মেয়ের বয়ঃসন্ধিকালে মায়ের করণীয়: পিরিয়ড নিয়ে কখন, কীভাবে কথা বলবেন
ছোট করে উত্তর
মেয়ের বয়ঃসন্ধিকালে মায়ের করণীয় শুরু হয় শরীর বদলানোর আগেই: প্রায়ই ৮–৯ বছরের দিকে কথা শুরু করুন, একবারে বড় আলোচনা নয়, ছোট ছোট শান্ত আলাপে। সহজ ভাষায় স্তন, লোম, লম্বা হওয়া আর পিরিয়ডের কথা বলুন, প্যাড দেখান, স্কুলব্যাগে ছোট একটা কিট দিন। বলুন, পিরিয়ড সুস্থ শরীরের লক্ষণ, লজ্জার কিছু নয়। ৮ বছরের আগে লক্ষণ দেখা দিলে, বা ১৩ বছরেও কোনো লক্ষণ না থাকলে ডাক্তার দেখান।
লেখাটি শুনুন
১৬ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া
এক নজরে
- কাদের জন্য
- মোটামুটি ৮–১৫ বছরের মেয়ের মা, বাবা আর অন্য অভিভাবক, প্রথম পিরিয়ডের আগে ও পরে
- মূল কথা
- প্রথম লক্ষণের আগেই শুরু করুন, প্রায়ই ৮–৯ বছরের দিকে, আর মেয়ে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অল্প অল্প করে কথা চালিয়ে যান।
- সহজ, শান্ত কথাই সবচেয়ে ভালো কাজ করে: পিরিয়ড বড় হওয়ার সুস্থ একটা অংশ, আপনার কাছে এটা লুকানোর কিছু নেই।
- স্কুলব্যাগে ছোট একটা কিট আর স্কুলে কাকে বলবে সেই পরিকল্পনা থাকলে ভয়ের অনেকটাই কেটে যায়।
- ৮ বছরের আগে লক্ষণ, ১৩ বছরেও কোনো লক্ষণ না থাকা, বা খুব বেশি রক্ত, খুব ব্যথা কিংবা তিন মাস বা তার বেশি বন্ধ থাকলে ডাক্তার দেখান।
মেয়ের বয়স ৯, কাজিনের সদ্য পিরিয়ড শুরু হয়েছে, আর আপনি হঠাৎ খেয়াল করলেন, মেয়েকে এখনো কেউ কিছু বুঝিয়ে বলেনি। মেয়ের বয়ঃসন্ধিকালে মায়ের করণীয় কী, তা ভাবা কঠিন, বিশেষ করে যখন আপনাকে ছোটবেলায় কেউ কিছু বলেনি। তবে কাজটা বেশিরভাগ বাবা-মা যতটা ভাবেন, সাধারণত তার চেয়ে সহজ।
যে পরিবর্তনের কথা আগে থেকে জানা, মেয়েরা সাধারণত সেটা সবচেয়ে ভালো সামলায়। কয়েকটা ছোট, শান্ত আলাপ, ব্যাগে একটা ছোট কিট, আর লজ্জা ছাড়া প্রশ্ন করা যায় এমন একজন বড় মানুষ থাকলে প্রথম পিরিয়ড ভয়ের বদলে স্বাভাবিক একটা দিন হয়ে উঠতে পারে।
নিচে পাবেন: লক্ষণগুলো, কোন বয়সে কী বলবেন, ঠিক কী বলবেন, পিরিয়ড কিট, কোন ব্যথা স্বাভাবিক আর কোনটা নয়, আমাদের বাসার বাস্তবতা, ৭ দিনের পরিকল্পনা, আর কখন ডাক্তার দেখাবেন।
বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তন: কী বদলায়, কখন?
