১৬–১৮ বছরের সন্তানের আচরণ ও স্বাধীনতা: ভরসা, পরীক্ষা আর কোনটা স্বাভাবিক
ছোট করে উত্তর
১৬–১৮ বছরের সন্তানের আচরণ ও স্বাধীনতা নিয়ে মূল কথা: এই বয়সে বেশির ভাগই আরও স্বাধীনতা, নিজস্ব জায়গা আর সিদ্ধান্তে মত দেওয়ার সুযোগ চায়, আর তর্ক ও মেজাজের ওঠানামা সাধারণ। ভরসা যত বাড়ে, ধাপে ধাপে তত নিয়ন্ত্রণ ছাড়ুন, ৮–১০ ঘণ্টার ঘুম রক্ষা করুন, আর রাস্তা, টাকা ও ফোন নিয়ে নিরাপত্তার নিয়ম মিলে ঠিক করুন। নিজের ক্ষতির কথা, মাদক বা সহিংসতায় সেদিনই সাহায্য নিন।
লেখাটি শুনুন
১৮ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া
এক নজরে
- কাদের জন্য
- ১৬, ১৭ ও ১৮ বছরের সন্তানের বাবা-মা, এসএসসির বছর থেকে এইচএসসির পরের প্রথম বছর পর্যন্ত
- মূল কথা
- নিজস্ব জায়গা চাওয়া, মুখে মুখে তর্ক আর বন্ধুদের সঙ্গে বেশি সময় কাটানো ১৬–১৮ বছরে বড় হওয়ার স্বাভাবিক অংশ।
- স্বাধীনতা দিন ধাপে ধাপে; প্রতিটা ধাপ দুজনে মিলে ঠিক করুন, পরে মিলিয়ে দেখুন: একটু দেরিতে ফেরা, নিজের হাতে বেশি টাকা, পরিকল্পনায় বেশি মত।
- এসএসসি-এইচএসসির বছরেও বেশির ভাগের ৮–১০ ঘণ্টা ঘুম দরকার; রাতে ফোন চার্জ হবে শোয়ার ঘরের বাইরে।
- নিজের ক্ষতির কথা, মাদক, সহিংসতা বা ব্ল্যাকমেইলে সেদিনই সাহায্য নিন; দুই সপ্তাহ বা তার বেশি মন খারাপ থাকলে শিগগির ডাক্তার দেখান; কেউ এই মুহূর্তে বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
১৬–১৮ বছরের সন্তানের আচরণ ও স্বাধীনতা নিয়ে ভাবতে গেলে মনে হয়, ঘরে প্রায়-বড় একজন মানুষ থাকে, যার আপনাকে এখনো দরকার, তবে নিজের শর্তে। এক সন্ধ্যায় সে সব সিদ্ধান্ত নিজে নিতে চায়; পরদিন সকালেই আপনাকে লাগে কোনো ফরম, ফি বা মন ভাঙার কষ্ট সামলাতে।
এই বয়সে বাবা-মাকে যা ভাবায়, তার বেশির ভাগই বড় হওয়ার স্বাভাবিক অংশ: বন্ধ দরজা, বন্ধুদের সঙ্গে সন্ধ্যা পেরিয়ে আড্ডা, জোরালো মতামত, আর কখনো আত্মবিশ্বাস, কখনো দ্বিধা। আমাদের দেশে এই বছরগুলোর ভারও অনেক: ১৬-র আশপাশে এসএসসি, ১৮-র আশপাশে এইচএসসি, তারপর ভর্তি পরীক্ষা, আর পড়াশোনা ও কাজ নিয়ে প্রথম বড় সিদ্ধান্ত।
নিচে পাবেন: কোনটা স্বাভাবিক, স্বাধীনতা আর ভরসা, পরীক্ষা, সম্পর্ক, নিরাপত্তা, ঘুম, ৭ দিনের পরিকল্পনা আর কখন সাহায্য নেবেন। ঠিক আগের বছরগুলোর জন্য পড়ুন ১৩–১৫ বছরের সন্তান; পুরো কৈশোর নিয়ে পড়ুন টিনএজ সন্তানের সঙ্গে কীভাবে চলবেন।
১৬–১৮ বছরের সন্তানের আচরণ ও স্বাধীনতা: কোনটা স্বাভাবিক?
