মূল কনটেন্টে যান

শিশুর আবেগ সামলাতে সাহায্য করার উপায়: কী বলবেন, কী করবেন

ছোট করে উত্তর

শিশুর আবেগ সামলাতে সাহায্য করার উপায় হলো নিজে শান্ত থাকা, অনুভূতির নাম বলা, বুঝিয়ে দেওয়া যে অনুভূতিটা যুক্তিসঙ্গত, আর ঝড় না থামা পর্যন্ত কাছে থাকা; তারপর একসাথে সমাধান খোঁজা। ২–১২ বছরের বাচ্চারা আবেগ সামলাতে শেখে মূলত বড়দের কাছ থেকে বারবার এমন সাহায্য পেয়ে। শান্ত সময়ে অনুভূতির শব্দ শেখান। মন খারাপ দুই সপ্তাহ ধরে চললে, বা কয়েক মাস ধরে বেশিরভাগ দিন রাগে-কান্নায় ফেটে পড়লে সাহায্য নিন।

ParentMind টিমের লেখা১৩ মিনিটের পড়া

লেখাটি শুনুন

১৮ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া

এক নজরে

কাদের জন্য
২–১২ বছর বয়সী সন্তানের বাবা-মা, যাদের বাচ্চার অনুভূতি কান্না, ভেঙে পড়া, অভিমান বা চিৎকারে গিয়ে ঠেকে
মূল কথা
  • বড় আবেগ স্বাভাবিক: অনুভূতি থামানোর “ব্রেক” ধীরে ধীরে তৈরি হয়, তাই বাচ্চাকে বড়দের শান্ত ভাবটা “ধার” নিতে হয়।
  • অনুভূতির নাম বলুন, বুঝিয়ে দিন অনুভূতিটা যুক্তিসঙ্গত, তবু সীমাটা রাখুন: অনুভূতি মেনে নেওয়া মানে আবদার মেনে নেওয়া নয়।
  • সবাই শান্ত থাকার সময় অনুভূতির শব্দ শেখালে বাচ্চা প্রায়ই আচরণে না দেখিয়ে মুখেই বলতে পারে কী হয়েছে।
  • কয়েক সপ্তাহ ধরে বড় অনুভূতির কারণে রোজকার জীবন আটকে গেলে, বা বাচ্চা নিজেকে আঘাত করার কথা বললে সাহায্য নিন।

শিশুর আবেগ সামলাতে সাহায্য করার উপায় খুঁজছেন? হয়তো এইমাত্র এমন একটা ঝড় পার করলেন: ভাঙা বিস্কুট নিয়ে কান্না, পার্ক থেকে ফেরার সময় চিৎকার, কিংবা ৯ বছরের মেয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, “আমাকে কেউ পছন্দ করে না।” ওই মুহূর্তে মনে হয়, কোনো কথাই যেন কানে ঢুকছে না।

বড় অনুভূতি বেড়ে ওঠারই স্বাভাবিক অংশ; এর মানে এই নয় যে আপনার বাচ্চার বা আপনার লালন-পালনে কোনো গলদ আছে। বাচ্চারা আবেগ সামলাতে শেখে মূলত এভাবে: একজন শান্ত বড় মানুষ বারবার পাশে থেকে তাকে ঝড়টা পার করতে সাহায্য করেন। নিচে ঠিক সেটাই পাবেন: ধাপ, বলার মতো কথা, শান্ত হওয়ার কৌশল আর ৭ দিনের একটা পরিকল্পনা।

বাচ্চাদের আবেগ এত বড় হয় কেন?

