বাবা প্রবাসে থাকলে সন্তান লালন-পালন: দূরে থেকেও কাছে থাকার উপায়
ছোট করে উত্তর
বাবা প্রবাসে থাকলে সন্তান লালন-পালনে তিনটা জিনিস প্রায়ই সবচেয়ে কাজে দেয়: নির্দিষ্ট সময়ে ছোট ছোট ভিডিও কল, সহজ আর সত্যি কথায় দূরত্বের ব্যাখ্যা, আর রোজকার সিদ্ধান্তে প্রবাসী মানুষটির অংশ নেওয়া। বাসায় যিনি সবটা সামলান, তাঁর পাশে দাঁড়ান। দেশে ফেরা আর বিদায়ের সময় বাচ্চার লজ্জা বা আঁকড়ে থাকা স্বাভাবিক; দুই সপ্তাহ বা তার বেশি মন খারাপ থাকলে ডাক্তার দেখান।
লেখাটি শুনুন
১৬ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া
এক নজরে
- কাদের জন্য
- যে পরিবারের বাবা বা মা প্রবাসে কাজ করেন: ২–১৬ বছরের সন্তান, আর বাসায় যে মা, বাবা বা দাদা-দাদি-নানা-নানি তাদের বড় করছেন
- মূল কথা
- মাঝে মাঝে লম্বা কলের চেয়ে নির্দিষ্ট সময়ে নিয়মিত ছোট ভিডিও কল সাধারণত বেশি কাজে দেয়, আর রোজকার সাধারণ মুহূর্তগুলোই সবচেয়ে দামি।
- বাচ্চাকে সহজ আর সত্যি কথায় বলুন বাবা বা মা কোথায়, কেন, আর আবার কখন কথা হবে; বাচ্চা ঘুমিয়ে থাকার সময় চুপিচুপি চলে যাবেন না।
- বাসায় যিনি আছেন, তিনি দুজনের কাজ একা করছেন: কলে তাঁর সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়ান, কঠিন কাজগুলো ভাগ করে নিন, আর খেয়াল রাখুন তিনিও যেন বিশ্রাম আর সাহায্য পান।
- দেশে ফেরার পর লজ্জা আর বিদায়ের পর আঁকড়ে থাকা খুব সাধারণ, আর প্রায়ই কয়েক সপ্তাহে কমে আসে; দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে বেশিরভাগ দিন মন খারাপ থাকলে ডাক্তার দেখান।
শিফট শেষে রিয়াদ থেকে আব্বু ভিডিও কল দেন, আর ৪ বছরের ছেলে সোফার পেছনে লুকিয়ে পড়ে। ১১ বছরের মেয়ে এই সপ্তাহে তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করে, আব্বু কবে আসবে। বাবা প্রবাসে থাকলে সন্তান লালন-পালন অনেকটাই চলে আসে বাসায় থাকা মা বা দাদা-দাদির কাঁধে, আর এতে সবার ওপরই অনেক চাপ পড়ে।
দূর থেকে সন্তান পালন কঠিন, কিন্তু দূরে থাকা মানেই দূরের মানুষ হয়ে যাওয়া নয়। অনেক বাচ্চা এমন বাবা বা মায়ের খুব কাছের হয়ে বড় হয়, যাঁকে বেশিরভাগ সময় দেখে শুধু ফোনের পর্দায়, বিশেষ করে যখন ফোন নিয়মিত আসে, কথাগুলো সত্যি হয়, আর বাসায় থাকা মানুষটি সাহায্য পান। নিখুঁত পরিস্থিতি লাগে না; লাগে কয়েকটা নিয়মিত অভ্যাস।
নিচে পাবেন: কোন বয়সে বাচ্চা কী অনুভব করে, দূরত্বের কথা কীভাবে বোঝাবেন, যে ভিডিও কল সত্যিই কাজে দেয়, বাসায় থাকা মা বা বাবা, দাদা-দাদি, টাকা আর উপহার, দেশে ফেরা আর বিদায়, ৭ দিনের পরিকল্পনা, আর কখন সাহায্য নেবেন।
বাবা বিদেশে থাকলে ছেলেমেয়ের আচরণ: কোন বয়সে কী অনুভব করে?