১৬ বছরের মধ্যে বেশির ভাগ কিশোর-কিশোরীর শরীরের বেড়ে ওঠা প্রায় শেষ হয়ে আসে, কিন্তু মস্তিষ্ক পরিণত হতে থাকে বিশের কোঠা পর্যন্ত, বিশেষ করে সেই অংশগুলো, যা আগে থেকে পরিকল্পনা করে, ঝুঁকি মাপে আর তীব্র আবেগ সামলায়। এ কারণেই ১৭ বছরের বুদ্ধিমান সন্তান খাবার টেবিলে উকিলের মতো যুক্তি দিতে পারে, আবার বন্ধুরা দেখছে বলে বোকার মতো ঝুঁকিও নিতে পারে।
| দিক | ১৬–১৮ বছরে যা সাধারণ | আপনি যা করতে পারেন |
|---|---|---|
| স্বাধীনতা | নিজের পরিকল্পনা নিজে করতে, একা যাতায়াত করতে, টাকা সামলাতে আর বন্ধু বাছতে চায় | একবারে একটা দিক ছাড়ুন, নিয়মটা মিলে ঠিক করুন, তারপর একটু সরে দাঁড়ান |
| ভাবনা | যুক্তি দেয়, তর্ক করে, সামনের পরিকল্পনা করে; তবে দলের মধ্যে বা উত্তেজনায় ঝুঁকি নিতে পারে | পরিস্থিতি আসার আগেই আলাপ করুন: “যদি এমন হয়, তুমি কী করবে?” |
| অনুভূতি | মেজাজ কখনো আত্মবিশ্বাসী, কখনো দুশ্চিন্তায়; ন্যায্য-অন্যায্য নিয়ে খুব সচেতন | উপদেশের আগে শুনুন; মন খারাপ অনেক দিন থাকলে খেয়াল করুন |
| বন্ধু ও সম্পর্ক | প্রায়ই বন্ধুরাই আগে; কাউকে ভালো লাগা বা প্রথম সম্পর্ক খুব সাধারণ | বন্ধুদের চিনুন; লজ্জা না দিয়ে সম্মান আর সম্মতি নিয়ে কথা বলুন |
| পরিবার | পরিবারের সঙ্গে সময় কম, নিজের জায়গা বেশি; তবে প্রায়ই নিজের মতো করে কাছে থাকতে চায় | রোজ একসাথে একটা মুহূর্ত রাখুন: খাবার, চা, হাঁটা বা কোথাও একসাথে যাওয়া |
| ঘুম | শরীরের ঘড়ি পিছিয়ে যায়; অনেকেরই ঘুম কম হয় | ৮–১০ ঘণ্টার ঘুম রক্ষা করুন; রাতে ফোন চার্জ হবে শোয়ার ঘরের বাইরে |
| ভবিষ্যৎ | ফলাফল, ভর্তি পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় আর কাজ নিয়ে দুশ্চিন্তা | একসাথে পরিকল্পনা করুন, চেষ্টার প্রশংসা করুন, একাধিক পথ খোলা রাখুন |
যে ১৬ বছরের ছেলে বা মেয়ে মুখে মুখে তর্ক করে, কিন্তু ঠিকমতো ঘুমায়, খায়, পড়ে আর বন্ধুদের সঙ্গে মেশে, সে সাধারণত ভালোই আছে; স্বাভাবিক জেদ কোথায় শেষ আর সতর্ক হওয়ার লক্ষণ কোথায় শুরু, বুঝিয়ে বলেছে টিনএজ সন্তানের অবাধ্যতা লেখাটি।
১৬ বা ১৭ বছরের সন্তানকে কতটা স্বাধীনতা দেবেন?
