সন্তান লালন-পালনে বাবার ভূমিকা: প্রতিদিনের কাজে বাবা যেভাবে পাশে থাকবেন
ছোট করে উত্তর
সন্তান লালন-পালনে বাবার ভূমিকা মানে প্রতিদিনের হাতে-কলমে যত্ন: খাওয়ানো, গোসল করানো, ঘুম পাড়ানো, স্কুল, খেলা আর মনের কথা বলা; শুধু টাকা আয় বা শাসন নয়। জন্ম থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত, বাবা-মা দুজনেই কাছে থাকলে সন্তান প্রায়ই বেশি নিরাপদ আর আত্মবিশ্বাসী বোধ করে। ব্যস্ত বাবা রোজকার একটা ছোট্ট রীতি ধরে রাখতে পারেন। সন্তান যদি আপনাকে ভয় পায়, বুঝবেন পথ বদলানোর সময় এসেছে।
লেখাটি শুনুন
১৬ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া
এক নজরে
- কাদের জন্য
- ০–১৮ বছর বয়সী সন্তানের বাবা, যে মায়েরা চান স্বামী সন্তানের কাজে আরও যুক্ত হোক, আর যে বাবারা অনেকক্ষণ কাজ করেন বা প্রবাসে থাকেন
- মূল কথা
- খাওয়ানো আর ডায়াপার বদলানো থেকে হোমওয়ার্ক আর ঘুমের আগের গল্প — প্রতিদিনের যত্নের প্রায় সব কাজই বাবা করতে পারেন।
- শাসনের দায়িত্ব শুধু বাবার হলে সন্তান প্রায়ই বাবাকে ভয় পায় আর কথা লুকায়; মায়ের সঙ্গে মিলে শান্ত নিয়ম ঠিক করা সাধারণত ভালো কাজ করে।
- ব্যস্ত বা দূরে থাকা বাবাও ছোট, নিয়মিত রীতির মাধ্যমে কাছে থাকতে পারেন: নির্দিষ্ট সময়ের ফোন, ঘুমের আগের গল্প, শুক্রবারের একটা বেড়ানো।
- যে বাবা মন দিয়ে শোনেন, অনুভূতি প্রকাশ করেন আর ঘরের কাজ ভাগ করে নেন, এমন স্নেহশীল বাবার কাছ থেকে মেয়ে আর ছেলে দুজনেই অনেক কিছু পায়।
আমাদের দেশের অনেক বাবা বড় হয়েছেন এমন বাবার কাছে, যিনি সংসারের টাকা আনতেন আর শাসন করতেন। এখন নিজের সন্তানের বেলায় তাঁরা ভাবেন, সন্তান লালন-পালনে বাবার ভূমিকা আসলে কেমন হওয়া উচিত।
উত্তরটা যতটা কঠিন শোনায়, ততটা নয়: সন্তানের দরকার প্রতিদিনের ছোট ছোট মুহূর্তে বাবাকে, শুধু বড় সিদ্ধান্তের সময় নয়। খাওয়ানো, গোসল, স্কুলে আনা-নেওয়া, খেলা আর রাতে ১০ মিনিটের গল্প — সবই গোনায় ধরা হয়, আর এর প্রায় সবই বাবা করতে পারেন।
নিচে পাবেন: বাবার ভূমিকা কী কী, বয়স অনুযায়ী আইডিয়া, প্রতিদিনের কাজ ভাগ করে নেওয়া, শুধু শাসনের দায়িত্ব থেকে বেরিয়ে আসা, ব্যস্ত বা দূরে থাকা বাবা, মেয়ে আর ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক, ৭ দিনের পরিকল্পনা আর কখন সাহায্য নেবেন।
সন্তান লালন-পালনে বাবার ভূমিকা আসলে কী?
