মূল কনটেন্টে যান

১৩–১৫ বছরের কিশোর-কিশোরীর আচরণ ও পরিবর্তন: ঘুম, পড়া, বন্ধু আর কোনটা স্বাভাবিক

ছোট করে উত্তর

১৩–১৫ বছরের কিশোর-কিশোরীর আচরণ ও পরিবর্তন: এই বয়স কৈশোরের শুরু; বেশির ভাগই বয়ঃসন্ধির মাঝপথে, বন্ধু আর গোপনীয়তা নিয়ে খুব ভাবে, তর্ক বেশি করে, মেজাজও তীব্র। শরীরের ঘড়ি পিছিয়ে যায় বলে অনেকে দেরিতে ঘুমায়, অথচ ৮–১০ ঘণ্টা ঘুম দরকার। রোজ অল্প সময়ের গল্পে কাছে থাকুন, নিয়ম একসঙ্গে ঠিক করুন, আর দুই সপ্তাহ বা তার বেশি মন খারাপ থাকলে সাহায্য নিন।

ParentMind টিমের লেখা১৪ মিনিটের পড়া

লেখাটি শুনুন

১৮ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া

এক নজরে

কাদের জন্য
১৩ থেকে ১৫ বছরের কিশোর-কিশোরীর বাবা-মা, যাদের সন্তান সাধারণত ক্লাস সেভেন থেকে নাইনে পড়ে
মূল কথা
  • ১৩ থেকে ১৫ বছরের বেশির ভাগই বয়ঃসন্ধির মাঝপথে: অনেক মেয়ের পিরিয়ড ধীরে ধীরে নিয়মিত হয়; অনেক ছেলের হঠাৎ লম্বা হওয়া, গলার স্বর ভাঙা আর স্বপ্নদোষ।
  • মেজাজ, গোপনীয়তা, তর্ক আর বন্ধুদের সবার আগে রাখা স্বাভাবিক; তবু কিশোর-কিশোরীর দরকার আন্তরিকতা, অল্প কয়েকটা স্পষ্ট নিয়ম, আর ভরসা করার মতো বাবা-মা।
  • ১৩–১৮ বছরে ৮–১০ ঘণ্টা ঘুম দরকার, অথচ শরীরের ঘড়ি দেরিতে চলে; তাই রাতে মোবাইল শোবার ঘরের বাইরে রাখা আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি।
  • নিজের ক্ষতির কোনো কথা বা মাদকের লক্ষণ দেখলে সেদিনই সাহায্য নিন, আর দুই সপ্তাহ বা তার বেশি মন খারাপ থাকলে শিগগিরই ডাক্তার দেখান; কেউ এই মুহূর্তে বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।

১৩–১৫ বছরের কিশোর-কিশোরীর আচরণ ও পরিবর্তন নিয়ে বাবা-মায়েরা প্রায়ই একই কথা বলেন: ছুটির দিনে দুপুর পর্যন্ত ঘুম, সারাক্ষণ মোবাইল, এক কথায় উত্তর, সবকিছু নিয়ে তর্ক, আবার মাঝরাতে হঠাৎ গল্প করার ইচ্ছা। এটা কৈশোরের শুরু, যখন শরীর, মস্তিষ্ক আর বন্ধুত্বে শৈশবের পর সবচেয়ে বড় কিছু পরিবর্তন আসে। এর বেশির ভাগই স্বাভাবিক, আর আপনার ভূমিকা এখনো অনেক বড়।

প্রত্যেক কিশোর-কিশোরী নিজের গতিতে বদলায়, তাই এই লেখাকে পরীক্ষা নয়, গাইড হিসেবে পড়ুন। নিচে পাবেন ১৪ বছরের সন্তানের পরিবর্তন আর তার আগে-পরের বছরগুলোর কথা: শরীর আর মস্তিষ্ক, মেজাজ আর গোপনীয়তা, বন্ধু আর ঝুঁকি, ক্লাস সেভেন থেকে নাইনের পড়াশোনা, ঘুম আর রুটিন, মোবাইল, ৭ দিনের পরিকল্পনা, আর কখন সাহায্য নেবেন।

১৩–১৫ বছরের কিশোর-কিশোরীর আচরণ ও পরিবর্তন: কী কী বদলায়?