মেয়েদের বয়ঃসন্ধি সাধারণত মোটামুটি ৮ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে শুরু হয়, আর চলে কয়েক বছর ধরে। এই সীমার মধ্যে আগে বা পরে হওয়া সাধারণত স্বাভাবিক, আর সময়টা প্রায়ই পরিবারের ধারা মেনে চলে। পরিবর্তনগুলো মোটামুটি এই ক্রমে আসে:
- স্তন বড় হতে শুরু করা: এক বা দুই স্তনের বোঁটার নিচে ছোট, শক্ত গুটি, ছুঁলে কখনো একটু ব্যথা লাগে। প্রায়ই এক পাশে আগে শুরু হয়।
- বগলে আর গোপনাঙ্গে লোম, আর ঘামে গন্ধ হতে শুরু করা।
- হঠাৎ লম্বা হওয়া, নিতম্ব চওড়া হওয়া, খিদে বাড়া, আর অনেকের ব্রণ।
- অন্তর্বাসে সাদা বা স্বচ্ছ স্রাব, প্রায়ই প্রথম পিরিয়ডের কয়েক মাস আগে। এটা স্বাভাবিক, সুস্থ শরীরেরই লক্ষণ।
- প্রথম পিরিয়ড (মাসিক), প্রায়ই স্তন বড় হতে শুরু করার দুই বছরের মতো পরে। অনেক মেয়ের মোটামুটি ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে শুরু হয়।
প্রথম এক-দুই বছর পিরিয়ড প্রায়ই অনিয়মিত থাকে: কোনো মাসে বাদ যেতে পারে, আবার দুটো কাছাকাছি আসতে পারে। প্রতিবার সাধারণত কয়েক দিন থেকে মোটামুটি এক সপ্তাহ থাকে। ৯–১২ বছর বয়সে ছেলে-মেয়েদের কী কী বদলায়, তার পুরো ধারণা পাবেন প্রি-টিন বয়সী সন্তানের সঙ্গে আচরণ লেখায়।
কখন কথা শুরু করবেন, আর কোন বয়সে কী বলবেন
কথা শুরুর সঠিক সময়টা নিখুঁত শব্দের চেয়েও বেশি জরুরি। মোটামুটি ৮ বছরের মধ্যে বেশিরভাগ মেয়ে শুনতে প্রস্তুত থাকে যে তার শরীর বদলাবে, আর একদিন পিরিয়ড শুরু হবে। তারপর ওর প্রশ্ন ধরে প্রতি বছর একটু একটু করে যোগ করুন।
| বয়স | কী নিয়ে কথা বলবেন | যা কাজে দেয় |
|---|---|---|
| ৫–৭ বছর | শরীরের অঙ্গের ঠিক নাম, গোপনীয়তা, আর শরীর যে বড় হয় ও বদলায় | ওর প্রশ্নের ছোট উত্তর; শরীরের নিরাপত্তার নিয়ম |
| ৮–৯ বছর | সামনে কী কী বদলাবে, পিরিয়ড কী, আর এটা যে সুস্থ শরীরের লক্ষণ | শান্ত প্রথম আলাপ; একটা প্যাড দেখানো |
| ১০–১২ বছর | প্যাড পরা ও বদলানো, স্কুলের কিট, ঘাম আর পরিষ্কার থাকা, প্রথম ব্রা, মনের অবস্থা | বাসায় একবার প্যাড পরে দেখা; স্কুলের পরিকল্পনা |
| ১৩–১৫ বছর | অনিয়মিত চক্র, ব্যথা, তারিখ মনে রাখা, নিজের চেহারা নিয়ে ভাবনা, গোপনীয়তা | ওকেই এগোতে দিন; কোনো কিছু নিয়ে দুজনের কারও চিন্তা হলে ডাক্তার |
শুরু থেকেই এই আলাপে শরীরের নিরাপত্তার কথাও থাকা দরকার: কোন অঙ্গগুলো গোপন, আর কেউ অস্বস্তিতে ফেললে ও যে সবসময় আপনাকে বলতে পারে। প্রতিটি বয়সে কী বলবেন, পাবেন শিশুকে গুড টাচ ব্যাড টাচ শেখানো লেখায়।
মেয়ের বয়ঃসন্ধিকালে মায়ের করণীয়: প্রথম আলাপ, ধাপে ধাপে