সন্তান লালন-পালনে বাবার ভূমিকাও আসলে মায়ের মতোই: সন্তানকে নিরাপদ রাখা, যত্ন নেওয়া, ভালোবাসা আর পথ দেখানো। একেক পরিবার কাজটা একেকভাবে ভাগ করে, কিন্তু সন্তান সাধারণত সবচেয়ে ভালো থাকে যখন বাবা-মা দুজনেই প্রতিদিনের জীবনের অংশ; একজন সব করেন আর আরেকজন শুধু বড় মুহূর্তে আসেন, এমন নয়।
স্নেহশীল, পাশে থাকা বাবার সন্তান প্রায়ই যা পায়:
- নিরাপত্তা: বিপদে ভরসা করার মতো আরেকজন কাছের মানুষ, যিনি রক্ষা করার পাশাপাশি সান্ত্বনাও দেন।
- আত্মবিশ্বাস: বাবার সঙ্গে ছোটাছুটির খেলা, সাইকেল চালানো বা পার্কে ওঠানামা বাচ্চাকে সাহসী আর সক্ষম বোধ করতে সাহায্য করতে পারে।
- মায়ের একটু বিশ্রাম: যত্নের কাজ ভাগ হলে মা কম ক্লান্ত থাকেন, তাতে পুরো পরিবারেরই লাভ।
বয়স অনুযায়ী বাবা ও সন্তানের সম্পর্ক
সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবার কাজ বদলায়, কিন্তু মূল কথা একই থাকে: পাশে থাকা, মন দেওয়া, আর এমন মানুষ হওয়া যার কাছে নির্ভয়ে আসা যায়।
| বয়স | প্রতিদিনের যত্ন | কাছে আসার উপায় |
|---|---|---|
| নবজাতক থেকে ১ বছর | ডায়াপার বদলানো, গোসল করানো, ঢেকুর তোলানো, রাতে ঘুম পাড়ানো, বাচ্চা বোতলে খেলে রাতে খাওয়ানো, মা যেন ঘুমাতে পারেন সেজন্য বাচ্চাকে কোলে রাখা | খালি গায়ে বুকে জড়িয়ে রাখা, কথা বলা আর গান শোনানো, কোলে নিয়ে বাসায় ঘুরে বেড়ানো |
| ১–৫ বছর | খাওয়ানো, গোসল আর ঘুম পাড়ানো, পটি ট্রেনিং, জেদের সময় শান্ত করা, ডাক্তারের কাছে নেওয়া | ধস্তাধস্তির খেলা, ছাদে হাঁটা, বাসায় থাকলে প্রতি রাতে ঘুমের আগের গল্প |
| ৬–১২ বছর | স্কুলে আনা-নেওয়া, হোমওয়ার্ক, টিফিন গোছানো, ঘরের কাজ শেখানো | সাইকেল, ক্রিকেট বা ফুটবল, ক্যারম, একসঙ্গে রান্না, শুধু আপনাদের দুজনের সাপ্তাহিক বেড়ানো |
| ১৩–১৮ বছর | বয়ঃসন্ধি, পড়াশোনা, বন্ধু, ফোন আর টাকা নিয়ে কথা; আনা-নেওয়া করা; দেরিতে ফিরলে জেগে অপেক্ষা করা | রিকশায়, হাঁটতে হাঁটতে বা রাতের নাশতায় পাশাপাশি বসে কথা; গোপনীয়তার সম্মান; ওর জগৎ নিয়ে আগ্রহ দেখানো |
প্রতিটা বয়সের জন্য আরও আইডিয়া পাবেন সন্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার উপায় লেখায়।
সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব মায়ের একার নয়: খাওয়ানো, ঘুম, স্কুল আর কথা
অনেক বাবা এখনই সাহায্য করেন। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা প্রায়ই আসে “সাহায্য করা” থেকে “দায়িত্ব নেওয়া”য়: পুরো একটা কাজ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজের করে নেওয়া, মনে রাখাসহ। একটা দিক পুরোপুরি নিজের করে নিয়ে দেখুন:
