সন্তানের উপর চিৎকার করা বন্ধ করার উপায়, আর করে ফেললে কীভাবে মিটিয়ে নেবেন
ছোট করে উত্তর
সন্তানের উপর চিৎকার করা বন্ধ করার উপায়: রাগ ওঠার শুরুর লক্ষণগুলো চিনুন, কথা বলার আগে থেমে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন, তারপর কাছে গিয়ে একটা শান্ত নির্দেশ দিন। সবচেয়ে কঠিন সময়ের জন্য, সাধারণত ক্লান্ত সন্ধ্যার জন্য, আগে থেকে পরিকল্পনা করুন। চিৎকার করে ফেললে তাড়াতাড়ি ছোট, সৎ একটা ‘সরি’ বলে মিটিয়ে নিন। কখনো মনে হলে যে বাচ্চাকে আঘাত করে ফেলতে পারেন, সরে যান আর সেদিনই সাহায্য নিন।
লেখাটি শুনুন
১৬ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া
এক নজরে
- কাদের জন্য
- যে বাবা-মা বা অভিভাবক চান না, তবু চিৎকার করে ফেলেন; যেকোনো বয়সের সন্তানের জন্য
- মূল কথা
- চিৎকার সাধারণত বোঝায় যে আপনি ক্লান্ত আর চাপে আছেন, আপনি খারাপ বাবা-মা নন; আর এটা বদলানো যায়।
- আসল কাজটা চিৎকারের আগে: শরীরের সতর্কসংকেতগুলো চিনুন, আর থামার একটা পরিকল্পনা তৈরি রাখুন।
- জোরে বলার চেয়ে কাছে গিয়ে আস্তে বলা প্রায়ই বেশি কাজ করে: চোখের সমান উচ্চতায় গিয়ে একটা ছোট নির্দেশ দিন।
- চিৎকারের পর মিটিয়ে নিন: কী করেছেন বলুন, ‘কিন্তু’ ছাড়া সরি বলুন, আবার শুরু করুন। আপনাকে ভুল শুধরাতে দেখে বাচ্চা অনেক কিছু শেখে।
সন্তানের উপর চিৎকার করা বন্ধ করার উপায় খুঁজছেন মানে হয়তো ধরনটা আপনার চেনা: প্রথমে ভালোভাবে বলেন, তারপর আবার, তারপর তৃতীয়বার, আর তারপর চিৎকারটা বেরিয়ে আসে, যতটা চেয়েছিলেন তার চেয়ে অনেক জোরে। পরে নিজেরই খুব খারাপ লাগে। প্রায় সব বাবা-মা-ই কখনো না কখনো চিৎকার করেন, আর বেশির ভাগ সময় তা হয় ক্লান্তি, তাড়াহুড়া বা দুশ্চিন্তার মধ্যে, সন্তানকে কম ভালোবাসেন বলে নয়।
চিৎকারে তখনকার মতো কাজ হয়, কিন্তু সময়ের সঙ্গে দাম দিতে হয় অনেক: বাচ্চারা প্রায়ই স্বাভাবিক গলার কথা কানে তোলা বন্ধ করে দেয়, পাল্টা চিৎকার করে, বা ভয়ে ভয়ে থাকে। এই লেখাটা আপনাকে নিয়ে, বাচ্চাকে নিয়ে নয়: রাগ ওঠার কারণ, থামার পরিকল্পনা, বদলে কী বলবেন, কীভাবে মিটিয়ে নেবেন, আর ৭ দিনের পরিকল্পনা।
সন্তানের উপর রাগ করা: কেন বারবার মেজাজ হারাই?
