টিনএজ সন্তানের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করবেন: কাছে থাকুন, ধীরে ধীরে স্বাধীনতা দিন
ছোট করে উত্তর
টিনএজ সন্তানের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করবেন: কাছে থাকুন, আর নিয়ন্ত্রণ ধাপে ধাপে ওর হাতে ছাড়ুন; প্রতিদিন অল্প সময় একসঙ্গে কাটান, উপদেশের চেয়ে বেশি শুনুন, একসঙ্গে বসে অল্প কয়েকটা স্পষ্ট নিয়ম ঠিক করুন, আর বিশ্বাস যত বাড়ে, স্বাধীনতাও তত বাড়ান। ১৩–১৮ বছরে মেজাজ, তর্ক আর নিজের জগৎ চাওয়া স্বাভাবিক। নিজের ক্ষতি, মাদক বা মারামারিতে সেদিনই সাহায্য নিন, আর কয়েক সপ্তাহ ধরে খুব মন খারাপ থাকলে শিগগিরই।
লেখাটি শুনুন
১৭ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া
এক নজরে
- কাদের জন্য
- ১৩–১৮ বছর বয়সী সন্তানের বাবা-মা: ক্লাস সেভেন-এইট থেকে এইচএসসি পর্যন্ত
- মূল কথা
- ১৩–১৮ বছরে যা প্রত্যাখ্যানের মতো লাগে, যেমন বন্ধ দরজা, চোখ উল্টানো, আগে বন্ধুরা, তার বেশির ভাগই কিশোরের স্বাধীন হওয়ার অনুশীলন; আর অনেকেই পরিবারের কাছেই থাকে।
- প্রতিদিন ১০–১৫ মিনিট সহজ সময় আর উপদেশের চেয়ে বেশি শোনা জরুরি আলাপের দরজা খোলা রাখে।
- নিরাপত্তা, সম্মান, ঘুম আর ফোন নিয়ে একসঙ্গে ঠিক করা অল্প কয়েকটা স্পষ্ট নিয়ম অনেক নিয়ম, চিৎকার বা মারধরের চেয়ে বেশি কাজে দেয়; বিশ্বাস যত বাড়ে, স্বাধীনতাও তত বাড়ান।
- নিজের ক্ষতি, মাদক বা মদ, মারামারি বা বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ায় সেদিনই সাহায্য নিন, আর দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে খুব মন খারাপ থাকলে শিগগিরই ডাক্তার দেখান; কারও এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
টিনএজ সন্তানের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করবেন, এটা শিখতে গিয়ে অনেক সময় মনে হয় নতুন একটা চাকরি শিখছেন, ঠিক যখন পুরোনোটায় হাত পাকা হয়েছিল। যে সন্তান একসময় সব কথা বলত, সে এখন এক শব্দে উত্তর দেয়, দরজা বন্ধ রাখতে চায়, আর মনে হয় আপনার চেয়ে বন্ধুদের কথা বেশি শোনে। আপনার বাসায় এমন হলে আপনি একা নন, আর এর মানে এই নয় যে সন্তানকে হারিয়ে ফেলেছেন।
মোটামুটি ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সে সন্তান বড় হওয়ার অনুশীলন করে, আর তখনো তার আপনাকে দরকার, শুধু অন্যভাবে। নিচে পাবেন: কী বদলায়, কীভাবে কাছে থাকবেন, নিয়ম আর স্বাধীনতা, বিশ্বাস আর ফোন, পড়াশোনা আর এসএসসি-এইচএসসির চাপ, বন্ধু আর প্রেম, আমাদের বাসার বাস্তবতা, ৭ দিনের পরিকল্পনা, আর কখন সাহায্য নেবেন। ৯–১২ বছরের জন্য পড়ুন প্রি-টিন বয়সী সন্তানের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করবেন।
বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানের আচরণগত পরিবর্তন: ১৩ থেকে ১৮ বছরে কী বদলায়?