কৈশোরের শুরুতে একসঙ্গে অনেক দিকে দ্রুত পরিবর্তন আসে। এগুলো মোটামুটি ধারণা; একই বয়সের কিশোর-কিশোরী দেখতে আর আচরণে খুব আলাদা হতে পারে, আর সেটা সাধারণত স্বাভাবিক।

১৩ থেকে ১৫ বছরে সাধারণত যা বদলায়, আর আপনি কীভাবে সাহায্য করতে পারেন (মোটামুটি ধারণা)
দিকসাধারণত যা হয়আপনি কীভাবে সাহায্য করতে পারেন
শরীরহঠাৎ লম্বা হওয়া আর খুব খিদে; ব্রণ আর ক্লান্তি; অনেক মেয়ের পিরিয়ড নিয়মিত হতে থাকা; অনেক ছেলের গলার স্বর ভাঙা আর স্বপ্নদোষনিয়মিত খাবার, রোজ গোসল, ঘুমের সময় আগলে রাখা, আর ওর শরীর নিয়ে কোনো মন্তব্য নয়
মস্তিষ্ক ও ভাবনাবিমূর্ত ভাবনা ভাবে, ভালো যুক্তি দেয়, ন্যায্যতা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে; পরিকল্পনা আর নিজেকে সামলানোর ক্ষমতা এখনো তৈরি হচ্ছে, বিশেষ করে বন্ধুরা আশপাশে থাকলেনিয়মের কারণ বুঝিয়ে বলুন, ওর মত জানতে চান, আর ঝুঁকির পরিস্থিতি নিয়ে ঘটার আগেই কথা বলুন
অনুভূতিতীব্র, দ্রুত বদলানো মেজাজ; অন্যরা কী ভাবছে তা নিয়ে খুব সচেতন; মন খারাপ আর দুশ্চিন্তা দেখা দিতে শুরু করতে পারেওর মেজাজের ঝড়ে নিজে শান্ত থাকুন, আগে শুনুন, আর যে পরিবর্তন অনেক দিন থাকে তা খেয়াল করুন
বন্ধুপ্রায়ই বন্ধুরাই সবার আগে; কারও কারও প্রথম সম্পর্ক; অনলাইনে আর বাইরে, দলে মানিয়ে চলার জোরালো টানওর বন্ধুদের চিনুন, বাসায় স্বাগত জানান, ভালো লাগা নিয়ে কখনো ঠাট্টা নয়
স্বাধীনতাগোপনীয়তা, নিজের মত আর বেশি স্বাধীনতা চায়; চেনা পথে যাতায়াত, টাকা আর সময় সামলাতে পারেবিশ্বাস যত বাড়ে, ধাপে ধাপে স্বাধীনতা বাড়ান, সঙ্গে খোঁজ দেওয়ার পরিষ্কার নিয়ম

আগের বছরটা দেখুন আপনার ১২ বছরের সন্তান লেখায়, আর পুরো কৈশোর নিয়ে দেখুন টিনএজ সন্তানের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করবেন লেখায়।

১৩ থেকে ১৫ বছরে বয়ঃসন্ধি

১৩ থেকে ১৫ বছরে বেশির ভাগ মেয়ের বয়ঃসন্ধি অনেকটা এগিয়ে যায়, অনেকের প্রথম পিরিয়ডও হয়ে যায়; প্রথম এক-দুই বছর পিরিয়ড প্রায়ই অনিয়মিত থাকে। অনেক ছেলের এই সময়েই সবচেয়ে বেশি লম্বা হওয়া, সঙ্গে ভারী গলা, শরীরে বেশি লোম আর স্বপ্নদোষ। অল্প কয়েকজনের এখনো শুরু হয়নি, আর দেরিতে হওয়াও স্বাভাবিক হতে পারে। কী বলবেন, দেখুন মেয়ের সঙ্গে বয়ঃসন্ধি নিয়ে কথা বলা আর ছেলের সঙ্গে বয়ঃসন্ধি নিয়ে কথা বলা লেখায়।

কিশোর বয়সের স্বাভাবিক আচরণ: মেজাজ, গোপনীয়তা আর কথা বলা

এই বয়সে বাবা-মাকে যা ভাবায়, তার বেশির ভাগই স্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে ওঠা: এমন মস্তিষ্ক যা অনুভূতি তীব্রভাবে টের পায়, দেরিতে চলা শরীরের ঘড়ি, আর নিজের মতো একজন মানুষ হয়ে ওঠার জোরালো ইচ্ছা। ১৩ থেকে ১৫ বছরে খুব সাধারণ:

  • অল্পতেই বিরক্তি, জোরে দরজা বন্ধ করা, আর ঘণ্টায় ঘণ্টায় বদলানো মেজাজ।
  • নিজের ঘরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, ছোট্ট উত্তর, আর বন্ধুদের সঙ্গে গোপন চ্যাট।
  • নিয়ম, বাসায় ফেরার সময়, মোবাইল আর ন্যায্যতা নিয়ে তর্ক, প্রায়ই বেশ দক্ষভাবে।
  • বাবা-মাকে নিয়ে লজ্জা, আর চেহারা, ত্বক আর ওজন নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা।
  • বন্ধুদের সঙ্গে কিছুটা ঝুঁকি নেওয়া, আর হুটহাট সিদ্ধান্ত।

কিশোর সন্তান যখন রেগে ওঠে, মুখ ভার করে বা দরজা বন্ধ করে

  1. গলা নামান, রাগের মুহূর্তে তর্ক নয়: ‘দুজনে শান্ত হলে কথা বলি।’
  2. আগে অনুভূতির জবাব দিন: ‘তোমাকে খুব বিরক্ত শোনাচ্ছে।’ আচরণের কথা পরে।
  3. গোপনীয়তার সম্মান দিন: টোকা দিন, আর নিরাপত্তার গুরুতর কারণ ছাড়া ডায়েরি বা মেসেজ পড়বেন না; কোন কারণে পড়বেন, তা আগেই বলে রাখুন।
  4. পাশাপাশি থেকে কথা বলুন: রিকশায়, হাঁটতে হাঁটতে, রান্নার সময়, বা রাতে যখন ও নিজে থেকে মুখ খোলে।
  5. অল্প কয়েকটা বিষয়ে ছাড় নয়, যেমন নিরাপত্তা, ঘুম আর সম্মান; বাকিগুলো নিয়ে আলোচনা করে ঠিক করুন।
  6. ঝগড়ার পরে সম্পর্কটা জোড়া দিন: ‘আমি মেজাজ হারিয়েছিলাম। সরি। চলো আবার চেষ্টা করি।’

যা বলতে পারেন

  • তোমাকে মন খারাপ দেখাচ্ছে। কথা বলতে চাইলে আমি আছি, এখন বা পরে।
  • সব কথা আমাকে বলতে হবে না। শুধু কখনো বিপদে পড়লে আমাকে জানিও।
  • সত্যি কথা বললে আমি চিৎকার করব না, খারাপ কিছু হলেও।
  • পরামর্শ চাও, নাকি শুধু শুনব?
  • ‘না’ বললেও আমি তোমার পক্ষেই আছি।

সন্তান অনেক দিন চুপচাপ থাকলে পাশাপাশি থাকার মুহূর্ত আর রোজকার নিয়মগুলো চালু রাখুন; রাগের বিস্ফোরণ নিয়ে দেখুন টিনএজ সন্তান খুব রেগে যায় লেখাটি।

১৩ থেকে ১৫ বছরে বন্ধু, প্রেম-ভালো লাগা আর বন্ধুদের চাপ

১৩ থেকে ১৫ বছরে প্রায়ই বন্ধুরাই সবার আগে, আর বন্ধুদের সঙ্গে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা সাধারণত কৈশোরের মাঝামাঝি সবচেয়ে বেশি থাকে। সাধারণ চাপের মধ্যে আছে সিগারেট আর ভেপ, এনার্জি ড্রিংক, বাইক বা ছাদে বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ, কোচিং ফাঁকি দেওয়া, অনলাইনের নানা চ্যালেঞ্জ, আর ছবি শেয়ার করা। কাউকে ভালো লাগা বা প্রথম সম্পর্কও খুব সাধারণ, আর এ নিয়ে প্রতিটা পরিবারের নিজস্ব মূল্যবোধ আছে।

