মূল কনটেন্টে যান

আপনার ৩ বছরের সন্তান: বিকাশ, আচরণ, ঘুম, খেলা আর কোনটা স্বাভাবিক

ছোট করে উত্তর

৩ বছরের বাচ্চার বিকাশ ও আচরণ সাধারণত এমন: সব কিছুতেই ‘আমি নিজে করব’; বেশির ভাগ দৌড়াতে, বেয়ে উঠতে আর তিন চাকার সাইকেল চালাতে পারে, ছোট বাক্যে এমন কথা বলে যা পরিবারের লোকজন বোঝে, আর কল্পনার খেলা খেলে। জেদ আর বিদায়ের সময় আঁকড়ে ধরা খুব সাধারণ। বেশির ভাগের দুপুরের ঘুমসহ ২৪ ঘণ্টায় ১০–১৩ ঘণ্টা ঘুম দরকার, আর ভালো মানের স্ক্রিন দিনে বড়জোর ১ ঘণ্টা। আগে পারত এমন দক্ষতা হারিয়ে গেলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।

ParentMind টিমের লেখা১৩ মিনিটের পড়া

লেখাটি শুনুন

১৮ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া

এক নজরে

কাদের জন্য
৩ বছর বয়সী বাচ্চার বাবা-মা: বাচ্চা বাসায় থাকুক বা প্লে গ্রুপে যাওয়া শুরু করুক
মূল কথা
  • বেশির ভাগ ৩ বছরের বাচ্চা দৌড়ায়, বেয়ে ওঠে, তিন চাকার সাইকেল চালায়, ছোট বাক্যে কথা বলে, অফুরন্ত প্রশ্ন করে আর অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে শুরু করে; প্রত্যেকে নিজের গতিতে।
  • ৩ বছরে ‘না!’, জেদ আর বিদায়ের সময় আঁকড়ে ধরা খুব সাধারণ; শান্ত, প্রতিদিন একই রকম নিয়ম আর মোটামুটি একই রুটিনে সাধারণত কমে আসে।
  • বেশির ভাগ ৩ বছরের বাচ্চার দরকার দুপুরের ঘুমসহ ২৪ ঘণ্টায় ১০–১৩ ঘণ্টা ঘুম, দিনে অন্তত ১৮০ মিনিট নড়াচড়া, আর বড়জোর ১ ঘণ্টা ভালো মানের স্ক্রিন।
  • আগে পারত এমন দক্ষতা হারিয়ে গেলে, পরিবারের লোকজন বাচ্চার কথা খুব কম বুঝলে, বা মানুষের প্রতি আগ্রহ কম দেখালে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।

৩ বছরের বাচ্চার বিকাশ ও আচরণ বুঝতে গেলে আগে মেনে নিতে হয়, এই বয়সটা প্রশ্ন, মতামত আর কল্পনার খেলায় ভরা। এক মুহূর্তে বাচ্চা আপনাকে মিছিমিছি চা বানিয়ে খাওয়াচ্ছে, পরের মুহূর্তে কলা ভেঙে গেছে বলে মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছে। দুটোই স্বাভাবিক। ৩ বছর কথা, কল্পনা আর স্বাধীনতা দ্রুত বেড়ে ওঠার বছর, আর ‘আমি নিজে করব’ ইচ্ছাটা প্রায়ই দক্ষতার চেয়ে আগে আগে ছোটে।

এই লেখাকে পরীক্ষা নয়, গাইড হিসেবে নিন। নিচে পাবেন: ৩ বছরের বাচ্চার কাছে কী আশা করবেন, বেশির ভাগ কী পারে, কোন আচরণ স্বাভাবিক, ঘুম, খাবার আর স্ক্রিন, ছোট ফ্ল্যাটে খেলার আইডিয়া, বাংলাদেশে প্লে গ্রুপ, একটা দিনের নমুনা, ৭ দিনের পরিকল্পনা, আর কখন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলবেন।

৩ বছরের বাচ্চার বিকাশ ও আচরণ: এই বয়সে কী কী পারে?