সন্তানের উপর মেজাজ হারানো খুব কমই শুধু একটা গ্লাস উল্টে ফেলার জন্য হয়। রাগটা সাধারণত জমে সারাদিন ধরে: কম ঘুম, লম্বা যানজট, কাজের লম্বা তালিকা, টাকা বা পরীক্ষার দুশ্চিন্তা, তারপর আরও একটা কিছু। যাঁরা চিৎকার করেন, তাঁদের রাগের সাধারণত কিছু চেনা কারণ থাকে, আর নিজেরগুলো চেনাই প্রথম ধাপ।
| কারণ | কেমন দেখায় | ছোট একটা বদল |
|---|---|---|
| ক্লান্তি বা খিদে | অফিস বা স্কুল থেকে ফেরার পরের ঘণ্টা, রাতের খাবারের আগে | বাসায় ঢোকার আগে কিছু খেয়ে নিন, পানি খান; ওই এক ঘণ্টায় প্রত্যাশা একটু কম রাখুন |
| তাড়াহুড়া | স্কুলের সকাল, দাওয়াতে বের হওয়ার সময় | ১৫ মিনিট আগে শুরু করুন; জামাকাপড় আর ব্যাগ আগের রাতেই গুছিয়ে রাখুন |
| একই কথা বারবার বলা | চতুর্থবারের মতো ‘জুতা পরো’ | কাছে গিয়ে একবার বলুন; তারপর আবার বলার বদলে কাজটা করতে সাহায্য করুন |
| অসম্মানিত লাগা | চোখ ঘোরানো, ‘না!’, দরজা জোরে বন্ধ করা | নিজেকে বলুন, এটা অপমান নয়; নিজেকে সামলানো ও এখনো শিখছে। পরে শান্তভাবে কথা বলুন |
| নিজের ছোটবেলা | নিজের মুখে বাবা-মায়ের সেই কথাগুলো শুনতে পাওয়া | দোষ না দিয়ে খেয়াল করুন, আর বদলে কোন কথাটা বলতে চান, তা ঠিক করে রাখুন |
এক সপ্তাহ ধরে কখন চিৎকার করেছেন আর ঠিক আগে কী হয়েছিল, তা লিখে রাখলে প্রায়ই দেখা যায়, বেশির ভাগ চিৎকার হয় একই দু-তিনটা মুহূর্তে; পরিকল্পনা দরকার ঠিক ওই মুহূর্তগুলোর জন্য। বাচ্চার নিজের রাগ যদি আপনার রাগ উসকে দেয়, দুজনের জন্যই উপায় আছে শিশুর রাগ কমানোর উপায় লেখায়।
সন্তানের উপর চিৎকার করা বন্ধ করার উপায়: চিৎকারের আগের কয়েক সেকেন্ডে থামা
রাগ ভালো ইচ্ছার চেয়ে দ্রুত চলে, তাই বাবা-মায়ের রাগ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা এত সহজ হতে হবে যে মাথা গরম অবস্থাতেও কাজে লাগানো যায়। শান্ত দিনগুলোতে প্র্যাকটিস করুন, যাতে দরকারের সময় তা হাতের কাছে থাকে।
- রাগের শুরুর লক্ষণ চিনে ফেলুন: মুখ গরম হয়ে যাওয়া, চোয়াল শক্ত হওয়া, হাত মুঠো হয়ে আসা, গলা চড়তে থাকা, মনে ‘আর পারছি না’ ভাবনা।
- মুখে বলুন: ‘আমার রাগ হচ্ছে। একটু সময় দরকার।’ নাম দিলে গতি একটু কমে, আর বাচ্চাও দেখে রাগ হলে কী করতে হয়।
- মুখ বন্ধ রাখুন, আর তিনবার ধীরে শ্বাস ছাড়ুন, নেওয়ার চেয়ে লম্বা করে।
- শরীরের ভঙ্গি বদলান: হাতের মুঠো খুলুন, বসে পড়ুন, বা মুখে পানির ঝাপটা দিন। শরীর নিচে নামলে গলাও প্রায়ই নামে।