  • চাপ আসার আগেই কথা বলুন, আর সহজে বেরিয়ে আসার কথা চর্চা করুন: ‘কাল সকালে কোচিং আছে’, ‘আব্বু-আম্মু ফোন দিয়ে খোঁজ নেয়’।
  • প্রশ্ন ছাড়া একটা উদ্ধার পরিকল্পনা ঠিক করুন: একটা সংকেত-শব্দ লিখে পাঠালেই আপনি গিয়ে নিয়ে আসবেন, আর সেই রাতে কোনো বকাঝকা নয়।
  • প্রেম-ভালো লাগা নিয়ে শান্তভাবে কথা বলুন: লজ্জা না দিয়ে পরিবারের মূল্যবোধের কথা বলুন, আর সম্মান, সম্মতি আর কখনো ব্যক্তিগত ছবি না পাঠানো নিয়ে কথা বলুন।
  • ওর বন্ধুদের চিনুন, বাসায় স্বাগত জানান, আর বাসায় ফেরার সময় আর খোঁজ দেওয়ার নিয়ম ঠিক করুন, যা বিশ্বাসের সঙ্গে বাড়বে।

ক্লাস সেভেন থেকে নাইন: কোচিং, বিভাগ বাছাই আর পরীক্ষার চাপ

বেশির ভাগ বাংলাদেশি কিশোর-কিশোরীর জন্য ১৩ থেকে ১৫ বছর মানে ক্লাস সেভেন, এইট বা নাইন, আর কিছু ১৫ বছরের জন্য ক্লাস টেন আর এসএসসির বছর। বিকেলগুলো প্রায়ই কোচিংয়ে ভরা, আর বেশির ভাগ স্কুলে ক্লাস নাইনে বিভাগ বাছাই করতে হয়, যেমন বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা বা মানবিক, যা নিয়ে পরিবারে চাপ তৈরি হতে পারে; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়ম বদলেছে, তাই স্কুলের নোটিশ দেখে নিন। অনেকে রাত জেগে পড়ে, আর পরীক্ষার চাপও প্রায়ই বাড়ে।

১৫ বছর বয়সে সন্তানকে কী শেখানো উচিত? নিজেকে সামলানোর দক্ষতা: সপ্তাহের পড়ার পরিকল্পনা, আগেভাগে রিভিশন শুরু, কখন বিশ্রাম দরকার তা বোঝা, আর পড়া জমে যাওয়ার আগেই সাহায্য চাওয়া।

  • বিভাগ একসঙ্গে বেছে নিন: আত্মীয়রা কী আশা করেন শুধু তা নয়, সন্তান কী ভালোবাসে আর কীসে ভালো, তা নিয়ে কথা বলুন।
  • আরেকটা কোচিং ব্যাচ যোগ করার আগে হিসাব করুন দিনে আর কী বাকি থাকে: ৮–১০ ঘণ্টা ঘুম, এক ঘণ্টা দৌড়ঝাঁপ, খাওয়া আর একটু অবসর।
  • প্রত্যেক টিউটর আর কোচিংয়ের শিক্ষককে বলুন চেষ্টার প্রশংসা করতে, আর কখনো মারতে বা লজ্জা দিতে নয়।
  • পরীক্ষা এলেই আতঙ্ক, নির্ঘুম রাত বা কান্না হলে শান্ত একটা পরিকল্পনা পাবেন পরীক্ষার ভয় ও মানসিক চাপ কমানোর উপায় লেখায়, যা কিশোর-কিশোরীর জন্যও কাজে দেয়।

