সন্তান মুখে মুখে তর্ক করে? রাগ না করে কী বলবেন, কী করবেন (৫–১৬ বছর)
ছোট করে উত্তর
সন্তান মুখে মুখে তর্ক করে? শান্ত থাকুন, পাল্টা তর্ক করবেন না, আর আবার বলতে বলুন: ‘কথাটা শান্ত গলায় আরেকবার বলো।’ ওর আসল কথাটা শুনুন, নিয়মটা ধরে রাখুন, আর বেয়াদবি নিয়ে কথা বলুন পরে, আড়ালে। মুখে মুখে তর্ক সাধারণত ৫ বছরের আশপাশ থেকে দেখা যায়, আর কৈশোরে প্রায়ই বাড়ে। এর সঙ্গে হুমকি বা মারধর থাকলে সাহায্য নিন।
লেখাটি শুনুন
১৭ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া
এক নজরে
- কাদের জন্য
- ৫–১৬ বছরের যে সন্তান মুখে মুখে তর্ক করে, চোখ ঘোরায় বা প্রতিটা নিয়ম নিয়ে তর্ক জোড়ে, তার বাবা-মায়ের জন্য
- মূল কথা
- মুখে মুখে তর্ক ৫ বছরের আশপাশ থেকে খুব সাধারণ, আর কৈশোরে প্রায়ই বাড়ে; এটা সাধারণত এখনো শিখতে থাকা একটা দক্ষতা, স্বভাবের দোষ নয়।
- খোঁচার জবাব নয়, সুরের জবাব দিন: শান্ত থাকুন, ভদ্রভাবে আবার বলতে বলুন, আর নিয়মটা ধরে রাখুন।
- ভদ্রভাবে দ্বিমত করতে শেখান, আর শান্তভাবে ভালো যুক্তি দিলে মাঝে মাঝে ‘হ্যাঁ’ বলুন, যাতে বাচ্চা দেখে ভদ্র কথাতেই কাজ হয়।
- বেয়াদবি নিয়ে কথা বলুন পরে, আড়ালে। আত্মীয়দের সামনে বাচ্চাকে লজ্জা দিলে মুখে মুখে তর্ক সাধারণত আরও বাড়ে।
সন্তান মুখে মুখে তর্ক করে, আর ব্যাপারটা কত দ্রুত ঘটে তা আপনি জানেন: ফোনটা চাইলেন, আর জবাব এল ‘কেন দেব?’ বা ‘তুমি আমাকে কিছুই করতে দাও না!’, সঙ্গে চোখ ঘোরানো। বাচ্চা মুখের ওপর কথা বললে বাবা-মায়ের কষ্ট লাগে, লজ্জা লাগে, আর দুশ্চিন্তা হয়, ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
স্বস্তির কথা হলো, স্কুলপড়ুয়া বাচ্চা আর কিশোরদের মধ্যে মুখে মুখে তর্ক খুব সাধারণ একটা আচরণ। বেশির ভাগ পরিবারে এটা দ্বিমত করতে শেখার একটা ধাপ; আপনি বেয়াদব সন্তান মানুষ করছেন, এমন লক্ষণ নয়।
নিচে পাবেন: বাচ্চারা কেন উল্টো জবাব দেয়, তখন কী করবেন ও বলবেন, ভদ্রভাবে দ্বিমত করতে শেখানো, আমাদের পরিবারে সম্মানের প্রশ্ন, ৭ দিনের পরিকল্পনা, আর কখন সাহায্য নেবেন।
বাচ্চা কেন উল্টো জবাব দেয়? বয়স অনুযায়ী সাধারণ কারণ