দূরে থাকা বাবা বা মাকে মিস করার অনুভূতি বয়সভেদে বদলায়। মিস করা, রাগ, গর্ব আর দুশ্চিন্তা একসঙ্গে থাকতে পারে, আর বাচ্চারা প্রায়ই তা কথায় নয়, আচরণে দেখায়:
| বয়স | কী দেখা যেতে পারে | কী সাহায্য করে |
|---|---|---|
| ২–৪ বছর | কলে লজ্জা বা আগ্রহ না দেখানো; বাসায় থাকা মা বা বাবাকে আঁকড়ে থাকা; বিদায়ের পর ঘুম বা টয়লেটের অভ্যাসে পিছিয়ে যাওয়া | রোজ ছোট কল; বাচ্চার চোখের উচ্চতায় ছবি; প্রতিবার একই সহজ কথা: “আব্বু অনেক দূরে কাজ করে। রাতের খাবারের পর ফোন দেবে।” |
| ৫–৮ বছর | বারবার জিজ্ঞেস করা কবে আসবে; ভাবা যে তার কারণেই বাবা বা মা চলে গেছে; কলের পর কান্না; ভালোবাসার প্রমাণ হিসেবে উপহার চাওয়া | দিন গোনার জন্য ছবির চার্ট; স্পষ্ট করে বলা যে এতে তার দোষ নেই; প্রতিটা কলের শেষে বিদায়ের একটা ছোট রীতি |
| ৯–১২ বছর | কারণ বোঝে, তবু রাগ বা বাদ পড়ার অনুভূতি; বাসার মানুষটিকে কষ্ট না দিতে মন খারাপ লুকানো; পড়াশোনায় ওঠানামা | কারণ নিয়ে সত্যি কথা; আলাদা করে শুধু ওর সঙ্গে কথা বলার কল; স্কুলের কাজ আর খেলার খবর ভাগ করা; সবসময় সাহায্যকারী নয়, বাচ্চা হয়েই থাকতে দেওয়া |
| ১৩–১৬ বছর | কলে আগ্রহ কমে যাওয়া; “বাসার পুরুষ” বা দ্বিতীয় মা হয়ে ওঠা; বাসায় থাকা মা বা বাবার সঙ্গে তর্ক; বন্ধুদের সঙ্গে বেশি সময় | সিদ্ধান্তে মতামত দেওয়ার সুযোগ; তার নিজের ধরনে কথা, যেমন মেসেজ বা একসঙ্গে ম্যাচ দেখা; মা-বাবা দুজনেই যার পক্ষে, এমন স্পষ্ট নিয়ম; বড়দের দায়িত্বের ভারী বোঝা না চাপানো |
অনেক বাচ্চা কঠোর পরিশ্রমী বাবা বা মাকে নিয়ে গর্বও বোধ করে, আর কারণগুলো বুঝলে সেই গর্ব প্রায়ই বাড়ে। অনুভূতি সাধারণত ওঠানামা করে: বিদায়ের পরে কঠিন, রুটিন থিতু হলে সহজ।
বাবা কেন বিদেশে থাকে, সন্তানকে কীভাবে বোঝাবেন
বাবা প্রবাসে থাকলে সন্তান লালন-পালনের প্রথম কাজ হলো সত্যি কথাটা নরমভাবে বলা, কারণ রহস্যের চেয়ে কঠিন সত্যিও বাচ্চারা সাধারণত ভালো সামলায়। যাওয়ার আগে, আর যখনই আবার জিজ্ঞেস করে, তখনই:
- বাবা বা মা যাওয়ার আগেই বলুন: ছোট বাচ্চাকে কয়েক দিন আগে, বড়দের আরও আগে, যাতে প্রশ্ন করার সময় পায়।
- সহজ করে বলুন: কোথায় যাচ্ছে, কাজের জন্য যাচ্ছে, আর মোটামুটি কতদিন, বাচ্চা যেভাবে বোঝে সেভাবে, যেমন “দুটো ঈদের পরে”।
- কী একই থাকবে, তা বলুন: কে দেখাশোনা করবে, কোথায় ঘুমাবে, আর কখন কথা হবে।
- স্পষ্ট করে বলুন, এতে তার কোনো দোষ নেই, আর এর মানে কম ভালোবাসা নয়।
- কান্না হলেও ঠিকমতো বিদায় নিন। বাচ্চা ঘুমিয়ে থাকার সময় চুপিচুপি চলে গেলে আঁকড়ে থাকা প্রায়ই বাড়ে; নরম বিদায়ের ধাপগুলো পাবেন বিদায়ের সময় বাচ্চার কান্না সামলানো লেখায়।
- আঁকড়ে রাখার মতো কিছু রেখে যান: দিনের বেলা জড়িয়ে ধরার জন্য গায়ের গন্ধ লাগা একটা টি-শার্ট, রেকর্ড করা একটা গল্প, বিছানার পাশে একটা ছবি।
যা বলতে পারেন
- আব্বু দুবাইয়ে কাজ করতে যাচ্ছে, অনেক দূরে। প্রতি রাতে খাবারের পর তোমাকে ফোন দেবে।
- তুমি কিছু করেছ বলে আব্বু যাচ্ছে না। আব্বু তোমাকে প্রতিদিন ভালোবাসে।
- আম্মুকে মিস করা ঠিক আছে। আমিও মিস করি। চলো আম্মুর জন্য একটা ছবি আঁকি?