প্রতিটি সারিতে আছে তৃতীয় জন্মদিনের আশপাশে বেশির ভাগ বাচ্চা যা করে। এটাকে সময়সীমা নয়, দিক-নির্দেশনা হিসেবে পড়ুন: এক দিকে এগিয়ে আর আরেক দিকে পিছিয়ে থাকা খুব সাধারণ।

বেশির ভাগ ৩ বছরের বাচ্চা যা করে, আর আপনি কীভাবে সাহায্য করতে পারেন (মোটামুটি ধারণা)
দিকবেশির ভাগ ৩ বছরের বাচ্চা যা করেআপনি কীভাবে সাহায্য করতে পারেন
শরীরদৌড়ায়, বেয়ে ওঠে, দুই পায়ে লাফায়, বলে লাথি দেয়; অনেকে তিন চাকার সাইকেল চালায় আর পা বদলে বদলে সিঁড়ি দিয়ে ওঠে; বইয়ের পাতা একটা একটা করে ওল্টায়; দেখিয়ে দিলে গোল আঁকেপ্রতিদিন দৌড়ঝাঁপ, বেয়ে ওঠা আর বল খেলা; মোম রং, বড় টুকরার পাজল আর খেলার মাটি
কথাছোট বাক্যে কথা বলে; পরিবারের লোকজন আর চেনা মানুষেরা বেশির ভাগ কথা বোঝেন; ‘কে?’, ‘কী?’, ‘কোথায়?’, ‘কেন?’ জিজ্ঞেস করে; নিজের নাম বলতে পারেপ্রশ্নের সহজ উত্তর দিন, ওর কথার সঙ্গে এক-দুটো শব্দ জুড়ে বলুন, আর প্রতিদিন একসঙ্গে ছড়া বলুন ও ছবির বই দেখুন
ভাবনা ও শেখাকল্পনার খেলা খেলে, যেমন পুতুলকে খাওয়ানো বা আপনার জন্য ভাত রান্না; সহজ পাজল মেলায়; রং বা আকার দেখে জিনিস আলাদা করে; ‘ভেতরে’, ‘ওপরে’, ‘নিচে’ বোঝে; দুই ধাপের নির্দেশ মানে‘চামচটা কাপের ভেতরে রাখো, তারপর আমার কাছে নিয়ে এসো’ খেলুন; একসঙ্গে মোজা, চামচ আর খেলনা আলাদা করুন
বন্ধুঅন্য বাচ্চাদের খেয়াল করে, খেলায় যোগ দেয়; পাশাপাশি খেলে, একসঙ্গে খেলাও শুরু করে; সাহায্য পেলে পালা করে খেলে; ভাগাভাগি এখনো কঠিনচাচাতো ভাই-বোন বা প্রতিবেশীর সঙ্গে অল্প সময়ের খেলা; পালা করে খেলুন আর মুখে বলুন: ‘আমার পালা, তোমার পালা’
অনুভূতিনানা রকম অনুভূতি দেখায়; জেদ এখনো সাধারণ; বিদায়ের সময় আঁকড়ে ধরতে পারে, তবে চেনা কারও কাছে শান্ত হয়ে যায়; বন্ধু কাঁদলে মন খারাপ করেঅনুভূতির নাম মুখে বলুন; বিদায় ছোট আর আদরের রাখুন; দিনের ক্রম মোটামুটি একই রাখুন
নিজের কাজ নিজেচামচে বা হাতে নিজে খায়; ঢিলেঢালা জামা নিজে টেনে পরে; সাহায্য নিয়ে হাত ধোয়; অনেকে টয়লেট ব্যবহার শিখছেধীরে হলেও আগে নিজে চেষ্টা করতে দিন; জুতা র‍্যাকে রাখার মতো ছোট কাজ দিন

অনেক ৩ বছরের বাচ্চা এখনো রং গুলিয়ে ফেলে, বোতাম লাগাতে পারে না, কিছু শব্দ অস্পষ্ট বলে; এগুলো সাধারণ। তবে যে কোনো বয়সে আগে পারত এমন দক্ষতা হারিয়ে গেলে দেরি না করে দেখিয়ে নিন। পুরো ছবিটা দেখুন বয়স অনুযায়ী শিশুর বিকাশের ধাপ লেখায়, আর সামনের বছরের জন্য পড়ুন ৪ বছরের বাচ্চার বিকাশ ও আচরণ।

৩ বছরের শিশুর স্বাভাবিক আচরণ: কোনটা চিন্তার নয়?

