মূল কনটেন্টে যান

শিশু স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হলে কী করবেন: লক্ষণ, কী বলবেন, স্কুলের সঙ্গে কীভাবে কথা বলবেন

ছোট করে উত্তর

সন্তানের কথা বিশ্বাস করুন, শান্ত থাকুন, আর সেদিনই ব্যবস্থা নিন — শিশু স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হলে কী করবেন, তার প্রথম উত্তর এটাই। কী ঘটেছে লিখে রাখুন, সেই সপ্তাহেই ক্লাস টিচারের সঙ্গে দেখা করুন, আর বুলিং না থামলে প্রধান শিক্ষকের কাছে যান। হঠাৎ কোনো পরিবর্তন খেয়াল করুন; বাচ্চা বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।

ParentMind টিমের লেখা১২ মিনিটের পড়া

লেখাটি শুনুন

১৬ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া

এক নজরে

কাদের জন্য
৬–১৭ বছর বয়সী সন্তানের বাবা-মা, যাদের সন্তানকে স্কুলে, কোচিংয়ে বা অনলাইনে ক্ষেপানো হয়, দলে নেওয়া হয় না, আঘাত করা বা ভয় দেখানো হয়
মূল কথা
  • বুলিং হলো এমন কষ্ট দেওয়া আচরণ, যা বারবার ঘটে আর কম ক্ষমতার কাউকে লক্ষ্য করে: মারা, বাজে নামে ডাকা, দলে না নেওয়া বা অনলাইনে আক্রমণ।
  • অনেক বাচ্চা মুখ ফুটে কিছু বলে না, তাই মেজাজ, ঘুম, খাওয়া বা স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছায় হঠাৎ পরিবর্তনই প্রায়ই প্রথম লক্ষণ।
  • সন্তানের কথা বিশ্বাস করুন, কী ঘটেছে লিখে রাখুন, আর সেই সপ্তাহেই ক্লাস টিচারের সঙ্গে কথা বলুন; না থামলে প্রধান শিক্ষকের কাছে যান।
  • আঘাত, হুমকি বা নিজের ক্ষতি করার কোনো কথা শুনলে সেদিনই ব্যবস্থা নিন; বাচ্চা বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।

শিশু স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হলে কী করবেন — এই প্রশ্নের মুখে কোনো বাবা-মা-ই পড়তে চান না। কথাটা হয়তো বেরিয়ে আসে রাতে ঘুমানোর আগে কান্নার মধ্যে, ছেঁড়া খাতা দেখে, বা বাচ্চা হঠাৎ স্কুলভ্যানে উঠতে না চাইলে। প্রথমে রাগ হতে পারে, বা মনে হতে পারে, আগে কেন টের পেলাম না।

বুলিং খুব সাধারণ ঘটনা, এতে কখনোই বাচ্চার দোষ নেই, আর বড়রা একসঙ্গে ব্যবস্থা নিলে সাধারণত পরিস্থিতি ভালো হয়। স্কুল যতদিন বিষয়টা সামলাচ্ছে, বাসায় বিশ্বাস পেলে বাচ্চারা সাধারণত সেই সময়টা ভালোভাবে পার করে।

নিচে পাবেন: বুলিং নাকি সাধারণ ঝগড়া, লক্ষণ, কী বলবেন আর কী লিখে রাখবেন, স্কুলের সঙ্গে কাজ, অনলাইন বুলিং, নিজের সন্তান অন্যকে বুলি করলে কী করবেন, ৭ দিনের পরিকল্পনা, আর কখন দেরি করবেন না।

বুলিং কী, আর সাধারণ ঝগড়া থেকে এটা আলাদা কীভাবে?