সন্তান উল্টো জবাব দেয় সাধারণত এসব কারণে: দেখছে তার মতামতের দাম কতটা, এমন হতাশা বের করে দিচ্ছে যার জন্য ভালো কোনো ভাষা তার জানা নেই, কাজিন, সহপাঠী বা স্ক্রিন থেকে যা শোনে তা নকল করছে, বা সারাদিন হুকুম শুনে মনে হচ্ছে কেউ তার কথা শোনে না। বন্ধু, শিক্ষক বা বুলিং নিয়ে অন্য কোথাও খারাপ দিন গেলে তা প্রায়ই বাসায় এসে বেরিয়ে পড়ে, কারণ বাসাটাই নিরাপদ মনে হয়। ক্লান্তি আর খিদে সবকিছু আরও খারাপ করে, তাই মুখে মুখে তর্ক প্রায়ই সবচেয়ে বেশি হয় স্কুল বা কোচিং থেকে ফেরার পর, আর মোবাইল বা টিভি বন্ধ করার সময়।
| বয়স | যা শুনতে পারেন | পেছনে প্রায়ই যা থাকে |
|---|---|---|
| ৫–৭ বছর | ‘তুমি আমার বস না!’, ‘না, করব না!’, নতুন শেখা খারাপ কথা বলে দেখা কী হয় | স্বাধীনতা, সীমা যাচাই, স্কুল বা স্ক্রিন থেকে শেখা কথার নকল |
| ৮–১০ বছর | ‘এটা অন্যায়!’, ‘কিন্তু তুমিই তো বলেছিলে…’, প্রতিটা নিয়ম নিয়ে তর্ক, প্রথম খোঁচা দেওয়া কথা | ন্যায্যতার প্রবল বোধ আর বাড়তে থাকা যুক্তি; মত দিতে চাওয়া |
| ১১–১৩ বছর | চোখ ঘোরানো, দীর্ঘশ্বাস, ‘যা খুশি’, ‘তুমি বুঝবে না’, দরজা জোরে বন্ধ করা | শরীর আর মেজাজের বদল, একান্ত সময় চাওয়া, বন্ধুদের মতামত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা |
| ১৪–১৬ বছর | লম্বা তর্ক, খোঁচা দেওয়া মন্তব্য, ‘এটা আমার জীবন’ | নিজের মতো মানুষ হয়ে ওঠা, নিজের মত যাচাই করা, পরীক্ষা আর বন্ধুত্বের চাপ |
মুখে মুখে তর্ক যদি প্রায় সবকিছুতে ‘না’ বলার বড় একটা ধরনের অংশ হয়, দেখুন জেদি সন্তান সামলানোর উপায়। এই লেখাটা কথা আর গলার সুর নিয়ে।
সন্তান মুখে মুখে তর্ক করে: ঠিক তখন কী করবেন
সন্তান মুখে মুখে তর্ক করে যখন, প্রথম কয়েক সেকেন্ডেই ঠিক হয়ে যায় ব্যাপারটা চিৎকারের লড়াইয়ে গড়াবে কি না। আপনার লক্ষ্য তর্কে জেতা নয়; শান্ত বড় মানুষটা থাকা, নিয়মটা ধরে রাখা, আর বাচ্চাকে আবার চেষ্টা করার সুযোগ দেওয়া।
- জবাব দেওয়ার আগে থামুন, একবার ধীরে শ্বাস ছাড়ুন। ‘এত বড় সাহস?’ বা ব্যঙ্গ বাদ দিন, গলা নিচু রাখুন; আপনার গলা নামলে বাচ্চার গলাও প্রায়ই নামে।
- সুরটা ধরিয়ে দিন, আর আবার বলতে বলুন: ‘কথাটা কিন্তু ভালো শোনাল না। শান্তভাবে আরেকবার বলো।’ সুযোগ পেলে অনেক বাচ্চাই ভালোভাবে বলে।
- ভেতরের আসল কথাটা শুনুন: ‘গেমে আরও সময় চেয়েছিলে, তাই রাগ হচ্ছে।’ নাম দিলে রাগের ঝাঁজ প্রায়ই কমে।
- নিয়মটা ধরে রাখুন, অল্প কথায়: ‘তোমার কথা শুনলাম। উত্তর এখনো না।’ লম্বা ব্যাখ্যা দিলে তর্কও লম্বা হয়।
- তবু চলতে থাকলে কথা থামান: ‘দুজনে শান্ত হলে কথা বলব।’ একটু সরে যান, ছোট বাচ্চা হলে চোখের সামনে রেখে, আর সেদিনই আবার বিষয়টায় ফিরে আসুন।