বড় হয়ে যাওয়া সন্তানকে স্বাধীনতা দেওয়া ভালো সিঁড়ির মতো, ধাপে ধাপে; সুইচ টিপে একবারে নয়। প্রতিটা ধাপ মিলে ঠিক করা হয়, চেষ্টা করে দেখা হয়, তারপর রাখা বা বদলানো হয়; এতে দুই দিকেই ভরসা বাড়ে, আর ১৮-তে পৌঁছে হঠাৎ লাফ দিতে হয় না।
- এই মাসে একটা দিক বেছে নিন, যেটা সন্তানের হাতে ছাড়বেন: একা কোচিংয়ে যাওয়া, হাতখরচ সামলানো, বা নিজের পড়ার সপ্তাহ নিজে সাজানো।
- নিয়মটা দুজনে মিলে ঠিক করুন: কোথায়, কার সঙ্গে, কত রাত পর্যন্ত, আর কীভাবে যাতায়াত করবে।
- নিরাপত্তার কয়েকটা মূল নিয়ম রাখুন, যা বদলাবে না: কোথায় আছে জানাবে, মেসেজের উত্তর দেবে, আর গোলমাল হলে ফোন করবে।
- তারপর একটু সরে দাঁড়ান। ঘণ্টায় ঘণ্টায় খোঁজ নিলে সন্তান বোঝে আপনি ভরসা করছেন না; ভরসা পেলেই ভরসার যোগ্য হওয়া সহজ হয়।
- এক-দুই সপ্তাহ পরে মিলিয়ে দেখুন। ভালো গেলে আরেকটু বাড়ান; নিয়ম ভাঙলে শান্তভাবে কিছুদিনের জন্য এক ধাপ পিছিয়ে যান।
- একটা কথা দিন: “বিপদে পড়লে ফোন করো, আজ রাতে কোনো প্রশ্ন করব না।” অনিরাপদ কোথাও আটকে গেলে আপনি গিয়ে নিয়ে আসবেন, কথা হবে পরদিন।
আরও স্বাধীনতা চাইলে যা বলতে পারেন
- আমি হ্যাঁ-ই বলতে চাই। চলো এমন একটা পরিকল্পনা করি, যাতে আমিও নিশ্চিন্ত থাকি।
- তোমার কী মনে হয়, কয়টার মধ্যে ফেরা ঠিক হবে?
- পৌঁছে একটা মেসেজ দিয়ো, বের হওয়ার সময়ও।
- তোমাকে আমি ভরসা করি। চিন্তা হয় রাস্তা আর অন্য মানুষদের নিয়ে।
- আমরা তো এভাবে ঠিক করিনি। দুই সপ্তাহ এক ধাপ পিছিয়ে থাকি, তারপর আবার চেষ্টা করব।
- কখনো আটকে গেলে আমাকে ফোন করো। আমি চলে আসব, কথা হবে কাল।
নিজস্ব জায়গা আর ফোন: যা আপনার এখনো জানা দরকার
নিজস্ব জায়গা বড় হওয়ারই অংশ, আর লুকিয়ে নজরদারি করলে যা জানা যায়, সাধারণত তার চেয়ে বেশি ভরসা হারায়। কী কী জানবেন, খোলাখুলি ঠিক করে নিন:
- কোথায় আছে, কার সঙ্গে, কীভাবে যাতায়াত করছে আর কখন ফিরবে।
- সন্তানের ঘরে, বা ভাগাভাগির ঘরে তার কোণটুকুতে ঢোকার আগে নক করুন।
- নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা হলে সেটা মুখে বলুন, আর লুকিয়ে মেসেজ না পড়ে একসাথে ফোনটা দেখতে চান।
- কথা দিন, অনলাইনে খারাপ কিছু ঘটলে, যেমন হুমকি, প্রতারণা বা ছবি চাওয়ার চাপ, আপনাকে জানালে কখনো ফোন কেড়ে নেবেন না।
এসএসসি, এইচএসসি, ভর্তি পরীক্ষা আর ক্যারিয়ারের দুশ্চিন্তা: কীভাবে পাশে থাকবেন
আমাদের দেশে ১৬–১৮ বছরের অনেকের জন্য এগুলোই বোর্ড পরীক্ষার বছর, প্রায়ই একই দিনে স্কুল, কোচিং আর টিউটর। ফলাফল, ভর্তি পরীক্ষা আর চাকরি নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেক খিটখিটে মেজাজের পেছনে লুকিয়ে থাকে।