বাচ্চার অনুভূতি আমাদের মতোই তীব্র, কিন্তু সেটা সামলানোর দক্ষতা এখনো তৈরি হচ্ছে। শিশুর মানসিক বিকাশ ধীরে আর ওঠানামা করে এগোয়, আর সাধারণত কয়েকটা জিনিস একসাথে কাজ করে:

  • মস্তিষ্কের “ব্রেক” এখনো তৈরি হচ্ছে: অনুভূতি শান্ত করা আর আগে থেকে ভাবার অংশগুলো পুরো শৈশব আর কৈশোর জুড়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে; তাই অনুভূতি প্রায়ই নিয়ন্ত্রণের আগেই চলে আসে।
  • শরীরের চাহিদা: ক্লান্তি, খিদে, অসুখ আর হইচই প্রতিটা অনুভূতিকে বড় করে তোলে; তাই সন্ধ্যাবেলাটাই প্রায়ই সবচেয়ে কঠিন।
  • এখনো যথেষ্ট শব্দ নেই: যে বাচ্চা বলতে পারে না “আমাকে বাদ দিয়ে খেলছিল, খারাপ লেগেছে,” সে হয়তো সেটা দেখায় কান্না, মারা বা সবকিছুতে “না” বলে।
  • পরিবর্তন: খেলা ছেড়ে ওঠা, নতুন ভাই বা বোন, নতুন স্কুল বা নতুন বাসা কয়েক সপ্তাহ ধরে মন অস্থির রাখতে পারে।
  • স্বভাব: কোনো কোনো বাচ্চা সবকিছু একটু বেশি তীব্রভাবে অনুভব করে। এটা বুঝে নেওয়ার মতো স্বভাব, সারানোর মতো দোষ নয়।

বয়স অনুযায়ী আবেগ: ২ থেকে ১২ বছরে কী আশা করবেন

বড় হতে হতে বাচ্চার আবেগের ধরন বদলায়। নিচের ছকে দেখুন কোন বয়সে কী স্বাভাবিক, আর সাধারণত কী সবচেয়ে বেশি কাজে দেয়।

বয়স অনুযায়ী বড় অনুভূতি, আর যা কাজে দেয়
বয়সবড় অনুভূতি প্রায়ই দেখতে যেমনযা সবচেয়ে বেশি কাজে দেয়
২–৩ বছরহঠাৎ, জোরালো ঝড়: কান্না, মাটিতে গড়াগড়ি, মারা; সাধারণত কয়েক মিনিটেই শেষকাছে থাকা, তার হয়ে অনুভূতির নাম বলা, কম কথা, আদর
৪–৫ বছরকথা বেশি, তবু ছোট ব্যাপারে বড় প্রতিক্রিয়া; হিংসা, নতুন ভয়, সবকিছু নিজের মতো চাওয়ানাম বলা, দুটো সহজ পছন্দ দেওয়া, খেলার ছলে শান্ত হওয়ার অনুশীলন
৬–৮ বছরন্যায়-অন্যায়, হারা, বন্ধু আর স্কুল নিয়ে তীব্র অনুভূতি; সারা দিন চেপে রাখার পর কান্না বা মেজাজশান্ত হলে কথা বলা, “মনের আবহাওয়া” জিজ্ঞেস করা, স্কুলের পর নাশতা আর বিশ্রাম
৯–১২ বছরঅনুভূতি ভেতরে ঢুকে যায়: মেজাজ, অভিমান, নম্বর, বন্ধু বা শরীরের পরিবর্তন নিয়ে দুশ্চিন্তা; “আমি ঠিক আছি”পাশাপাশি বসে কথা, সমাধানের চেয়ে বেশি শোনা, তার নিজের জগৎকে সম্মান

৪ বছরের কম বয়সে বেশিরভাগ বড় ঝড়ই জেদ-কান্না; ওই বয়সের ধাপগুলো পাবেন ছোট বাচ্চার জেদ ও কান্নাকাটি লেখায়, আর প্রতিবার বিদায়ের সময়ের কান্না নিয়ে আছে বাচ্চা মাকে ছাড়তে চায় না লেখায়। বড় বাচ্চা সব প্রশ্নের উত্তরে শুধু “ভালো” বললে দেখুন উত্তর যখন শুধু “ভালো”: মনের কথা বলানোর উপায়; প্রায়ই “আমি পারি না” বললে দেখুন বাচ্চার আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর উপায়।

