প্যারেন্টিং স্টাইল কত প্রকার? কড়া, নরম আর ভারসাম্যের অভিভাবকত্ব
ছোট করে উত্তর
প্যারেন্টিং স্টাইল কত প্রকার? সাধারণত চারটি ধরনের কথা বলা হয়, যা ঠিক হয় বাবা-মায়ের আদর আর নিয়মের মিশ্রণে: উষ্ণ কিন্তু দৃঢ় (অথরিটেটিভ), কড়া কিন্তু আদর কম (অথরিটারিয়ান), আদর বেশি কিন্তু নিয়ম কম (পারমিসিভ), আর দুটোই কম (উদাসীন)। শিশু-বিকাশের নির্দেশনা বেশির ভাগ সময় উষ্ণ কিন্তু দৃঢ় ধরনের দিকেই ইঙ্গিত করে: প্রচুর আদর, শান্তভাবে বুঝিয়ে বলা অল্প কয়েকটা স্পষ্ট নিয়ম, আর মারধর বা চিৎকার নয়।
লেখাটি শুনুন
১৬ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া
এক নজরে
- কাদের জন্য
- যেকোনো বয়সের সন্তানের বাবা-মা, যাঁরা ভাবেন তাঁরা বেশি কড়া, বেশি নরম, নাকি মাঝামাঝি
- মূল কথা
- প্যারেন্টিং স্টাইল আসলে দুটো জিনিসের ব্যাপার: আপনি কতটা উষ্ণ আর সাড়া দেন, আর আপনার নিয়ম কতটা স্পষ্ট ও স্থির।
- উষ্ণতা আর দৃঢ়তা একসঙ্গে, অর্থাৎ অথরিটেটিভ প্যারেন্টিং; শিশু-বিকাশের নির্দেশনা এই ধরনটিকেই সবচেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী, সহযোগী বাচ্চার সঙ্গে যুক্ত করে।
- বেশির ভাগ বাবা-মা দিন, বাচ্চা আর নিজের ক্লান্তি অনুযায়ী একেক সময় একেক ধরন মেশান; স্টাইল একটা ধরন, আপনার গায়ে লাগানো তকমা নয়।
- উষ্ণ কিন্তু দৃঢ় হওয়ার পথ ছোট ছোট পদক্ষেপে: রোজ কাছে আসার একটা মুহূর্ত, শান্তভাবে বুঝিয়ে বলা অল্প কয়েকটা নিয়ম, আর মারধর বা অপমান নয়।
প্যারেন্টিং স্টাইল হলো রোজকার হাজারো মুহূর্তের পেছনের ধরন: বাচ্চা ‘না’ বললে আপনি কী বলেন, হোমওয়ার্ক না হলে কী হয়, ভয় পেলে বাচ্চা আপনাকে বলতে পারে কি না। প্যারেন্টিং স্টাইল কত প্রকার, তা জেনে বুঝে খুব কম বাবা-মা-ই কোনো ধরন বেছে নেন। আমরা সাধারণত সেভাবেই সন্তান মানুষ করি, যেভাবে আমরা মানুষ হয়েছি, বা ঠিক তার উল্টো, তারপর চলতে চলতে বদলাই।
সাধারণত যে চারটি ধরনের কথা বলা হয়, সেগুলো জানলে নিজেকে বিচার না করেই নিজের ধরনটা পরিষ্কার দেখা যায়। নিচে পাবেন সহজ কথায় সন্তান লালন-পালনের ধরন, একটা তুলনার টেবিল, রোজকার জীবনে অথরিটেটিভ প্যারেন্টিং দেখতে কেমন, জেন্টল আর পজিটিভ প্যারেন্টিং কোথায় পড়ে, আমাদের পরিবারে এই ধরনগুলো কেমন দেখায়, আর কীভাবে উষ্ণ কিন্তু দৃঢ় হওয়ার দিকে এগোবেন।
প্যারেন্টিং স্টাইল কত প্রকার? এক নজরে চারটি ধরন
প্যারেন্টিং স্টাইল কত প্রকার, এ প্রশ্নে শিশু-বিকাশ বিশেষজ্ঞরা সাধারণত চারটি ধরনের কথা বলেন, যা ঠিক হয় রোজকার দুটো মাপকাঠিতে। প্রথমটা উষ্ণতা: আদর, মন দিয়ে শোনা, বাচ্চার কেমন লাগছে তা খেয়াল করা। দ্বিতীয়টা নিয়ম: স্পষ্ট প্রত্যাশা, নিয়মকানুন আর কথা রাখা। কোনটা কতটা বেশি বা কম, তা থেকেই চারটি ধরন।
| ধরন | উষ্ণতা | নিয়ম | প্রায়ই যেমন শোনায় | বাচ্চা প্রায়ই যা শেখে |
|---|---|---|---|---|