কিশোর সন্তানকে বোঝার উপায় শুরু হয় কী বদলাচ্ছে তা জানা দিয়ে। কৈশোরে শরীর, মস্তিষ্ক আর পরিবারের পুরো জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসে, আর সামলাতে কষ্ট হলেও বেশির ভাগই সুস্থ বেড়ে ওঠার অংশ:
| বিষয় | মোটামুটি ১৩–১৫ | মোটামুটি ১৬–১৮ |
|---|---|---|
| শরীর ও ঘুম | বেশির ভাগের বয়ঃসন্ধি পুরোদমে চলছে; হঠাৎ লম্বা হওয়া, ত্বক আর শরীর নিয়ে দুশ্চিন্তা; রাতে ঘুম আসে আরও দেরিতে | বেশির ভাগের বেড়ে ওঠা প্রায় শেষ; শরীরের ঘড়ি এখনো দেরিতে চলে; বেশির ভাগের ৮–১০ ঘণ্টা ঘুম দরকার |
| অনুভূতি | মেজাজ দ্রুত ওঠানামা করতে পারে; নিজেকে নিয়ে খুব সচেতন; বাবা-মায়ের কারণে সহজে লজ্জা পায় | মেজাজ সাধারণত আরও স্থির; কথা বলে সমস্যা মেটাতে বেশি পারে; ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা |
| বন্ধু ও ভালো লাগা | দলে মানিয়ে চলা খুব জরুরি মনে হয়; গ্রুপ চ্যাট আর বন্ধুদের দল খুব গুরুত্বপূর্ণ; প্রথম ভালো লাগা | বন্ধু কম, কিন্তু গভীর; প্রেমের অনুভূতি বেশি গুরুত্ব পেতে পারে |
| ভাবনা | নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলে, যুক্তি দিয়ে তর্ক করে; পরিকল্পনা আর ঝুঁকি মাপার ক্ষমতা এখনো তৈরি হচ্ছে | আরও ভালো পরিকল্পনা করে, অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝে; তবে ঝুঁকি মাপার ক্ষমতা বিশের কোঠা পর্যন্ত বাড়তে থাকে |
| বাংলাদেশে পড়াশোনা | সপ্তম থেকে দশম শ্রেণি: ভারী সিলেবাস, কোচিং আর এসএসসির প্রস্তুতি | এসএসসির রেজাল্ট, কলেজ আর গ্রুপ বেছে নেওয়া, তারপর এইচএসসি আর ভর্তি পরীক্ষা |
| আপনার কাছে যা দরকার | ধৈর্য, নিজের জগৎ, নিরাপত্তার স্পষ্ট নিয়ম, আর এমন বাবা-মা যিনি মেজাজকে ব্যক্তিগতভাবে নেন না | সিদ্ধান্তে বেশি মতামত, নিজের জীবন নিজে চালানোর অনুশীলন, আর পরামর্শের জন্য আপনাকে পাশে পাওয়া |
বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের দায়িত্বও বদলায়। বয়ঃসন্ধি সাধারণত শুরু হয় প্রি-টিন বয়সেই, তাই সে নিয়ে কথা এখনো না হয়ে থাকলে দেরি হয়ে যায়নি; দেখুন মেয়ের বয়ঃসন্ধিকালে মায়ের করণীয়। কিশোরদের ৮–১০ ঘণ্টা ঘুম দরকার, কিন্তু ঘুম আসে দেরিতে; শরীরের ঘড়ির ব্যাপারটা বুঝতে পড়ুন ১০–১৫ বছর বয়সীদের কতটা ঘুম দরকার।
টিনেজ সন্তানের সাথে সম্পর্ক: দূরে সরে গেলে কীভাবে কাছে থাকবেন
কিশোররা প্রায়ই সবচেয়ে বেশি কথা বলে যখন মুখোমুখি তাকাতে হয় না: রিকশায়, রান্নাঘরে, অনেক রাতে। সম্পর্ক ভালো থাকলেই নিয়মগুলো মানার মতো মনে হয়, তাই ইচ্ছা করে সম্পর্কটা গড়ে তুলুন:
- রোজ ১০–১৫ মিনিট সহজ সময় বের করুন: চা, দোকান পর্যন্ত হাঁটা, ওর পছন্দের গান, একটা গেম, একসঙ্গে রান্না।
- আগে শুনুন, আর পরামর্শ দেওয়ার আগে জিজ্ঞেস করুন: ‘আমার পরামর্শ চাও, নাকি শুধু শুনব?’