শিশুর আবেগ সামলাতে সাহায্য করার উপায়: ঝড়ের মুহূর্তে

অনুভূতি থামিয়ে না দিয়ে তার ভেতর দিয়ে বাচ্চাকে পথ দেখানোর একটা সহজ উপায় আছে: খেয়াল করা, নাম দেওয়া, মেনে নেওয়া, তারপর একসাথে সমাধান খোঁজা। ঝড়ের মুহূর্তে এটা দেখতে এমন:

  1. আগে নিজেকে স্থির করুন: ধীরে শ্বাস ছাড়ুন, গলা নামান, আর বাচ্চার চোখের সমান হয়ে বসুন।
  2. সবাইকে নিরাপদ রাখুন: ছোট ভাইবোন বা ভাঙার মতো জিনিস নাগালের বাইরে সরিয়ে নিন।
  3. যা দেখছেন তার নাম বলুন, বিচার না করে: “তোমার খুব মন খারাপ হয়েছে।” আন্দাজে বললেও চলে; ভুল হলে বাচ্চা নিজেই ঠিক করে দিতে পারে।
  4. বুঝিয়ে দিন অনুভূতিটা যুক্তিসঙ্গত: “সারা সপ্তাহ তুমি এটার অপেক্ষায় ছিলে।”
  5. আদর দিন, অপেক্ষা করুন: জড়িয়ে ধরুন বা পাশে বসুন, কথা খুব কম; অনুভূতি যখন চূড়ায়, তখন তর্ক, ব্যাখ্যা বা সমাধান নয়।
  6. নরমভাবে সীমায় অটল থাকুন। অনুভূতি মেনে নেওয়া মানে সিদ্ধান্ত বদলানো নয়: আজকের মতো পার্ক শেষ, এটাই থাকবে।
  7. শান্ত হলে একসাথে সমাধান খুঁজুন: কী হয়েছিল, কী কাজে দিল, আর পরের বার দুজনে কী করে দেখতে পারেন।

যা বলতে পারেন

  • তুমি খুব কষ্ট পাচ্ছো। আমি আছি, তোমার পাশেই বসছি।
  • তুমি আরও থাকতে চাইছিলে। খুব কষ্ট লাগছে, তাই না?
  • মন খারাপ হতেই পারে, তবু এখন আমরা বাসায় যাচ্ছি।
  • চলো একসাথে শ্বাস নিই, বেলুনের মতো ধীরে ধীরে।
  • যখন ইচ্ছা হবে, বলো কী হয়েছিল। আমি বুঝতে চাই।

বাচ্চার অনুভূতি মেনে নেবেন যেভাবে, সব আবদার না মেনেও

অনুভূতি মেনে নেওয়া মানে বাচ্চাকে বোঝানো, “তুমি যা অনুভব করছো তা সত্যি, আর আমি তোমার পাশে আছি।” এর মানে এই নয় যে আপনি বলছেন সে-ই ঠিক, বা সে যা চায় তা দিয়ে দিচ্ছেন। রোজকার অনেক কথা না চাইতেই অনুভূতিকে উড়িয়ে দেয়; ছোট্ট কিছু বদল প্রায়ই কাজে দেয়।

অনুভূতি উড়িয়ে না দিয়ে যা বলে দেখতে পারেন
এর বদলেবলে দেখুন
“কান্না থামাও, কিছুই হয়নি।”“খুব লেগেছে, তাই না? এদিকে এসো।”
“ছেলেরা কাঁদে না।”“কাঁদতে পারো, সমস্যা নেই। কাঁদলে কষ্টটা বের হয়ে যায়।”
“ভয়ের কিছু নেই।”“ভয় লাগছে, বুঝতে পারছি। চলো একসাথে দেখি।”
“এত নাটক করছো কেন?”“এই মুহূর্তে ব্যাপারটা তোমার কাছে অনেক বড় লাগছে।”
“আর কাঁদলে আজ টিভি বন্ধ।”“মন খারাপ হতেই পারে, তবু আমার উত্তর বদলাবে না।”
“এখনই সরি বলো!”“আগে একটু শান্ত হই। তারপর মিটিয়ে নেব।”