- খাওয়ানো: দিনে একবেলার খাওয়ানো পুরোটাই আপনার, খাবার দেওয়া থেকে টেবিল মোছা পর্যন্ত। ছোট বাচ্চা বোতলে খেলে রাতের একবার খাওয়ানো আপনি নিন; নইলে বাচ্চাকে মায়ের কাছে এনে দিন, আর ঢেকুর তোলানো ও ঘুম পাড়ানো আপনি করুন।
- ঘুমের সময়: বাসায় থাকলে প্রতি রাতে হাত-মুখ ধোয়া, দাঁত ব্রাশ, গল্প আর বাতি নেভানো — সবই আপনার। পরিবারে ঘুমের আগে দোয়া পড়ার রীতি থাকলে একসঙ্গে পড়তে পারেন।
- স্কুল: শিক্ষকের নাম জানুন, অভিভাবক সভায় যান, ডায়েরি দেখুন, আর সপ্তাহে অন্তত এক সন্ধ্যা হোমওয়ার্কে সাহায্য করুন।
- স্বাস্থ্য: টিকার কার্ড নিজের কাছে রাখুন, ডাক্তারের কাছে নিজেই নিয়ে যান, আর বাচ্চার ওষুধ ও অ্যালার্জির কথা জানুন।
- কথা বলা: রোজ ১০ মিনিট, মোবাইল ছাড়া; বন্ধু, দুশ্চিন্তা আর কিসে হাসি পেল, এসব জিজ্ঞেস করুন।
- মনে রাখার দায়িত্ব: জন্মদিন, স্কুলের বেতন, ইউনিফর্মের মাপ, পরের টিকা। কেউ মনে করিয়ে দেবে, সেই অপেক্ষা না করে নিজের মোবাইলের ক্যালেন্ডারে তুলে রাখুন।
বাবা যা বলতে পারেন
- আজকের একটা ভালো কথা আর একটা কঠিন কথা বলো তো।
- তুমি আমাকে যেকোনো কথা বলতে পারো, এমনকি যদি মনে হয় আমি রাগ করব। আমি আগে পুরোটা শুনব।
- তখন আমি চিৎকার করেছি, এর জন্য আমি দুঃখিত। চলো, আবার নতুন করে শুরু করি।
- ফল যা-ই হোক, তুমি যে এত চেষ্টা করেছ, তাতে আমি গর্বিত।
- স্ত্রীকে: “আজ রাতে গোসল আর ঘুম পাড়ানো আমি করব। তুমি একটু বিশ্রাম নাও।”
আমাদের পরিবারে: শাসনের দায়িত্ব কি শুধু বাবার?
“আজ তোর বাবা আসুক, তারপর দেখিস” — অনেক বাংলাদেশি বাচ্চা এই কথা শুনে বড় হয়। অনেক বাসায় মা নরম মানুষ, আর শাসনের দায়িত্ব শুধু বাবার; ফলে দরজায় বাবার পায়ের শব্দেই বাচ্চা ভয় পেতে শেখে। এর পেছনে থাকে ভালোবাসা আর দুশ্চিন্তা, কিন্তু প্রায়ই এর একটা দামও দিতে হয়:
- যে মানুষকে ভয় পায়, তার কাছ থেকে বাচ্চা ভুল আর সমস্যা লুকায়; তাই কিছু ভুল হলে বাবাই প্রায়ই সবার শেষে জানেন।
- বাবা সন্তানের আদরের দিকটা হারান, আর সান্ত্বনা দেওয়ার পুরো ভার একা মায়ের ওপর পড়ে।
- ঘণ্টার পর ঘণ্টা জমিয়ে রাখা শাস্তিতে খুব কমই কিছু শেখা হয়; বাচ্চার মনে থাকে ভয়টা, শিক্ষাটা নয়।
- মারধর আর কঠোর শাস্তি সময়ের সঙ্গে আচরণকে সাধারণত আরও খারাপ করে, আর কিশোর বয়স পর্যন্ত সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে।
শাসন ভাগ করে নেওয়ার আরও সদয় উপায়
- মূল নিয়মগুলো বাবা-মা দুজনে মিলে ঠিক করুন, আর বাচ্চাদের জানিয়ে দিন যে নিয়ম দুজনেরই।