বুলিং হলো ইচ্ছা করে, বারবার কষ্ট দেওয়া, এমন কারও কাছ থেকে যার ক্ষমতা বেশি: বয়সে বড়, গায়ে শক্তিশালী, বেশি জনপ্রিয়, বা একটা দলের অংশ। বাচ্চাদের মধ্যে ঝগড়া-মনোমালিন্য সবসময়ই হয়; বুলিং আলাদা, কারণ এখানে একই বাচ্চা বারবার কষ্ট পায় আর নিজে থামাতে পারে না।

সাধারণ ঝগড়া, নাকি বুলিং? পার্থক্য বুঝবেন যেভাবে
যা দেখবেনসাধারণ ঝগড়াবুলিং
কত ঘন ঘনমাঝে মাঝে, তারপর মিটে যায়বারবার, প্রায়ই কয়েক সপ্তাহ ধরে
ক্ষমতাসমানে সমান দুজনবয়সে বড়, শক্তিশালী বা জনপ্রিয় কেউ, কিংবা একটা দল
উদ্দেশ্যদুজনেরই মন খারাপ; কেউ লম্বা সময় ধরে কষ্ট দিতে চায় নাকষ্ট দেওয়া, লজ্জা দেওয়া বা ভয় দেখানোই উদ্দেশ্য
এরপরমিটমাট হয়ে যায়, প্রায়ই পরদিনইআবার দেখা হবে ভেবে বাচ্চা ভয়ে থাকে
যা কাজে দেয়কথা বলে মিটিয়ে নেওয়া, মিটমাটে একটু সাহায্যবড়দের হস্তক্ষেপ: বাসা আর স্কুল একসঙ্গে

বুলিং হতে পারে শারীরিক (মারা, ধাক্কা দেওয়া, টিফিন বা টাকা কেড়ে নেওয়া), মুখের কথায় (গায়ের রং, ওজন, তোতলামি বা গ্রামের টান নিয়ে বাজে নামে ক্ষেপানো), দল থেকে বাদ দিয়ে (“ক্লাসে কেউ খেলতে নেয় না”), কিংবা অনলাইনে। সবগুলোই বুলিং।

কী করে বুঝবেন স্কুলে শিশু বুলিংয়ের শিকার?

অনেক বাচ্চা কখনো মুখ ফুটে বলে না, তাই বুলিংয়ের লক্ষণ প্রায়ই প্রথমে চোখে পড়ে আচরণের পরিবর্তনে। এক-দুই সপ্তাহ ধরে একটা ধরন খেয়াল করুন:

  • শরীরে: স্কুলের দিন সকালে পেট ব্যথা বা মাথাব্যথা, এমন কালশিটে বা আঁচড় যার ব্যাখ্যা দিতে পারে না।
  • জিনিসপত্রে: ছেঁড়া বই বা ইউনিফর্ম, হারানো পেনসিল বক্স, টিফিন না খেয়ে ফেরত আনা, হঠাৎ বেশি টাকা চাওয়া।
  • স্কুলে: যেতে না চাওয়া, স্কুলভ্যান, বাস বা নির্দিষ্ট কোনো বারান্দা নিয়ে নতুন ভয়, নম্বর কমে যাওয়া।
  • মেজাজ আর ঘুম: স্কুল থেকে ফিরে চুপচাপ, কাঁদো-কাঁদো বা রাগী, খারাপ স্বপ্ন, স্বাভাবিকের চেয়ে কম বা বেশি খাওয়া।
  • বন্ধু আর ফোন: বন্ধুদের কথা আর বলে না, ফোন লুকিয়ে রাখে, মেসেজ দেখার পর মন খারাপ করে।

শিশু স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হলে কী করবেন: প্রথম দিনের ধাপ

  1. শান্ত থাকুন আর শুনুন। বাচ্চাকে নিজের মতো করে বলতে দিন; মাঝখানে থামাবেন না, সমাধান দিতে তাড়াহুড়ো করবেন না।
  2. বিশ্বাস করুন, আর বলার জন্য ধন্যবাদ দিন। পরিষ্কার করে বলুন, এতে তার কোনো দোষ নেই।
  3. এমন প্রশ্ন করুন যার উত্তর শুধু হ্যাঁ বা না নয়: কী হয়েছে, কে, কোথায়, কখন, আর কে কে দেখেছে। আলতো করে দেখে নিন কোথাও আঘাত লেগেছে কি না।
  4. সেদিনই লিখে রাখুন (নিচে দেখুন), আর মেসেজ, স্ক্রিনশট বা ছেঁড়া জিনিস রেখে দিন।
  5. পরের ধাপ একসঙ্গে ঠিক করুন, আর স্কুলে কথা বলার আগে বাচ্চাকে জানিয়ে দিন। পেছনে পেছনে কিছু না ঘটলে বাচ্চারা সাধারণত বেশি নিরাপদ বোধ করে।
  6. সেদিন বা পরদিনই ক্লাস টিচারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন, আর সেই সপ্তাহেই দেখা করার সময় চান।
  7. “মার খেলে তুমিও মারবে” বলবেন না, আর নিজে গিয়ে অন্য বাচ্চা বা তার বাবা-মাকে ধরবেন না। এতে সাধারণত পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, আর আপনার বাচ্চাও বিপদে পড়তে পারে।