বাংলা আর ইংরেজিতে শিশুর অনুভূতি বুঝতে শেখানো

যে বাচ্চার কাছে অনুভূতির শব্দ আছে, তাকে প্রায়ই কান্না বা মারামারি দিয়ে সেটা কম দেখাতে হয়। আবেগ প্রকাশ করতে শেখানো তাই শুরু হয় শব্দ দিয়ে। অনেক বাংলাদেশি বাচ্চা বাসায় আর স্কুলে দুই ভাষাই শোনে, যেকোনোটাতেই চলে; তবে অনুভূতির কথা বলতে ঘরের ভাষাটাই প্রায়ই সবচেয়ে আপন লাগে। অল্প কয়েকটা শব্দ দিয়ে শুরু করুন, বয়সের সাথে সাথে বাড়ান।

শিশুদের অনুভূতির চার্ট: বয়স অনুযায়ী শেখানোর মতো শব্দ
বয়সঅনুভূতির শব্দবাচ্চা যেভাবে বলতে পারে
২–৩ বছরখুশি, মন খারাপ, রাগ, ভয়“আমার মন খারাপ। কোলে নাও।”
৪–৫ বছরআনন্দে লাফানো, চিন্তা, হিংসা, লজ্জা, গর্ব“নতুন ক্লাস নিয়ে আমার চিন্তা লাগছে।”
৬–৮ বছরহতাশ, বিরক্ত, বাদ পড়ার কষ্ট, লজ্জা, নার্ভাস“টিফিনের সময় কেউ আমাকে খেলায় নেয়নি। খুব একা লাগছিল।”
৯–১২ বছরঅভিমান, চাপে দিশেহারা লাগা, অপরাধবোধ, একাকীত্ব, মিশ্র অনুভূতি“বেড়াতে যাব বলে খুশি, আবার একটু ভয়ও লাগছে।”

অনুভূতি বোঝার দক্ষতা বাড়ানোর সহজ কিছু খেলা

  • অনুভূতির মুখ: একটা কাগজে ৪–৬টা মুখ এঁকে ফ্রিজে লাগিয়ে দিন; নাশতার সময় বা ঘুমের আগে সবাই আঙুল দিয়ে দেখাক কার কেমন লাগছে।
  • মনের আবহাওয়া: জিজ্ঞেস করুন, “আজ ভেতরে রোদ, মেঘ, বৃষ্টি, নাকি ঝড়?” যে বাচ্চা কথা বলতে চায় না, সে-ও প্রায়ই একটা আবহাওয়া বেছে নেয়।
  • গল্পের অনুভূতি: গল্প বা কার্টুনের মাঝে থেমে জিজ্ঞেস করুন, “ওর কেমন লাগছিল বলে মনে হয়? ও কী করতে পারত?” বাচ্চার মনের কথা বোঝার উপায় হিসেবেও এটা সহজ, কারণ বাচ্চা প্রায়ই নিজের চেয়ে গল্পের চরিত্রকে নিয়ে বেশি কথা বলে।
  • নিজের কথা: ছোট ছোট করে নিজের অনুভূতি মুখে বলুন: “জ্যামে খুব বিরক্ত লাগছে। একটা গান চালাই।”

শান্ত হওয়ার কৌশল, শুরু হোক আপনার নিজের শান্ত থাকা দিয়ে

শিশুর আবেগ সামলাতে সাহায্য করার উপায়গুলোর বড় অংশই আসলে আপনার নিজের শান্ত থাকা। ছোট বাচ্চারা শান্ত হয় বড়দের শান্ত ভাব “ধার” করে: ধীর গলা, স্থির মুখ, পিঠে একটা হাত। খেয়াল করুন কখন আপনার নিজের মেজাজ চড়ে যায়, যেমন খিদে পেলে, লম্বা জ্যাম পেরিয়ে এলে বা কোনো আত্মীয়ের মন্তব্যে, আর সেই মুহূর্তগুলোর জন্য একটু থামার পরিকল্পনা রাখুন।