| অথরিটেটিভ (উষ্ণ কিন্তু দৃঢ়) | বেশি | বেশি | ‘বুঝতে পারছি তোমার মন খারাপ। তবু আজ হবে না, কারণটা বলছি।’ | নিয়মের পেছনে কারণ থাকে; আমার অনুভূতির দাম আছে; ‘না’ শুনেও সামলে নিতে পারি |
| অথরিটারিয়ান (কড়া) | কম | বেশি | ‘আমি বলেছি, তাই।’ | মানো, নইলে শাস্তি; ভুল লুকাও; প্রশ্ন কোরো না |
| পারমিসিভ (নরম) | বেশি | কম | ‘আচ্ছা আচ্ছা, শুধু এবারের মতো।’ | কাঁদলে বা তর্ক করলে উত্তর বদলায়; সীমা মেনে নেওয়া কঠিন |
| উদাসীন (আনইনভলভড) | কম | কম | ‘যা খুশি করো, আমি ব্যস্ত।’ | আমি একা; কেউ খেয়াল করে না |
অথরিটেটিভ প্যারেন্টিং: উষ্ণ কিন্তু দৃঢ়
অথরিটেটিভ বাবা-মা আদর করেন, সাড়া দেন, আবার বয়স অনুযায়ী স্পষ্ট সীমাও ধরে রাখেন। তাঁরা নিয়ম বুঝিয়ে বলেন, বাচ্চার কথা শোনেন, তারপরও কথা রাখেন। এভাবে বড় হওয়া বাচ্চারা প্রায়ই বেশি আত্মবিশ্বাসী আর সহযোগী হয়, কারণ তারা সান্ত্বনা আর কাঠামো দুটোই একসঙ্গে পায়।
অথরিটারিয়ান প্যারেন্টিং: কড়া আর নিয়ন্ত্রণে
অথরিটারিয়ান বাবা-মা বাধ্যতা আশা করেন, অনেক নিয়ম দেন, কিন্তু খুব কমই বুঝিয়ে বলেন। প্রধান উপায় শাস্তি, প্রায়ই কঠোর, আর আদর প্রকাশ পায় কম। কেউ দেখলে বাচ্চা হয়তো ভালো আচরণ করে, কিন্তু বড় হতে হতে সে ভীত, লুকোচুরি করা বা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে, আর কেউ কেউ পরে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খায়।
পারমিসিভ প্যারেন্টিং: আদর আছে, নিয়ম কম
পারমিসিভ বাবা-মা উষ্ণ আর কাছের, কিন্তু বাচ্চা মন খারাপ করলে ‘না’ বলা বা নিয়ম ধরে রাখা তাঁদের জন্য কঠিন। আদরের কমতি নেই, কিন্তু কাঠামো দুর্বল। বাচ্চার জন্য অপেক্ষা করা, ‘না’ মেনে নেওয়া, ঘুম আর স্ক্রিনের সীমা কঠিন হতে পারে, আর পরে স্কুলে নিজেকে নিয়মে রাখাও।
উদাসীন প্যারেন্টিং: দুটোই কম
উদাসীন বাবা-মা আদরও কম দেন, পথও কম দেখান। এটা প্রায়ই ইচ্ছে করে নয়: এর পেছনে থাকতে পারে চরম ক্লান্তি, মন খারাপ, খুব লম্বা কর্মঘণ্টা, টাকার দুশ্চিন্তা, বা দূরে থাকা বাবা কিংবা মা। বাচ্চার মনে হতে পারে, কেউ তাকে দেখে না, আর সে অন্য কোথাও মনোযোগ খুঁজতে পারে। আপনার বাসার এখনকার অবস্থা এমন মনে হলে প্রথম ধাপ নিজের জন্য সাহায্য, নিজেকে দোষ দেওয়া নয়।
অথরিটেটিভ প্যারেন্টিং কী? রোজকার উদাহরণ
অথরিটেটিভ প্যারেন্টিংকে প্রায়ই এক কথায় বলা হয় ‘উষ্ণ কিন্তু দৃঢ়’: আপনি নরম আর কাছে থাকেন, আবার যা বলেন তা-ই করেন। রোজকার জীবনে এটা সাধারণত দেখতে এমন:
- জরুরি অল্প কয়েকটা স্পষ্ট নিয়ম, যেমন নিরাপত্তা, ভালো ব্যবহার, ঘুম আর পড়াশোনা, বাচ্চা বোঝে এমন ভাষায় একবার বুঝিয়ে বলা।
- অনুভূতি মেনে নেওয়া, আচরণে সীমা: ‘রাগ হতেই পারে। কিন্তু মারা যাবে না।’
- সিদ্ধান্তের আগে শোনা, বিশেষ করে বড় বাচ্চাদের বেলায়: ‘তোমার কথাটা বলো।’
- যুক্তিসংগত পরিণতি, শান্তভাবে মানা: একা রাস্তায় সাইকেল নিয়ে গেলে কাল সাইকেল বাসার ভেতরেই থাকবে।
- সীমার ভেতরে বেছে নেওয়ার সুযোগ: ‘গোসল গল্পের আগে, নাকি পরে?’