মেয়েকে পিরিয়ড নিয়ে কীভাবে বোঝাবেন, তা নিয়ে ঘাবড়ানোর কিছু নেই; প্রথম আলাপ নিখুঁত হতে হবে না। বেশিরভাগ পরিবারে এই ধাপগুলো কাজে দেয়:
- শান্ত, একান্ত একটা মুহূর্ত বেছে নিন: একসাথে হাঁটা, কাপড় ভাঁজ করা, রিকশায় কোথাও যাওয়া। মুখোমুখি বসার চেয়ে পাশাপাশি থাকলে প্রায়ই সহজ লাগে।
- আগে জিজ্ঞেস করুন ও কী জানে, আর বন্ধু বা ইন্টারনেট থেকে শোনা আধা-সত্যি কথাগুলো নরমভাবে শুধরে দিন।
- সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলুন। প্রতি মাসে জরায়ুর ভেতরে একটা নরম আস্তরণ তৈরি হয়; দরকার না হলে সেটা অল্প রক্ত হয়ে যোনিপথ দিয়ে বেরিয়ে আসে। এটাই পিরিয়ড: মোটামুটি মাসে একবার, কয়েক দিনের জন্য। এটা সুস্থ শরীরের লক্ষণ, কোনো অসুখ নয়।
- একটা প্যাড দেখান: কীভাবে অন্তর্বাসে লাগাতে হয়, কতক্ষণ পরপর বদলাতে হয়, আর কীভাবে মুড়িয়ে ময়লার ঝুড়িতে ফেলতে হয়। বাসায় একবার পরে দেখতে দিন।
- বলুন, যেকোনো সময়, যেকোনো প্রশ্ন নিয়ে আপনার কাছে আসতে পারে, আর এর কোনো কিছুই লজ্জার নয়।
- ও ক্লান্ত হওয়ার আগেই থামুন, কয়েক দিন পর আবার কথা তুলুন। একটা লম্বা আলোচনার চেয়ে অনেকগুলো ছোট আলাপ বেশি কাজে দেয়।
মেয়ে বড় হচ্ছে: মা কী বলবেন
- বন্ধুরা কি পিরিয়ড নিয়ে কিছু বলে? কী শুনেছ বলো, আমি বলে দেব কোনটা সত্যি।
- পিরিয়ড নোংরা কিছু না, অসুখও না। এর মানে তোমার শরীর সুস্থভাবে বড় হচ্ছে।
- যেদিন শুরু হবে, শুধু আমাকে বলো, একটা শব্দে বললেও হবে। কিছু বুঝিয়ে বলতে হবে না।
- তোমার বয়সে আমাকে কেউ এসব বুঝিয়ে বলেনি। আমি চাই তোমার জন্য ব্যাপারটা সহজ হোক।
- কোনো প্রশ্নই বোকা প্রশ্ন না। মুখে বলতে লজ্জা লাগলে একটা কাগজে লিখে আমার জন্য রেখে দিও।
স্কুলে মাসিকের প্রস্তুতি: পিরিয়ড কিট, প্যাড আর পরিচ্ছন্নতা
স্কুলের পিরিয়ড কিট হলো ছোট একটা পাউচ, যা প্রথম পিরিয়ডের আগে থেকেই ব্যাগে থাকবে, যাতে দিনটা হঠাৎ এলেও ও অপ্রস্তুত না থাকে। পাউচটা ওকেই বেছে নিতে দিন; পেন্সিল-বক্সের মতো দেখতে হলে কেউ বুঝতেও পারবে না। ভেতরে রাখুন:
- দুই-তিনটা প্যাড, তার মধ্যে বেশি রক্তের দিনের জন্য একটা লম্বা প্যাড।
- ছোট একটা চেন-ব্যাগে এক জোড়া বাড়তি অন্তর্বাস।
- ব্যবহার করা প্যাড মোড়ানোর কাগজ বা ছোট পলিব্যাগ, যদি ময়লার ঝুড়ি না থাকে।
- টিস্যু বা ভেজা টিস্যু, আর টয়লেটের জন্য ছোট এক বোতল পানি।
- ছোট মেয়েদের জন্য বাড়তি একটা সালোয়ার বা ইউনিফর্মের প্যান্ট, দাগ লাগলে কাজে লাগবে।
প্যাড, কাপড় আর পরিষ্কার থাকা
- কয়েক ঘণ্টা পরপর প্যাড বদলাতে হয়, বেশি রক্তের দিনে আরও ঘন ঘন, আর ঘুমানোর আগে একবার। ব্যবহার করা প্যাড মুড়িয়ে ময়লার ঝুড়িতে ফেলবে; কখনো কমোডে ফ্লাশ করবে না।