৩ বছরের বাচ্চা এখন নিয়ম বোঝে, আর ইচ্ছা করেই সেগুলো ভেঙে দেখে কী হয়। ৩ বছরের বাচ্চার বিকাশ ও আচরণ নিয়ে বাবা-মায়ের যত চিন্তা, তার বেশির ভাগই বেড়ে ওঠার সাধারণ অংশ:

  • প্রায় সব কিছুতে ‘না!’, আর আপনি কী করেন দেখতে উল্টোটা করা। দুই বছরের আশপাশে শুরু হওয়া ‘নিজে করব’ ঝোঁক প্রায়ই তিন বছরেও চলে; দেখুন ২ বছরের বাচ্চার জেদ ও আচরণ।
  • ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, তাড়াহুড়ায় থাকলে বা ‘না’ শুনলে জেদ আর কান্নাকাটি। বেশির ভাগ কয়েক মিনিটের মধ্যেই থেমে যায়; ধাপগুলো পাবেন ছোট বাচ্চার জেদ আর কান্নাকাটিতে কী করবেন লেখায়।
  • প্রথমবার বললেই না শোনা, বিশেষ করে খেলার মাঝখানে; শান্তভাবে কথা শোনানোর উপায় দেখুন বাচ্চা কথা শোনে না, কী করবেন লেখায়।
  • অফুরন্ত ‘কেন?’, প্রায়ই একই প্রশ্ন বারবার। বারবার জিজ্ঞেস করেই ৩ বছরের বাচ্চা মনে রাখে; ছোট, সহজ একটা উত্তরই যথেষ্ট।
  • বিদায়ের সময় আঁকড়ে ধরা আর কান্না, বিশেষ করে নতুন কারও কাছে রেখে গেলে বা প্লে গ্রুপের শুরুতে; দেখুন বাচ্চা মাকে ছাড়তে না চাইলে কী করবেন।
  • রেগে গেলে খেলনা কেড়ে নেওয়া বা ধাক্কা দেওয়া; সাধারণত ২ বছরের চেয়ে কম, আর কথা যত বাড়ে তত কমে।
  • কল্পনা আর সত্যি গুলিয়ে ফেলা, কল্পনার বন্ধু, আর অন্ধকার, কুকুর বা জোরে আওয়াজের নতুন ভয়। ভয় নিয়ে হাসাহাসি না করে আদর দিয়ে সামলান।

৩ বছরের বাচ্চা যখন ‘না’ বলে বা রেগে-কেঁদে অস্থির হয়

  1. কোনো কিছু বদলানোর আগে আগেভাগে বলে রাখুন: ‘আর দুবার স্লিপারে নামবে, তারপর বাসা।’ হঠাৎ থামিয়ে দিলেই ৩ বছরে অনেক কঠিন মুহূর্ত তৈরি হয়।
  2. ‘করতেই হবে’ কাজটাকে খেলা বানিয়ে ফেলুন: বাথরুম পর্যন্ত দৌড় প্রতিযোগিতা, গোছানোর সময় একটা গান।
  3. এমন দুটো বিকল্প দিন, যার যে কোনোটা আপনি মেনে নিতে পারবেন; তাতে বাচ্চা একটু নিয়ন্ত্রণ পায়।
  4. জেদ শুরু হলে কাছে থাকুন, শান্ত থাকুন, কয়েকটা শব্দে অনুভূতির নাম বলুন, আর সবাইকে নিরাপদ রাখুন।
  5. একটা ছোট বাক্যে নিয়মটা বলুন, আর তাতেই অটল থাকুন। ৩ বছরের বাচ্চা অস্থির থাকলে লম্বা ব্যাখ্যা বুঝতে পারে না।
  6. শান্ত হলে জড়িয়ে ধরুন, তারপর এর পরে ও যে কাজটা ভালো করবে, সেটা খেয়াল করে প্রশংসা করুন।