সন্তানকে যা বলতে পারেন

  • আমাকে বলার জন্য ধন্যবাদ। বলতে অনেক সাহস লাগে।
  • আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি। এতে তোমার কোনো দোষ নেই।
  • কারও সঙ্গেই এমন আচরণ করা ঠিক নয়। তোমার সঙ্গেও না, অন্য কারও সঙ্গেও না।
  • কী করব, আমরা দুজন মিলে ঠিক করব। তোমার টিচারের সঙ্গে কথা বলার আগে তোমাকে জানাব।
  • আমাকে বলেছ বলে তোমার ফোন কেড়ে নেব না। আমি চাই তুমি এভাবেই আমাকে বলো।
  • আবার কেউ কষ্ট দিলে বা ভয় দেখালে সঙ্গে সঙ্গে আমার কাছে আসবে।

কী ঘটেছে, কীভাবে লিখে রাখবেন

ছোট একটা লিখিত হিসাব “ছেলেটা মন খারাপ করে থাকে” কথাটাকে এমন তথ্যে বদলে দেয়, যা নিয়ে স্কুল ব্যবস্থা নিতে পারে। প্রতিটি ঘটনা আলাদা লাইনে, বাচ্চার নিজের ভাষায়, যেদিন ঘটে সেদিনই লিখুন।

বুলিংয়ের সহজ খাতা (প্রতিটি ঘটনার জন্য এক লাইন)
কী লিখবেনউদাহরণ
তারিখ আর সময়মঙ্গলবার, টিফিনের সময়
কোথায়ক্যান্টিনের পেছনে
কী ঘটেছে, বাচ্চার নিজের ভাষায়“ওরা আবার আমার টিফিন নিয়ে নিল, আর গায়ের রং নিয়ে বাজে নামে ডাকল।”
কে করেছে, কে দেখেছেএকই সেকশনের তিনজন ছেলে; একজন সহপাঠী দেখেছে
পরে বাচ্চার অবস্থাবাসায় এসে কেঁদেছে, রাতে খায়নি
আপনি কী করলেনক্লাস টিচারকে মেসেজ দিয়েছি; বৃহস্পতিবার দেখা করব

শিক্ষককে জানানোর উপায়: স্কুলের সঙ্গে কথা বলবেন যেভাবে

বেশিরভাগ বুলিং হয় বড়দের চোখের আড়ালে: টিফিনের সময়, বাথরুমে, ভ্যানে, ক্লাস বদলের ফাঁকে বারান্দায়। ক্লাস টিচার একবার জানলে এই জায়গাগুলোতে নজর রাখতে পারেন, তাই সেখান থেকেই শুরু করুন, শান্তভাবে, খাতাটা সঙ্গে নিয়ে।