  • বেলুন শ্বাস: পেটের ভেতর বেলুন ফোলানোর মতো ধীরে শ্বাস নাও, তারপর আরও ধীরে ছেড়ে দাও। ছোটরা টিস্যু বা পালকে ফুঁ দিতে পারে।
  • চেপে ধরা: নরম বল বা কুশন চেপে ধরা, দুই হাতের তালু জোরে একসাথে চাপা, বা শক্ত করে জড়িয়ে ধরা।
  • ঠান্ডা পানি আর গোনা: এক গ্লাস পানি, তারপর চোখে পড়ছে এমন ৫টা জিনিস আর কানে আসছে এমন ৪টা শব্দ গোনা, যাতে মন আবার ঘরে ফিরে আসে।
  • নড়াচড়া: ১০ বার লাফানো, আপনার সাথে একটু হাঁটা, বা একটা গানের সাথে নাচ।
  • বাচ্চার নিজের বেছে নেওয়া নিরিবিলি একটা জায়গা, যা কখনো শাস্তির জায়গা নয়; ছোট বাসায় কীভাবে বানাবেন, তা আছে শান্ত হওয়ার কোণ বানানোর উপায় লেখায়।

নিজের মেজাজ চড়ে গেলে যা বলতে পারেন

  • আমার রাগ লাগছে। কথা বলার আগে আমি ৩ বার ধীরে শ্বাস নেব।
  • আমার এক মিনিট সময় লাগবে। রান্নাঘরে যাচ্ছি, এখনই ফিরে আসছি।
  • তখন আমি চিৎকার করেছিলাম। সরি। চলো আবার চেষ্টা করি।

সরে যাবেন শুধু তখনই, যখন বাচ্চা নিরাপদ। অনুভূতি নিয়ে যত কথাই বলুন, বাচ্চা প্রায়ই বেশি শেখে আপনাকে নিজের অনুভূতি সামলাতে দেখে। চিৎকার, হুমকি বা মারধরে হয়তো মুহূর্তটা থামে, কিন্তু সময়ের সাথে সাধারণত বড় অনুভূতি আর আচরণ দুটোই খারাপের দিকে যায়; শান্ত বিকল্পগুলো আছে মারধর ছাড়া শাসন লেখায়।

আমাদের বাসায় বড় অনুভূতি: মুরুব্বি, মেহমান আর “ছেলেরা কাঁদে না”

আমাদের অনেক বাসায় একটা বাচ্চাকে বড় করেন কয়েকজন আদরের মানুষ মিলে, আর এই আন্তরিকতা একটা বড় শক্তি। তবে রোজকার কয়েকটা অভ্যাস একটু ভেবে দেখার মতো:

  • “ছেলেরা কাঁদে না” আর “লক্ষ্মী মেয়েরা রাগ করে না”: প্রতিটা বাচ্চারই মন খারাপ, ভয় আর রাগ অনুভব করার অনুমতি দরকার, আর দরকার সেটা সামলানোর সাহায্য। কাঁদতে দিলে ছেলেরা দুর্বল হয়ে যায় না।
  • মেহমান আর আত্মীয়: সবার সামনে বাচ্চা ভেঙে পড়লে তাড়াতাড়ি চুপ করানোর চাপটা সত্যি। বাচ্চাকে নিরিবিলি একটা ঘরে নিয়ে যান; মেহমানদের সামনে বকা বা খেপানো সাধারণত অনুভূতিটা আরও বাড়িয়ে দেয়। মেহমান এলে বাচ্চা উল্টো লুকিয়ে গেলে বা চুপ হয়ে গেলে দেখুন লাজুক বাচ্চাকে সাহায্য করার উপায়।
  • দাদা-দাদি, নানা-নানি আর গৃহকর্মী অনেক সময় মিষ্টি, মোবাইল বা তাড়াতাড়ি অন্য দিকে মন ঘুরিয়ে কান্না থামান, ভালোবাসা থেকেই। সবাই বলতে পারেন এমন ২–৩টা কথা ঠিক করে নিন, যেমন “তোমার মন খারাপ। আমি আছি।”
  • ভয় দেখিয়ে থামানো: “ভূত আসবে” বা “পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে” বললে হয়তো এক মিনিট কান্না থামে, কিন্তু রেখে যেতে পারে লম্বা সময়ের ভয়। আদর দিয়ে থামানোই সাধারণত বেশি কাজে দেয়; রাতের ভয় নিয়ে আছে বাচ্চা অন্ধকারে ভয় পায় লেখায়।
  • নম্বর আর কোচিং: অনেক চোখের পানিই রেজাল্ট নিয়ে। নম্বরের আগে অনুভূতির কথা বলুন: “তোমার খারাপ লাগছে। তুমি তো অনেক খেটেছিলে।”
  • এক ঘরে অনেকে আর ছোট ফ্ল্যাট: যে বাচ্চা কয়েকজনের সাথে এক ঘরে থাকে, তার মন খারাপ নিয়ে একা বসার জায়গা নাও থাকতে পারে। জানালার পাশে একটা চেয়ার বা এক কোণে রাখা কুশন কয়েক মিনিটের জন্য তার নিজের হতে পারে।
  • বিশ্বাস আর পরিবার: অনেক পরিবার এই ধাপগুলোর পাশাপাশি ঘুমের আগে সন্তানের মনের শান্তির জন্য দোয়াও করেন।