- যিনি সামনে থাকবেন, তিনিই তখনই শান্তভাবে ব্যাপারটা সামলাবেন; বাবার জন্য জমিয়ে রাখা নয়।
- সমস্যার সঙ্গে মেলে এমন শান্ত পরিণতি ব্যবহার করুন, যেমন স্ক্রিনের নিয়ম ভাঙলে কিছুক্ষণ স্ক্রিন বন্ধ; কখনো মারধর বা অপমান নয়। দেখুন বাচ্চাকে মারধর ছাড়া শাসন করার উপায়।
- বাবা বাসায় ফিরলে প্রথম কয়েক মিনিট হোক আদর আর কুশল জিজ্ঞাসার, সারাদিনের নালিশের নয়।
- মেজাজ হারালে পরে সম্পর্কটা জোড়া লাগান: দুঃখিত বলুন, আর বুঝিয়ে দিন যে সম্পর্কটা আবার নিরাপদ।
যৌথ পরিবারে কোনো মুরুব্বি হয়তো ঠাট্টা করবেন, “পুরুষমানুষ আবার ডায়াপার বদলায় নাকি?” হাসিমুখে “আমার ভালো লাগে” বলাই সাধারণত যথেষ্ট; সবার সামনে বাবা যত্ন নিচ্ছেন, বাচ্চা এটা খেয়াল করে।
ব্যস্ত বা প্রবাসী বাবা: দূরে থেকেও কাছে থাকা
লম্বা অফিস, সপ্তাহে ছয় দিন কাজ আর ঢাকার যানজটে অনেক বাবার হাতে সপ্তাহের দিনে সময় খুব কম থাকে; আবার অনেক পরিবারের বাবা বছরের পর বছর মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া বা অন্য কোনো দেশে কাজ করেন। “বাবা সন্তানকে সময় দেন না” — এই অভিযোগ অনেক ঘরে শোনা যায়, কিন্তু ব্যস্ততা বা দূরত্ব মানেই দূরের বাবা নয়।
যদি অনেকক্ষণ কাজ করেন
- রোজকার একটা রীতি রাখুন, যা কখনো বাদ যাবে না: একসঙ্গে নাশতা, স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, বা দেরি হলেও ঘুমের আগের গল্প।
- বাসায় ফিরে প্রথম ১০ মিনিট সন্তানকে দিন, মোবাইল আর খবরের আগে।
- শুক্রবারটা কাজে লাগান, আপনার আর সন্তানের নিজস্ব একটা বেড়ানো বা কাজ দিয়ে, যেমন বাজারে যাওয়া, পার্ক, বা একসঙ্গে দুপুরের রান্না। আরও আইডিয়া পাবেন কর্মজীবী বাবা-মায়ের কোয়ালিটি টাইম লেখায়।
যদি প্রবাসে থাকেন
- নির্দিষ্ট সময়ে ফোন করুন, যাতে সন্তান অপেক্ষায় থাকতে পারে। মাঝে মাঝে লম্বা কলের চেয়ে নিয়মিত ছোট কল সাধারণত বেশি কাজে দেয়।
- ভিডিও কলে সাধারণ কাজগুলো করুন: ঘুমের আগের গল্প পড়ে শোনান, হোমওয়ার্ক দেখুন, ওর আঁকা ছবি দেখুন।
- স্কুল, স্বাস্থ্য আর নিয়মের সিদ্ধান্তে যুক্ত থাকুন, আর সন্তানের সামনে মায়ের সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়ান।
- উপহার থাকুক বাড়তি হিসেবে, ভালোবাসা প্রকাশের মূল উপায় হিসেবে নয়; আপনার সময় আর মনোযোগই বেশি জরুরি।
- দেশে ফিরে ধীরে এগোন। ছোট বাচ্চা প্রথম কয়েক দিন লজ্জা পেতে পারে। আগে খেলুন, আর নিয়মকানুন মায়ের গড়ে তোলা রুটিনের ওপরই ছেড়ে দিন।
বাবার কাছে মেয়ে আর ছেলের কী দরকার?