  1. ক্লাস টিচারের কাছে অল্প সময়ের জন্য দেখা করার অনুরোধ করুন, পারলে সামনাসামনি, আর আগেই জানিয়ে দিন কী বিষয়ে।
  2. খাতা থেকে তথ্যগুলো বলুন, কাউকে “খারাপ ছেলে” বা “খারাপ মেয়ে” বলে তকমা দেবেন না: কী ঘটেছে, কখন, আর বাচ্চা এখন কেমন আছে।
  3. শিক্ষক কী খেয়াল করেছেন জানতে চান, আর টিফিনের সময়, বাথরুমে আর ভ্যানে বাচ্চাকে নিরাপদ রাখতে স্কুল কী করবে, তা জিজ্ঞেস করুন।
  4. একটা পরিকল্পনা আর এক সপ্তাহ পর আবার খোঁজ নেওয়ার একটা দিন ঠিক করুন। কী ঠিক হলো, লিখে রাখুন।
  5. কিছু না বদলালে, বা বাচ্চা আঘাত পেলে, খাতাটা নিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে যান। অনেক স্কুলে এখন বুলিং ও র‍্যাগিং দেখার জন্য ছোট একটা কমিটি আছে, বা থাকার কথা; প্রধান শিক্ষকের কাছে জেনে নিন সেখানে কারা আছেন।
  6. শিক্ষক নিজেই যদি বাচ্চাকে আঘাত বা অপমান করেন, সরাসরি প্রধান শিক্ষকের কাছে যান: বাংলাদেশের স্কুলে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ। কোচিং বা বাসার শিক্ষক হলে বিষয়টা খোঁজ নেওয়ার সময় পড়া বন্ধ রাখুন।

শিক্ষককে যা বলতে পারেন

  • আমার বাচ্চা স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে। চলুন, একসঙ্গে একটা পরিকল্পনা করি।
  • গত দুই সপ্তাহে কী কী হয়েছে, আমি লিখে এনেছি।
  • টিফিনের সময় বা ক্লাসে আপনি কিছু খেয়াল করেছেন?
  • এই সপ্তাহে ওকে নিরাপদ রাখতে স্কুল কী করতে পারে?
  • আগামী বৃহস্পতিবার আবার কথা বলে দেখি, কেমন চলছে?

অনলাইন বুলিং: গ্রুপ চ্যাট, গেম আর সোশ্যাল মিডিয়া

অনলাইন বুলিং বাচ্চার পিছু পিছু বাসা পর্যন্ত চলে আসে: ক্লাসের গ্রুপ চ্যাটে বাজে মেসেজ, গ্রুপ থেকে বের করে দেওয়া, ছবি বিকৃত করে ছড়ানো, বা অনলাইন গেমে গালাগালি। ফোন সবসময় হাতের কাছে থাকে বলে এ থেকে পালানো আরও কঠিন হতে পারে।

  • অনলাইনে উত্তর দেওয়া বা পাল্টা আক্রমণ নয়; এতে সাধারণত বুলিং আরও বাড়ে।
  • প্রমাণ রেখে দিন: নাম, তারিখ আর সময়সহ স্ক্রিনশট।
  • অ্যাপে অ্যাকাউন্টটা ব্লক আর রিপোর্ট করুন, আর বাচ্চা চাইলে গ্রুপ থেকে বেরিয়ে আসুক।
  • সহপাঠীরা জড়িত থাকলে স্কুলকে জানান, ঘটনা রাতে ঘটলেও।
  • বুলিংয়ের শিকার হয়েছে বলে শাস্তি হিসেবে ফোন কেড়ে নেবেন না; তাহলে বাচ্চারা বলা বন্ধ করে দেয়। বরং ফোন ব্যবহারের শান্ত কিছু নিয়ম একসঙ্গে ঠিক করুন; দেখুন কিশোর সন্তানের মোবাইল আসক্তি।
  • কেউ যদি বাচ্চার আপত্তিকর ছবি ছড়ায়, ছড়ানোর হুমকি দেয় বা এমন ছবি চায়: টাকা দেবেন না, কিছুই পাঠাবেন না, আর ছবিটা কখনো কপি বা ফরোয়ার্ড করবেন না। বাচ্চার কথা বিশ্বাস করুন, তাকে নিরাপদে রাখুন, অ্যাকাউন্টটা ব্লক ও রিপোর্ট করুন, সেদিনই এলাকার থানায় পুলিশকে জানান, আর এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।

নিজের সন্তানই যদি অন্যকে বুলি করে?