- নিরাপত্তা যতটুকু অনুমতি দেয়, ততটুকুই সরে যান। বড় বাচ্চা হলে পাশের ঘরে যাওয়া যায়। ছোট বাচ্চা বা কোলের শিশু থাকলে ঘরেই থাকুন: জানালার দিকে ফিরে দাঁড়ান, বা বাসার অন্য কোনো বড় মানুষের হাতে দায়িত্ব দিন। ছোট বাচ্চাকে কখনো একা, বা কোলের শিশুর সঙ্গে একা রেখে যাবেন না।
- লম্বা বক্তৃতা নয়, একটা উপায় নিয়ে ফিরে আসুন: চোখের সমান উচ্চতায় একটা ছোট নির্দেশ, ‘আগে এটা, তারপর ওটা’, বা আগে থেকে ঠিক করা ছোট একটা পরিণতি।
চিৎকারের বদলে কী করবেন: কাছে গিয়ে, আস্তে, কম কথায়
সন্তানের উপর চিৎকার করা বন্ধ করার উপায়ের বড় অংশ হলো চিৎকারের জায়গায় এমন কিছু বসানো, যা আরও ভালো কাজ করে। চিৎকার অনেক সময় দূর থেকে মনোযোগ পাওয়ার একটা উপায়, আর তার বেশির ভাগই কাছে গিয়ে, কম কথায় আরও ভালোভাবে বলা যায়।
| চিৎকার করে বলার বদলে | চেষ্টা করুন |
|---|---|
| ‘কতবার বলতে হবে তোমাকে?!’ | কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রাখুন: ‘এখন জুতা পরো। আমি সাহায্য করছি।’ |
| ‘দুজনেই থামো, ঝগড়া বন্ধ!’ | দুজনের মাঝে দাঁড়ান: ‘হাত সরাও। তুমি ওখানে বসো, তুমি এখানে।’ |
| ‘তুমি কখনো কথা শোনো না!’ | শান্তভাবে একটা শব্দ: ‘হোমওয়ার্ক।’ অথবা ‘আগে এটা, তারপর ওটা’। |
| ‘এখনই মোবাইল বন্ধ করো!’ | ৫ মিনিট আগে জানিয়ে রাখুন, তারপর: ‘সময় শেষ। মোবাইলটা আমার হাতে দাও।’ |
| ‘এই মুহূর্তে ঘুমাও!’ | ফিসফিস করে: ‘এখন বাতি বন্ধ। আমি ২ মিনিট তোমার পাশে বসছি।’ |
রাগের মুহূর্তে যা বলতে পারেন
- আমার ২ মিনিট সময় দরকার। তারপর আমরা একসঙ্গে ব্যাপারটা মেটাব।
- আমি চিৎকার করব না। একবারই বলছি: এখন ব্যাগ গোছাও।
- দেখছি তুমি রেগে আছো। আমারও রাগ হচ্ছে। চলো, আগে দুজনেই একটু শান্ত হই।
- (জীবনসঙ্গী বা বাসার অন্য কাউকে) আমি প্রায় চিৎকার করে ফেলছি। কয়েক মিনিট একটু সামলাবে?
বাচ্চা কথা শোনে না বলেই যদি বেশির ভাগ চিৎকার হয়, দেখুন বাচ্চা কথা শোনে না; চিৎকারের বদলে শান্ত, দৃঢ় পরিণতির জন্য দেখুন বাচ্চাকে শাসন করার উপায়।
ছোট বাচ্চা, স্কুলপড়ুয়া আর টিনএজারের ওপর চিৎকার
- ছোট বাচ্চারা (১–৩ বছর) চিৎকারের কথা নয়, মূলত ভয়টা শোনে। বাচ্চাকে বা জিনিসটাকে সরিয়ে নিন, আর অল্প কথায় বলুন: ‘আস্তে ধরো, সোনা।’
- স্কুলপড়ুয়া বাচ্চারা (৪–১২ বছর) প্রায়ই বেশি চিৎকার করা বাবা-মায়ের কথা কানে তোলা বন্ধ করে দেয়। কম কথা, আস্তে বলা আর শান্তভাবে কথা রাখা সাধারণত বেশি দূর পৌঁছায়।
- টিনএজাররা প্রায়ই পাল্টা চিৎকার করে। বলুন ‘দুজনে একটু শান্ত হলে কথা বলি’, ঘর থেকে বেরিয়ে যান, আর সেদিনই আবার কথাটায় ফিরে আসুন।
ক্লান্ত সন্ধ্যা: সবচেয়ে কঠিন সময়টা কীভাবে শান্ত করবেন