- বয়স আর বিশ্বাসের সঙ্গে বাড়তে থাকা স্বাধীনতা: ৪ বছরে নিজের জামা বাছা থেকে ১২ বছরে নিজের পড়ার সময় ঠিক করা।
- মারধর, অপমান বা ভয় দেখানো নয়; সময়ের সঙ্গে এগুলোতে আচরণ সাধারণত আরও খারাপ হয়। বদলে কী করবেন, আছে মারধর না করে শাসন লেখায়।
উষ্ণ কিন্তু দৃঢ় কথা যেমন শোনাতে পারে
- তোমাকে অনেক ভালোবাসি, তবু আজ হবে না।
- তুমি রেগে আছ, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু খেলনা ছুড়ে মারা ঠিক না।
- কী হয়েছে বলো। আমি শুনছি।
- নিয়ম হলো রাত ৮টায় স্ক্রিন বন্ধ। ৫ মিনিট আগে মনে করিয়ে দেব?
- ভুল করে ভেঙে ফেলেছ। চলো দেখি, দুজনে মিলে কীভাবে ঠিক করা যায়।
কড়া নাকি নরম: প্রতিটা ধরনে বাচ্চারা সাধারণত কেমন সাড়া দেয়?
অথরিটারিয়ান আর পারমিসিভ প্যারেন্টিং দেখতে উল্টো হলেও দুটোতেই একটা ফাঁক আছে: প্রতিটা ধরন বাচ্চাকে তার দরকারের অর্ধেক দেয়। আদর ছাড়া কড়া শাসন দেয় কাঠামো, কিন্তু নিরাপদ বোধ দেয় না; নিয়ম ছাড়া আদর দেয় ভালোবাসা, কিন্তু পথ দেখায় না।
- কড়া বাবা-মায়ের প্রভাবে বাচ্চা ভয়ে কথা শুনতে পারে, ভুল লুকাতে পারে, শাস্তি এড়াতে মিথ্যা বলতে পারে, বা কৈশোরে খুব জোরে বিদ্রোহ করতে পারে।
- খুব নরম ধরনে বাচ্চার কাছে ‘না’ অসহ্য লাগতে পারে, রুটিন আর ঘুমে সমস্যা হতে পারে, আর স্পষ্ট সীমা না থাকায় অস্থির লাগতে পারে।
- বাচ্চারা মানিয়ে নিতে পারে। কড়া বা নরম, দুই রকম বাসাতেই অনেক বাচ্চা ভালোভাবে বড় হয়, বিশেষ করে অন্তত একজন বড় মানুষ যদি সবসময় উষ্ণ থাকেন।
দৃঢ়তা নিজে কোনো সমস্যা নয়। আমাদের অনেক বাবা-মা সম্মান, পড়াশোনা আর পারিবারিক দায়িত্ব নিয়ে উঁচু প্রত্যাশা রাখেন, আর তাঁদের বাচ্চারা গভীরভাবে ভালোবাসা টের পায়। সমস্যা সাধারণত শুরু হয় তখন, যখন দৃঢ়তার সঙ্গে আসে ভয়, মারধর, অপমান, বা কথা বলার কোনো সুযোগই না থাকা।
আধুনিক প্যারেন্টিংয়ের নানা নাম: জেন্টল, পজিটিভ, হেলিকপ্টার আর টাইগার
অনলাইনে প্রায়ই নতুন নতুন নাম আসে। এর বেশির ভাগই আসলে উষ্ণতা আর নিয়মের সেই দুটো মাপকাঠিরই নানা রূপ:
| নাম | সাধারণত যা বোঝায় | সবচেয়ে কাছের ধরন |
|---|---|---|
| জেন্টল প্যারেন্টিং | সহমর্মিতা, কাছের সম্পর্ক আর শান্ত কথা; মারধর বা চিৎকার নয়; তবু সীমা ধরে রাখা | সীমা থাকলে অথরিটেটিভ; সীমা হারিয়ে গেলে পারমিসিভ |
| পজিটিভ প্যারেন্টিং | উৎসাহ, চেষ্টার প্রশংসা, রুটিন, আর শাস্তির বদলে শেখানো | অথরিটেটিভ |
| হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং | প্রতিটা পদক্ষেপে মাথার ওপর ঘোরা, বাচ্চার সব সমস্যা নিজে সমাধান করে দেওয়া | আদরসহ বেশি নিয়ন্ত্রণ; বাচ্চার নিজে করার সুযোগ কমে যেতে পারে |
| টাইগার প্যারেন্টিং | সাফল্যের জন্য খুব বেশি চাপ, লম্বা সময় পড়া, খেলার সময় কম | অথরিটারিয়ানের কাছাকাছি, বিশেষ করে আদর কম হলে |
তাহলে পজিটিভ প্যারেন্টিং কী, আর জেন্টল প্যারেন্টিং কি সব মেনে নেওয়া? ঠিকভাবে করলে দুটোতেই দৃঢ় সীমা থাকে, শুধু ভয়টা বাদ যায়; তাই দুটোই অথরিটেটিভ প্যারেন্টিংয়ের কাছাকাছি। জেন্টল প্যারেন্টিং পারমিসিভ হয়ে যায় তখনই, যখন ‘নরম’ মানে দাঁড়ায় কখনো ‘না’ না বলা।
আমাদের পরিবারে প্যারেন্টিং স্টাইল: শাসন, আদর আর মুরুব্বিরা
আমাদের অনেক পরিবারে প্রশ্নটা চারটি ধরনের কোনটা বাছবেন তা নয়; প্রশ্নটা হলো ‘আদর, নাকি শাসন?’ সত্যি উত্তর হলো দুটোই, একসঙ্গে। আজকের বাংলাদেশে সন্তান মানুষ করা নিয়ে আরও বড় পরিসরে পড়ুন বাংলাদেশে প্যারেন্টিং। কয়েকটা চেনা ধরন:
কড়া শাসন: ‘বাবা-মাকে ভয় না পেলে মানুষ হবে না’
আমরা অনেকেই বড় হয়েছি কড়া শাসনে: উঁচু গলা, তাকের ওপর বেত, ‘মুখে মুখে তর্ক করবে না।’ আমাদের বাবা-মা ভালো চেয়েই করতেন, আর ভয়টাও আমাদের মনে আছে। সম্মান, পড়াশোনা আর পারিবারিক নিয়মের উঁচু প্রত্যাশাগুলো রাখতে পারেন, শুধু ভয়টা বাদ দিন: বুঝিয়ে বলুন, শুনুন, আর মারধরের বদলে শান্ত পরিণতি ব্যবহার করুন।
অতিরিক্ত আদর: সবার ছোট আর প্রথম নাতি-নাতনি
অন্য প্রান্তে আছে সীমা ছাড়া আদর: সব আবদার মেটানো, কান্না থামাতে হাতে মোবাইল, আর এমন দাদা-দাদি, যাঁরা নাতি-নাতনির কান্না সহ্যই করতে পারেন না। ভালোবাসাটা সত্যি, আর তাতে কোনো ক্ষতি নেই; জীবন কঠিন করতে পারে সীমা না থাকাটা। আরও পড়ুন অতিরিক্ত আদরে বাচ্চা নষ্ট হয় কি লেখায়।
‘বাবা কড়া, মা নরম’
অনেক বাসায় একজন কড়া ভূমিকায়, আরেকজন নরম, আর বাচ্চা শিখে যায় ‘হ্যাঁ’ যিনি বলেন তাঁর কাছে যেতে। দুজনের ধরন হুবহু এক হওয়ার দরকার নেই, কিন্তু অল্প কয়েকটা নিয়ম একই হতে হবে। বাচ্চাদের আড়ালে নিজেরা সেগুলো ঠিক করুন; সহজ একটা শুরু দেখানো আছে দুজন বাবা-মা, একটি পরিকল্পনা লেখায়।
যৌথ পরিবার, অনেক মুরুব্বি
যৌথ পরিবারে দুপুরের খাবারের আগেই একটা বাচ্চা চার রকম ধরনের দেখা পেতে পারে: কড়া দাদা, সব মেনে নেওয়া দাদি, ব্যস্ত চাচা, আর উষ্ণ কিন্তু দৃঢ় চাচি। এই বৈচিত্র্য নিজে ক্ষতিকর নয়। সবচেয়ে বেশি কাজে দেয় তখন, যখন জরুরি অল্প কয়েকটা নিয়ম, যেমন নিরাপত্তা, ঘুম আর মারধর নয়, সব বড়দের কাছে একই থাকে; দেখুন যৌথ পরিবারে সন্তান লালন-পালন।