নিজের বাচ্চা কাউকে বুলি করেছে, এটা শোনা কষ্টের, আর তাকে আড়াল করতে চাওয়াটাও স্বাভাবিক। যে বাচ্চারা বুলি করে, তাদেরও সাধারণত সাহায্য দরকার: অনেকে দেখে শেখা কিছু করছে, নিজের কোনো কষ্টের মধ্যে আছে, বা কোনো দলে জায়গা পেতে চাইছে।

  1. শান্তভাবে স্কুলের কথা শুনুন, আর কী ঘটেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তথ্যগুলো জেনে নিন।
  2. শান্ত কোনো সময়ে বাচ্চার সঙ্গে কথা বলুন: কী হয়েছিল, আর অন্য বাচ্চাটার কেমন লেগেছে বলে তার মনে হয়?
  3. পরিষ্কার করে বলুন যে এটা বন্ধ করতে হবে, আর ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার একটা উপায় ঠিক করুন: ক্ষমা চাওয়া, জিনিস ফেরত দেওয়া, গ্রুপ চ্যাটে ভালো কথা লেখা।
  4. পেছনের কারণ খুঁজুন: নিজেও বুলিংয়ের শিকার কি না, বাসায় কোনো ঝামেলা, নতুন বন্ধুদল, বা কারও খোঁজখবর ছাড়া অনেক বেশি সময় অনলাইনে থাকা।
  5. বাচ্চাকে মারবেন না, লজ্জাও দেবেন না। শারীরিক শাস্তি সাধারণত শেখায় যে শক্তিশালী মানুষই জেতে, আর আপনি ঠিক এই শিক্ষাটাই বদলাতে চান; দেখুন না মেরে শাসন করার উপায়।
  6. ভালো আচরণ খেয়াল করে প্রশংসা করুন, আর কয়েক সপ্তাহ শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন।

আমাদের স্কুলে বুলিং: কোচিং, স্কুলভ্যান আর “ও তো মজা করছে”

শিশু স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হলে কী করবেন, তা ঠিক করার আগে আমাদের বাস্তবতাটাও মনে রাখুন: এখানে বুলিংয়ের কিছু ধরন একেবারেই আমাদের নিজস্ব, আর চিনতে পারলে খেয়াল করা সহজ হয়।

  • “ও তো মজা করছে”: বড়রা অনেক সময় একে বাচ্চাদের খেলা বলে উড়িয়ে দেন। যে ক্ষেপানো নিয়ে একটা বাচ্চা প্রতিদিন ভয়ে থাকে, তাকে যে নামেই ডাকা হোক, সেটা বুলিং।
  • চেহারা আর পরিচয়: গায়ের রং, ওজন, উচ্চতা, তোতলামি, গ্রামের টান, ধর্ম বা পরিবারের টাকাপয়সা প্রায়ই বুলিংয়ের বিষয় হয়। বাসায় পরিষ্কার বলুন, এর কোনোটাই কাউকে নিয়ে হাসাহাসির কারণ নয়।
  • ভ্যান, কোচিং আর টিফিন: স্কুলভ্যানে, কোচিং সেন্টারে আর টিফিনের সময় প্রায়ই বড়দের নজর সবচেয়ে কম থাকে। ভ্যানচালক, কোচিং সেন্টার আর শিক্ষককে একটু নজর রাখতে বলুন।
  • সিনিয়র আর র‍্যাগিং: কিছু স্কুল, কলেজ আর হোস্টেলে বড় ক্লাসের শিক্ষার্থীরা ছোটদের “র‍্যাগ” দেয়। এটাও বুলিং, আর একই ধাপগুলো এখানেও খাটে।
  • পারিবারিক অনুষ্ঠান: কাজিনরাও বুলি করতে পারে, প্রায়ই ঈদ বা বিয়ের অনুষ্ঠানে। আত্মীয়দের সামনেও নরমভাবে আপনাকে এগিয়ে আসতে হতে পারে।
  • পরে আত্মবিশ্বাস: কয়েক সপ্তাহ ধরে হাসাহাসির শিকার হলে বাচ্চার আবার নিজের ওপর ভরসা ফিরে পেতে সাহায্য লাগতে পারে; দেখুন বাচ্চার আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর উপায়।

বুলিং মোকাবিলায় অভিভাবকের করণীয়: ৭ দিনের পরিকল্পনা

শিশু স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হলে কী করবেন — এই চিন্তায় রাতে ঘুম না এলে প্রতিদিনের ছোট একটা নোট দেখিয়ে দেয় পরিস্থিতি বদলাচ্ছে কি না। প্রতি সন্ধ্যায় এক লাইন লিখুন: স্কুল কেমন গেল, কিছু ঘটেছে কি না, আর বাচ্চার মন-মেজাজ আর ঘুম কেমন।