- আব্বুর জন্য মন খারাপ আর গর্ব, দুটোই একসঙ্গে হতে পারে।
- এই ঘরগুলো সব রং করা হয়ে গেলে আব্বুর ঈদে বাসায় আসার কথা।
ভিডিও কলে সন্তানের সঙ্গে কথা: দূর থেকে কাছে থাকার উপায়
প্রবাসী বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের সেতু হলো ফোন কল। কয়েকটা অভ্যাস সেতুটাকে মজবুত করে:
- দুই দেশের সময় মিলিয়ে একটা নির্দিষ্ট সময়ে ফোন করুন; মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের চেয়ে কয়েক ঘণ্টা পিছিয়ে, মালয়েশিয়া ঘণ্টা দুয়েক এগিয়ে। সপ্তাহে একটা লম্বা কলের চেয়ে বেশিরভাগ দিন ছোট কল সাধারণত বেশি কাজে দেয়।
- সাধারণ কাজগুলো একসঙ্গে করুন: “একসঙ্গে” খাওয়া, ঘুমের আগের গল্প, হোমওয়ার্ক দেখা, বা ওর আঁকা ছবি আর নতুন শেখা কিছু দেখা।
- ছোট বাচ্চা কল থেকে সরে গেলে জোর করবেন না। ৩ বছরের বাচ্চা এক মিনিট পর দৌড়ে চলে যাবে, এটাই স্বাভাবিক; ফোনটা এমন জায়গায় রাখুন, যেন আবার ফিরে আসতে পারে।
- পরিবারের সবার কলের পাশাপাশি প্রত্যেক বাচ্চাকে কয়েক মিনিট একা কথা বলতে দিন।
- কলকে নালিশের জায়গা বানাবেন না। “আব্বুকে বলো তুমি কী করেছ!” বললে দূরের মানুষটি হয়ে যান শাস্তিদাতা, আর কলটা হয়ে যায় ভয়ের।
- শিফট বা ক্যাম্পের নিয়মের কারণে কল করা না গেলে দুই দিক থেকেই ভয়েস মেসেজ, ছবি আর ছোট ভিডিও পাঠান।
পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কল ভালো ধরনের স্ক্রিন টাইম, ১৮ মাসের কম বয়সী শিশুর জন্যও। কলের জন্য পরিবারের ফোনটাই রাখুন, যাতে কল শেষে তা এক ঘণ্টার কার্টুনে না গড়ায়। দূরে থেকেও রোজকার জীবনে যুক্ত থাকার আরও উপায় পাবেন সন্তান লালন-পালনে বাবার ভূমিকা লেখায়।
বাসায় থাকা মা: স্বামী প্রবাসে থাকলে একা সন্তান পালন
বাসায় যিনি থাকেন, বেশিরভাগ সময় মা, তিনি দুজনের কাজ একা করেন: স্কুলে আনা-নেওয়া, রাতে বাচ্চার অসুখ, হোমওয়ার্ক, টাকাপয়সা, শাসন, আর প্রায়ই শ্বশুরবাড়ির দায়িত্বও, সাধারণত কোনো বিরতি ছাড়া। অনেক প্রবাসীর স্ত্রী একা সন্তান পালন করতে গিয়ে একাকিত্ব আর দুশ্চিন্তায় ভোগেন, এটা খুব সাধারণ, আর এর মানে ব্যর্থতা নয়।
- বড় সিদ্ধান্তগুলো কলে একসঙ্গে নিন: স্কুল, স্বাস্থ্য, টাকাপয়সা আর নিয়ম। তারপর প্রবাসী মানুষটি সন্তানের সামনে সেই সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়ান।
- শুধু ভালো খবর নয়, কঠিন কথাগুলোও ভাগ করুন। শুধু “সব ঠিক আছে” শুনলে দূরের মানুষটি সাহায্য করতে পারেন না।
- কাজে সাহায্য চান: স্কুলে আনা-নেওয়ার জন্য একজন আত্মীয়, ভরসার একজন প্রতিবেশী, সপ্তাহে কয়েক ঘণ্টা নিজের জন্য।