মেয়ে আর ছেলে — দুজনেরই বাবার কাছ থেকে একই রকম স্নেহ, সময় আর সম্মান দরকার। তবে কয়েকটা ব্যাপারে একটু বাড়তি যত্ন দরকার।
বাবা ও মেয়ের সম্পর্ক
- ওর ভাবনা, পড়াশোনা আর স্বপ্নকে গুরুত্ব দিন। ও কী ভাবে জিজ্ঞেস করুন, আর উত্তরটা মন দিয়ে শুনুন।
- ওর মা, আপনার মা আর বাসায় কাজ করেন এমন নারীদের সঙ্গে আপনার ব্যবহার দিয়ে ওকে দেখান, একজন ভালো পুরুষ নারীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন।
- বয়ঃসন্ধিতেও কাছে থাকুন। ওকে ওর মতো করে এগোতে দিন, মায়ের পাশে থাকুন, আর এমন বাবা হোন যিনি লজ্জা না পেয়ে স্যানিটারি প্যাড কিনে আনতে পারেন; তাতে ও শেখে নিজের শরীর নিয়ে লজ্জার কিছু নেই। দেখুন মেয়ের সঙ্গে বয়ঃসন্ধির কথা।
- বড় হতে থাকলে জড়িয়ে ধরার আগে জিজ্ঞেস করুন, আর “না” বললে মেনে নিন। এতে ও শেখে, ওর শরীর ওর নিজের।
বাবা ও ছেলের বন্ধুত্ব
- দেখান যে ছেলেদেরও অনুভূতি আছে। “আমার খুব চিন্তা হচ্ছিল” বা “এতে আমার মন খারাপ হয়েছে” — এমন কথা ছেলেকে শেখায় যে ছেলেরাও কাঁদতে আর মনের কথা বলতে পারে; “ছেলেরা কাঁদে না” কথাটা ভুল শেখায়।
- আপনাকে রান্না করতে, ঘর গোছাতে আর ছোটদের যত্ন নিতে দেখুক, যাতে বড় হয়ে এটাকেই স্বাভাবিক মনে করে।
- বয়ঃসন্ধি, শরীরের পরিবর্তন আর মেয়েদের সম্মান করার কথা আপনিই বলুন, বন্ধু বা ইন্টারনেটের আগে। দেখুন ছেলের সঙ্গে বয়ঃসন্ধির কথা।
- পাশাপাশি কিছু করতে করতে বন্ধুত্ব গড়ুন: ক্রিকেট, কিছু সারাই করা, লম্বা হাঁটা। অনেক ছেলে মুখোমুখি না বসলে বেশি কথা বলে।
বাবার জন্য ৭ দিনের পরিকল্পনা
প্রতি সন্ধ্যায় এক লাইন লিখুন: সন্তানের সঙ্গে কী করলেন, কতক্ষণ, আর সে কেমন সাড়া দিল। সন্তান লালন-পালনে বাবার ভূমিকা এমন ছোট, বারবার আসা মুহূর্তেই গড়ে ওঠে।
- দিন ১: কিছুই বদলাবেন না। আজ সন্তানের সঙ্গে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত আর কী করলেন, লিখে রাখুন।
- দিন ২: শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজের করে নেওয়ার মতো রোজকার একটা কাজ বেছে নিন, যেমন ঘুম পাড়ানো বা স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, আর পরিবারকে জানান।
- দিন ৩: বাসায় ফিরে প্রথম ১০ মিনিট সন্তানকে দিন, মোবাইল দূরে রেখে।
- দিন ৪: এমন একটা প্রশ্ন করুন যার উত্তর হ্যাঁ বা না দিয়ে হয় না: “আজকের সবচেয়ে ভালো অংশ কোনটা ছিল?”
- দিন ৫: আজ কোনো নিয়ম ভাঙলে নিজেই সামলান, শান্তভাবে, তখনই, চিৎকার ছাড়া।
- দিন ৬: শুধু আপনাদের দুজনের জন্য শুক্রবারের একটা কাজের পরিকল্পনা করুন, সন্তানের পছন্দে। প্রবাসে থাকলে গল্পসহ একটু লম্বা ভিডিও কলের পরিকল্পনা করুন।
- দিন ৭: স্ত্রীর সঙ্গে বসে নোটগুলো পড়ুন। সন্তান কোনটা সবচেয়ে উপভোগ করেছে? সেটা ধরে রাখুন, আর পরের সপ্তাহে আরেকটা কাজ যোগ করুন।
বাবা কখন সাহায্য নেবেন?