- সপ্তাহটা একসাথে সাজান: ঘুম, খাবার, এক ঘণ্টা খেলাধুলা আর একটু অবসর, শুধু পড়ার ঘণ্টা নয়।
- জিপিএ ৫-এর চেয়ে চেষ্টা আর নিয়মিত পড়ার প্রশংসা বেশি করুন, আর কখনো চাচাতো-খালাতো ভাইবোন বা প্রতিবেশীর সন্তানের সঙ্গে তুলনা করবেন না।
- একাধিক পথ নিয়ে কথা বলুন: সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ডিপ্লোমা, কারিগরি কাজ, অথবা এক বছর কাজ করা বা আবার প্রস্তুতি নেওয়া। বিকল্প পথ আছে জানলে প্রায়ই আতঙ্ক কমে।
- বিষয় আর ক্যারিয়ার বাছাইয়ে সন্তানকে এগিয়ে থাকতে দিন; যে সিদ্ধান্ত নিজের, তার জন্য সন্তান প্রায়ই বেশি খাটে।
- ফলাফলের দিনের আগেই ঠিক করে রাখুন, ফল আশানুরূপ না হলে কী করবেন, যাতে একটা পরীক্ষাকে কখনো জীবনের শেষ মনে না হয়।
টেস্ট পরীক্ষা থেকে ফলাফলের দিন পর্যন্ত বোর্ড পরীক্ষার বছর নিয়ে বিস্তারিত পাবেন এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার্থী সন্তানের পাশে থাকা লেখায়।
১৬–১৮ বছরে প্রেম ও সম্পর্ক: লজ্জা না দিয়ে কীভাবে সামলাবেন
কাউকে ভালো লাগা বা প্রথম সম্পর্ক বড় হওয়ার স্বাভাবিক অংশ, সব সংস্কৃতিতে, সব ধরনের পরিবারে, এমনকি যে পরিবার প্রেমের সম্পর্ক মেনে নেয় না, সেখানেও। আপনার প্রতিক্রিয়াই অনেক সময় ঠিক করে দেয়, সন্তান আপনার সঙ্গে কথা বলা চালিয়ে যাবে কি না; আর যে সন্তান আপনার সঙ্গে কথা বলে, সে বেশি নিরাপদ।
- জানতে পারলে শান্ত থাকুন। কথা বলুন পরে, একান্তে, যখন দুজনেই শান্ত; আত্মীয়স্বজন বা ভাইবোনের সামনে কখনো নয়।
- পরিবারের মূল্যবোধ পরিষ্কার করে বলুন, সন্তানের কথাও শুনুন, আর সম্মান ও সম্মতি নিয়ে কথা বলুন: কেউ তাকে চাপ দেবে না, সে-ও কাউকে চাপ দেবে না।
- ছবি নিয়ে কথা বলুন: যা পাঠানো হয়, তা অন্যের কাছে চলে যেতে পারে; আর যে ছবি চেয়ে চাপ দেয় বা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়, অন্যায়টা তার।
- লজ্জা দেওয়া, মারধর, ফোন কেড়ে নেওয়া বা ঘরে আটকে রাখলে সম্পর্কটা সাধারণত লুকিয়ে চলে যায়, যেখানে ঝুঁকি আরও বেশি।
- তাড়াহুড়া করে বিয়ে দেওয়া কখনোই সমাধান নয়: বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ আইনত অপরাধ, আর এতে সন্তানের স্বাস্থ্য আর ভবিষ্যতের ক্ষতি হয়।
টাকা-পয়সা, রাস্তা আর ঝুঁকির পরিস্থিতি: বড় সন্তানের নিরাপত্তার নিয়ম
টাকা-পয়সা
টাকা সামলাতে সামলাতেই বড় সন্তান টাকার হিসাব শেখে। চাইলেই টাকা দেওয়ার বদলে যাতায়াত, নাশতা আর মোবাইল ডেটার জন্য নির্দিষ্ট হাতখরচ দিন, আর সামলানোর দায়িত্ব দিন তাকেই।