কোচিং, টিউটর আর পরীক্ষার বছর
কোচিং, প্রাইভেট টিউটর আর বোর্ড পরীক্ষার চাপে উষ্ণ বাবা-মাও টাইগার ধরনের চাপের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন। এই বছরগুলোতে আদরটা যেন চোখে পড়ে: চেষ্টাটা খেয়াল করুন, ঘুম বাঁচিয়ে রাখুন, আর বাচ্চা যেন জানে, আপনার ভালোবাসা জিপিএ-র ওপর নির্ভর করে না।
ভালো অভিভাবক হওয়ার উপায়: ধাপে ধাপে উষ্ণ কিন্তু দৃঢ় হওয়া
পুরো ধরনটা বদলানোর দরকার নেই। বেশির ভাগ বাবা-মা অল্প কয়েকটা ছোট পরিবর্তন বারবার করেই অথরিটেটিভ প্যারেন্টিংয়ের কাছাকাছি আসেন:
- নিজের অভ্যাসটা খেয়াল করুন। ক্লান্ত থাকলে আপনি কি গলা চড়ান, মেনে নেন, নাকি সরে যান? কাজ করতে হবে ওই অভ্যাসটা নিয়েই।
- আপনি কড়ার দিকে ঝুঁকলে আগে উষ্ণতা যোগ করুন: দিনে ১০ মিনিট বাচ্চার পছন্দের খেলা, আর একটা নির্দিষ্ট প্রশংসা।
- আপনি নরমের দিকে ঝুঁকলে এমন একটা সীমা যোগ করুন, যা প্রতিবার নরমভাবে ধরে রাখবেন, যেমন খাওয়ার সময় মোবাইল নয়।
- কারণটা এক বাক্যে বুঝিয়ে বলুন, তারপর তর্ক থামান।
- মারধর আর চিৎকারের জায়গায় শান্ত পরিণতি আনুন, আর মেজাজ হারালে সম্পর্কটা জোড়া লাগান: ‘আমি চিৎকার করেছি। দুঃখিত। চলো, আবার চেষ্টা করি।’
- বাচ্চা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেছে নেওয়ার সুযোগ আর কাজের দায়িত্ব ওর হাতে দিন, যাতে দায়িত্বের সঙ্গে স্বাধীনতাও বাড়ে।
উষ্ণ কিন্তু দৃঢ় হওয়ার ৭ দিনের পরিকল্পনা
একটা পরিবর্তন বেছে নিন, প্রতিদিন কী হলো লিখে রাখুন, আর এক সপ্তাহ পরে মিলিয়ে দেখুন।
- দিন ১: খেয়াল করুন। দিনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তটা আর আপনি কী করলেন লিখে রাখুন: গলা চড়ালেন, নরম হয়ে গেলেন, নাকি সরে গেলেন।
- দিন ২: এই সপ্তাহের সবচেয়ে জরুরি একটা নিয়ম বেছে নিন, আর ভাঙলে শান্ত পরিণতি কী হবে ঠিক করুন।
- দিন ৩: দিনে ১০ মিনিট মোবাইল ছাড়া এমন সময় শুরু করুন, যেখানে বাচ্চা ঠিক করবে কী হবে।
- দিন ৪: নিয়মটা এক বাক্যে বাচ্চাকে বুঝিয়ে বলুন, আর ওর কথাও শুনুন।
- দিন ৫: সঙ্গীর সঙ্গে, আর দাদা-দাদি বা গৃহকর্মী দেখাশোনায় থাকলে তাঁদের সঙ্গেও, আলাদা করে নিয়মটা নিয়ে একমত হোন।
- দিন ৬: উষ্ণ কিন্তু দৃঢ় একটা কথা অনুশীলন করুন, যতক্ষণ না সহজ লাগে: ‘তোমাকে অনেক ভালোবাসি, তবু আজ হবে না।’