ঘুম, খাবার আর দৌড়ঝাঁপ: ১৩ থেকে ১৫ বছরের সন্তানের রুটিন

  • ঘুম: ১৩–১৮ বছরে ৮–১০ ঘণ্টা ঘুম দরকার। বয়ঃসন্ধিতে শরীরের ঘড়ি পিছিয়ে যায়, তাই অনেকে রাতে একদম চনমনে থাকে আর সকাল সাড়ে ৬টায় ক্লান্তিতে উঠতে পারে না; সকালে ওঠার সময় থেকে পিছিয়ে হিসাব করে ঘুমের সময় ঠিক করুন।
  • খাবার: তিন বেলা খাবার, স্কুলের আগে অল্প হলেও নাশতা, সঙ্গে হালকা খাবার। হঠাৎ লম্বা হওয়ার সময় কিশোর-কিশোরী প্রায়ই অনেক খায়; ফাস্ট ফুড আর এনার্জি ড্রিংক মাঝেমধ্যে, রোজ নয়।
  • দৌড়ঝাঁপ: দিনে অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে জোরালো খেলাধুলা। এই সময়ে অনেকে, বিশেষ করে মেয়েরা, খেলাধুলা ছেড়ে দেয়; কোনো দল, সাইকেল, সাঁতার, নাচ, মার্শাল আর্ট বা বাবা-মায়ের সঙ্গে জোরে হাঁটা, সবই গোনায় ধরা যায়।
  • স্ক্রিন: ৬ বছর থেকে নির্দিষ্ট কোনো ঘণ্টার হিসাব নেই; এমন সীমা রাখুন যাতে ঘুম, দৌড়ঝাঁপ, পড়া আর পরিবারের সময় ঠিক থাকে; ঘুমের আগের এক ঘণ্টায় কোনো স্ক্রিন নয়, আর রাতে কোনো ডিভাইস শোবার ঘরে নয়।
১৪ বছরের সন্তানের স্কুলের একটা দিন (একটা উদাহরণ; মর্নিং শিফট, সঙ্গে কোচিং)
সময়কী হয়
সকাল সাড়ে ৬টাঘুম থেকে ওঠা, হাত-মুখ ধোয়া, তাড়াতাড়ি নাশতা
সকাল সোয়া ৭টা–দুপুর সাড়ে ১২টাযাতায়াত আর স্কুল (সময় স্কুলভেদে আলাদা)
দুপুর সোয়া ১টাবাসায় দুপুরের খাবার আর একটু বিশ্রাম
বিকেল ৩টাকোচিং
বিকেল ৫টানাশতা, তারপর এক ঘণ্টা দৌড়ঝাঁপ: কোনো খেলা, সাইকেল বা হাঁটা
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টাসপ্তাহের পরিকল্পনা ধরে নিজে পড়া, মাঝে ছোট বিরতি
রাত সাড়ে ৮টাপরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার, মোবাইল দূরে
রাত সোয়া ৯টাস্ক্রিন ছাড়া অবসর: বই, গল্প, গান
রাত ১০টামোবাইল চার্জ হবে শোবার ঘরের বাইরে; বাতি নেভানো, সকাল সাড়ে ৬টায় ওঠার আগে প্রায় সাড়ে ৮ ঘণ্টা ঘুম

১৩ থেকে ১৫ বছরে মোবাইল আর সোশ্যাল মিডিয়া

বেশির ভাগ সোশ্যাল অ্যাপে ন্যূনতম বয়স ১৩ বছর, তাই অনেক কিশোর-কিশোরী এই বছরেই অ্যাকাউন্ট খোলে, আর মোবাইল হয়ে ওঠে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান পথ। বেশি ব্যবহার খুব সাধারণ। লক্ষ্য পুরোপুরি নিষেধ নয়, বরং এমন মোবাইল-ব্যবহার যা ঘুম, পড়া, পরিবার আর বাস্তবের বন্ধুদের জায়গা কেড়ে নেয় না।

  • একসঙ্গে নিয়ম ঠিক করে লিখে রাখুন: রাতে মোবাইল শোবার ঘরের বাইরে, খাওয়ার সময় মোবাইল নয়, আর পড়ার সময় নোটিফিকেশন বন্ধ।
  • অ্যাকাউন্ট প্রাইভেট রাখুন, আর কী কখনো শেয়ার করা যাবে না তা নিয়ে কথা বলুন: পাসওয়ার্ড, বাসার ঠিকানা, ব্যক্তিগত ছবি।
  • ব্ল্যাকমেইলের নিয়ম শেখান: কেউ ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিলে কোনো টাকা বা কিছুই পাঠাবে না, ছবিটা কখনো কপি বা ফরোয়ার্ড করবে না, অ্যাকাউন্টটা ব্লক আর রিপোর্ট করবে, আর সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মাকে জানাবে।
  • অনলাইনে ও কী পছন্দ করে জিজ্ঞেস করুন, আর মাঝে মাঝে একসঙ্গে দেখুন বা খেলুন; শুধু নিয়ম যে দরজা খোলে না, আগ্রহ তা খুলে দেয়।
  • মোবাইল যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে ঘুম, পড়া বা মেজাজের জায়গা কেড়ে নেয়, ধাপে ধাপে পরিকল্পনা পাবেন কিশোর সন্তানের মোবাইল আসক্তি লেখায়।