- ছোটখাটো ভুল হতে দিন: ১৭ বছরে মাস শেষের আগে টাকা ফুরিয়ে যাওয়া সস্তা একটা শিক্ষা।
- প্রতারণা নিয়ে কথা বলুন: পিন বা ওটিপি কাউকে কখনো দেবে না, আর “সহজে টাকা” কামানোর প্রস্তাব বা বেটিং অ্যাপ থেকে সাবধান থাকবে।
- টাকা হারিয়ে যাওয়া, হঠাৎ ধারদেনা বা লুকিয়ে টাকা পাঠানো জুয়া, মাদক বা ব্ল্যাকমেইলের লক্ষণ হতে পারে: শান্তভাবে জিজ্ঞেস করুন, আর সেদিনই সাহায্য নিন।
রাস্তায়
তরুণদের জন্য সড়ক দুর্ঘটনা সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটা। নিয়ম কম রাখুন, কিন্তু শক্ত, আর প্রথমবার বাইকে ওঠার আগেই ঠিক করে নিন:
- মোটরসাইকেলে প্রতিবার, চালক হোক বা পেছনের যাত্রী, ঠিকমতো আটকানো হেলমেট, অল্প পথ হলেও।
- চালক মদ খেয়ে থাকলে, মাদক নিয়ে থাকলে, খুব ক্লান্ত থাকলে, বা রেস দিলে কিংবা বাহাদুরি দেখালে, সেই গাড়ি বা বাইকে কখনো উঠবে না।
- লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি বা বাইক চালাবে না, আর চালানোর সময় হাতে ফোন নয়।
- কোনো যাত্রা অনিরাপদ মনে হলে আপনাকে ফোন করবে, বা সিএনজি কিংবা রিকশায় বাসায় চলে আসবে; ভাড়া আপনি দেবেন।
- দুর্ঘটনা বা মাথায় আঘাতের পর ঘুম ঘুম ভাব, বমি বা অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
ধূমপান, ভেপ, মদ আর মাদক
এসব নিয়ে কথা বলুন কেউ সাধার আগেই। আপনার অবস্থান আর তার কারণ পরিষ্কার বলুন, বন্ধুদের মধ্যে সে কী দেখেছে জিজ্ঞেস করুন, আর মনে করিয়ে দিন, বিপদে পড়লে সবসময় আপনাকে ফোন করতে পারে। সন্তানের বন্ধুদের নিয়ে চিন্তা হলে পড়ুন সন্তান খারাপ সঙ্গে মিশলে কী করবেন।
১৬–১৮ বছরের সন্তানের ঘুম, খাবার, স্ক্রিন আর খেলাধুলা
১৬–১৮ বছরের বেশির ভাগ সন্তানের রাতে ৮–১০ ঘণ্টা ঘুম দরকার, কিন্তু কৈশোরে শরীরের ঘড়ি পিছিয়ে যায়, আর কোচিং, রাত জেগে পড়া আর ফোন প্রায়ই ঘুমকে এর চেয়ে অনেক কমিয়ে দেয়। বাড়তি এক ঘণ্টা পড়ার চেয়ে ঘুম রক্ষা করা প্রায়ই ফলাফল আর মেজাজের জন্য বেশি কাজে দেয়।
- ঘুম: ঘুম থেকে ওঠার নির্দিষ্ট সময়, ছুটির দিনেও কাছাকাছি; ফোন চার্জ হবে শোয়ার ঘরের বাইরে, আর ঘুমের আগের এক ঘণ্টা কোনো স্ক্রিন নয়। পরীক্ষার আগে সারা রাত জেগে পড়ায় সাধারণত লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি।
- খাবার: নিয়মিত খাবার, স্কুল বা কোচিংয়ের আগে নাশতা, আর সারা দিন পানি। খাবার বাদ দেওয়া, কড়া ডায়েট বা ওজনে বড় পরিবর্তন দেখলে নরমভাবে কথা বলুন।