  1. দিন ১: শুনুন, বিশ্বাস করুন, ধন্যবাদ দিন, আর বাচ্চা যা বলল লিখে রাখুন।
  2. দিন ২: ক্লাস টিচারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখা করার সময় ঠিক করুন। কবে, বাচ্চাকে জানিয়ে দিন।
  3. দিন ৩: বাচ্চার সঙ্গে মিলে স্কুলে একজন ভরসার বড় মানুষ আর টিফিনের সময় যাওয়ার মতো একটা নিরাপদ জায়গা ঠিক করুন।
  4. দিন ৪: শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করুন, আর পরিকল্পনা আর পরের বার খোঁজ নেওয়ার দিন ঠিক করুন।
  5. দিন ৫: ক্লাসের বাইরে কোনো বন্ধু, কাজিন বা পছন্দের কোনো শখ নিয়ে বাচ্চার ভালো লাগার মতো কিছু করুন।
  6. দিন ৬: জিজ্ঞেস করুন কী বদলেছে, আর নতুন কোনো ঘটনা ঘটলে খাতায় যোগ করুন।
  7. দিন ৭: দিন ১-এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। কিছুই না বদলালে খাতাটা নিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে যান।

কখন দেরি করবেন না, আর কখন বাড়তি সাহায্য নেবেন

বাসা আর স্কুল একসঙ্গে ব্যবস্থা নিলে বেশিরভাগ বুলিং কমে আসে। তবে কিছু লক্ষণ দেখলে অপেক্ষা করবেন না।

সেদিনই ব্যবস্থা নিন যদি

  • বাচ্চা আঘাত পেয়েছে, মারধর বা অস্ত্রের হুমকি পাচ্ছে, বা জোর করে টাকা নেওয়া হচ্ছে: বাচ্চার কথা বিশ্বাস করুন, আর সেদিনই ব্যবস্থা নিন। স্থানীয় থানায় জানাতে পারেন; বাচ্চা এখনই বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
  • হঠাৎ পরিবর্তন: বাচ্চা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, ঘুমাতে পারছে না, বাসা থেকে বের হতে চায় না, বা নির্দিষ্ট কোনো মানুষ বা জায়গাকে ভয় পাচ্ছে। নরমভাবে জিজ্ঞেস করুন, বিশ্বাস করুন, আর সেদিনই ব্যবস্থা নিন।
  • যৌন স্পর্শ, ছবি বা এ নিয়ে হুমকি: ওই মানুষের কাছ থেকে বাচ্চাকে দূরে রাখুন, এলাকার থানায় পুলিশকে জানান, আর এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
  • বেঁচে থাকতে না চাওয়া বা নিজের ক্ষতি করার কোনো কথা: শান্ত থাকুন, কাছাকাছি থাকুন, এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন, নইলে সেদিনই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
  • এক-দুই সপ্তাহের বেশি স্কুল কামাই, বা দুই সপ্তাহ ধরে বেশিরভাগ দিন মন খারাপ: স্কুল আর ডাক্তার বা শিশু-মনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলুন; দেখুন বাচ্চা স্কুলে যেতে চায় না।
  • দুইবার দেখা করার পরও কিছু বদলায়নি: প্রধান শিক্ষককে লিখিতভাবে জানান, আর একটা কপি রেখে দিন।

বুলিং অনেক সময় ধাপে ধাপে কমে, আর দুশ্চিন্তার মধ্যে সেই ধাপগুলো চোখ এড়িয়ে যায়। ParentMind আপনাকে প্রতিদিন কী হলো তা নোট করতে, বারবার যা হচ্ছে তা দেখতে আর গাইড পেতে সাহায্য করে: ParentMind কীভাবে কাজ করে।

বাবা-মায়েরা যা জানতে চান

স্কুলে বুলিং হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষক কিছু করছেন না, কী করব?