বাবারা প্রায়ই সবার শেষে সাহায্য চান, অথচ সাহায্য চাওয়াও সন্তান লালন-পালনে বাবার ভূমিকার অংশ। নিচের কোনোটা নিজের সঙ্গে মিলে গেলে ডাক্তার বা কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলুন, আর বিপদ থাকলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিন:
এসব দেখলে সাহায্য নিন
- দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে বেশিরভাগ দিন মন খারাপ, অনুভূতিহীন, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বা খিটখিটে লাগছে, নতুন বাচ্চা আসার পরও। সন্তান জন্মের পর বাবাদেরও কষ্ট হতে পারে।
- প্রায়ই চিৎকার করেন বা মারেন, কিংবা মনে হচ্ছে সন্তানকে আঘাত করে ফেলতে পারেন। এখনই সরে যান: আগে সন্তানকে অন্য কোনো বড় মানুষের কাছে রাখুন, কোলের শিশু হলে চিত করে তার নিজের ছোট খাটে; তারপর শান্ত হতে অন্য ঘরে যান, আর সেদিনই সাহায্য নিন।
- সন্তান আপনাকে ভয় পায় বলে মনে হয়: আপনি বাসায় ফিরলে চুপ হয়ে যায় বা লুকায়, চমকে ওঠে, বা অন্যদের অনুরোধ করে আপনাকে কিছু না বলতে। কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলুন, আর ওপরের সম্পর্ক জোড়া লাগানোর ধাপগুলো শুরু করুন।
- বাসায় কাউকে মারা হচ্ছে বা ভয় দেখানো হচ্ছে। এই মুহূর্তে কারও বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন; চাইলে স্থানীয় থানায়ও জানাতে পারেন।
- মদ, মাদক বা জুয়া, অনলাইন বেটিংসহ, আপনার মেজাজ, টাকা বা পরিবারের সঙ্গে সময়ের ওপর প্রভাব ফেলছে।
- সন্তানের হঠাৎ পরিবর্তন, যেমন হঠাৎ গুটিয়ে যাওয়া বা নির্দিষ্ট কোনো মানুষ বা জায়গাকে হঠাৎ ভয় পাওয়া: সন্তানের কথা বিশ্বাস করুন, সেদিনই ব্যবস্থা নিন, আর এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
বাবা আর সন্তানের সম্পর্ক গড়ে ওঠে ছোট ছোট, নিয়মিত মুহূর্তে। ParentMind আপনাকে প্রতিদিন কী হলো তা নোট করতে, বারবার যা হচ্ছে তা দেখতে আর গাইড পেতে সাহায্য করে: ParentMind কীভাবে কাজ করে।
বাবা-মায়েরা যা জানতে চান
সন্তানের জীবনে বাবার ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কারণ স্নেহশীল, পাশে থাকা বাবা সন্তানের জীবনে অনেক কিছু যোগ করেন: ভরসা করার মতো আরেকজন মানুষ, নতুন কিছু চেষ্টা করার সাহস, আর একজন সম্মানশীল পুরুষ কেমন হন তার উদাহরণ। যত্নের কাজ ভাগ হলে মা-ও কম ক্লান্ত থাকেন। সবচেয়ে জরুরি হলো কাছে থাকা আর সদয় হওয়া, কঠোরতা বা কত ঘণ্টা দিলেন তা নয়।
ব্যস্ত বাবা সন্তানকে সময় দেবেন কীভাবে?
মাঝে মাঝে বড় আয়োজনের চেয়ে নিয়মিত ছোট মুহূর্তে। রোজকার একটা রীতি রাখুন, যেমন একসঙ্গে নাশতা বা ঘুমের আগের গল্প; বাসায় ফিরে প্রথম ১০ মিনিট মোবাইল দূরে রেখে সন্তানকে দিন; আর শুক্রবারের একটা কাজ নিজের করে নিন। কত ঘণ্টা দিলেন, তার চেয়ে মন দিয়ে শোনা হয়েছিল কি না, সেটাই সন্তানের মনে বেশি থাকে।
মেয়ের জীবনে বাবার ভূমিকা কী?