- রুটিন সহজ আর নিয়মিত রাখুন: খাওয়া, হোমওয়ার্কের সময়, ঘুমের সময়। দিনগুলো একরকম হলে বাচ্চারা বেশি নিরাপদ বোধ করে।
- নিজের যত্ন নিন: সুযোগ পেলে ঘুমিয়ে নিন, অন্তত একটা বন্ধুত্ব ধরে রাখুন, আর বেশি কঠিন লাগলে কাউকে বলুন। সবচেয়ে কঠিন সপ্তাহগুলোর জন্য পরামর্শ পাবেন বাবা-মায়ের অপরাধবোধ আর ক্লান্তি লেখায়।
মা যখন প্রবাসে
আমাদের অনেক মা-ও প্রবাসে কাজ করেন, প্রায়ই সন্তানকে বাবা বা দাদা-দাদি-নানা-নানির কাছে রেখে, আর এ নিয়ে বাচ্চাকে অনেক সময় বাজে কথা শুনতে হয়। একই অভ্যাসগুলো কাজে দেয়: নিয়মিত কল, সিদ্ধান্তে মতামত, সত্যি কথা, আর এই স্পষ্ট বার্তা যে মা-বাবা দুজনেই তাকে ভালোবাসেন।
আমাদের বাসায়: শ্বশুরবাড়ি, দাদা-দাদি, টাকা আর দূরে থেকে ঈদ
প্রবাসী পরিবারগুলোর কিছু পরিস্থিতি একেবারেই আমাদের দেশের:
- শ্বশুরবাড়িতে থাকা: যাওয়ার আগেই মূল নিয়মগুলো ঠিক করে নিন, আর মনোমালিন্য হলে প্রবাসী মানুষটি নিজের পরিবারের সঙ্গে কথা বলুন। আরও পাবেন যৌথ পরিবারে সন্তান লালন-পালন লেখায়।
- দাদা-দাদি বা নানা-নানি যখন মূল অভিভাবক: মা-বাবা দুজনেই প্রবাসে থাকলে বা মা দূরে থাকলে তাঁদের ধন্যবাদ দিন, জরুরি কয়েকটা নিয়মে একমত হোন, আর প্রবাসী মা-বাবাকে সব খবর জানিয়ে রাখুন।
- টাকা আর উপহার: প্রবাসের টাকায় স্কুল আর সংসার চলে, আর বাচ্চা দূরের মানুষটিকে মূলত উপহারদাতা ভাবতে শুরু করতে পারে। উপহার থাকুক বাড়তি হিসেবে, ক্ষমা চাওয়ার উপায় হিসেবে নয়; আর ভালো আচরণের বিনিময়ে “আব্বু কিনে দেবে” বলবেন না।
- ত্যাগের বোঝা: “তোর বাবা তোর জন্য রোদে পুড়ে কষ্ট করছে, তাই পড়!” ধরনের কথা বাচ্চার ঘাড়ে অপরাধবোধ চাপিয়ে দিতে পারে। বাবা বা মায়ের পরিশ্রমের কথা বলুন গর্ব নিয়ে, ঋণের মতো করে নয়।
- দূরে থেকে ঈদ: ঈদের সকালে একটা কলের পরিকল্পনা করুন, ঈদের খাবারের টেবিলের ছবি পাঠান, আর পরিবারের রীতিগুলো চালু রাখুন, যাতে দিনটা ঈদের মতোই লাগে।
- কানাঘুষা: “তোর বাবা কি আর আসবে না?” ধরনের প্রশ্ন বাচ্চাকে ভয় পাইয়ে দিতে পারে। বাচ্চার হয়ে আপনিই ছোট করে, নরমভাবে উত্তর দিন, তারপর অন্য কথায় যান।
দেশে ফেরা আর আবার চলে যাওয়া: দুই সময়েই বাচ্চার পাশে থাকার উপায়
বাবা বা মা দেশে ফিরলে
- একটু সময় লাগবে, ধরে নিন। ছোট বাচ্চা কয়েক দিন লজ্জা পেতে পারে, লুকাতে পারে, বা অন্যজনকে আঁকড়ে থাকতে পারে। জোর করে কোলে নেবেন না; আগে খেলুন।
- রুটিন বদলে না দিয়ে তাতে যোগ দিন। নিয়মকানুন আপাতত সেই মানুষটির হাতেই থাকুক, যিনি এতদিন সামলেছেন, আর ধীরে ধীরে দায়িত্ব নিন।