- পরিবারে কাপড় ব্যবহারের চল থাকলে পরিষ্কার, নরম সুতি কাপড় দিন; সাবান দিয়ে ধুয়ে রোদে পুরোপুরি শুকিয়ে পরিষ্কার, শুকনো জায়গায় রাখতে হবে।
- প্যাড বদলানোর আগে ও পরে হাত ধোবে, সুতির অন্তর্বাস পরবে, আর প্রতিদিনের গোসল চালিয়ে যাবে।
স্কুলের দিন আর যাতায়াতের দিন
দরকারের আগেই স্কুলের পরিকল্পনা ঠিক করে নিন: কোন টয়লেট ব্যবহার করবে, কখন প্যাড বদলাবে (টিফিনের সময়, বা ক্লাসের মাঝে অনুমতি নিয়ে), আর কাকে বলবে, যেমন কোনো ম্যাডাম। লম্বা যাত্রায়, যেমন ঈদে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার সময়, বাড়তি প্যাড আর কাগজ নিন, আরামদায়ক গাঢ় রঙের জামা পরুক, আর কোথায় থামবেন তা একসাথে ঠিক করুন।
পিরিয়ডের ব্যথা আর বেশি রক্ত: কোনটা স্বাভাবিক, কোনটা নয়
কিছুটা পেট কামড়ানো ব্যথা খুব সাধারণ, বিশেষ করে প্রথম এক-দুই দিন। কাপড়ে মোড়ানো গরম (ফুটন্ত নয়) পানির ব্যাগ দিয়ে পেটে সেঁক, হালকা নড়াচড়া আর বিশ্রামে প্রায়ই আরাম লাগে। তাতে না কমলে ওর বয়সে ব্যথার জন্য কী নিরাপদ, তা ডাক্তারের কাছে জেনে নিন।
| বিষয় | সাধারণত স্বাভাবিক | ডাক্তার দেখান |
|---|---|---|
| ব্যথা | তলপেট বা কোমরে কামড়ানো ব্যথা, যা সেঁক আর বিশ্রামে কমে | ব্যথায় বমি হয় বা অজ্ঞান হয়ে যায়, বা মাসের পর মাস স্কুলে যেতে পারে না |
| রক্ত | কয়েক দিন থেকে মোটামুটি এক সপ্তাহ, প্রথম দিকে বেশি | এক-দুই ঘণ্টায় প্যাড ভিজে যাওয়া, বড় বড় রক্তের চাকা, বা মোটামুটি এক সপ্তাহের বেশি রক্ত |
| সময় | প্রথম এক-দুই বছর অনিয়মিত | শুরু হওয়ার পর তিন মাস বা তার বেশি বন্ধ |
| শরীর-মন | পিরিয়ডের আগে-পরে ক্লান্তি, মেজাজ খারাপ, স্তনে ব্যথা | পিরিয়ডের সময় মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট বা খুব ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, বা মাসের বেশিরভাগ সময় মন খারাপ |
মেয়ের মন, গোপনীয়তা আর শরীর নিয়ে মন্তব্য
বয়ঃসন্ধি শুধু শরীরের ব্যাপার নয়। অনেক মেয়ের একই দিনে লজ্জা, মেজাজ খারাপ, গর্ব আর অস্বস্তি সব লাগে। ছোট কিছু অভ্যাস ওকে নিরাপদ বোধ করায়:
- ওর ঘরে ঢোকার আগে দরজায় টোকা দিন, আর প্যাড ও নিজের জিনিস রাখার একটা একান্ত জায়গা দিন, এক ঘরে থাকলে অন্তত একটা ড্রয়ার।
- ওর প্রথম পিরিয়ডের কথা কাউকে, আত্মীয়দেরও, বলার আগে ওকে জিজ্ঞেস করুন। খবরটা ওর নিজের।
- ও চাইলে নরম সুতির শেমিজ বা প্রথম ব্রা কিনে দিন, আর বেছে নিতে দিন ওকেই।
- ওর শরীর, ওজন বা গায়ের রং নিয়ে যে কারও মন্তব্য থামান। নরম গলায় “থাক, ওর শরীর নিয়ে কিছু না বলি” বললেই ও অনেকটা সুরক্ষিত বোধ করে।