যা বলতে পারেন

  • তুমি রাগ করেছ। আরও খেলতে চেয়েছিলে, তাই না?
  • আর দুবার স্লিপারে নামবে, তারপর আমরা বাসায় যাব।
  • লাল কাপ, না নীল কাপ? তুমি বেছে নাও।
  • গাড়িটা ছুড়তে দেব না। চাইলে নরম বলটা ছুড়তে পারো।
  • দেখি তো, কে আগে বাথরুমে পৌঁছায়!
  • আমি এখানেই আছি। ইচ্ছা হলে এসে জড়িয়ে ধরো।

৩ বছরের বাচ্চার ঘুম, খাবার আর স্ক্রিন: কতটা দরকার?

  • ঘুম: বেশির ভাগ ৩ বছরের বাচ্চার দুপুরের ঘুমসহ ২৪ ঘণ্টায় ১০–১৩ ঘণ্টা ঘুম দরকার। অনেকে এখনো দুপুরে খাওয়ার পরে ঘুমায়; যারা দুপুরের ঘুম ছেড়ে দেয়, তাদের সাধারণত রাতে একটু আগে ঘুমাতে হয়। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম আর রোজ একই ছোট রুটিন (হাত-মুখ ধোয়া, দাঁত ব্রাশ, গল্প, আদর) সন্ধ্যাগুলো সহজ করে।
  • খাবার: ৩ বছরের বাচ্চা পরিবারের সবার খাবারই খেতে পারে, ঝাল আর লবণ একটু কমিয়ে; তিন বেলা খাবার আর দুবার নাশতা, আর পান করার জন্য পানি। খিদে প্রায়ই দিনে দিনে ওঠানামা করে, আর নতুন খাবার অনেকবার সামনে দিতে হতে পারে; দেখুন বাচ্চা খেতে না চাইলে কী করবেন।
  • নিরাপদে খাওয়া: মোটামুটি ৫ বছর পর্যন্ত আঙুর আর ছোট টমেটো লম্বালম্বি চার টুকরা করে দিন, আস্ত চিনাবাদাম, চানাচুর আর শক্ত লজেন্স দেবেন না, আর খাওয়ার সময় বসিয়ে রাখুন। বাচ্চার গলায় খাবার আটকে যদি শ্বাস নিতে, কাশতে বা কাঁদতে না পারে, সাথে সাথে ৯৯৯-এ ফোন করুন, আর জানা থাকলে গলায় খাবার আটকানোর প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করুন।
  • স্ক্রিন: শিশু-স্বাস্থ্য নির্দেশনা বলে, ২–৫ বছরের বাচ্চার জন্য দিনে বড়জোর ১ ঘণ্টা ভালো মানের কিছু, সম্ভব হলে আপনার সঙ্গে বসে দেখা; খাওয়ার সময় আর ঘুমের আগের এক ঘণ্টায় কোনো স্ক্রিন নয়। কার্টুনের চেয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলে আর খেলে বাচ্চা সাধারণত বেশি শব্দ শেখে।
  • নড়াচড়া: ৩–৪ বছরের বাচ্চার দিনে অন্তত ১৮০ মিনিট নড়াচড়া দরকার, সারাদিন মিলিয়ে। যে কোনো নড়াচড়াই হিসাবে ধরা যায়: দোকান পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া, নাচ, বেয়ে ওঠা, বুদবুদের পেছনে ছোটা।

ছোট ফ্ল্যাটে ৩ বছরের বাচ্চার খেলা ও কাজ

৩ বছরের বাচ্চা হাতে-কলমে করে শেখে, আর সবচেয়ে ভালো খেলায় প্রায় কোনো খরচই নেই। এই আইডিয়াগুলো ঢাকার ফ্ল্যাটেও চলে:

  • সাবান-পানি দিয়ে বানানো বুদবুদ: বড় কেউ ফুঁ দেবে, বাচ্চা দৌড়ে গিয়ে ফাটাবে।
  • কুশনের পাহাড়: জানালা থেকে দূরে, ফাঁকা মেঝেতে কুশন জড়ো করে বেয়ে ওঠা আর গড়িয়ে নামা।
  • পশুপাখির মতো হাঁটা: ব্যাঙের মতো লাফ, হাঁসের মতো হেলেদুলে চলা, হাতির মতো ধুপধাপ।
  • রান্নাঘরের ব্যান্ড: স্টিলের হাঁড়ি, ঢাকনা আর কাঠের চামচ দিয়ে বাজনা।
  • রান্নাবাটি: ছোট হাঁড়ি-পাতিল আর আটার খেলার মাটি দিয়ে মিছিমিছি রান্না: ‘আম্মু, তোমার ভাত হয়ে গেছে!’
  • অগভীর গামলায় পানি নিয়ে খেলা, বড় কেউ ঠিক পাশে বসে থাকবে: ঢালা, পুতুলের জামা ধোয়া, পাতা ভাসানো।
  • ‘আয় আয় চাঁদ মামা’ বা ‘টুইংকল টুইংকল’-এর মতো ছড়া, হাত নেড়ে নেড়ে; সঙ্গে সত্যিকারের কাজ: আলু ধোয়া, টেবিলে চামচ নিয়ে যাওয়া।

বাংলাদেশি পরিবারে ৩ বছর: প্লে গ্রুপ, অনেকের আদর আর দুই ভাষা

৩ বছরেই প্লে গ্রুপ, নাকি আরেকটু বাসায়?

বাংলাদেশে কিছু স্কুল ৩ বছরের আশপাশেই প্লে গ্রুপে ভর্তি নেয়; কোথাও শুরু হয় ৪ বছরে নার্সারি বা ৫ বছরে কেজি দিয়ে, তাই বয়স আর ভর্তির নিয়মের জন্য স্কুলের নিজের নোটিশ দেখে নিন। ৩ বছরে বাসায় থাকাও একদম ঠিক আছে। স্কুলে গেলে ছোট, খেলাভিত্তিক দিন আর আন্তরিক শিক্ষক খুঁজুন, বিদায়ের অনুশীলন করুন, আর প্রথম কয়েক সপ্তাহ একটু কান্নাকাটি হতে পারে ধরে নিন। কোনো ৩ বছরের বাচ্চার হাতের লেখার অনুশীলন বা ভর্তি কোচিং লাগে না।

দাদা-দাদি আর গৃহকর্মী যখন সব করে দেন

অনেক যৌথ পরিবারে ৩ বছরের বাচ্চাকে যিনি কাছে থাকেন তিনিই খাইয়ে দেন, কোলে নেন, জামা পরিয়ে দেন; প্রায়ই খাওয়ার সময় কার্টুন চলে। এটা ভালোবাসা থেকেই, কিন্তু এতে প্রতিদিনের চর্চাটা হারিয়ে যায়। দুটো কাজ ঠিক করুন যা বাচ্চা এখন নিজে করবে, যেমন নিজের হাতে বা চামচে খাওয়া আর স্যান্ডেল পরা; আর দাদা-দাদি ও গৃহকর্মীকে অনুরোধ করুন একটু অপেক্ষা করে ওকে চেষ্টা করতে দিতে। টয়লেটের শব্দ আর নিয়মও সবাই মিলে এক রাখুন; সহজ পরিকল্পনা পাবেন বাচ্চার টয়লেট ট্রেনিং লেখায়।

বাংলা, ইংরেজি আর বেশি কথা বলা চাচাতো ভাই

অনেক ৩ বছরের বাচ্চা বাসায় বাংলা শোনে, ইউটিউবে ইংরেজি ছড়া, আর দাদা-দাদির মুখে আঞ্চলিক ভাষা; প্রায়ই এক বাক্যেই সব মিশিয়ে ফেলে। এটা স্বাভাবিক: সব ভাষায় বলা শব্দ একসঙ্গে গুনুন। আত্মীয়রা চাচাতো ভাই-বোনের সঙ্গে তুলনা করলে মনে রাখবেন, প্রত্যেক বাচ্চার নিজের সময় আছে। ৩ বছরের আশপাশেও পরিবারের লোকজন বাচ্চার কথা খুব কম বুঝলে পড়ুন বাচ্চা দেরিতে কথা বললে কী করবেন, আর ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।