- উপহার ছোট রাখুন, সময় বেশি দিন: প্রত্যেক বাচ্চার সঙ্গে একা সময়, স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, একসঙ্গে সাধারণ একটা শুক্রবার। রোজকার সহজ রীতির আইডিয়া পাবেন কর্মজীবী বাবা-মায়ের কোয়ালিটি টাইম লেখায়।
- বড় বাচ্চা আপনাকে পরখ করতে পারে বা দূরত্ব রাখতে পারে। ধৈর্য রাখুন; বিশ্বাস ফেরে একসঙ্গে কাটানো সময়ে, উপদেশে নয়।
আবার চলে যাওয়ার সময়
- আগেই বাচ্চাদের জানান, আর একসঙ্গে দিন গুনুন, যাতে চলে যাওয়াটা হঠাৎ ধাক্কা না হয়।
- বিদায় ছোট আর উষ্ণ রাখুন, আর সেই সপ্তাহেই কলের রুটিন শুরু করুন।
- কয়েক সপ্তাহ একটু খারাপ যেতে পারে, ধরে নিন: কান্না, জেদ, আঁকড়ে থাকা বা বিছানা ভেজানো কিছুদিনের জন্য ফিরে আসতে পারে। বাড়তি আদর আর নিয়মিত রুটিন সাধারণত কাজে দেয়।
বাবা প্রবাসে থাকলে সন্তান লালন-পালন: কাছাকাছি থাকার ৭ দিনের পরিকল্পনা
একটা সপ্তাহ বেছে নিন। প্রতি সন্ধ্যায় লিখে রাখুন কখন কথা হলো, কলে কী করলেন, আর পরে বাচ্চাকে কেমন দেখাল।
- দিন ১: দুই দেশের সময় মিলিয়ে একটা নির্দিষ্ট কলের সময় ঠিক করুন, আর বাচ্চাদের জানিয়ে দিন।
- দিন ২: একটা কলের বাক্স শুরু করুন, আর প্রবাসী মা বা বাবার একটা ছবি বাচ্চার চোখের উচ্চতায় রাখুন।
- দিন ৩: কলে একটা সাধারণ কাজ করুন: গল্প, হোমওয়ার্ক বা একসঙ্গে খাওয়া।
- দিন ৪: প্রত্যেক বাচ্চাকে প্রবাসী মা বা বাবার সঙ্গে কয়েক মিনিট একা কথা বলতে দিন।
- দিন ৫: মা-বাবা আলাদা করে কথা বলুন: একসঙ্গে নেওয়ার মতো একটা সিদ্ধান্ত, আর খোলাখুলি ভাগ করার মতো একটা কঠিন কথা।
- দিন ৬: বাসায় থাকা মা বা বাবা নিজের জন্য এক ঘণ্টা নিন, আর সেই সময়টা ভরসার কোনো আত্মীয় বাচ্চাদের দেখুক।
- দিন ৭: কলে একসঙ্গে নোটগুলো পড়ুন। কোন কলগুলো সবচেয়ে ভালো গেছে? পরের সপ্তাহে সেভাবেই চালান।
কখন সাহায্য নেবেন, সন্তানের জন্য বা নিজের জন্য
বাবা প্রবাসে থাকলে সন্তান লালন-পালন একটা ছন্দে চলে: কল, ছুটিতে আসা আর বিদায়, আর বেশিরভাগ বাচ্চা এই ছন্দে মানিয়ে নেয়। তবে এসব দেখলে সাহায্য নিন:
এসব দেখলে সাহায্য নিন
- দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে বেশিরভাগ দিন বাচ্চার মন খারাপ, চুপচাপ বা খুব খিটখিটে, বা প্রিয় জিনিসেও আনন্দ পায় না: শিগগির ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। নিজের ক্ষতির যেকোনো কথায় শান্ত থাকুন, কাছে থাকুন; এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন, নইলে সেদিনই ডাক্তার দেখান।
- বিদায়ের পর আঁকড়ে থাকা, বিছানা ভেজানো বা ঘুমের সমস্যা কয়েক সপ্তাহ পরেও বাড়তে থাকলে, বা এক সপ্তাহ বা তার বেশি স্কুলে যেতে না চাইলে: স্কুল আর বাচ্চার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