- পরে, আড়ালে, কথা রাখুন। সত্যিকারের অপমানজনক কথার জন্য আগে থেকে ঠিক করা ছোট একটা পরিণতি রাখুন, যেমন দুঃখ প্রকাশ করা, বা সেদিন সন্ধ্যায় স্ক্রিন টাইম আগে শেষ হওয়া।
বাচ্চা মুখে মুখে তর্ক করলে যা বলতে পারেন
- কথাটা শান্ত গলায় আরেকবার বলো। আমি শুনছি।
- আমার সঙ্গে দ্বিমত করতেই পারো। কিন্তু আমাকে বাজে কথা বলতে পারো না।
- জানি, তোমার কাছে এটা অন্যায় মনে হচ্ছে। তবু উত্তর না।
- আমি এখন তর্ক করব না। রাতের খাবারের পর কথা বলব।
- ভালো যুক্তি দিয়েছ, আর সুন্দর করে বলেছ। আমি একটু ভেবে দেখি।
- (কিশোর সন্তানকে) আমি তোমার দিকটা শুনতে চাই। তুমি যেভাবে চাও আমি তোমার সঙ্গে কথা বলি, তুমিও আমার সঙ্গে সেভাবে বলো।
বাচ্চা বেয়াদবি করে? কখন ছেড়ে দেবেন, কখন আবার বলতে বলবেন, কখন থামাবেন
সব মুখে মুখে তর্কের জবাব এক রকম হওয়ার দরকার নেই। অনেক পরিবার দেখে, এগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করলে সুবিধা হয়: ছোট ব্যাপার লড়াইয়ে গড়ায় না, আর সত্যিকারের বেয়াদবিও উপেক্ষা হয় না।
| যা শুনছেন | সাধারণত এটা কী | শান্ত জবাব |
|---|---|---|
| দীর্ঘশ্বাস, চোখ ঘোরানো, কাজটা করতে করতে বিড়বিড় করে ‘ঠিক আছে…’ | কথা মেনে নিয়েও মনের ঝাল ঝাড়া | ছেড়ে দিন, আর কাজটা করার জন্য ধন্যবাদ দিন |
| ‘এটা অন্যায়!’, ‘আমাকেই কেন করতে হবে?’, গলা চড়ানো | সত্যিকারের দ্বিমত, কিন্তু বেয়াদবি সুরে | আবার বলতে বলুন: ‘শান্তভাবে আরেকবার বলো, আমি শুনব’ |
| বাজে নামে ডাকা, গালি, অপমান, হুমকি, অন্যদের সামনে আপনাকে নিয়ে ঠাট্টা | সীমা ছাড়ানো অসম্মান | কথা থামান, পরে আড়ালে কথা বলুন, আর আগে থেকে ঠিক করা পরিণতি মেনে চলুন |
সীমাটা পরিষ্কার আর প্রতিদিন একই থাকলে সন্তানের অবাধ্য কথাবার্তা বদলানো সহজ হয়। পরিবারের ‘এটা চলবে না’ তালিকাটা সবাই মিলে লিখে ফেলুন, যেমন বাজে নামে ডাকা নয়, গালি নয়, ঠাট্টা-বিদ্রূপ নয়; আর তালিকাটা বড়দের জন্যও খাটবে।
ভদ্রভাবে দ্বিমত করতে সন্তানকে কীভাবে শেখাবেন
ভদ্রভাবে দ্বিমত করতে দেওয়া মানে বাচ্চাকে জিতিয়ে দেওয়া নয়। ‘আমি একমত না’ কথাটা সম্মান রেখে বলার উপায় যে বাচ্চা জানে, তার চিৎকার করার দরকার কম পড়ে।
- বলার একটা সহজ ছক শিখিয়ে দিন: ‘আমার … লাগছে, কারণ …। আমরা কি … করতে পারি?’ যেমন: ‘আমার রাগ লাগছে, কারণ গেমটা শেষ করতে পারিনি। আর ৫ মিনিট পেতে পারি?’