ছেলের ক্ষেত্রে যেমন, মোটামুটি তেমনই: স্নেহ, সময়, সম্মান আর পথ দেখানো। যে বাবা মেয়ের ভাবনাকে গুরুত্ব দেন, নারীদের সম্মান করেন আর বয়ঃসন্ধিতেও কাছে থাকেন, তিনি মেয়েকে আত্মবিশ্বাসী হতে আর সম্মান কেমন হয় তা চিনতে সাহায্য করতে পারেন। বড় হতে থাকলে জড়িয়ে ধরার আগে জিজ্ঞেস করলে মেয়ে শেখে, তার শরীর তার নিজের।
বাবা নবজাতকের সঙ্গে কীভাবে বন্ধন গড়বেন?
শুরু থেকেই হাতে-কলমে যত্ন নিয়ে: খালি গায়ে বুকে জড়িয়ে রাখা, ডায়াপার বদলানো, গোসল করানো, ঢেকুর তোলানো আর রাতে ঘুম পাড়ানো। বাচ্চার সঙ্গে কথা বলুন, গান শোনান; সে শিগগিরই আপনার গলা চিনে ফেলে। মা যেন একটু ঘুমাতে পারেন, সেজন্য বাচ্চাকে কোলে রাখাও বন্ধন গড়ার সময়। ঘুম পেলে বাচ্চাকে চিত করে শুইয়ে দিন তার নিজের আলাদা শক্ত ও সমান জায়গায়, যেখানে নরম বা ঢিলেঢালা কিছু নেই; সোফা বা চেয়ারে শিশুকে নিয়ে কখনো ঘুমিয়ে পড়বেন না।
বাচ্চাকে কি শুধু বাবাই শাসন করবেন?
না। শাসনের দায়িত্ব শুধু বাবার হলে সন্তান প্রায়ই তাঁকে ভয় পায়, আর নিজের সমস্যা তাঁর কাছ থেকে লুকায়। সাধারণত ভালো কাজ করে যখন বাবা-মা দুজনে মিলে কয়েকটা নিয়ম ঠিক করেন, যিনি সামনে থাকেন তিনিই তখনই শান্তভাবে ব্যাপারটা সামলান, আর কেউ মারধর বা অপমান করেন না। তখন বাবা হন এমন মানুষ, যাঁর দিকে সন্তান ছুটে আসে, যাঁর কাছ থেকে পালায় না।
বাবা বিদেশে থাকলে কি সন্তানের ওপর খারাপ প্রভাব পড়ে?
কঠিন হতে পারে, তবে বন্ধন নষ্ট হবেই এমন নয়। নিয়মিত ফোন, পরিবারের সাহায্য পাওয়া মা, আর রোজকার খবর ও সিদ্ধান্তে বাবার যুক্ত থাকা — এসব থাকলে সন্তান প্রায়ই ভালোভাবে মানিয়ে নেয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা পরিবর্তন খেয়াল করুন, যেমন খুব মন খারাপ, স্কুলে যেতে না চাওয়া বা আচরণে বড় বদল; এমন দেখলে স্কুল বা ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
স্বামী সন্তানকে সময় দেন না, কী করব?
সমালোচনা না করে আমন্ত্রণ জানান। পুরো একটা কাজ তাঁর হাতে দিন, যেমন গোসল আর ঘুম পাড়ানো, আর তিনি নিজের মতো করে করার সময় সরে থাকুন। যা করেন তার জন্য ধন্যবাদ দিন, আর সপ্তাহের পরিকল্পনা দুজনে মিলে করুন। নিয়ম নিয়ে বারবার মতের অমিল হলে, বা কে কী করবে তা নিয়ে ঝগড়া হলে, দুজনে বসে একটা পরিকল্পনা ঠিক করুন।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।