- কিশোর সন্তান স্কুল ফাঁকি দিচ্ছে, নতুন বন্ধুদের সঙ্গে রাত করে বাসায় ফিরছে, বা বাসা থেকে টাকা হারাচ্ছে: শান্তভাবে কথা বলুন, আর এই সপ্তাহেই স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। মাদক, অস্ত্র বা মারামারির লক্ষণ দেখলে সেদিনই সাহায্য নিন, আর সন্তান এই মুহূর্তে বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
- নির্যাতনের যেকোনো লক্ষণ বা আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, যেমন নির্দিষ্ট কাউকে ভয় পাওয়া, এমন আঘাত যার ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারে না, বা দেখাশোনাকারী, আত্মীয় কিংবা টিউটর গায়ে হাত তোলেন: বাচ্চার কথা বিশ্বাস করুন, ওই মানুষটার কাছ থেকে দূরে রাখুন, সেদিনই ব্যবস্থা নিন আর স্থানীয় থানায় জানান; এই মুহূর্তে বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
- বাসায় থাকা আপনার নিজেরই দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে বেশিরভাগ দিন মন খারাপ, হতাশ বা দিশেহারা লাগে: শিগগির ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। আপনারও সাহায্য পাওয়ার অধিকার আছে।
- আপনার মনে হয় বাচ্চাকে আঘাত করে ফেলতে পারেন: বাচ্চারা নিরাপদে বা অন্য কোনো বড় মানুষের কাছে আছে কি না নিশ্চিত করে সরে যান, আর সেদিনই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। বাসার কেউ আপনাকে বা বাচ্চাদের আঘাত করলে বা হুমকি দিলে নিরাপদ জায়গায় যান আর সেদিনই ব্যবস্থা নিন; স্থানীয় থানায় জানাতে পারেন। কেউ এই মুহূর্তে বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
দূরত্ব কঠিন, কিন্তু পরিবার কতটা কাছের থাকবে, তা দূরত্ব ঠিক করে না। নিয়মিত কল, সত্যি কথা, আর বাসায় যিনি আছেন তাঁর পাশে দাঁড়ানো, এই তিনটা জিনিস প্রবাসী বাবা বা মায়ের সঙ্গে সন্তানের বন্ধন মজবুত রাখতে পারে। ParentMind আপনাকে প্রতিদিন কী হলো তা নোট করতে, বারবার যা ঘটছে তা দেখতে আর গাইড পেতে সাহায্য করে: ParentMind কীভাবে কাজ করে দেখে নিন।
বাবা-মায়েরা যা জানতে চান
বাবা বিদেশে থাকলে বাচ্চা কি বাবাকে ভুলে যাবে?
নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে সাধারণত না। কোলের শিশু আর ছোট বাচ্চা কলে বা দেশে ফেরার প্রথম কয়েক দিন লজ্জা পেতে পারে, কিন্তু যে কণ্ঠ, মুখ আর রুটিন বারবার পায়, তা মনে রাখে। রোজ ছোট কল, চোখের উচ্চতায় ছবি, রেকর্ড করা গল্প, আর প্রবাসী বাবার কণ্ঠে ঘুমের আগের একই ছড়া, সবকিছুই বন্ধনটা জীবন্ত রাখতে সাহায্য করে।
প্রবাসী বাবা বা মা কত ঘন ঘন সন্তানকে ফোন করবেন?