বড় অনুভূতি সামলাতে ৭ দিনের পরিকল্পনা

শিশুর আবেগ সামলাতে সাহায্য করার উপায় জানা এক জিনিস; আপনার বাচ্চার বেলায় কোনটা কাজ করে, তা বুঝতে লাগে এক সপ্তাহের নোট। প্রতিদিন এক লাইন লিখুন: অনুভূতিটা কী ছিল, ঠিক আগে কী ঘটেছিল, কতক্ষণ চলল, আর কী কাজে দিল।

  1. দিন ১: কিছুই বদলাবেন না। শুধু প্রতিটা বড় অনুভূতির জন্য লাইনটা লিখুন, দিনের কোন সময়ে হলো সেটাসহ।
  2. দিন ২: বারবার যা হচ্ছে তা খুঁজুন, যেমন কোচিংয়ের পর খিদে বা খেলা থেকে হোমওয়ার্কে যাওয়ার সময়, আর একটা কারণ সহজ করুন।
  3. দিন ৩: একসাথে অনুভূতির চার্ট বানান, ৩টা অনুভূতির শব্দ শেখান; নিজের বেলাতেও ব্যবহার করুন।
  4. দিন ৪: সবার মন ভালো থাকার সময় একটা কৌশল অনুশীলন করুন, যেমন বেলুন শ্বাস, যতক্ষণ না সেটা খেলার মতো লাগে।
  5. দিন ৫: পরের বড় অনুভূতিতে ওপরের ধাপগুলো কাজে লাগান, নিজেকে স্থির করা থেকে সীমায় অটল থাকা পর্যন্ত।
  6. দিন ৬: ঘুমের আগে বা রিকশায় যেতে যেতে দিনের একটা অনুভূতি নিয়ে কথা বলুন, তার বা আপনার।
  7. দিন ৭: দিন ১-এর সাথে মিলিয়ে দেখুন: কতবার ঝড় উঠল, কতক্ষণ চলল, কত তাড়াতাড়ি শান্ত হলো, আর কী কাজে দিল। যা কাজে দিয়েছে তা রাখুন, পরের সপ্তাহের ধাপটা বেছে নিন।

কখন বুঝবেন বাচ্চার আরও সাহায্য দরকার?