চেহারা নিয়ে দুশ্চিন্তায় যদি ওর আত্মবিশ্বাস কমে যায়, দেখুন বাচ্চার আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর উপায়।
আমাদের বাসায়: মাসিক নিয়ে লজ্জা ভাঙানো, আস্তে আস্তে
অনেক বাংলাদেশি বাসায় মাসিকের নামই প্রায় নেওয়া হয় না। পিরিয়ড হলে বলা হয় মেয়ের “শরীর খারাপ”, প্যাড আসে খবরের কাগজে বা কালো পলিব্যাগে মুড়িয়ে, আর বাবা বা ভাইয়ের সামনে এ নিয়ে কথাই হয় না। অনেক মা-কেও ছোটবেলায় কেউ কিছু বলেননি।
মেয়ের বয়ঃসন্ধিকালে মায়ের করণীয় নিয়ে যদি আপনার সামনে কোনো উদাহরণ না থাকে, ছোট করে শুরু করুন। বাসার ভেতরে কয়েকটা ছোট পরিবর্তনই ওর জন্য যথেষ্ট:
- বাজারের অন্য জিনিসের সঙ্গেই প্যাড কিনুন, আর এমন জায়গায় রাখুন যেখান থেকে না বলেই নিতে পারে।
- বাসায় শান্তভাবে আসল শব্দগুলো বলুন: পিরিয়ড, মাসিক, প্যাড, স্তন। শান্ত গলায় বললেই বিষয়টা স্বাভাবিক হয়ে যায়।
- স্বাস্থ্য নিয়ে ভুল ধারণাগুলো নরমভাবে সরিয়ে দিন: পিরিয়ডের সময় গোসল করা, টকসহ যেকোনো খাবার খাওয়া, স্কুলে যাওয়া আর খেলা, সবই চলে।
- কাপড় ব্যবহার করলে রোদে শুকানোর একটা আড়ালের জায়গা দিন। লজ্জায় স্যাঁতসেঁতে কোণে লুকিয়ে শুকালে কাপড় ঠিকমতো শুকায় না।
- পিরিয়ডের দিনগুলোতে আপনার পরিবারের রীতি যা-ই হোক, নামাজ বা রমজানের রোজা নিয়েও, খেয়াল রাখুন কেউ যেন এ নিয়ে ওকে খোঁচা না দেয় বা প্রশ্ন না করে। ধর্মীয় প্রশ্নে প্রতিটি পরিবার নিজেদের আলেম বা ধর্মীয় শিক্ষকের পরামর্শ মানে; তবে বাসায় ও যেন শোনে, ওর শরীর সুস্থ।
- পিরিয়ড শুরুর পর যদি ওর জন্য কিছু নিয়ম বদলায়, যেমন জামাকাপড় বা বাইরে খেলা, শান্তভাবে কারণটা বুঝিয়ে বলুন, আর ওর ভালোবাসার জিনিসগুলো ধরে রাখুন: স্কুল, খেলা আর বন্ধু।
- ভাইদেরও বলুন যে পিরিয়ড বড় হওয়ার স্বাভাবিক অংশ, তাই বাসায় এ নিয়ে হাসাহাসির কোনো জায়গা নেই।
বাবা, খালা-ফুপু আর অন্য অভিভাবকও পারেন
মেয়ের বয়ঃসন্ধিকালে মায়ের করণীয় নিয়ে অনেক কথা হয়, কিন্তু বাবারও অনেক কিছু করার আছে: বাসায় প্যাড আছে কি না খেয়াল রাখা, মেয়ের কিট কোথায় তা জানা, আর একবার স্পষ্ট করে বলা যে কী লাগবে তা বাবাকে বলা যায়। বাবা দূরে কাজ করলে বা মা প্রবাসে থাকলে খালা, ফুপু, নানি-দাদি বা বড় কাজিন আলাপগুলো এগিয়ে নিতে পারেন।
আপনি বাবা হলে বলতে পারেন
- পিরিয়ডের ব্যাপারটা আমি জানি। প্যাড বা আর কিছু লাগলে শুধু বলো, কিছু বুঝিয়ে বলতে হবে না।
- বাথরুমের তাকে এক প্যাকেট রেখেছি। শেষ হয়ে এলে আমাকে বলো।
- আজ শরীরটা ভালো লাগছে না? একটু শুয়ে থাকো, আমি গরম কিছু এনে দিচ্ছি।
মেয়ের প্রথম মাসিকের প্রস্তুতি: ৭ দিনের পরিকল্পনা