- দিন ৭: দিন ১-এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন: কতবার চিৎকার করলেন বা মেনে নিলেন, আর বাচ্চা কেমন সাড়া দিল। যা কাজে দিয়েছে তা রাখুন, আর পরের ধাপ বেছে নিন।
দৃঢ়তা ছাড়া আদরে বাচ্চা দিশা হারাতে পারে; আদর ছাড়া দৃঢ়তা ঠান্ডা লাগে। বাচ্চার দরকার দুটোই।
প্যারেন্টিং নিয়ে কখন সাহায্য নেবেন
সব বাবা-মায়েরই মাঝে মাঝে কঠিন সময় যায়। নিচের কোনোটা হলে নিজের বা বাচ্চার জন্য ডাক্তার, কাউন্সেলর বা শিশু-মনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলুন:
এমন হলে সাহায্য নিন
- প্রায় প্রতিদিন মারছেন, চিৎকার করছেন বা ভয় দেখাচ্ছেন, আর থামাতে পারছেন না, বা মনে হচ্ছে বাচ্চাকে আঘাত করে ফেলতে পারেন। বাচ্চা নিরাপদে আছে কি না নিশ্চিত করুন, সরে যান, আর সেদিনই সাহায্য নিন; কেউ এখনই বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
- দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে বেশির ভাগ দিন মন খারাপ, অনুভূতিহীন বা ক্লান্ত লাগে, আর বাচ্চার জন্য প্রায় কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
- বাচ্চা বাসার কোনো বড় মানুষকে ভয় পায় বলে মনে হয়, এমন আঘাত আছে যার ব্যাখ্যা কেউ দেয় না, বা বাচ্চা বলছে কেউ ওকে মারে। বাচ্চার কথা বিশ্বাস করুন, ওকে ওই মানুষটার কাছ থেকে দূরে রাখুন, আর সেদিনই ব্যবস্থা নিন। স্থানীয় থানায় জানান, আর বাচ্চা এই মুহূর্তে বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
- দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে বাচ্চা বেশির ভাগ দিন দুঃখী, খিটখিটে বা চুপচাপ, বা আগের পছন্দের কাজেও আর আগ্রহ নেই।
- আপনার সন্তান মরে যেতে চাওয়ার কথা বলে, বা ইচ্ছে করে নিজেকে আঘাত করে। শান্ত থাকুন আর পাশে থাকুন; এখনই বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন, নইলে সেদিনই ডাক্তার দেখান।
- সন্তান মানুষ করা নিয়ে বড়দের তর্ক প্রায় প্রতি সপ্তাহে চিৎকার-চেঁচামেচিতে গড়ায়: একজন পারিবারিক কাউন্সেলর সবাইকে এক পরিকল্পনায় আনতে সাহায্য করতে পারেন।
আপনার প্যারেন্টিং স্টাইল স্থির কিছু নয়; বেশির ভাগ দিন আপনি যা করেন, সেটাই, আর একটু একটু করে তা বদলাতে পারে। ParentMind আপনাকে প্রতিদিন কী হলো তা নোট করতে সাহায্য করে, যেমন কঠিন মুহূর্তগুলো আর কী কাজে দিল, যাতে নিজের ধরনগুলো সহজে চোখে পড়ে; ParentMind কীভাবে কাজ করে দেখুন।
বাবা-মায়েরা যা জানতে চান
প্যারেন্টিং স্টাইল কত প্রকার ও কী কী?