বড় হতে হতে, শব্দ আর কৌশল শিখতে শিখতে বেশিরভাগ বাচ্চার বড় অনুভূতি সহজ হয়ে আসে। শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার উপায়ের একটা অংশ হলো সময়মতো সাহায্য নেওয়া। নিচের কোনোটি দেখলে বাচ্চার ডাক্তার, শিশু-মনোবিজ্ঞানী বা স্কুলের সাথে কথা বলুন:

এসব দেখলে সাহায্য নিন

  • কয়েক মাস ধরে বেশিরভাগ দিন রাগে-কান্নায় ফেটে পড়া, ঝড়গুলো কমার বদলে আরও লম্বা আর ঘন ঘন হওয়া, বা প্রায়ই মানুষ বা প্রাণীকে আঘাত করা।
  • কয়েক সপ্তাহ ধরে অনুভূতির কারণে রোজকার জীবন আটকে যাওয়া: স্কুলে যেতে না চাওয়া, ঠিকমতো না খাওয়া বা না ঘুমানো, খেলা বা বন্ধুদের সাথে মেলামেশা বন্ধ।
  • দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে বেশিরভাগ দিন মন খারাপ, খিটখিটে বা কান্নাভেজা, বা আগের পছন্দের কাজেও আর আনন্দ নেই। দুশ্চিন্তা পুরো মন দখল করে নিলে পড়ুন শিশুর দুশ্চিন্তা।
  • বাচ্চা নিজেকে আঘাত করে, বা রাগের মাথায়ও মরে যেতে চাওয়ার কথা বলে: শান্ত থাকুন, তার কাছাকাছি থাকুন। এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন; নইলে সেদিনই ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।
  • হঠাৎ পরিবর্তন: হাসিখুশি বাচ্চা হঠাৎ ভীত, আঁকড়ে থাকা বা চুপচাপ হয়ে গেছে, বা হঠাৎ নির্দিষ্ট কোনো মানুষ বা জায়গাকে ভয় পাচ্ছে। আলতো করে জিজ্ঞেস করুন, বাচ্চা যা বলে বিশ্বাস করুন, সেদিনই ব্যবস্থা নিন, আর এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
  • আপনার মনে হচ্ছে আর সামলাতে পারছেন না, বা ভয় হচ্ছে বাচ্চাকে আঘাত করে ফেলতে পারেন: শিগগিরই ডাক্তারের সাথে কথা বলুন, আর কেউ এই মুহূর্তে বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।

বড় অনুভূতি প্রায়ই এমন একটা ধারা মেনে চলে, যা এক-দুই সপ্তাহ ধরে দেখলে সহজে চোখে পড়ে। ParentMind আপনাকে প্রতিদিন কী হলো তা নোট করতে, বারবার যা হচ্ছে তা দেখতে আর গাইড পেতে সাহায্য করে: ParentMind কীভাবে কাজ করে।

বাবা-মায়েরা যা জানতে চান

বাচ্চার এত বড় বড় আবেগ কি স্বাভাবিক?

হ্যাঁ। বড় আবেগ শৈশবের স্বাভাবিক অংশ, কারণ অনুভূতি শান্ত করার দক্ষতা ধীরে ধীরে, কৈশোর পর্যন্ত গড়ে ওঠে। বাচ্চা ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত বা নতুন কোনো পরিবর্তনের মধ্যে থাকলে ঝড় প্রায়ই বেশি হয়। কয়েক মাস ধরে বেশিরভাগ দিন এমন হলে, রোজকার জীবন আটকে গেলে, বা বয়সের সাথে কমার বদলে বাড়তে থাকলে আরও খেয়াল করুন।

আবেগের সময় পাশে থেকে পথ দেখানো (ইমোশন কোচিং) কী?

এর মানে অনুভূতি থামিয়ে না দিয়ে তার ভেতর দিয়ে বাচ্চাকে পথ দেখানো। আপনি অনুভূতিটা খেয়াল করেন, নাম দেন, সত্যি বলে মেনে নেন, আর বাচ্চা শান্ত হলে একসাথে সমস্যার সমাধান খোঁজেন। আচরণের সীমা ঠিকই থাকে। বারবার এভাবে পথ দেখালে অনেক বাচ্চা ধীরে ধীরে নিজেই অনুভূতির নাম দিতে আর সামলাতে শেখে।

সব আবদার না মেনে কীভাবে বাচ্চার অনুভূতি মেনে নেব?