বাংলাদেশি পরিবারে কৈশোর: স্বাধীনতা, ন্যায্যতা আর পরিবারের সম্মান

কোচিংয়ে যাতায়াত, বাসায় ফেরার সময় আর ছেলে-মেয়ের জন্য একই নিয়ম

অনেক কিশোর-কিশোরী এখন একা স্কুল আর কোচিংয়ে যাতায়াত করে। পথ, সময় আর খোঁজ দেওয়ার একটা ফোন ঠিক করুন, আর বিশ্বাস যত বাড়ে, স্বাধীনতাও তত বাড়ান। ছেলে আর মেয়ের জন্য একই নিয়ম রাখুন: প্রায়ই মেয়েকে বাসায় আটকে রাখা হয় আর ছেলে ঘুরে বেড়ায়, অথচ ছেলেদেরও সত্যিকারের ঝুঁকি আছে, সড়ক দুর্ঘটনা থেকে খারাপ সঙ্গ পর্যন্ত।

প্রেম, গুজব আর পরিবারের সম্মান

অনেক পরিবারে সন্তানের প্রেমের খবর এলে পরিবারের সম্মান আর আত্মীয়রা কী বলবে, তা নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়। শান্ত থাকুন, আড়ালে কথা বলুন। আত্মীয়দের সামনে লজ্জা দেওয়া, পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া বা গায়ে হাত তোলা সাধারণত ব্যাপারটাকে লুকোছাপার দিকে ঠেলে দেয় আর বিশ্বাস ভেঙে দেয়। তাড়াহুড়া করে বিয়ে দেওয়া কখনোই সমাধান নয়: বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ আইনত অপরাধ, আর এতে সন্তানের স্বাস্থ্য আর ভবিষ্যতের ক্ষতি হয়। নিজের মূল্যবোধের কথা বলুন, নিরাপদ সীমা ঠিক করুন, আর মনের দরজা খোলা রাখুন, যাতে সন্তান এরপরও আপনার কাছেই আসে।

কিশোর-কিশোরী প্রায়ই পারিবারিক আড্ডা এড়িয়ে যায়। একটা সহজ নিয়ম ধরে রাখুন, যেমন শুক্রবারের দুপুরের খাবার বা বিকেলে একসঙ্গে হাঁটা, আর সেটাকে মোবাইল আর উপদেশ থেকে মুক্ত রাখুন।

১৩–১৫ বছরের সন্তানের কাছাকাছি থাকতে ৭ দিনের পরিকল্পনা

একটা পরিবর্তন বেছে নিন, প্রতিদিন কী হচ্ছে লিখে রাখুন, আর এক সপ্তাহ পরে মিলিয়ে দেখুন।

  1. দিন ১: খেয়াল করুন সন্তান কখন সবচেয়ে সহজে কথা বলে: রাতে, রিকশায়, খাওয়ার সময়, নাকি হাঁটতে হাঁটতে।
  2. দিন ২: কোনো উপদেশ ছাড়া ছোট, নিঃশব্দ একটা যত্ন দিন, যেমন পড়ার সময় এক কাপ চা বা একটু নাশতা।
  3. দিন ৩: একসঙ্গে মোবাইলের একটা নিয়ম ঠিক করুন, যেমন রাত ১০টা থেকে মোবাইল চার্জ হবে শোবার ঘরের বাইরে।
  4. দিন ৪: ওর পছন্দের কিছু নিয়ে জিজ্ঞেস করুন, কোনো গেম, অনুষ্ঠান বা বন্ধু, আর শুধু শুনুন।
  5. দিন ৫: একটা সংকেত-শব্দসহ উদ্ধার পরিকল্পনা ঠিক করুন, আর কথা দিন, সেই রাতে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই চলে আসবেন।
  6. দিন ৬: পরিষ্কার খোঁজ দেওয়ার নিয়মসহ নতুন একটা দায়িত্ব বা স্বাধীনতা দিন।
  7. দিন ৭: ফিরে দেখুন: কোন মুহূর্তগুলো সবচেয়ে কাছের লেগেছে, আর কোন নিয়ম নিয়ে সবচেয়ে বেশি ঝগড়া হয়েছে? প্রথমটা ধরে রাখুন, দ্বিতীয়টা একসঙ্গে বসে আবার ভাবুন।

১৩–১৫ বছরের সন্তানের জন্য কখন সাহায্য নেবেন

এই বয়সের বেশির ভাগ মেজাজ, তর্ক আর রাত জাগা বড় হয়ে ওঠারই অংশ। তবু এমন কিছু দেখলে সাহায্য নিন:

এমন হলে সাহায্য নিন

  • সন্তান নিজেকে আঘাত করেছে, বা বেঁচে থাকতে চায় না এমন কথা বলছে: শান্ত থাকুন, ওর কাছাকাছি থাকুন। এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন; নইলে সেদিনই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
  • দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে বেশির ভাগ দিন খুব মন খারাপ, হতাশা বা সবার কাছ থেকে গুটিয়ে থাকা, অথবা খাওয়া, ওজন বা ঘুমে বড় পরিবর্তন: শিগগিরই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
  • মাদক বা মদের যে কোনো লক্ষণ, যেমন ট্যাবলেট, পাউডার বা ব্যাখ্যা ছাড়া গন্ধ, কিংবা টাকা আর জিনিসপত্র হারিয়ে যাওয়া: সেদিনই সাহায্য নিন।
  • মেয়ের মোটামুটি ১৩ বা ছেলের ১৪ বছরেও বয়ঃসন্ধির কোনো লক্ষণ নেই, ১৫ বছরেও পিরিয়ড হয়নি, বা পিরিয়ডে এত রক্ত বা ব্যথা যে মেয়ে স্কুলে যেতে পারে না: ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। অণ্ডকোষে হঠাৎ তীব্র ব্যথা হলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।
  • নির্যাতন, বুলিং বা ব্ল্যাকমেইলের যে কোনো লক্ষণ, যেমন কেউ ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে, বা অনলাইনের কোনো বড় মানুষ সন্তানের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করছে: সন্তানের কথা বিশ্বাস করুন, সেদিনই ব্যবস্থা নিন। কোনো টাকা বা কিছুই পাঠাবেন না, মেসেজগুলো রেখে দিন, তবে কোনো ব্যক্তিগত ছবি কপি বা ফরোয়ার্ড করবেন না, আর অ্যাকাউন্টটা ব্লক ও রিপোর্ট করুন। নির্যাতন, ব্ল্যাকমেইল বা এমন দেখা করার পরিকল্পনার কথা সেদিনই স্থানীয় থানায় জানান; সন্তান কারও সঙ্গে দেখা করতে চলে গেলে, তাকে খুঁজে না পেলে বা এই মুহূর্তে বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
  • মারামারি, অস্ত্র, বাসা ছেড়ে চলে যাওয়া বা কোনো যোগাযোগ ছাড়া রাতে বাইরে থাকা: কারও এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে বা সন্তানের খোঁজ না পেলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।

সন্তান ১৬-র দিকে এগোলে কৈশোরের শেষ ভাগ পাবেন আপনার ১৬–১৮ বছরের সন্তান লেখায়। ১৩–১৫ বছরের কিশোর-কিশোরীর আচরণ ও পরিবর্তনের ধারা বুঝতে ParentMind-এ প্রতিদিন মেজাজ, ঘুম আর মোবাইলের সময় লিখে রাখতে পারেন, যাতে একটা খারাপ দিন নয়, পুরো ধারাটা চোখে পড়ে; ParentMind কীভাবে কাজ করে দেখুন।

বাবা-মায়েরা যা জানতে চান

১৪ বছরের সন্তান এত দেরিতে ঘুমায়, এটা কি স্বাভাবিক?

হ্যাঁ, একটা পর্যন্ত। বয়ঃসন্ধিতে শরীরের ঘড়ি পিছিয়ে যায়, তাই অনেক ১৪ বছরের সন্তান রাতে চনমনে থাকে আর স্কুলের জন্য উঠতে কষ্ট পায়, অথচ ৮–১০ ঘণ্টা ঘুম দরকার। ওঠার সময় নির্দিষ্ট রাখুন, মোবাইল শোবার ঘরের বাইরে রাখুন, সকালে রোদে একটু থাকতে দিন, আর ছুটির দিনে খুব বেশি দেরি করে উঠতে দেবেন না। যথেষ্ট ঘুমের পরও বেশির ভাগ দিন খুব ঘুম-ঘুম ভাব থাকলে, বা জোরে নাক ডাকলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।

১৩ বছরের সন্তান বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে, এটা কি স্বাভাবিক?