- শুধু নম্বর নয়, ওর জগতের খোঁজ নিন: বন্ধু, গান, গেম, আজ কী নিয়ে হাসল।
- কঠিন কিছু বললে শান্ত থাকুন, যাতে পরের বারও আপনার কাছেই আসে।
- ঝগড়ার পরে সম্পর্ক জোড়া লাগান: নিজের ভুলের অংশটুকুর জন্য সরি বলুন, সঙ্গে কোনো উপদেশ জুড়ে না দিয়ে।
- এমন কিছু পারিবারিক অভ্যাস রাখুন যার ওপর ভরসা করা যায়, যেমন শুক্রবারের দুপুরের খাবার বা রাতের চা, ও একটু গজগজ করলেও।
যা বলতে পারেন
- উপদেশ দেব না। শুধু শুনতে চাই, কেমন গেল।
- পরামর্শ চাও, নাকি শুধু শুনব?
- তখন রেগে গিয়ে বেশি বলে ফেলেছি। সরি।
- সব কথা বলতেই হবে, এমন না। কিন্তু যে কোনো কথা আমাকে বলতে পারো।
- কখনো কোথাও আটকে গেলে বা অনিরাপদ লাগলে আমাকে ফোন দিয়ো। আমি চলে আসব, প্রশ্ন পরে হবে।
- এ ব্যাপারে তোমার ওপর ভরসা করছি। দেখাও তো, কীভাবে সামলাও।
সন্তান যদি দিন নয়, কয়েক সপ্তাহ ধরে চুপ হয়ে থাকে, আরও উপায় পাবেন কিশোর সন্তান কথা বলে না, কী করবেন লেখায়।
নিয়ম আর স্বাধীনতা: কিশোর সন্তানের সঙ্গে একসঙ্গে কীভাবে ঠিক করবেন
সন্তান বড় হলে বাবা-মায়ের ভূমিকাও বদলায়: হুকুম দেওয়ার বদলে একসঙ্গে নিয়ম ঠিক করা। ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নিয়মের চেয়ে যে নিয়ম ঠিক করায় তারও হাত ছিল, কিশোররা সাধারণত সেটা অনেক বেশি মানে; তাই ঝগড়ার মাঝখানে নয়, চা নিয়ে বসুন:
- যেগুলোতে ছাড় নেই, আগে সেগুলো ঠিক করুন: নিরাপত্তা (কোথায়, কার সঙ্গে, কীভাবে বাসায় ফিরবে), সম্মান আর যথেষ্ট ঘুম।
- খুঁটিনাটি, যেমন বাসায় ফেরার সময় বা পড়ার সময়, ওকে প্রস্তাব করতে দিন, আর যেখানে পারেন মাঝামাঝি জায়গায় আসুন।
- পরিণতি আগে থেকে ঠিক রাখুন, ছোট আর নিয়মের সঙ্গে মিল রেখে: দেরিতে ফিরেছে, তাই পরের ছুটির দিনে আগে ফিরতে হবে।
- নিয়মগুলো লিখে রাখুন বা পরিবারের চ্যাটে দিয়ে রাখুন, যাতে পরে কী বলা হয়েছিল তা নিয়ে তর্ক না হয়।
- স্বাধীনতা ধাপে ধাপে দিন: আগে একা কোচিংয়ে যাওয়া, তারপর বন্ধুর বাসায়, তারপর একদিনের বেড়ানো; প্রতিটা ঠিকমতো সামলালে পরেরটা।
- কয়েক মাস পরপর নিয়মগুলো আবার দেখুন; ১৭ বছরের সন্তানের নিয়ম ১৩ বছরের মতো হবে না।
চিৎকার, গালি, মারধর আর আত্মীয়দের সামনে লজ্জা দেওয়া কিশোরকে সাধারণত শান্ত নয়, আরও বেপরোয়া করে তোলে, আর সমস্যাগুলো চোখের আড়ালে ঠেলে দিতে পারে। শান্তভাবে নিয়ম ধরে রাখার উপায় দেখুন মারধর না করে শাসন লেখায়; প্রায়ই নিয়ম ভাঙলে আরও বিস্তারিত পাবেন টিনএজ সন্তান অবাধ্য হলে কী করবেন লেখায়।
বিশ্বাস, গোপনীয়তা আর ফোন: কতটা নজর রাখবেন?