- সবাই শান্ত থাকলে চর্চা করুন। রাতের খাবারের সময় ‘যদি এমন হয়, তুমি কী বলবে?’ খেলুন, আর ভূমিকা বদলে বাচ্চাকে বাবা-মা হতে দিন।
- ছোট ব্যাপারে সত্যিকারের পছন্দের সুযোগ দিন: কোন জামা, নাশতার আগে না পরে হোমওয়ার্ক, সপ্তাহে কোন দিন ঘর গোছানো।
- ভালো যুক্তি দিলে মাঝে মাঝে ‘হ্যাঁ’ বলুন: ‘ঠিক বলেছ। আর ১০ মিনিট।’ শান্ত কথায় কাজ হলে বেয়াদবি করার দরকার পড়ে না।
- খেয়াল করলে মুখে বলুন: ‘তুমি আমার সঙ্গে একমত হওনি, তবু শান্ত ছিলে। একদম বড়দের মতো কাজ করেছ।’
কথায় কথায় তর্ক জোড়ে? রোজকার জীবনে তর্ক কমানো, আর যে ভুলগুলো তর্ক বাড়ায়
মুখে মুখে তর্কের সাধারণত একটা ধরন থাকে, তাই তর্কের সময় কী বলছেন তার চেয়ে আশপাশের ছোট কিছু বদল প্রায়ই বেশি কাজে দেয়।
- আগে খাবার, পরে কথা। স্কুল বা কোচিং থেকে ফেরার পরের ক্ষুধার্ত সময়ে অনেক তর্ক শুরু হয়, তাই কিছু বলার আগে একটু নাশতা দিন।
- শুধু হুকুম নয়, আগে জানান আর বেছে নিতে দিন: ‘৫ মিনিট পর হোমওয়ার্ক। পড়ার টেবিলে বসবে, না খাবার টেবিলে?’
- নিজের গলার সুরটা খেয়াল করুন। বাচ্চারা ব্যঙ্গ আর চিৎকার নকল করে; আপনি রেগে কিছু বলে ফেললে মিটিয়ে নিন। কঠিন সন্ধ্যার জন্য থামার একটা পরিকল্পনা আছে সন্তানের উপর চিৎকার করা বন্ধ করার উপায় লেখায়।
- প্রায় প্রতিদিন ১০ মিনিট শুধু ওর সঙ্গে কাটান, কী করবেন ও-ই ঠিক করুক। যে বাচ্চা মনে করে তার কথা শোনা হয়, সে সাধারণত কম তর্ক করে।
- ও কী দেখছে, খেয়াল রাখুন: কিছু কার্টুনে বেয়াদব, মুখে মুখে কথা বলা চরিত্রটাকেই মজার করে দেখানো হয়। মাঝে মাঝে একসঙ্গে দেখুন আর তা নিয়ে কথা বলুন।
বাচ্চা বাবা-মায়ের সঙ্গে বেয়াদবি করলে যে ভুলগুলো হয়
সন্তান অবাধ্য হলে করণীয় নিয়ে অনেক পরামর্শই শুরু হয় শাস্তি দিয়ে। অথচ এই সাধারণ ভুলগুলো তর্ক সাধারণত আরও বাড়ায়:
- ‘বেয়াদব’, ‘অকৃতজ্ঞ’, ‘অভদ্র’ জাতীয় তকমা। যে নামে ডাকা হয়, বাচ্চারা প্রায়ই সেরকমই হয়ে ওঠে।
- বেয়াদবির কাছে হার মানা। চিৎকার করলেই যদি গেমের বাড়তি সময় মেলে, তাহলে চাওয়ার উপায় হয়ে দাঁড়ায় চিৎকার।
- বড় হুমকি, যা আপনি রাখবেন না, যেমন ‘এবার ঈদে কোনো নতুন জামা নেই!’ বড়, অবিশ্বাস্য শাস্তির চেয়ে ছোট, নিশ্চিত পরিণতি বেশি কাজ করে।