৩ বছরের শিশুর রুটিন: একটা দিনের নমুনা

প্রতিটি পরিবারের দিন আলাদা; এই উদাহরণটা বাসায় থাকা এমন এক ৩ বছরের বাচ্চার, যে এখনো দুপুরে ঘুমায়। নিজের পরিবারের সুবিধামতো সময় সরিয়ে নিন, কিন্তু ক্রমটা মোটামুটি একই রাখুন।

৩ বছরের বাচ্চার একটা দিনের নমুনা (একটা উদাহরণ; সময় নিজের মতো বদলে নিন)
সময়কী হয়
সকাল ৭টার দিকেঘুম থেকে ওঠা, টয়লেট বা ডায়াপার বদলানো, মুখ ধোয়া, একসঙ্গে দাঁত ব্রাশ
সকাল সাড়ে ৭টানাশতা: সুজি, ডিম দিয়ে রুটি বা খিচুড়ি, আর একটু ফল
সকাল ৯টাবড় কারও সঙ্গে বাইরে: ছাদ, পার্ক বা দোকান পর্যন্ত হাঁটা
সকাল সাড়ে ১০টানাশতা, তারপর কল্পনার খেলা, খেলার মাটি বা পাজল
দুপুর সাড়ে ১২টাদুপুরের খাবার: ভাত, ডাল, মাছ বা ডিম, আর নরম সবজি
দুপুর দেড়টাআলো কমানো ঘরে দুপুরের ঘুম বা শান্ত বিশ্রাম
বিকেল ৪টানাশতা, তারপর দৌড়ঝাঁপ: নাচ, বুদবুদ, ছোঁয়াছুঁয়ি
সন্ধ্যা ৬টাহাত-মুখ ধোয়া, শান্ত খেলা আর বই; স্ক্রিন টাইম থাকলে, একসঙ্গে বসে, এখানেই
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টাপরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার
রাত সোয়া ৮টাদাঁত ব্রাশ, একটা গল্প, একটু আদর, ঘুমের দোয়া বা গান, তারপর বাতি নেভানো

৩ বছরের বাচ্চা দুপুরের ঘুম ছেড়ে দিলে দুপুরে খাওয়ার পরে একটু শান্ত বিশ্রাম রাখুন, আর রাতে ঘুমের সময় একটু এগিয়ে আনুন। পরিবারে রাতের খাবার দেরিতে হলে বাচ্চাকে আগে খাইয়ে দিন, যাতে ঘুমের সময় রাত ৯টা পেরিয়ে না যায়।

৩ বছরের বাচ্চার সঙ্গে শান্ত দিনের জন্য ৭ দিনের পরিকল্পনা

একটা পরিবর্তন বেছে নিন, প্রতিদিন কী হচ্ছে লিখে রাখুন, আর এক সপ্তাহ পরে মিলিয়ে দেখুন।

  1. দিন ১: প্রতিটি ‘না!’ বা জেদ লিখে রাখুন: কখন, কোথায়, আর ঠিক আগে কী হয়েছিল।
  2. দিন ২: রাতের ঘুম আর দুপুরের ঘুম বা বিশ্রামের একটা করে সময় ঠিক করুন, আর ছুটির দিনেও তা মেনে চলুন।
  3. দিন ৩: প্রতিটি পরিবর্তনের আগে আগেভাগে বলুন: ‘আর দুই মিনিট, তারপর গোসল।’
  4. দিন ৪: দিনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে দুটো ছোট বিকল্প দিন।
  5. দিন ৫: ১০ মিনিট এমন খেলা খেলুন যেখানে বাচ্চা ঠিক করবে কী হবে; আপনার মোবাইল থাকবে দূরে।
  6. দিন ৬: একটা ‘আমি পারি’ কাজ বাচ্চার হাতে দিন, আর আপনার মূল দুই-তিনটা নিয়ম দাদা-দাদি আর গৃহকর্মীকে জানিয়ে দিন।
  7. দিন ৭: প্রথম দিনের নোটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন, আর যা দিনগুলো সহজ করেছে সেটা রেখে দিন।