আবার দেখা করার সময় চান, লেখা খাতাটা সঙ্গে নিন, আর জানতে চান স্কুল কী করবে, কবের মধ্যে। কিছু না বদলালে প্রধান শিক্ষককে লিখিতভাবে জানান, কপি রেখে দিন; অনেক স্কুলে এখন বুলিং দেখার জন্য একটা কমিটি আছে, বা থাকার কথা। বাচ্চা আঘাত পেলে বা বিপদে থাকলে সেদিনই ব্যবস্থা নিন, ৯৯৯-এ ফোন করুন।

বাচ্চাকে কি পাল্টা মারতে বলব?

না। পাল্টা মারলে বাচ্চা নিজেই আঘাত বা শাস্তি পেতে পারে, আর এতে বুলিং খুব কমই থামে। বরং শান্ত কিন্তু দৃঢ়ভাবে সাড়া দিতে শেখান: সোজা হয়ে দাঁড়ানো, শক্ত গলায় “থামো। এটা আমার ভালো লাগে না” বলা, তারপর কোনো বড় মানুষের কাছে গিয়ে জানানো। বাসায় অনুশীলন করুন, আর স্কুলকেও জানান।

বাচ্চা বুলিংয়ের কথা আমাকে বলতে চায় না কেন?

বাচ্চারা প্রায়ই চুপ থাকে লজ্জায়, বড়রা হস্তক্ষেপ করলে আরও খারাপ হবে এই ভয়ে, আপনাকে কষ্ট দিতে চায় না বলে, বা ফোন হারানোর ভয়ে। প্রতিদিন স্বাভাবিকভাবে স্কুলের খোঁজ নিন, ছোট ছোট কথায় শান্তভাবে সাড়া দিন, আর কথা দিন, কারও সঙ্গে কথা বলার আগে তাকে জানাবেন।

স্কুলে সহপাঠীরা ক্ষেপায়, এটা কি বুলিং?

হতে পারে। ক্ষেপানো তখনই বুলিং, যখন তা বারবার ঘটে, একই বাচ্চাকে লক্ষ্য করে, কষ্ট দেয়, আর বাচ্চা নিজে থামাতে পারে না। এর জন্য বাচ্চা যদি স্কুলে যেতে ভয় পায়, একে বুলিং ধরেই এগোন: কী বলা হয়, কখন, লিখে রাখুন, আর সেই সপ্তাহেই ক্লাস টিচারের সঙ্গে কথা বলুন।

যে বাচ্চা বুলি করছে, তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কি কথা বলব?

শুরুতে সাধারণত নয়। নিজে গিয়ে কথা বললে তা ঝগড়ায় গড়াতে পারে, আর বাচ্চার জন্য স্কুল আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে। ক্লাস টিচার বা প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে এগোন; তাঁরা দুই পরিবারের সঙ্গেই কথা বলতে পারেন। বাবা-মাকে ভালো করে চিনলে আর আপনি শান্ত থাকলে, পরে নিরিবিলিতে নরম আলাপ কাজে দিতে পারে।

বুলিংয়ের কারণে কি স্কুল বদলে ফেলব?

কখনো কখনো সেটাই ঠিক সিদ্ধান্ত, তবে বাচ্চা বিপদে না থাকলে আগে স্কুলের পরিকল্পনাটা ঠিকমতো চেষ্টা করে দেখুন। স্কুল ব্যবস্থা নেওয়ার পরও বুলিং চললে, বা বাচ্চা সেখানে কিছুতেই নিরাপদ বোধ না করলে, স্কুল বদলানো কাজে দিতে পারে। বাচ্চার সঙ্গে মিলে সিদ্ধান্ত নিন, আর নতুন স্কুলকে কী ঘটেছিল জানিয়ে রাখুন।

এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।

স্কুলপড়ুয়া (৬–৯ বছর): আরও গাইড

স্কুলপড়ুয়া: সব গাইড

নিজের সন্তানের সাথে চেষ্টা করে দেখুন

ParentMind প্রতিদিনের একটি ছোট নোট রাখে আর দেখায় — আপনার সন্তানের নিজের সংখ্যায় — একটি পরিবর্তন কাজে লাগছে কি না।

বিনামূল্যে নাম লিখুন। ক্রেডিট কার্ড লাগবে না। আপনার তথ্য গোপন থাকবে।