১৩ বছরের ছেলেমেয়ের আচরণে এভাবে একটু দূরে সরে যাওয়া খুব সাধারণ, কারণ কিশোর-কিশোরী নিজের একটা জীবন গড়তে শুরু করে, আর ছোট উত্তর সাধারণত প্রত্যাখ্যান নয়। রোজকার নিয়মগুলো চালু রাখুন, পাশাপাশি থেকে কথা বলুন, আর যে সময়গুলোতে ও কথা বলে তখন কাছে থাকুন। তবে সবার কাছ থেকে গুটিয়ে গেলে, খাওয়া বা ঘুম কমে গেলে, দুই সপ্তাহ বা তার বেশি বেশির ভাগ দিন মন খারাপ থাকলে, বা নিজের ক্ষতির কথা বললে সাহায্য নিন।

১৫ বছরের সন্তানের প্রেম বা ভালো লাগার সম্পর্ক কি স্বাভাবিক?

১৫ বছরের মধ্যে কাউকে ভালো লাগা বা প্রথম সম্পর্ক খুব সাধারণ, আর এ নিয়ে একেক পরিবারের মূল্যবোধ একেক রকম। শান্ত থাকুন, লজ্জা না দিয়ে নিজের মূল্যবোধের কথা বলুন, আর নিরাপদ সীমা ঠিক করুন। সম্মান, সম্মতি আর কখনো ব্যক্তিগত ছবি না পাঠানো নিয়ে কথা বলুন, আর বুঝিয়ে দিন, কেউ চাপ দিলে ও আপনাকে জানাতে পারে। কড়া শাস্তি সাধারণত সম্পর্ককে গোপনীয়তার দিকে ঠেলে দেয়।

১৫ বছরের মেয়ের এখনো পিরিয়ড শুরু হয়নি, চিন্তার কিছু আছে?

একবার ডাক্তার দেখানো ভালো, তবে এটা জরুরি অবস্থা নয়। অনেক মেয়ের পিরিয়ড শুরু হয় মোটামুটি ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে, প্রায়ই স্তন বড় হতে শুরু করার দুই বছরের মতো পরে। অন্য পরিবর্তন এসে গেলেও মোটামুটি ১৫ বছরে পিরিয়ড না হলে, বা ১৩ বছরেও বয়ঃসন্ধির কোনো লক্ষণ না থাকলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।

১৫ বছর বয়সে সন্তানকে কী কী শেখানো উচিত?

অনেক ১৫ বছরের সন্তান সহজ একটা খাবার রাঁধতে, নিজের কাপড় ধুয়ে ইস্ত্রি করতে, হাতখরচ সামলাতে, চেনা পথে নিরাপদে যাতায়াত করতে, নিজের পড়ার সপ্তাহ সাজাতে, আর একটু সাহায্যে নিজের শরীরের যত্ন নিতে পারে। চাপের মুখে ‘না’ বলতে আর শুরুতেই সাহায্য চাইতে শেখান। একবারে একটা দক্ষতা হাতে দিন, আর নিজে করে না দিয়ে ওকে চর্চা করতে দিন।

১৪ বছরের সন্তানকে কতটা স্বাধীনতা দেওয়া উচিত?

এতটা, যাতে ও চর্চা করতে পারে, আর ধাপগুলো বিশ্বাসের সঙ্গে বাড়ে। অনেক ১৪ বছরের সন্তান একা স্কুল আর কোচিংয়ে যায়, দিনের আলোয় আপনার চেনা জায়গায় বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়, আর নিজের জামা, গান আর পড়ার সময় নিজেই বেছে নেয়। কখন খোঁজ দেবে আর কখন বাসায় ফিরবে তা ঠিক করুন, আর নিয়ম ভাঙলে সব কেড়ে না নিয়ে এক ধাপ পিছিয়ে আসুন।

এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।

কিশোর-কিশোরী (১৩–১৮ বছর): আরও গাইড

কিশোর-কিশোরী: সব গাইড

নিজের সন্তানের সাথে চেষ্টা করে দেখুন

ParentMind প্রতিদিনের একটি ছোট নোট রাখে আর দেখায় — আপনার সন্তানের নিজের সংখ্যায় — একটি পরিবর্তন কাজে লাগছে কি না।

বিনামূল্যে নাম লিখুন। ক্রেডিট কার্ড লাগবে না। আপনার তথ্য গোপন থাকবে।