৩ বছরের বাচ্চাকে নিয়ে কখন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলবেন

এক দিকে একটু পিছিয়ে থাকা বেশির ভাগ ৩ বছরের বাচ্চা পরে সমান হয়ে যায়, আর মনে প্রশ্ন থাকলে দেখিয়ে নেওয়া সহজ। নিচের কোনোটা দেখলে বাচ্চার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন:

এমন হলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন

  • আগে পারত এমন দক্ষতা হারিয়ে ফেলে, যেমন কথা, টয়লেটে যাওয়া বা খেলা। দেরি না করে দেখিয়ে নিন।
  • বেশির ভাগ ৩ বছরের বাচ্চা যা করে, তার কয়েকটা পারে না: যেমন পরিবারের লোকজন তার কথা খুব কম বোঝে, সহজ নির্দেশ মানতে পারে না বা কল্পনার খেলা খেলে না, অন্য মানুষের প্রতি আগ্রহ কম, বা প্রায়ই পড়ে যায় আর সিঁড়ি দিয়ে উঠতে খুব কষ্ট হয়।
  • শোনা বা দেখা নিয়ে চিন্তা: নাম ধরে ডাকলে প্রায়ই সাড়া দেয় না, টিভির আওয়াজ খুব বাড়িয়ে দেয় বা খুব কাছে গিয়ে বসে, চোখ কুঁচকে তাকায়, বা একটা চোখ ভেতরে বা বাইরে বেঁকে যায়।
  • প্রায় প্রতিদিন দিনে কয়েকবার জেদ হয়, প্রায়ই মোটামুটি ২৫ মিনিটের বেশি চলে, বা তখন বাচ্চা প্রায়ই নিজেকে বা অন্যকে আঘাত করে।
  • হঠাৎ নির্দিষ্ট কোনো মানুষ বা জায়গাকে ভয় পায়, বা বয়সের তুলনায় অনেক বেশি যৌন আচরণ বা জানাশোনা দেখায়। আলতো করে জিজ্ঞেস করুন, বাচ্চা যা বলে বিশ্বাস করুন, আর সেদিনই ব্যবস্থা নিন; এই মুহূর্তে বিপদে থাকতে পারে মনে হলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
  • মনে হয় আর পারছেন না, বা বাচ্চাকে আঘাত করে ফেলতে পারেন: বাচ্চাকে আরেকজন বড় মানুষের কাছে নিরাপদে রাখুন, একটু সরে যান, আর নিজের জন্য সাহায্য নিন। কারও এই মুহূর্তে বিপদ থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।

ParentMind-এ প্রতিদিনের কঠিন মুহূর্ত, ঘুম আর নতুন শেখা শব্দ লিখে রাখতে পারেন, যাতে এক-দুই সপ্তাহ পরে ধারাটা চোখে পড়ে; ParentMind কীভাবে কাজ করে দেখুন।

বাবা-মায়েরা যা জানতে চান

৩ বছরের বাচ্চা কী কী করতে পারে?

বেশির ভাগ ৩ বছরের বাচ্চা দৌড়াতে, বেয়ে উঠতে, দুই পায়ে লাফাতে আর তিন চাকার সাইকেল চালাতে পারে; ছোট বাক্যে এমন কথা বলে যা পরিবারের লোকজন বোঝে, অনেক প্রশ্ন করে, কল্পনার খেলা খেলে আর অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে শুরু করে। অনেকে নিজে খায় আর টয়লেট ব্যবহার শিখছে। এক দিকে একটু পিছিয়ে থাকা সাধারণত চিন্তার নয়।

৩ বছরের বাচ্চা কতটা কথা বলতে পারে?