বড় হতে কিশোরদের কিছুটা নিজের জগৎ দরকার, আবার নিরাপদ রাখতে বাবা-মায়েরও কিছু জানা দরকার। এই ভারসাম্য সাধারণত সবচেয়ে ভালো কাজ করে, যখন নিয়মগুলো খোলাখুলি থাকে:
- ঢোকার আগে দরজায় টোকা দিন, আর লুকিয়ে ডায়েরি বা মেসেজ পড়বেন না; কিশোররা সাধারণত টের পেয়ে যায়, আর হারানো বিশ্বাস ফিরতে অনেক সময় লাগে।
- খোলাখুলি ঠিক করুন আপনি কী কী জানবেন: কোথায় আছে, কার সঙ্গে, কখন ফিরবে, আর ফোনে কোন কোন অ্যাপ আছে।
- রাতে ফোন চার্জ হবে শোবার ঘরের বাইরে, বাবা-মায়েরটাও। ৬ বছর থেকে নির্দিষ্ট কোনো ঘণ্টার হিসাব নেই; তবে সীমা এমন হোক যাতে ঘুম, পড়া, অন্তত ৬০ মিনিট নড়াচড়া আর পরিবারের সময় ঠিক থাকে, আর ঘুমের আগের এক ঘণ্টায় কোনো স্ক্রিন নয়।
- কথা দিন, অনলাইনে খারাপ কিছু হলে আপনাকে জানালে কখনো ফোন হারাতে হবে না; এই ভয়েই অনেক কিশোর চুপ থাকে।
- ছবি নিয়ে কথা বলুন: যা পাঠানো হয় তা অন্যের কাছে চলে যেতে পারে, আর যে ছবি চেয়ে চাপ দেয় বা হুমকি দেয়, অন্যায়টা তারই।
কিশোরের ফোন দেখা নিয়ে আরও বিস্তারিত পাবেন গ্রুপ চ্যাট আর অনলাইন বন্ধু লেখায়, আর ফোন যখন সব কিছু দখল করে নিয়েছে, তখন কাজে দেবে কিশোর সন্তানের মোবাইল আসক্তি।
পড়াশোনা, কোচিং আর এসএসসি-এইচএসসির চাপ
বাংলাদেশে কৈশোর মানে বোর্ড পরীক্ষারও বছর: মোটামুটি ১৬ বছরে এসএসসি আর ১৮ বছরে এইচএসসি, প্রায়ই একই দিনে স্কুল, কোচিং আর প্রাইভেট টিউটরের সঙ্গে। চাপ সবচেয়ে বেশি হয় ঠিক তখন, যখন কিশোরের ঘুম আর নিজের জীবনের ওপর একটু নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে বেশি দরকার:
- সন্তানের সঙ্গে বসে রুটিন বানান: শুধু পড়ার ঘণ্টা নয়, ঘুম, খাওয়া, এক ঘণ্টা নড়াচড়া আর কিছুটা নিজের সময়ও।
- ৮–১০ ঘণ্টা ঘুম আগলে রাখুন; পরীক্ষার আগে সারারাত জেগে পড়া প্রায়ই লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি করে।
- শুধু জিপিএ ৫ নয়, চেষ্টা আর পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলুন, আর কখনো কাজিনের রেজাল্টের সঙ্গে তুলনা করবেন না।
- নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর আগে জিজ্ঞেস করুন, কোচিং ফাঁকি বা নম্বর কমে যাওয়ার পেছনে কী আছে: অতিরিক্ত চাপ, কোনো শিক্ষক, বন্ধু বা দুশ্চিন্তা প্রায়ই কারণ হয়।
- রেজাল্ট আশানুরূপ না হলে কী হবে, আগেভাগেই একসঙ্গে ঠিক করে রাখুন, যাতে একটা পরীক্ষাকে কখনো জীবনের শেষ মনে না হয়।
পরীক্ষার আগের আর পরীক্ষার সময়ের শান্ত পরিকল্পনা পাবেন পরীক্ষার ভয় ও মানসিক চাপ কমানোর উপায় লেখায়।
বন্ধু, ভালো লাগা আর প্রেম: লজ্জা না দিয়ে কীভাবে সামলাবেন
এই বয়সে বন্ধুরা খুব গুরুত্বপূর্ণ, আর প্রথম ভালো লাগা যে কোনো সংস্কৃতিতেই বড় হওয়ার স্বাভাবিক অংশ। আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান, তার ওপর প্রায়ই নির্ভর করে সন্তান আপনার সঙ্গে কথা বলা চালিয়ে যাবে কি না।