- খেলাধুলা: ১৭ বছর পর্যন্ত দিনে অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে জোরালো শরীরচর্চা, যেমন ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, সাইকেল চালানো, জোরে হাঁটা বা নাচ। ১৮ বছরে সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক, আর বড়দের জন্যও রোজ শরীরচর্চা মেজাজ, ঘুম আর মনোযোগের জন্য উপকারী।
- স্ক্রিন: নির্দিষ্ট কোনো ঘণ্টা নেই, তবে সীমা এমন হবে যাতে ঘুম, পড়া, খেলাধুলা আর পরিবারের সময় ঠিক থাকে। ফোন যদি সব দখল করে নেয়, শান্ত পরিকল্পনা পাবেন টিনএজারের মোবাইল আসক্তি লেখায়।
আমাদের পরিবারে: আদব, আত্মীয়স্বজন আর ঘরে প্রায়-বড় একজন
আমাদের অনেক ছেলেমেয়ে ১৮ পেরিয়েও বাবা-মায়ের সঙ্গেই থাকে, প্রায়ই একই বাসায় দাদা-দাদি, চাচাতো ভাইবোন বা গৃহকর্মীও থাকেন। এই ঘনিষ্ঠতা একটা শক্তি, আবার এর সঙ্গে আসে নিজস্ব কিছু প্রশ্ন:
- আদব আর মত দেওয়ার সুযোগ: ১৭ বছরের সন্তানকে আদব রেখে দ্বিমত করতে দিলে, আর মাঝে মাঝে তর্কে জিততে দিলে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চর্চা করে। আদব রাখা আর মত দেওয়া পরস্পরের বিরোধী নয়।
- ছেলে আর মেয়ে: অনেক পরিবারে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে অনেক কম স্বাধীনতা পায়। শুধু ছেলে না মেয়ে, তার ওপর নিয়ম আলাদা হলে তা অন্যায্য লাগতে পারে, আর সন্তান লুকোতে শেখে। প্রতিটা স্বাধীনতা ঠিক করুন নিরাপত্তা আর ভরসার ভিত্তিতে, আর ছেলের কাছ থেকেও একই দায়িত্ব আশা করুন।
- জিপিএ, মেডিকেল না ইঞ্জিনিয়ারিং, বা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আত্মীয়দের প্রশ্ন: বাবা-মা মিলে ঠিক করুন কী বলবেন, আর সন্তানের ব্যক্তিগত কথা ব্যক্তিগতই রাখুন।
- ভাগাভাগির ঘর: অনেকেই ভাইবোন বা দাদা-দাদির সঙ্গে এক ঘরে থাকে। নিজের একটা তাক, ড্রয়ার বা কোণ, আর ঢোকার আগে নক করা কিছুটা নিজস্ব জায়গা দেয়।
- বড়দের জীবনের চর্চা: হল, মেস বা অন্য শহরে যাওয়ার আগে, বাসায় থাকতেই সহজ রান্না, টাকা সামলানো, একা যাতায়াত আর নিজে ডাক্তারের সিরিয়াল নেওয়ার সুযোগ দিন।
বড় হয়ে যাওয়া সন্তানের সঙ্গে নতুন করে শুরু: ৭ দিনের পরিকল্পনা
কাজ করার জন্য একটা দিক বেছে নিন, যেমন বাসায় ফেরার সময়, ঘুম বা ফোন, আর রোজ লিখে রাখুন কী হলো আর কথাবার্তা কেমন গেল।
- দিন ১: খেয়াল করুন। কিছু বদলাবেন না; ঘুম, কোথায় ঝামেলা বাধল আর একটা ভালো মুহূর্ত লিখে রাখুন।
- দিন ২: ১৫ মিনিট এমন কিছু করুন, যা সন্তান বেছে নেয়; কোনো উপদেশ নয়, পড়াশোনা নিয়ে প্রশ্নও নয়।
- দিন ৩: যে দিকটা বেছেছেন, তা নিয়ে সন্তানের মত জানতে চান: “তোমার কাছে কোনটা ন্যায্য মনে হয়?”