সাধারণত চারটি প্যারেন্টিং স্টাইলের কথা বলা হয়: অথরিটেটিভ (উষ্ণ, সঙ্গে স্পষ্ট সীমা), অথরিটারিয়ান (কড়া, আদর আর ব্যাখ্যা কম), পারমিসিভ (উষ্ণ, কিন্তু নিয়ম কম), আর উদাসীন (আদরও কম, পথ দেখানোও কম)। এগুলো ঠিক হয় দুটো জিনিসে: বাবা-মা কতটা সাড়া দেন, আর তাঁদের প্রত্যাশা কতটা স্পষ্ট। বেশির ভাগ বাবা-মা একেক সময় একেক ধরন মেশান।
কোন প্যারেন্টিং স্টাইল সবচেয়ে ভালো?
শিশু-বিকাশের নির্দেশনা বেশির ভাগ সময় অথরিটেটিভ প্যারেন্টিংয়ের দিকেই ইঙ্গিত করে, যেখানে উষ্ণতার সঙ্গে থাকে স্পষ্ট, শান্ত সীমা। এভাবে বড় হওয়া বাচ্চারা প্রায়ই বেশি আত্মবিশ্বাসী, সহযোগী হয়, আর নিজের অনুভূতি সামলাতে পারে। কোনো বাবা-মা-ই নিখুঁতভাবে একটা ধরনে পড়েন না, আর সংস্কৃতিভেদে ধরনগুলো দেখতে আলাদা। সবচেয়ে জরুরি হলো প্রচুর আদর, অল্প কয়েকটা নিয়ম যা মানা হয়, আর মারধর বা অপমান নয়।
অথরিটেটিভ আর অথরিটারিয়ান প্যারেন্টিংয়ের পার্থক্য কী?
দুই ধরনেই স্পষ্ট নিয়ম থাকে; তফাত উষ্ণতা আর ব্যাখ্যায়। অথরিটেটিভ বাবা-মা কারণ বুঝিয়ে বলেন, বাচ্চার কথা শোনেন, আর সীমা ধরে রেখেও আদর বজায় রাখেন। অথরিটারিয়ান বাবা-মা প্রশ্নহীন বাধ্যতা আশা করেন, আর শাস্তির ওপর বেশি নির্ভর করেন। প্রথম ধরনের বাচ্চারা প্রায়ই নিয়ম মানে বুঝে; দ্বিতীয় ধরনের বাচ্চারা মানতে পারে মূলত ভয়ে।
জেন্টল প্যারেন্টিং মানে কি সব মেনে নেওয়া?
না, ঠিকভাবে করলে নয়। জেন্টল প্যারেন্টিং মানে সহমর্মিতা, শান্ত কথা, মারধর বা চিৎকার নয়, তবু দৃঢ় সীমা ধরে রাখা; এটা অথরিটেটিভ প্যারেন্টিংয়ের কাছাকাছি। এটা পারমিসিভ হয়ে যায় তখনই, যখন ‘নরম’ মানে দাঁড়ায় কখনো ‘না’ না বলা, কান্না দেখলেই মেনে নেওয়া, বা মন খারাপ এড়াতে নিয়ম তুলে দেওয়া। নরম আর দৃঢ়, দুটো একসঙ্গে চলতে পারে।
কড়া বাবা-মা কি বাচ্চার জন্য খারাপ?
শুধু কড়া হওয়াটা সমস্যা নয়; উঁচু প্রত্যাশা আর স্পষ্ট নিয়মে অনেক বাচ্চা ভালো থাকে। সমস্যা সাধারণত হয় তখন, যখন কড়াকড়ির সঙ্গে আসে ভয়, মারধর, অপমান, বা কথা বলার কোনো সুযোগ না থাকা। তখন বাচ্চা হয়তো শুধু কেউ দেখলেই কথা শোনে, ভুল লুকায়, বা কৈশোরে বিদ্রোহ করে। প্রত্যাশাগুলো রাখুন, বুঝিয়ে বলুন, আর সঙ্গে আদর যোগ করুন।
বন্ধুর মতো বাবা-মা হওয়া কি ভালো?
বন্ধুর মতো কাছের হওয়া, যাঁর সঙ্গে সহজে কথা বলা যায়, যেকোনো বয়সেই ভালো। তবে বাচ্চার শুধু বন্ধু নয়, বাবা-মাও দরকার: এমন কেউ, যিনি সীমা ঠিক করেন, কঠিন সিদ্ধান্ত নেন, আর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকেন। অনেক পরিবার চায় এমন বাবা-মা, যাঁরা বন্ধুর মতো উষ্ণ আর পথপ্রদর্শকের মতো স্থির, বিশেষ করে কৈশোরে।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।