- ওর বন্ধুদের চিনে নিন: বাসায় দাওয়াত দিন, খাওয়ান, আর তাদের বাবা-মায়ের নম্বর রাখুন।
- কোনো বন্ধুকে নিয়ে চিন্তা হলে মানুষটাকে নিষেধ না করে যে আচরণ দেখেছেন সেটা নিয়ে কথা বলুন, যদি না সত্যিকারের বিপদ থাকে।
- সন্তানের ভালো লাগা বা সম্পর্কের কথা জানতে পারলে শান্ত থাকুন, আর একান্তে কথা বলুন সম্মান, সম্মতি, অনলাইন আর অফলাইনে নিরাপত্তা, আর আপনার পরিবারের মূল্যবোধ নিয়ে।
- লজ্জা দেওয়া, মারধর, ফোন কেড়ে নেওয়া বা ঘরে আটকে রাখলে বিষয়টা সাধারণত আরও গোপনে চলে যায়, যেখানে বিপদ বেশি।
- তাড়াহুড়া করে বিয়ে দেওয়া কখনোই সমাধান নয়: বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ আইনত অপরাধ, আর এতে সন্তানের স্বাস্থ্য আর ভবিষ্যতের ক্ষতি হয়।
বাংলাদেশি পরিবারে টিনএজ সন্তানের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করবেন
শাসন, সম্মান আর বন্ধু হওয়া
অনেক বাবা-মা নিজেরা কড়া শাসনে বড় হয়েছেন, আর ভয় পান নরম হলে সম্মান হারাবেন। কিশোররা সাধারণত সেই বাবা-মাকে সম্মান করে, যাঁরা একই সঙ্গে আন্তরিক আর দৃঢ়: কথা বলার মতো বন্ধুত্বপূর্ণ, আবার ভরসা করার মতো স্পষ্ট। বন্ধু হবেন নাকি অভিভাবক, এর যে কোনো একটা বেছে নিতে হবে না।
একই ঘর, তবু একটু আড়াল
অনেক ফ্ল্যাটে কিশোর সন্তান ভাই-বোন বা দাদা-দাদির সঙ্গে একই ঘরে থাকে। তবু আড়াল দেওয়া যায়: তালা দেওয়া একটা ড্রয়ার, ঘরে একা থাকার একটা নিয়মিত সময়, হেডফোন, বা পরিবারের এমন নিয়ম যে কেউ ওর খাতা খুলে পড়বে না।
আত্মীয়স্বজন, সমান নিয়ম আর বাসায় এক পরিকল্পনা
আত্মীয়দের সামনে সন্তানের সম্মান রক্ষা করুন, আর ছেলে-মেয়ের নিয়ম যতটা সম্ভব সমান রাখুন; দুই রকম নিয়ম কিশোররা খুব তাড়াতাড়ি ধরে ফেলে। মূল নিয়মগুলো জীবনসঙ্গী আর বাসার বড়দের সঙ্গে মিলে ঠিক করুন, যাতে ‘আব্বু আসুক, তারপর দেখবে’ ধরনের হুমকিতে একজন শাস্তিদাতা না হয়ে যান। বাবা বা মা বিদেশে কাজ করলে নিয়মিত ভিডিও কল আর বড় সিদ্ধান্তে তাঁর মতামত তাঁকে কাছে রাখে। ধর্ম নিয়ে প্রশ্নও আসতে পারে; ধর্মীয় বিষয়ে প্রতিটি পরিবার নিজেদের আলেমদের পরামর্শ মানে, আর শান্তভাবে শুনলে আলাপের দরজা খোলা থাকে।
কিশোর সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ার ৭ দিনের পরিকল্পনা
টিনএজ সন্তানের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করবেন, তার কোনো একক উত্তর নেই; তবে ছোট ছোট পরিবর্তনের একটা সপ্তাহ প্রায়ই দেখিয়ে দেয় আপনার বাসায় কী কাজ করে। একটা পরিবর্তন বেছে নিন, প্রতিদিন কী হচ্ছে লিখে রাখুন, আর এক সপ্তাহ পরে মিলিয়ে দেখুন।
- দিন ১: খেয়াল করুন। প্রতিটা ঝগড়া আর প্রতিটা ভালো মুহূর্ত লিখে রাখুন, এখনো কিছু বদলাবেন না।
- দিন ২: রোজ ১০–১৫ মিনিট একসঙ্গে সহজ সময় শুরু করুন; কোনো উপদেশ নয়, ফোন দেখাও নয়।