অনেক পরিবারে সন্তানের উপর চিৎকার করা বন্ধ করার উপায় খুঁজতে হয় সন্ধ্যার কয়েকটা ঘণ্টায়, মোটামুটি ৬টা থেকে রাত ৯টা: অফিস আর যানজট পেরিয়ে বাবা-মা বাসায় ফিরেছেন, রান্না বাকি, হোমওয়ার্ক দেখা বাকি, বাচ্চারা ক্লান্ত আর অস্থির। ইচ্ছাশক্তির চেয়ে এই সময়টায় ছোট কয়েকটা বদল প্রায়ই বেশি কাজে দেয়।
- খেয়ে বাসায় ঢুকুন। ঢোকার আগে, বা স্কুল থেকে আনতে যাওয়ার আগে, একটু নাশতা আর এক গ্লাস পানি রাগের ধার অনেকটা কমায়।
- শুরুতেই ৫ মিনিট নিজের জন্য: হোমওয়ার্ক বা রান্না ধরার আগে কাপড় বদলান, মুখ ধোন, নামাজ পড়ুন বা এক কাপ চা নিয়ে চুপচাপ একটু বসুন।
- বাসায় ফিরে বাচ্চাকে ১০ মিনিট পুরো মনোযোগ দিন। শুরুতেই আপনাকে পেলে বাচ্চা পরে প্রায়ই সহজ থাকে।
- বেশির ভাগ দিন সন্ধ্যাটা একই রকম রাখুন: নাশতা, হোমওয়ার্ক, খেলা, রাতের খাবার, হাত-মুখ ধোয়া, ঘুম। ঘুম থেকে ওঠার সময় ধরে পিছিয়ে এসে মানানসই ঘুমের সময় বের করে দেয় স্কুলের দিনের পরিকল্পনা।
- সবচেয়ে কঠিন ঘণ্টাটার জন্য প্রত্যাশা নামিয়ে আনুন: সাদামাটা রাতের খাবার, একটু এলোমেলো ঘর, একবারে একটাই লড়াই।
চিৎকার করে ফেললে কী করবেন: বাচ্চার সঙ্গে কীভাবে মিটিয়ে নেবেন
যিনি কখনো কখনো চিৎকার করেন, মাঝে মাঝে তাঁর আবারও ভুল হবে; সবচেয়ে জরুরি হলো তার পরে কী হচ্ছে। ছোট, সৎ একটা মিটমাটে বাচ্চা দেখে, যারা একে অপরকে ভালোবাসে তারা ভুল ঠিক করে নিতে পারে।
- আগে নিজে শান্ত হোন। মিটমাট ১০ মিনিট, বা ঘুমের সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে; তাড়াহুড়োর ‘সরি’ প্রায়ই আরেকটা উপদেশ হয়ে যায়।
- বাচ্চার কাছে যান, ওর সমান উচ্চতায় বসুন, আর কী করেছেন তা বলুন: ‘আমি তোমার ওপর চিৎকার করেছি।’
- ‘কিন্তু’ ছাড়া সরি বলুন। ‘সরি, চিৎকার করেছি, কিন্তু তুমি…’ বললে দোষটা আবার ওর ঘাড়েই যায়। ওর আচরণ নিয়ে কথা পরে, আলাদা করে।
- পরিষ্কার করে বলুন, আপনার চিৎকারের দায় ওর নয়, যদিও ওর আচরণ নিয়েও কাজ করতে হবে।
- পরের বার কী করার চেষ্টা করবেন তা বলুন, তারপর আবার কাছে আসুন: জড়িয়ে ধরা, একটা গল্প, একসঙ্গে হোমওয়ার্কটা শেষ করা।
মিটিয়ে নেওয়ার কথা
- আমি তোমার সঙ্গে গলা চড়িয়ে কথা বলেছি। এটা ঠিক হয়নি, আমি দুঃখিত।
- এমন চিৎকার শোনার মতো কিছু তুমি করোনি। আমি ক্লান্ত ছিলাম, আর এটা সামলানোর দায় আমার।
- পরের বার এত রাগ হলে আমি আগে বলব, ‘আমার এক মিনিট লাগবে।’
- (বড় সন্তানকে) তখন আমি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি। তুমি যখন চাও, তোমার কথাটা আমি শুনতে চাই।
বাচ্চাকে বকার পর অনুশোচনা: নিজেকে দোষ দিয়ে লাভ নেই কেন