- ‘মুখে মুখে কথা বলার’ জন্য চড়-থাপ্পড় বা মারধর। শারীরিক শাস্তি সময়ের সঙ্গে সাধারণত আচরণ আরও খারাপ করে, আর শেখায় যে বড়রাই জেতে; শান্ত উপায়গুলো পাবেন বাচ্চাকে শাসন করার উপায় লেখায়।
কিশোর সন্তান তর্ক করে: ১২ বছরের পর কী বদলায়
কিশোর বয়সে মুখে মুখে তর্ক প্রায়ই বড় হওয়ার চর্চা: নিজের মত তৈরি করা, আরও স্বাধীনতা চাওয়া, আর আপনি তাকে গুরুত্ব দেন কি না যাচাই করা। একই শান্ত পদ্ধতি তখনো কাজ করে, শুধু তার স্বাধীনতার প্রতি আরও সম্মান রেখে।
- কোন লড়াই লড়বেন, বেছে নিন। নিরাপত্তা, পড়াশোনা, ভালো ব্যবহার আর পরিবারের নিয়ম জরুরি; চুলের ছাঁট বা গান সাধারণত নয়।
- সামনে কেউ নয়। আড়ালে কথা বলুন, ভাইবোন, কাজিন বা বন্ধুদের সামনে কখনো নয়, যাতে মুখ রক্ষা করে ও পিছিয়ে আসতে পারে।
- যুক্তিটাকে গুরুত্ব দিন। জিজ্ঞেস করুন, ‘তুমি কী প্রস্তাব দাও?’ নিয়ম বানাতে যে কিশোর নিজে অংশ নেয়, সে সেটা মানতেও বেশি আগ্রহী হয়।
- অল্প কয়েকটা সীমা দৃঢ় রাখুন: অপমান নয়, মারধর বা জিনিস ভাঙা নয়, আর নিরাপত্তার নিয়ম অমান্য করা নয়।
মুখে মুখে তর্কের সঙ্গে যদি নিয়ম ভাঙা, দেরি করে ফেরা বা লুকোছাপাও থাকে, দেখুন টিনএজ সন্তান অবাধ্য হলে কী করবেন।
আমাদের পরিবারে: মুরব্বি, অতিথি আর বেয়াদবির ভয়
অনেক বাংলাদেশি পরিবারে বাবা-মা আর মুরব্বিদের সম্মান করা গভীর একটা মূল্যবোধ, যার শিকড় ধর্ম আর সংস্কৃতিতে; তাই বাচ্চা মুখে মুখে কথা বললে মনে হতে পারে সবার সামনে হেরে গেলাম: ‘ছেলেমেয়েকে কি কেউ আদব-কায়দা শেখায়নি?’ আমাদের অনেকেই বড় হয়েছি এমন সময়ে, যখন বাচ্চারা বড়দের সঙ্গে তর্কই করত না; আর এখনকার স্কুল প্রশ্ন করতে ও মত দিতে উৎসাহ দেয়। তাই সম্মান বলতে বাচ্চা আর দাদা-দাদির বোঝাপড়া অনেক আলাদা হতে পারে।
- সম্মান মানে চুপ থাকা নয়। মুরব্বিদের সালাম দেওয়া, নরম গলায় কথা বলা, দাদা-দাদিকে ‘আপনি’ বলা শেখাতে পারেন, আবার ভদ্রভাবে ‘আমি কি একটা কথা বলতে পারি?’ বলার সুযোগও দিতে পারেন। আরও পাবেন শিশুকে আদব-কায়দা ও ভালো অভ্যাস শেখানো লেখায়।
- অতিথিদের সামনে ব্যাপারটা আড়ালে রাখুন। সবার সামনে বকা বা ‘বেয়াদব’ তকমা নয়; আস্তে করে ‘এক মিনিট আমার সঙ্গে এসো’ বলে অন্য ঘরে কথা বলাটাই সাধারণত বেশি কাজে দেয়।