- দিন ৩: ওর জগৎ নিয়ে একটা প্রশ্ন করুন, আর শুধু উত্তরটা শুনুন।
- দিন ৪: একসঙ্গে বসে সবচেয়ে জরুরি দুটো নিয়ম আর সেগুলো ভাঙলে কী হবে, ঠিক করুন।
- দিন ৫: নতুন একটা স্বাধীনতা বা দায়িত্ব দিন, আর মুখে বলুন যে এ ব্যাপারে ওর ওপর ভরসা করছেন।
- দিন ৬: সন্তানের একটা নির্দিষ্ট গুণের কথা ওকে মুখে বলুন, যেটা আপনি সত্যিই পছন্দ করেন।
- দিন ৭: দিন ১-এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। যা কাজে দিল তা রেখে দিন, আর এক মাস পরে একসঙ্গে নিয়মগুলো আবার দেখার পরিকল্পনা করুন।
কিশোর সন্তানের জন্য কখন সাহায্য নেবেন
কিছু বিষয় কৈশোরের সাধারণ ওঠানামার বাইরে। এগুলোর কোনোটি দেখলে সন্তানের সঙ্গে শান্তভাবে কথা বলুন, আর ডাক্তার বা কাউন্সেলরের সাহায্য নিন: কাউকে ঝুঁকিতে ফেলে এমন কিছু হলে সেদিনই, আর মন খারাপ অনেক দিন চললে শিগগিরই।
এমন হলে সাহায্য নিন
- সন্তান নিজেকে আঘাত করেছে, বা বেঁচে থাকতে চায় না এমন কথা বলছে: শান্ত থাকুন, ওর কাছাকাছি থাকুন। এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন; নইলে সেদিনই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
- দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে বেশির ভাগ দিন খুব মন খারাপ, হতাশা বা সবার কাছ থেকে গুটিয়ে থাকা, অথবা খাওয়া, ওজন বা ঘুমে বড় পরিবর্তন: শিগগিরই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
- মাদক বা মদের যে কোনো লক্ষণ, যেমন ট্যাবলেট, পাউডার বা ব্যাখ্যা ছাড়া গন্ধ, কিংবা টাকা আর জিনিসপত্র হারিয়ে যাওয়া: সেদিনই সাহায্য নিন।
- মারামারি, অস্ত্র, বাসা ছেড়ে চলে যাওয়া বা কোনো যোগাযোগ ছাড়া রাতে বাইরে থাকা: কারও এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে বা সন্তানের খোঁজ না পেলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
- নির্যাতন, বুলিং বা ব্ল্যাকমেইলের যে কোনো লক্ষণ, যেমন কেউ ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে, কিংবা হঠাৎ বন্ধু বদল, সঙ্গে লুকোছাপা আর ব্যাখ্যা ছাড়া টাকা বা উপহার: সন্তানের কথা বিশ্বাস করুন, সেদিনই ব্যবস্থা নিন, নির্যাতন বা ব্ল্যাকমেইল হলে স্থানীয় থানায় জানান, আর এই মুহূর্তে বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
- মনে হয় আর সামলাতে পারছেন না, বা বাসার ঝগড়া হাতাহাতিতে গড়ায়: একটু সরে যান, সবাইকে নিরাপদ রাখুন, আর নিজের জন্যও সাহায্য নিন। কারও এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
পরিস্থিতি ভালোর দিকে যাচ্ছে নাকি খারাপের দিকে, বোঝা গেলে কিশোর সন্তানকে সামলানো সহজ হয়। ParentMind আপনাকে প্রতিদিন কী হলো তা লিখে রাখতে, ধারা দেখতে আর গাইড পেতে সাহায্য করে; ParentMind কীভাবে কাজ করে দেখুন।
বাবা-মায়েরা যা জানতে চান
কিশোর সন্তান বাবা-মায়ের কাছে সবচেয়ে বেশি কী চায়?