চিৎকারের পর অনুশোচনা হওয়া মানে আপনি যত্ন করেন। কিন্তু অনুশোচনা যখন হয়ে যায় ‘আমি খুব খারাপ মা’ বা ‘আমি ছেলেটাকে নষ্ট করে দিচ্ছি’, তখন পরের দিনটা সাধারণত আরও কঠিন হয়: নিজেকে ব্যর্থ মনে করা বাবা-মা প্রায়ই আরও টানটান থাকেন, আর সহজে মেজাজ হারান। বাবারাও এটা অনুভব করেন। শান্ত প্যারেন্টিং মানে কখনো রাগ না হওয়া নয়; মানে রাগ হলে কী করবেন, তার একটা পরিকল্পনা থাকা।
- দোষারোপের বদলে দায়িত্ব নিন: ‘আমি খারাপ বাবা-মা’ নয়, বরং ‘আমি চিৎকার করেছি, মিটিয়ে নেব, আর কালকের সন্ধ্যার জন্য পরিকল্পনা করব।’
- নিখুঁত হওয়া নয়, অগ্রগতি গুনুন: দিনে তিনবারের চিৎকার একবারে নেমে আসাও সত্যিকারের বদল।
- বাচ্চাকে যা দেন, নিজেকেও সেগুলো দিন: ঘুম, খাবার, একটু একা থাকার সময়, কথা বলার মতো কেউ।
- দায়িত্ব ভাগ করুন। জীবনসঙ্গী বা পরিবারের অন্য কাউকে বলুন বেশির ভাগ দিন সন্ধ্যার একটা কাজ নিতে, যেমন হোমওয়ার্ক বা ঘুম পাড়ানো; কীভাবে করবেন তা নিয়ে মতের অমিল থাকলে দেখুন দুজন বাবা-মা, এক পরিকল্পনা।
কখনো চিৎকার করেন না, এমন বাবা-মা হতে হবে না। এমন বাবা-মা হোন, যিনি মিটিয়ে নেন।
আমাদের বাসায়: মুরব্বি, ভরা সংসার আর ‘চিৎকার না করলে কথা শোনে না’
অনেক বাংলাদেশি পরিবারে উঁচু গলায় কথা বলা প্রতিদিনের স্বাভাবিক ব্যাপার, আর আমাদের অনেকেই বড় হয়েছি ভালোবাসার মানুষদের বকাঝকা শুনে। প্রায়ই শোনা যায়, ‘চিৎকার না করলে বাচ্চা কথা শোনে না।’ অনেক সময় উল্টোটাই ঘটে: যে বাচ্চা প্রায়ই চিৎকার শোনে, সে চিৎকারের জন্য অপেক্ষা করতে শেখে।
- মুরব্বিরা দেখছেন: যৌথ পরিবারে জোরে না বকলে মনে হতে পারে সবাই বিচার করছে। একই সঙ্গে দৃঢ় আর শান্ত থাকা যায়; শান্ত গলায় ‘আমি দেখছি’ বলাই যথেষ্ট। পরে আলাদা করে কথা বলুন।
- অন্যরা যখন বাচ্চার ওপর চিৎকার করেন, যেমন খালা, বড় কাজিন বা গৃহকর্মী: নরমভাবে বাসার সবার জন্য একটা নিয়ম ঠিক করুন। এই বাসায় বাচ্চাদের ওপর চিৎকার নয়, আর কেউ মারবে না।
- লোডশেডিংয়ের সন্ধ্যা: গরম আর অন্ধকারে সবার মেজাজই চড়ে থাকে। চার্জ দেওয়া একটা লাইট আর হাতপাখা হাতের কাছে রাখুন, আর বিদ্যুৎ না আসা পর্যন্ত হোমওয়ার্কের বদলে চুপচাপ একটা খেলা বা গল্প চলুক।
চিৎকার কমানোর ৭ দিনের পরিকল্পনা
- দিন ১: খেয়াল করুন। যতবার চিৎকার করেছেন বা করতে গিয়ে থেমেছেন, লিখে রাখুন: কখন, ঠিক আগে কী হয়েছিল, আর আপনি কতটা ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত বা তাড়াহুড়োয় ছিলেন। এখনই কিছু বদলাবেন না।