- দাদা-দাদি বা নানা-নানি যদি বলেন, ‘দুটো থাপ্পড় দিলেই ঠিক হয়ে যাবে’, আদবের ব্যাপারে তাঁদের যত্নের জন্য ধন্যবাদ দিন, আর নিজের পরিকল্পনাটা জানান: ‘আম্মা, আমরা ওকে ভদ্রভাবে আবার বলতে বলছি। আপনি কি এতে একটু সাহায্য করবেন?’
- সবার জন্য একই নিয়ম। বড়রা যদি একে অপরের সঙ্গে বা গৃহকর্মীর সঙ্গে কড়া সুরে কথা বলেন, বাচ্চারাও সেই সুর নকল করে। শান্ত, ভদ্র কথার নিয়ম বাসার সবার জন্য।
- পরীক্ষা আর কোচিংয়ের মৌসুমে ক্লান্ত সন্ধ্যাগুলোয় অনেক তর্ক হয়। এই সময় নির্দেশ কম দিন, ঘুম ঠিক রাখুন, আর গুরুতর আলাপ রাখুন শুক্রবারের জন্য।
সম্মান মানে কখনো দ্বিমত না করা নয়; সম্মান মানে ভদ্র কথা আর শান্ত গলা।
মুখে মুখে তর্ক কমানোর ৭ দিনের পরিকল্পনা
একবারে একটা বদল বেছে নিন, প্রতিদিন কী হলো লিখে রাখুন, আর এক সপ্তাহ পর মিলিয়ে দেখুন।
- দিন ১: খেয়াল করুন। যতবার বাচ্চা মুখে মুখে তর্ক করে, লিখে রাখুন কখন, আর ঠিক আগে কী হয়েছিল: কোনো নির্দেশ, খিদে, মোবাইল বন্ধ করা। এখনই কিছু বদলাবেন না।
- দিন ২: সবচেয়ে বেশি তর্ক হয় এমন দুটো সময় খুঁজে বের করুন, আর সেগুলোর পরিকল্পনা করুন: আগে নাশতা, ৫ মিনিট আগে জানানো, বা দুটোর মধ্যে বেছে নেওয়ার সুযোগ।
- দিন ৩: শান্ত একটা সময়ে পরিবারের ‘এটা চলবে না’ তালিকা আর আবার বলার নিয়ম ঠিক করুন: ‘কথাটা খারাপ শোনালে আবার বলার একটা সুযোগ পাবে।’
- দিন ৪: অভিনয় করে ভদ্রভাবে দ্বিমত করার চর্চা করুন, আর বাচ্চাকে বাবা-মায়ের ভূমিকায় খেলতে দিন।
- দিন ৫: তখনকার ধাপগুলো কাজে লাগান: থামুন, গলা নিচু রাখুন, আবার বলতে বলুন, নিয়ম ধরে রাখুন। প্রতিটা তর্ক কতক্ষণ চলল, লিখে রাখুন।
- দিন ৬: ভালোটা ধরুন। বাচ্চা শান্তভাবে দ্বিমত করলে প্রতিবার মুখে বলুন, আর ভালোভাবে বলা অন্তত একটা যুক্তিতে ‘হ্যাঁ’ বলুন।
- দিন ৭: দিন ১-এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন: কতবার, কোন সময়ে, কতক্ষণ। যা কাজে দিয়েছে রাখুন, আর পরের বদলটা বেছে নিন।
মুখে মুখে তর্কের জন্য কখন সাহায্য নেবেন
কিছুটা মুখে মুখে তর্ক বড় হওয়ারই অংশ। তবে আরও খেয়াল করুন, আর ডাক্তার বা কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলুন, যদি:
কখন সাহায্য নেবেন