বেশির ভাগ ৩ বছরের বাচ্চা ছোট বাক্যে কথা বলে আর ‘কে?’, ‘কী?’, ‘কেন?’ জিজ্ঞেস করে। পরিবার আর চেনা মানুষেরা সাধারণত বেশির ভাগ কথা বোঝেন, যদিও কিছু শব্দ এখনো অস্পষ্ট থাকে। ৩ বছরের আশপাশেও পরিবারের লোকজন বাচ্চার কথা খুব কম বুঝলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন; প্রায়ই প্রথম ধাপ হয় কানে শোনার পরীক্ষা।

৩ বছরের বাচ্চা কেন এমন করে, সব কিছুতে ‘না’ বলে?

‘না’ বলেই ৩ বছরের বাচ্চা নিজের আলাদা মানুষ হওয়ার অনুশীলন করে। এখন সে অনেক নিয়ম জানে, আর সেগুলো ভেঙে দেখে, বিশেষ করে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত বা তাড়াহুড়ায় থাকলে। এমন দুটো বিকল্প দিন যা আপনি মেনে নিতে পারবেন, কোনো কিছু বদলানোর আগে বলে রাখুন, কাজগুলোকে খেলা বানিয়ে ফেলুন, আর নিরাপত্তার জন্য অল্প কয়েকটা নিয়মে অটল থাকুন। কথা আর ধৈর্য যত বাড়ে, এটা সাধারণত তত কমে আসে।

৩ বছরের বাচ্চা এখনো টয়লেট শেখেনি, এটা কি স্বাভাবিক?

হ্যাঁ, অনেক ৩ বছরের বাচ্চা এখনো শিখছে। বেশির ভাগ বাচ্চা মোটামুটি ১৮ মাস থেকে ৩ বছরের মধ্যে তৈরি হওয়ার লক্ষণ দেখায়, আর তারপরও কয়েক মাস মাঝেমধ্যে কাপড় ভেজানো খুব সাধারণ। শান্তভাবে, তাড়াহুড়া ছাড়া এগোন; শাস্তি বা লজ্জা দেবেন না। প্রস্রাব বা পায়খানার সময় ব্যথা হলে, বা ৪ বছরের অনেক পরেও প্রায় প্রতিদিন দিনের বেলায় কাপড় ভেজালে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।

৩ বছর বয়সে বাচ্চাকে কী শেখানো উচিত?

পড়ার টেবিলে নয়, খেলা আর প্রতিদিনের কাজের মধ্যে শেখান: রান্নার সময় নতুন শব্দ, কাপড় গোছানোর সময় রং, সিঁড়ি গোনা, খেলায় পালা করা, আর নিজের পুরো নাম বলা। জুতা র‍্যাকে রাখার মতো ছোট কাজে স্বাধীনতা তৈরি হয়। অক্ষর আর লেখা অপেক্ষা করতে পারে; ৩ বছরে হাতের জোর বাড়ে খেলার মাটি, মোম রং আর পাজলে।

৩ বছরের শিশুর রুটিন কেমন হওয়া উচিত?

ভালো রুটিনে প্রতিদিন ক্রমটা একই থাকে: ঘুম থেকে ওঠা, নাশতা, বাইরে খেলা, নাশতা আর কল্পনার খেলা, দুপুরের খাবার, দুপুরের ঘুম বা শান্ত বিশ্রাম, দৌড়ঝাঁপ, সন্ধ্যায় হাত-মুখ ধোয়া, রাতের খাবার, তারপর গল্প দিয়ে শান্ত একটা ঘুমের সময়। দুপুরের ঘুমসহ ২৪ ঘণ্টায় ১০–১৩ ঘণ্টা ঘুমের লক্ষ্য রাখুন, আর ছুটির দিনেও ঘুমের সময় একই রাখুন।

এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।

প্রাক-স্কুল (৩–৫ বছর): আরও গাইড

প্রাক-স্কুল: সব গাইড

নিজের সন্তানের সাথে চেষ্টা করে দেখুন

ParentMind প্রতিদিনের একটি ছোট নোট রাখে আর দেখায় — আপনার সন্তানের নিজের সংখ্যায় — একটি পরিবর্তন কাজে লাগছে কি না।

বিনামূল্যে নাম লিখুন। ক্রেডিট কার্ড লাগবে না। আপনার তথ্য গোপন থাকবে।