- দিন ২: নোট দেখে সবচেয়ে বড় দুটো কারণ খুঁজে বের করুন, আর ওপরের তালিকা থেকে প্রতিটার জন্য একটা ছোট বদল বেছে নিন।
- দিন ৩: শান্ত অবস্থায় একবার থামার পরিকল্পনাটা প্র্যাকটিস করুন, আর বাচ্চাকে বলুন: ‘রাগ উঠতে থাকলে আমি বলব, আমার এক মিনিট লাগবে।’
- দিন ৪: দূর থেকে ডাকার বদলে কাছে যান। প্রতিটা নির্দেশ দিন কাছে গিয়ে, চোখের সমান উচ্চতায়, এক বাক্যে।
- দিন ৫: সবচেয়ে কঠিন ঘণ্টাটার পরিকল্পনা করুন: ঢোকার আগে একটু নাশতা, নিজের জন্য ৫ মিনিট, বাচ্চার জন্য ১০ মিনিট।
- দিন ৬: এই সপ্তাহে চিৎকার করে থাকলে ওপরের ধাপগুলো ধরে একবার মিটিয়ে নিন। না করে থাকলে বাচ্চাকে বলুন, আপনি কী নিয়ে চেষ্টা করছেন।
- দিন ৭: দিন ১-এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন: কতবার চিৎকার, কোন সময়ে, কতবার থামতে পেরেছেন। যা কাজে দিয়েছে তা রাখুন, আর পরের বদলটা বেছে নিন।
নিজের রাগের জন্য কখন সাহায্য নেবেন
মাঝে মাঝে চিৎকার পরিবারের সাধারণ জীবনেরই অংশ। লজ্জা না করে নিজের জন্য সাহায্য নিন, যদি:
কখন সাহায্য নেবেন
- কয়েক সপ্তাহ সত্যিই চেষ্টা করার পরও প্রায় প্রতিদিন চিৎকার করছেন।
- চিৎকার গড়ায় গালমন্দ, হুমকি, জিনিস ছোড়া, ধাক্কা দেওয়া বা মারধরে, অথবা একবার শুরু হলে থামতে পারেন না।
- বাচ্চা আপনাকে ভয় পায় বলে মনে হয়: কুঁকড়ে যায়, লুকায়, চুপ হয়ে যায়, বা আপনাকে কিছু বলা বন্ধ করে দেয়।
- দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতিদিন মন খারাপ, অসাড়, ক্লান্ত বা অস্থির লাগছে, অথবা আপনার রাগ পুরোনো কষ্ট, মদ বা মাদকের সঙ্গে জড়িত মনে হয়। ডাক্তার বা কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলুন।
- বাসায় বড়দের মধ্যে চিৎকার বা মারামারিতে বাচ্চারা ভয় পাচ্ছে। কেউ বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
- মনে হচ্ছে বাচ্চাকে আঘাত করে ফেলতে পারেন: এখনই সরে যান। আগে বাচ্চাকে নিরাপদে রাখুন: সম্ভব হলে অন্য কোনো বড় মানুষের কাছে, কোলের শিশু হলে চিত করে তার নিজের ছোট খাটে; তারপর শান্ত হতে অন্য ঘরে যান। সেদিনই সাহায্য নিন, আর কেউ বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
সন্তানের উপর চিৎকার করা বন্ধ করার উপায় শেখা একটা দক্ষতা, যা একেকটা সন্ধ্যায় একটু একটু করে তৈরি হয়, আর মাঝে মাঝে ভুল হওয়াও স্বাভাবিক। ParentMind আপনাকে প্রতিদিন কী হলো তা নোট করতে আর ধরনগুলো দেখতে সাহায্য করে, যেমন কোন সন্ধ্যাগুলো সবচেয়ে কঠিন আর তার আগে কী ঘটেছিল; ParentMind কীভাবে কাজ করে দেখুন।
বাবা-মায়েরা যা জানতে চান
বাচ্চাকে চিৎকার করে বকা কি ক্ষতিকর?