সপ্তাহে একটা লম্বা কলের চেয়ে বেশিরভাগ দিন ছোট কল, এমন সময়ে যার ওপর বাচ্চা ভরসা করতে পারে, সাধারণত বেশি কাজে দেয়। ছোট বাচ্চার জন্য ৫–১০ মিনিটের মন দেওয়া কথাই যথেষ্ট। বড় বাচ্চারা মেসেজ আর ছুটির দিনে একটু লম্বা কল বেশি পছন্দ করতে পারে। সবচেয়ে জরুরি হলো কল নিয়মিত হওয়া, আর কথা দেওয়া কল যেন সত্যিই হয়।
বাবা কেন বিদেশে থাকে, বাচ্চাকে কীভাবে বোঝাব?
বাচ্চার বয়স বুঝে সহজ আর সত্যি কথা বলুন: “আব্বু দুবাইয়ে কাজ করে, যাতে আমাদের স্কুল আর সংসারের খরচ চলে। আব্বু তোমাকে মিস করে, আর প্রতি রাতে ফোন দেয়।” মোটামুটি কতদিন, কী কী একই থাকবে, আর এতে যে তার দোষ নেই, তা বলুন। যতবার জিজ্ঞেস করে, ততবার উত্তর দিন; বারবার শুনেই ছোট বাচ্চারা বিষয়টা বোঝে।
প্রতিটা ভিডিও কলের পর বাবার জন্য বাচ্চা কাঁদে, তাহলে কি কম ফোন করব?
সাধারণত না। কলের পর কান্না প্রায়ই ভালোবাসা আর মিস করার প্রকাশ, ক্ষতির নয়। কল নিয়মিত রাখুন, প্রতিবার একইভাবে শেষ করুন, যেমন একটা ছড়া বা “কাল আবার কথা হবে”, আর ঠিক পরেই আরামের কিছু রাখুন: একটু কোলে নেওয়া, গল্প, বা নাশতা। দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে বেশিরভাগ দিন মন খারাপ থাকলে শিগগির ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
বাবা দেশে ফিরলে বাচ্চা কেন লজ্জা পায় বা কাছে যেতে চায় না?
খুব সাধারণ ব্যাপার, বিশেষ করে মোটামুটি ৬ বছরের কম বয়সে। পর্দার মানুষ আর ঘরের মানুষ বাচ্চার কাছে আলাদা, আর ছোট বাচ্চার সহজ হতে সময় লাগে। জোর করে কোলে নেবেন না, মনেও নেবেন না। মেঝেতে বসে খেলুন, খাইয়ে দিন, ঘুমের সময় পাশে থাকুন, আর বাচ্চাকে নিজে থেকে কাছে আসতে দিন। অনেক বাচ্চা কয়েক দিনের মধ্যেই সহজ হয়ে যায়।
স্বামী প্রবাসে, একা কীভাবে সন্তান সামলাব?
দিনগুলো সহজ আর নিয়মিত রাখুন, বড় সিদ্ধান্ত কলে একসঙ্গে নিন, আর ভরসার আত্মীয় বা প্রতিবেশীর কাছে কাজে সাহায্য চান। শুধু ভালো খবর নয়, কঠিন কথাগুলোও স্বামীকে জানান। নিজের জন্য ছোট ছোট বিরতি নিন, আর দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে বেশিরভাগ দিন মন খারাপ বা দিশেহারা লাগলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
বিদায়ের সময় কি বাচ্চাকে এয়ারপোর্টে নিয়ে যাব?
বাচ্চার ওপর নির্ভর করে। অনেক ছোট বাচ্চার জন্য এয়ারপোর্টের লম্বা, ভিড়ের অপেক্ষার চেয়ে বাসায় ছোট, উষ্ণ বিদায় সহজ, আর বড় বাচ্চারা যেতে চাইতে পারে। যা-ই ঠিক করুন, ঠিকমতো বিদায় নিন, বাচ্চা ঘুমিয়ে থাকার সময় চুপিচুপি চলে যাবেন না, আর যাওয়ার আগেই প্রথম কলের সময় ঠিক করে রাখুন।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।