বেশির ভাগ কিশোরের একসঙ্গে দরকার আন্তরিকতা আর কাঠামো: এমন বাবা-মা যাঁরা আগেভাগে বিচার না করে শোনেন, নিরাপত্তা আর সম্মান নিয়ে অল্প কয়েকটা স্পষ্ট নিয়ম, দায়িত্ব দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকা স্বাধীনতা, আর কিছু ভুল হলে ভরসা করার মতো একজন শান্ত মানুষ। লম্বা আলাপের চেয়ে প্রায়ই বেশি কাজে দেয় নিয়মিত অল্প সময় একসঙ্গে কাটানো।
টিনএজ সন্তানের বন্ধু হব, নাকি কড়া শাসন করব?
কোনো একটা চরম পথই সাধারণত ভালো কাজ করে না। খুব কড়া, রূঢ় নিয়ম প্রায়ই লুকোছাপা আর বিদ্রোহ ডেকে আনে, আবার কোনো নিয়ম না থাকলে কিশোরের পাশে কোনো নিরাপত্তার জাল থাকে না। আন্তরিক আর দৃঢ় থাকুন: এতটা বন্ধুত্বপূর্ণ যাতে ও আপনার সঙ্গে কথা বলে, আর নিরাপত্তা, সম্মান আর ঘুম নিয়ে এতটা স্পষ্ট যাতে সীমাগুলো ও জানে।
কিশোর সন্তানকে কতটা স্বাধীনতা দেওয়া উচিত?
এতটা, যাতে ও অনুশীলন করতে পারে, আর ধাপগুলো বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে। শুরু করুন কম ঝুঁকির সিদ্ধান্ত দিয়ে, যেমন জামা, গান আর পড়ার সময় কীভাবে সাজাবে; তারপর প্রতিটা ধাপ ঠিকমতো গেলে যোগ করুন বাইরে যাওয়া, একা কোচিংয়ে যাওয়া আর একটু দেরিতে ফেরার অনুমতি। নিয়ম ভাঙলে কী হবে আগে থেকে ঠিক রাখুন, আর সব কেড়ে না নিয়ে এক ধাপ পিছিয়ে আসুন।
কিশোর বয়সে কোন আচরণগুলো স্বাভাবিক?
নিয়ম নিয়ে তর্ক, মেজাজের ওঠানামা, নিজের জগৎ চাওয়া, দেরিতে ঘুমানো, চোখ উল্টানো আর বন্ধুদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া ১৩–১৮ বছরে খুব সাধারণ। চিন্তার কারণ হয় যখন আচরণ কাউকে ঝুঁকিতে ফেলে বা অনেক দিন ধরে চলে: মাদক, মারামারি, বাসা ছেড়ে চলে যাওয়া, নিজের ক্ষতি, দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে খুব মন খারাপ, বা হঠাৎ বন্ধু বদল আর লুকোছাপা। কাউকে ঝুঁকিতে ফেলে এমন কিছু হলে সেদিনই সাহায্য নিন, আর মন খারাপ অনেক দিন চললে শিগগিরই।
কৈশোরের কোন বয়সটা সামলানো সবচেয়ে কঠিন?
অনেক পরিবারের কাছে কৈশোরের শুরু থেকে মাঝামাঝি, মোটামুটি ১৩ থেকে ১৫ বছর, সবচেয়ে ঝঞ্ঝাটের মনে হয়, কারণ বয়ঃসন্ধি, বন্ধুত্ব আর স্বাধীন হওয়ার টান একসঙ্গে আসে। কৈশোরের শেষ দিকে প্রায়ই পরিস্থিতি শান্ত হয়, তখন মেজাজ স্থির হয় আর সন্তান পরিকল্পনা করতে আর আলোচনা করতে পারে। প্রত্যেক সন্তান আলাদা; ঠিক কোন বয়স, তার চেয়ে সম্পর্কটা ধরে রাখাই বেশি জরুরি।
কিশোর সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাস কীভাবে গড়ে তুলব?
বিশ্বাস দুই দিক থেকেই গড়ে ওঠে। কথা দিলে রাখুন, ওর গোপনীয়তার সম্মান করুন, লুকিয়ে কিছু দেখবেন না, আর কঠিন কিছু বললে শান্ত থাকুন, যাতে সত্যি বলাটা কখনো ভুল মনে না হয়। ছোট ছোট স্বাধীনতা দিন, আর ঠিকমতো সামলালে খেয়াল করে বলুন। নিয়ম ভাঙলে ন্যায্য একটা পরিণতি আর বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার স্পষ্ট একটা পথ একসঙ্গে ঠিক করুন।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।