- প্রায় প্রতিদিন বেয়াদবি হচ্ছে, আর এক মাস শান্ত, স্থির নিয়ম মেনে চলার পরও তা বাড়ছেই, বা পড়াশোনা কিংবা বন্ধুত্বের ক্ষতি করছে।
- তর্ক গড়াচ্ছে মারধর, জিনিস ছোড়া বা ভাঙায়, বা কাউকে আঘাত করার হুমকিতে। সবাইকে নিরাপদ রাখুন, আর কেউ এই মুহূর্তে বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
- হঠাৎ বদল, যেমন ভদ্র বাচ্চা হঠাৎ খুব রাগী বা চুপচাপ হয়ে যাওয়া, সঙ্গে ঘুমের সমস্যা, রেজাল্ট খারাপ হওয়া বা লুকোছাপা করা নতুন বন্ধু, বুলিং বা নির্যাতনের লক্ষণ হতে পারে: বাচ্চার কথা বিশ্বাস করুন, সেদিনই ব্যবস্থা নিন, আর এই মুহূর্তে বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন। বাচ্চা যদি বলে কেউ তাকে কষ্ট দিয়েছে, স্থানীয় থানায় জানান।
- দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতিদিন বাচ্চাকে মন খারাপ, খিটখিটে বা হতাশ মনে হচ্ছে।
- বাচ্চা বেঁচে থাকতে না চাওয়ার কথা বা নিজেকে আঘাত করার কথা বলছে: শান্ত থাকুন, পাশে থাকুন; এই মুহূর্তে বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন, নইলে সেদিনই ডাক্তার দেখান।
- দেখছেন প্রায় প্রতিদিন চিৎকার করছেন বা মারছেন, বা ভয় হচ্ছে বাচ্চাকে আঘাত করে ফেলতে পারেন। আগে নিশ্চিত করুন বাচ্চা নিরাপদ, তারপর সরে যান, আর সেদিনই নিজের জন্য সাহায্য নিন।
সন্তান মুখে মুখে তর্ক করে মানে সে একটু জোরে জোরেই শিখছে, কীভাবে নিজের পক্ষে কথা বলতে হয়; আর আপনার শান্ত থাকা সময়ের সঙ্গে সেটাকে ভদ্র দ্বিমতে বদলাতে সাহায্য করে। ParentMind আপনাকে নোট করতে সাহায্য করে কখন তর্ক হয় আর তার আগে কী ঘটে, যাতে এক সপ্তাহে ধরনগুলো দেখতে পান; ParentMind কীভাবে কাজ করে দেখুন।
বাবা-মায়েরা যা জানতে চান
বাচ্চার মুখে মুখে তর্ক করা কি স্বাভাবিক?
হ্যাঁ, বেশির ভাগ বাচ্চার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। ৫ বছরের আশপাশ থেকে বাচ্চারা নিজের স্বাধীনতা আর নতুন শেখা কথা যাচাই করতে গিয়ে মুখে মুখে তর্ক করে, আর প্রি-টিন বয়সে ও কৈশোরে এটা প্রায়ই আবার বাড়ে। এটা সাধারণত এখনো শিখতে থাকা একটা দক্ষতা, খারাপ স্বভাব নয়। সবচেয়ে বেশি কাজে দেয় শান্ত জবাব, দৃঢ় নিয়ম, আর ভদ্রভাবে আবার বলার সুযোগ।
৭ বছরের বাচ্চা মুখে মুখে কথা বলে, এটা কি স্বাভাবিক?