অনুভূতি আর সীমা একসাথে বলুন: “পার্ক শেষ হয়ে গেল বলে তোমার মন খারাপ, আর এখন বাসায় যাওয়ার সময়।” অনুভূতি মেনে নেওয়া মানে স্বীকার করা যে অনুভূতিটা সত্যি; বাচ্চার কথামতোই সব হবে, তা নয়। শান্ত থাকুন, কম কথা বলুন, আর নরমভাবে যা বলেছেন তা-ই করুন। উত্তর না বদলালেও, বাচ্চা বুঝতে পারলে যে আপনি তাকে বুঝেছেন, প্রায়ই তাড়াতাড়ি শান্ত হয়।

বাচ্চাকে কাঁদতে দেওয়া কি ঠিক?

হ্যাঁ। কান্না অনুভূতি বের করে দেওয়ার একটা সুস্থ উপায়, ছেলে-মেয়ে সবার জন্যই। কাছে থাকুন, আদর দিন, তাড়াহুড়া করে থামানোর বদলে কান্নাটা শেষ হতে দিন; বাচ্চা কাঁদার সময় কিছু সমাধান করতে হবে না। দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে বেশিরভাগ দিন কান্না হলে, বা সাথে মন খারাপ বা দুশ্চিন্তা থাকলে, বাচ্চার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

অনুভূতির চার্ট কি বাচ্চাদের কাজে দেয়?

প্রায়ই, হ্যাঁ। অনুভূতির চার্ট, মানে ফ্রিজে লাগানো আঁকা মুখের একটা কাগজ, বাচ্চাকে শব্দ শেখার আগেই নিজের অনুভূতি দেখানোর একটা উপায় দেয়। শান্ত সময়ে, যেমন নাশতার সময় বা ঘুমের আগে, চার্টে আঙুল দিয়ে দেখান, আর নিজের অনুভূতির বেলাতেও ব্যবহার করুন। ছোটদের জন্য ৪টা মুখ দিয়ে শুরু করুন, বয়স বাড়লে বাংলা বা ইংরেজিতে আরও শব্দ যোগ করুন।

কোন বয়সে বাচ্চারা নিজের আবেগ সামলাতে শেখে?

ধীরে ধীরে, পুরো শৈশব আর কৈশোর জুড়ে, কোনো একটা নির্দিষ্ট বয়সে নয়। ছোট বাচ্চার শান্ত হতে বড়দের সাহায্য লাগে; স্কুলবয়সী অনেক বাচ্চা মনে করিয়ে দিলে ধীরে শ্বাস নেওয়ার মতো কৌশল কাজে লাগাতে পারে; প্রি-টিন আর কিশোররা বেশিটা নিজে সামলায়, তবু কঠিন দিন আসে। বাচ্চাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা গড়ে ওঠে এভাবেই: প্রতিবার অনুভূতির ভেতর দিয়ে আপনি পথ দেখালে একটু একটু করে।

বাচ্চার আবেগ নিয়ে কখন চিন্তা করব?

যখন অনুভূতি রোজকার জীবন দখল করে নেয় বা অনেক দিন ধরে চলে। কয়েক মাস ধরে বেশিরভাগ দিন রাগে-কান্নায় ফেটে পড়লে, দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় বেশিরভাগ দিন মন খারাপ বা খিটখিটে থাকলে, বা কয়েক সপ্তাহ ধরে স্কুল, খাওয়া বা ঘুম আটকে গেলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। বাচ্চা নিজেকে আঘাত করলে বা তার কথা বললে শান্ত থাকুন, কাছে থাকুন: এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন, নইলে সেদিনই ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।

নিজের সন্তানের সাথে চেষ্টা করে দেখুন

ParentMind প্রতিদিনের একটি ছোট নোট রাখে আর দেখায় — আপনার সন্তানের নিজের সংখ্যায় — একটি পরিবর্তন কাজে লাগছে কি না।

বিনামূল্যে নাম লিখুন। ক্রেডিট কার্ড লাগবে না। আপনার তথ্য গোপন থাকবে।