শান্ত একটা সপ্তাহ বেছে নিন, পরীক্ষা বা বিয়েবাড়ির সপ্তাহ নয়। প্রতিদিন লিখে রাখুন কী নিয়ে কথা হলো, আর ও কী জিজ্ঞেস করল।
- দিন ১: ওর বয়সে থাকতে কোন দুই-তিনটা কথা কেউ আপনাকে আগে বললে ভালো হতো, লিখে রাখুন।
- দিন ২: একটা খোলা প্রশ্ন করুন, যেমন “স্কুলে কেউ কি বড় হওয়া নিয়ে কিছু বলেছে?”, তারপর বেশিরভাগ সময় শুধু শুনুন।
- দিন ৩: মোটামুটি ১০ মিনিটে সহজ ভাষায় শরীরের পরিবর্তনগুলো বুঝিয়ে বলুন।
- দিন ৪: একটা প্যাড দেখান, আর বাসায় একবার পরে দেখতে দিন।
- দিন ৫: একসাথে স্কুলের কিট গুছিয়ে নিন, আর ঠিক করুন স্কুলে কাকে বলবে।
- দিন ৬: ওর সম্মতি নিয়ে বাবা বা কাছের আরেকজন বড় মানুষকে জানান যে কথা শুরু হয়েছে, যাতে প্রশ্ন করার মতো মানুষ একজনের বেশি থাকে।
- দিন ৭: নোটগুলো ফিরে দেখুন। ও কী জানতে চেয়েছে? কোনটা সহজ লেগেছে? পরের ছোট আলাপটা ঠিক করুন।
বয়ঃসন্ধি বা মাসিক নিয়ে কখন ডাক্তার দেখাবেন
বেশিরভাগ মেয়ে কোনো সমস্যা ছাড়াই বয়ঃসন্ধি পার করে, আর পিরিয়ড নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তা সময়ের সঙ্গে কমে আসে। এসব দেখলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন:
এসব দেখলে ডাক্তার দেখান
- মোটামুটি ৮ বছরের আগেই বয়ঃসন্ধির লক্ষণ, যেমন স্তন বা শরীরে লোম দেখা দেয়, অথবা ১৩ বছরেও কোনো লক্ষণ নেই।
- অন্য পরিবর্তন এলেও মোটামুটি ১৫ বছরেও পিরিয়ড শুরু হয়নি।
- পিরিয়ডে খুব বেশি রক্ত বা খুব ব্যথা: এক-দুই ঘণ্টায় প্যাড ভিজে যাওয়া, মোটামুটি এক সপ্তাহের বেশি রক্ত, মাথা ঘোরা, বা এমন ব্যথা যাতে বমি হয়, অজ্ঞান হয়ে যায় বা স্কুলে যেতে পারে না।
- পিরিয়ড শুরু হওয়ার পর তিন মাস বা তার বেশি সময় বন্ধ থাকে।
- নির্যাতনের যেকোনো লক্ষণ: স্পষ্ট কারণ ছাড়া গোপনাঙ্গে ব্যথা, রক্ত বা আঘাত, বা হঠাৎ নির্দিষ্ট কোনো মানুষ বা জায়গাকে ভয়। ওর কথা বিশ্বাস করুন, সেদিনই ব্যবস্থা নিন। কেউ ওকে কষ্ট দিয়েছে বলে ও জানালে ওই মানুষের কাছ থেকে ওকে দূরে রাখুন আর স্থানীয় থানায় জানান; এই মুহূর্তে বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
মেয়ের বয়ঃসন্ধিকালে মায়ের করণীয় একদিনে শেষ হয় না; সবচেয়ে কাজে দেয় মাসের পর মাস ধরে বারবার হওয়া ছোট ছোট আলাপ। মেয়ে কৈশোরে পা দিলে সামনে প্রায়ই কী আসে, পাবেন টিনএজ সন্তানের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করবেন লেখায়। ParentMind আপনাকে প্রতিদিন কী হলো তা নোট করতে, বারবার যা ঘটছে তা দেখতে আর গাইড পেতে সাহায্য করে: ParentMind কীভাবে কাজ করে দেখে নিন।
বাবা-মায়েরা যা জানতে চান
মেয়েদের প্রথম মাসিক সাধারণত কোন বয়সে হয়?