- দিন ৪: নিরাপত্তার মূল নিয়ম আর আবার মিলিয়ে দেখার তারিখসহ একসাথে একটা নিয়ম ঠিক করুন।
- দিন ৫: ছোট একটা স্বাধীনতা বা দায়িত্ব সন্তানের হাতে দিন, আর একটু সরে দাঁড়ান।
- দিন ৬: সন্তান ভালো কী করল খেয়াল করুন, আর নির্দিষ্ট করে বলুন।
- দিন ৭: একসাথে পেছন ফিরে দেখুন। কী কাজ করল? কী বদলানো দরকার? নিয়মটা রাখুন, নয়তো বদলে নিন।
১৬, ১৭ বা ১৮ বছরের সন্তানের জন্য কখন সাহায্য নেবেন
বেশির ভাগ মেজাজ, তর্ক আর দেরিতে ফেরা বড় হওয়ারই অংশ। এই লক্ষণগুলো দেখলে সাহায্য নিন:
কখন সাহায্য নেবেন
- সন্তান নিজের ক্ষতি করে, তা নিয়ে কথা বলে, বা বলে বেঁচে থাকতে চায় না: শান্ত থাকুন, পাশে থাকুন। এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন; নইলে সেদিনই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
- দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে বেশির ভাগ দিন মন খারাপ, হতাশা বা খুব খিটখিটে মেজাজ, সবার থেকে সরে থাকা, বা খাওয়া, ওজন বা ঘুমে বড় পরিবর্তন: শিগগির ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
- মাদক, মদ বা জুয়ার যেকোনো লক্ষণ, যেমন ট্যাবলেট, গুঁড়া, ব্যাখ্যা করা যায় না এমন গন্ধ, বেটিং অ্যাপ, বা টাকা ও জিনিসপত্র হারিয়ে যাওয়া: সেদিনই সাহায্য নিন।
- অনলাইনে বা সামনাসামনি কেউ সন্তানকে হুমকি, ব্ল্যাকমেইল বা চাপ দিচ্ছে, বা নির্যাতন বা বুলিংয়ের লক্ষণ দেখছেন: সন্তানকে বিশ্বাস করুন, সেদিনই ব্যবস্থা নিন। অনলাইনে ব্ল্যাকমেইল হলে টাকা বা কিছুই পাঠাবেন না, কোনো ব্যক্তিগত ছবি কপি বা ফরোয়ার্ড করবেন না, আর অ্যাকাউন্টটা ব্লক করে রিপোর্ট করুন। নির্যাতন বা ব্ল্যাকমেইলের কথা স্থানীয় থানায় জানান, আর এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
- মারামারি, অস্ত্র, বাসা থেকে পালিয়ে যাওয়া, বা কোনো খবর না দিয়ে সারা রাত বাইরে থাকা: কেউ এই মুহূর্তে বিপদে থাকলে বা সন্তানকে খুঁজে না পেলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
- আপনি আর সামলাতে পারছেন না মনে হয়, বা বাসার তর্ক হাতাহাতিতে গড়ায়: একটু সরে যান, সবাইকে নিরাপদ রাখুন, আর নিজের জন্যও সাহায্য নিন। কেউ তাৎক্ষণিক বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
বড় হয়ে যাওয়া সন্তান খুব দ্রুত বদলায়, আর একটা বড় ঝগড়ার চেয়ে এক সপ্তাহের নোট প্রায়ই বেশি কিছু দেখায়: ঘুম, মেজাজ, কোথায় ঝামেলা বাধে আর ভালো দিনগুলো। ParentMind আপনাকে প্রতিদিন কী হলো তা নোট করতে, বারবার যা হচ্ছে তা দেখতে আর গাইড পেতে সাহায্য করে। ParentMind কীভাবে কাজ করে দেখে নিন।
বাবা-মায়েরা যা জানতে চান
১৭ বছরের সন্তান সারাক্ষণ একা থাকতে চায়, এটা কি স্বাভাবিক?
