকুচি দিয়ে মুড়ি, চিড়া ভাজা, ঘরে বানানো আলুর টুকরো ভাজা, বা পেয়ারা আর শসার টুকরো। মোটামুটি ৫ বছরের বেশি বয়সী বাচ্চার জন্য ভাজা বাদাম বা ছোলাও চলে; ছোটদের গলায় সহজে আটকে যেতে পারে বলে আস্ত বাদাম আর পপকর্ন দেবেন না।
দাদা-দাদি বা নানা-নানি বারবার চকলেট দিলে কী করব?
ধন্যবাদ দিন, তারপর বাচ্চার সামনে নয়, আলাদা করে একটা সহজ নিয়মে একমত হোন: উপহারের চকলেট যাবে মজার খাবারের বাক্সে, আর খাবারের পরে একটা করে বের হবে। নাতি-নাতনিকে আদর করার অন্য উপায়ও বলুন, যেমন ফল, গল্পের বই বা একসঙ্গে পিঠা বানানো। দাদা-দাদি, নানা-নানি এটা ভালোবাসা থেকেই করেন, তাই সমালোচনা না করে তাঁদের সাহায্য চান।
বাচ্চাকে কি বলব জাঙ্ক ফুড খেলে মোটা হয়ে যাবে?
না। ওজন বা ‘মোটা হয়ে যাবে’ ধরনের কথায় বাচ্চা নিজের শরীর নিয়ে লজ্জা পেতে পারে, খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে পারে, আর তাতে খাওয়ার অভ্যাস খুব কমই বদলায়। বরং কথা বলুন খেলার শক্তি, মজবুত দাঁত আর ঠিকমতো খাওয়ার পরের ভালো লাগা নিয়ে। বাচ্চার বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তা থাকলে বাচ্চার সঙ্গে নয়, তার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।