সাধারণত হ্যাঁ। ৬ থেকে ৮ বছরের দিকে বাচ্চাদের ন্যায্যতার বোধ খুব প্রবল হয়, আর স্কুল, ভাইবোন বা স্ক্রিন থেকে শেখা কথা দিয়ে তারা নিয়ম যাচাই করতে ভালোবাসে। কারণটা একবার বলুন, সুর বেয়াদবের মতো হলে আবার বলতে বলুন, আর শান্তভাবে নিয়ম ধরে রাখুন। ভদ্রভাবে দ্বিমত করলে প্রশংসা করুন।
মুখে মুখে তর্ক করলে কি বাচ্চাকে শাস্তি দেওয়া উচিত?
কড়া শাস্তি, চিৎকার বা মারধর সময়ের সঙ্গে সাধারণত মুখে মুখে তর্ক আরও বাড়ায়। শুধু সুর বেয়াদবের মতো হলে শান্তভাবে আবার বলতে বলাই প্রায়ই যথেষ্ট। সত্যিকারের অপমান বা বাজে নামে ডাকার জন্য আগে থেকে ঠিক করা, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছোট একটা পরিণতি রাখুন, যেমন দুঃখ প্রকাশ করা, বা সেদিন সন্ধ্যায় স্ক্রিন টাইম আগে শেষ হওয়া। শান্তভাবে কথা রাখুন, তারপর আর টেনে নেবেন না।
কিশোর সন্তান তর্ক করে, কী করব?
শান্ত থাকুন, তখনই তর্কে যাবেন না, আর পাল্টা অপমান করবেন না: ‘আমি তোমার কথা শুনতে চাই, কিন্তু এভাবে নয়। পরে কথা বলি।’ সেদিনই আড়ালে আবার বিষয়টায় ফিরে আসুন। নিয়ম ঠিক করায় সন্তানকে সত্যিকারের মত দিতে দিন, কোন লড়াই লড়বেন বেছে নিন, আর অল্প কয়েকটা সীমা দৃঢ় রাখুন: অপমান নয়, মারধর নয়, নিরাপত্তার নিয়ম অমান্য করা নয়।
আত্মীয়দের সামনে বাচ্চা বড়দের মুখের ওপর কথা বলে, কী করব?
শান্ত থাকুন, ব্যাপারটা আড়ালে রাখুন। সবার সামনে বকবেন না, ‘বেয়াদব’ তকমাও দেবেন না; আস্তে ‘এক মিনিট আমার সঙ্গে এসো’ বলে অন্য ঘরে অল্প কথা বলাটাই সাধারণত বেশি কাজে দেয়। পরে সালাম দেওয়া আর ভদ্রভাবে দ্বিমত করার চর্চা করুন। আত্মীয়রা কিছু বললে তাঁদের যত্নের জন্য ধন্যবাদ দিন, আর বলুন আপনারা একসঙ্গে চেষ্টা করছেন।
বাচ্চাকে কি আমার সঙ্গে তর্ক করতে দেওয়া উচিত?
হ্যাঁ, একটা সীমার মধ্যে। যে বাচ্চা বাবা-মায়ের সঙ্গে শান্তভাবে তর্ক করতে পারে, সে এমন একটা দক্ষতার চর্চা করছে, যা সারা জীবন কাজে লাগবে। দ্বিমত করতে দিন, কিন্তু বেয়াদবিকে ‘না’ বলুন: অপমান, আপনার কথার ওপর চিৎকার, বা দরজা জোরে বন্ধ করা। শান্তভাবে ভালো যুক্তি দিলে মাঝে মাঝে ‘হ্যাঁ’ বলুন। এতে বাচ্চা দেখে, ভদ্র কথাতেই কাজ হয়।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।