প্রায়ই, হ্যাঁ। নিজের মতো একা থাকতে চাওয়া, বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে চাওয়া বড় হওয়ার স্বাভাবিক অংশ। পুরো ছবিটা দেখুন: ঠিকমতো ঘুমাচ্ছে, খাচ্ছে, পড়ছে আর বন্ধুদের সঙ্গে মিশছে কি না। যদি সবার থেকে সরে যায়, আগে যা ভালো লাগত তাতে আর আগ্রহ না থাকে, আর দুই সপ্তাহ বা তার বেশি বেশির ভাগ দিন মন খারাপ থাকে, ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
১৬ বছরের সন্তান রাতে কয়টার মধ্যে বাসায় ফিরবে?
নির্দিষ্ট কোনো সঠিক সময় নেই; নির্ভর করে কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে, কীভাবে যাতায়াত করছে আর পথটা কতটা নিরাপদ, তার ওপর। সময়টা একসাথে ঠিক করুন, স্কুল আর কোচিংয়ের আগের রাতে একটু আগে, আর রওনা দেওয়ার সময় মেসেজ দিতে বলুন। সময় মেনে চললে ধীরে ধীরে বাড়ান, আর “বিপদে ফোন করো, আজ রাতে প্রশ্ন নয়” কথাটা রাখুন।
১৮ বছরের সন্তানকে কি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে দেব?
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, হ্যাঁ; আপনি থাকবেন পরামর্শদাতা হিসেবে। তরুণরা নিজে যে সিদ্ধান্ত নেয়, সেখান থেকেই সবচেয়ে বেশি শেখে। আপনার মত জানান, প্রশ্ন করুন, ঝুঁকি আর খরচ ভেবে দেখতে সাহায্য করুন, আর যেখানে একমত হতে পারবেন না, যেমন নিরাপত্তা, সেটা পরিষ্কার বলুন। তারপর সিদ্ধান্ত নিতে দিন, আর ভুল হলে পাশে থাকুন।
১৭ বছরের সন্তানের কত ঘণ্টা ঘুম দরকার?
১৩–১৮ বছরের বেশির ভাগ কিশোর-কিশোরীর রাতে ৮–১০ ঘণ্টা ঘুম দরকার। কোচিং, রাত জেগে পড়া আর ফোনের কারণে অনেকে এর চেয়ে অনেক কম ঘুমায়, আর কৈশোরে শরীরের ঘড়িও পিছিয়ে যায়। ঘুম থেকে ওঠার নির্দিষ্ট সময়, শোয়ার ঘরের বাইরে ফোন চার্জ, আর ঘুমের আগের এক ঘণ্টা স্ক্রিন বন্ধ রাখা সবচেয়ে কাজে দেয়। ঘুম কম হলে প্রায়ই খিটখিটে মেজাজ, মনোযোগের অভাব আর মন খারাপ দেখা দেয়।
১৬ বছরের সন্তান প্রেম করছে, এখন কী করব?
শান্ত থাকুন, আর পরে একান্তে কথা বলুন, যখন দুজনেই শান্ত। লজ্জা দেওয়া, মারধর বা ফোন কেড়ে নিলে বিষয়টা সাধারণত লুকিয়ে চলে যায়। পরিবারের মূল্যবোধের কথা বলুন, সম্মান, সম্মতি আর ছবি নিয়ে আলাপ করুন, আর সন্তানের কথাও শুনুন। চাপ, হুমকি বা ব্ল্যাকমেইলের কোনো লক্ষণ থাকলে সন্তানকে বিশ্বাস করুন, সেদিনই ব্যবস্থা নিন, আর স্থানীয় থানায় জানান; এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
১৭ বছরের সন্তানের মোটরসাইকেল চালানো কি নিরাপদ?
মোটরসাইকেলে যেকোনো বয়সেই ঝুঁকি আছে, আর নতুন, কম বয়সী চালকের ঝুঁকি আরও বেশি; তাই লাইসেন্স পাওয়ার পরেই কেবল চালাবে। চালক হোক বা পেছনের যাত্রী, নিয়ম শক্ত রাখুন: প্রতিবার আটকানো হেলমেট, ফোন নয়, রেস নয়, আর মদ বা মাদক নেওয়া বা খুব ক্লান্ত চালকের সঙ্গে কখনো নয়। ঠিক করে রাখুন, দরকার হলে সবসময় আপনাকে ফোন করে নিয়ে যেতে বলতে পারবে।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।