উষ্ণ পরিবারে মাঝেমধ্যে একটু চিৎকার, আর তারপর মিটিয়ে নেওয়া: এতে স্থায়ী ক্ষতির সম্ভাবনা কম। কিন্তু ঘনঘন চিৎকার, আর অপমান, হুমকি বা গালমন্দসহ চিৎকার সময়ের সঙ্গে সাধারণত আচরণ আরও খারাপ করে, আর বাচ্চাকে দুশ্চিন্তায় ভোগাতে পারে বা নিজেও চিৎকার করতে শেখাতে পারে। কোনো একটা মুহূর্তের চেয়ে ধরনটাই বেশি জরুরি, তাই চিৎকার কমানো আর তাড়াতাড়ি মিটিয়ে নেওয়ায় মন দিন।
আমি প্রতিদিন বাচ্চাদের ওপর চিৎকার করি। এখন কি আর বদলানো যায়?
না, দেরি হয়নি। প্রতিদিন চিৎকার করেন এমন অনেক বাবা-মা দেখেন, নিজের রাগের কারণগুলো চিনে আর থামার একটা পরিকল্পনা নিয়ে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অনেক কম চিৎকার করছেন। এক সপ্তাহ লিখে রাখুন কখন হচ্ছে, সবচেয়ে কঠিন ঘণ্টাটার পরিকল্পনা করুন, আর প্রতিবার ভুল হলে মিটিয়ে নিন। বাবা-মা সত্যিই চেষ্টা করছেন দেখলে যেকোনো বয়সের বাচ্চা সাধারণত সাড়া দেয়।
চিৎকার করার পর বাচ্চার কাছে কীভাবে দুঃখ প্রকাশ করব?
নিজে শান্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন, বাচ্চার সমান উচ্চতায় বসুন, আর ছোট রাখুন: ‘আমি তোমার ওপর চিৎকার করেছি। এটা ঠিক হয়নি, আমি দুঃখিত।’ ‘কিন্তু’ বাদ দিন। বলুন এটা ওর দোষ ছিল না, পরের বার কী করার চেষ্টা করবেন তা বলুন, তারপর জড়িয়ে ধরে বা কাজটা একসঙ্গে শেষ করে আবার কাছে আসুন। ওর আচরণ নিয়ে কথা পরে, আলাদা করে।
বাচ্চাকে ‘সরি’ বললে কি আমার কথার দাম কমে যাবে?
সাধারণত না। নিয়মের জন্য নয়, আপনি যেভাবে কথা বলেছেন তার জন্য শান্তভাবে দুঃখ প্রকাশ করলে বাচ্চারা প্রায়ই আরও বেশি কথা শুনতে চায়, কারণ তারা দেখে নিয়ম বড়দের জন্যও। চিৎকারের জন্য সরি বলেও সীমা ঠিক রাখা যায়: ‘চিৎকার করেছি, সরি। হোমওয়ার্ক কিন্তু করতেই হবে, আমি পাশে বসছি।’
বাচ্চা কথা না শুনলে চিৎকারের বদলে কী করব?
জোরে নয়, কাছে যান। হেঁটে গিয়ে কাঁধে হাত রাখুন, চোখে চোখ পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন, আর একটা ছোট নির্দেশ দিন। না নড়লে শুরু করতে সাহায্য করুন, বা বলুন ‘আগে এটা, তারপর ওটা’: ‘আগে খেলনা গোছাও, তারপর কার্টুন।’ শান্তভাবে কথা রাখুন। রান্নাঘর থেকে বারবার বলার চেয়ে কাছে গিয়ে আস্তে বলা সাধারণত বেশি কাজ করে।
রাগের মাথায় বাচ্চাকে মারধর করে ফেললে কী করবেন?
আগে নিশ্চিত হোন বাচ্চা নিরাপদ, আর কোথাও আঘাত লেগেছে কি না দেখুন; লাগলে, বা কোলের শিশু হলে, সেদিনই ডাক্তার দেখান। শান্ত হওয়ার পর মিটিয়ে নিন: কী করেছেন বলুন, বলুন এটা ভুল ছিল আর ওর দোষ নয়, আর পরের বার কী করবেন তা বলুন। একবারের বেশি হয়ে থাকলে, বা আবার হবে বলে ভয় হলে, সেদিনই নিজের জন্য সাহায্য নিন। কেউ বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।