অনেক মেয়ের প্রথম মাসিক হয় মোটামুটি ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে, প্রায়ই স্তন বড় হতে শুরু করার দুই বছরের মতো পরে। কারও একটু আগে বা পরে হয়, তাতেও সে পুরোপুরি সুস্থ থাকতে পারে। ৮ বছরের আগে বয়ঃসন্ধির লক্ষণ দেখা দিলে, বা ১৫ বছরেও মাসিক না হলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
৯ বছরের মেয়েকে পিরিয়ড নিয়ে কীভাবে বোঝাব?
ছোট, শান্ত আর সত্যি কথায় বলুন: মোটামুটি মাসে একবার কয়েক দিন শরীর থেকে অল্প রক্ত আসে; এটা সুস্থতার লক্ষণ, অসুখ নয়, আর যেকোনো সময় ও আপনাকে বলতে পারে। একটা প্যাড দেখান, ও যা জিজ্ঞেস করে তার উত্তর দিন, আর বিরক্ত হওয়ার আগেই থামুন।
মাসিকের সময় কি মেয়ে গোসল করতে পারবে?
হ্যাঁ, পারবে। মাসিকের সময় প্রতিদিন গোসল করা বা ধোয়া নিরাপদ, আর এতে ঝরঝরে লাগে। এ সময় গোসল করা যায় না বা টক খাওয়া যায় না, এগুলো ভুল ধারণা। ও স্বাভাবিকভাবে খেতে, স্কুলে যেতে আর খেলতে পারে; শুধু কয়েক ঘণ্টা পরপর প্যাড বদলালেই হলো।
স্কুলে হঠাৎ পিরিয়ড শুরু হলে মেয়ে কী করবে?
টয়লেটে গিয়ে কিট থেকে প্যাড পরে নেবে, না থাকলে আপাতত টিস্যু ভাঁজ করে অন্তর্বাসে দেবে, তারপর ভরসার কোনো ম্যাডামকে জানাবে বা অফিস থেকে বাসায় ফোন করতে বলবে। কোমরে সোয়েটার বা ওড়না বাঁধলে দাগ ঢেকে যায়। পরিকল্পনাটা আগে বাসায় ওর সঙ্গে একবার ঝালিয়ে নিন।
প্রথম দিকে মাসিক অনিয়মিত হওয়া কি স্বাভাবিক?
হ্যাঁ। প্রথম এক-দুই বছর অনেক মেয়ের কোনো মাস বাদ যায়, দুটো পিরিয়ড কাছাকাছি আসে, বা প্রতিবার আলাদা দিন ধরে রক্ত যায়। সময়ের সঙ্গে সাধারণত নিয়মিত হয়ে আসে। শুরু হওয়ার পর তিন মাস বা তার বেশি বন্ধ থাকলে, বা খুব বেশি রক্ত গেলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
বাবা কি মেয়ের সঙ্গে পিরিয়ড নিয়ে কথা বলতে পারেন?
অবশ্যই পারেন। তথ্য জানা শান্ত একজন বাবা অনেক সাহায্য করতে পারেন, বিশেষ করে মা দূরে থাকলে বা মেয়ে বাবার বেশি কাছের হলে। বাসায় প্যাড রাখা, মেয়ের কিট কোথায় জানা, আর স্পষ্ট করে বলা যে কিছু লাগলে বাবাকে বলা যায়, এসব তিনি করতে পারেন।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।




