মানুষের সামনে বাচ্চা জেদ করলে কী করবেন: বাজার, বিয়েবাড়ি আর আত্মীয়ের বাসা
ছোট করে উত্তর
মানুষের সামনে বাচ্চা জেদ করলে কী করবেন? বাসায় যেভাবে শান্ত থাকেন, ঠিক সেভাবেই, তবে আগে নিরাপত্তা। বাচ্চাকে রাস্তা, সিঁড়ি আর ভিড় থেকে সরিয়ে নিন, পাশে থাকুন, কম কথা বলুন, আর যে জিনিসের জন্য জেদ, সেটা দিয়ে দেবেন না। যাঁরা তাকিয়ে আছেন, তাঁদের অনেকেই এমন দিন পার করেছেন; মন দিন বাচ্চার দিকে। না থামলে শান্তভাবে চলে আসুন, আরেক দিন আবার চেষ্টা করবেন।
লেখাটি শুনুন
১৬ মিনিট শোনার · আপনার ডিভাইসের কণ্ঠে পড়া
এক নজরে
- কাদের জন্য
- ১–৬ বছরের বাচ্চার বাবা-মা: দোকান আর বাজারে, বিয়েবাড়ি আর দাওয়াতে, রাস্তায় আর আত্মীয়ের বাসায়
- মূল কথা
- মোটামুটি ১ থেকে ৫ বছরে মানুষের সামনে জেদ খুব সাধারণ: ভিড়, হইচই, অপেক্ষা, খিদে আর রাত জাগা, সবকিছুতেই জেদের সম্ভাবনা বাড়ে।
- আগে নিরাপত্তা: বাচ্চাকে রাস্তা, সিঁড়ি, চলন্ত সিঁড়ি আর ভিড় থেকে সরিয়ে নিন, তারপর শান্ত থাকুন, কম কথা বলুন, আর সীমাটা ধরে রাখুন।
- তাকিয়ে থাকা অচেনা মানুষ বা মন্তব্য করা আত্মীয়, যে-ই হোন, শান্ত একটা কথাই যথেষ্ট; আপনার মনোযোগ তাঁদের চেয়ে বাচ্চার বেশি দরকার।
- বেশির ভাগ কাজ আসলে বাসা থেকে বের হওয়ার আগেই: খাওয়া, ঘুম, ছোট একটা পরিকল্পনা, ছোট একটা ব্যাগ, আর দরকারে কীভাবে চলে আসবেন তা আগেই ঠিক করা।
বাসায় যে জেদ সামলানো যায়, মানুষের সামনে সেটাই দশ গুণ কঠিন মনে হয়। বাচ্চা সুপারশপের মেঝেতে গড়াগড়ি দিচ্ছে, বা কাজিনের বিয়েতে চিৎকার করছে, আর আপনি টের পাচ্ছেন সবার চোখ আপনার দিকে। মানুষের সামনে বাচ্চা জেদ করলে কী করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এমন হলে আপনি খারাপ মা-বাবা নন, আর বাচ্চাও খারাপ নয়। ১ থেকে ৫ বছরের বাচ্চারা যেখানেই থাকুক জেদ করে, আর ভিড়ের জায়গায় জেদ আরও বেশি হয়।
মানুষের সামনে জেদেরও একটা ধরন থাকে, আর অনেক জেদই ছোট বা কম করা যায়। নিচে পাবেন কেন এমন হয়, কী করবেন ও কী বলবেন, লোকের চাহনি সামলানো, বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা, রাস্তা আর ভিড়ে নিরাপত্তা, বিয়েবাড়ি আর দাওয়াত, আর ৭ দিনের একটা পরিকল্পনা। জেদ নিয়ে সাধারণ সব কথা পাবেন শিশুর জেদ কমানোর উপায় লেখায়।
বাচ্চারা মানুষের সামনে কেন বেশি জেদ করে?
মানুষের সামনে জেদের কারণ বাসার জেদের মতোই, শুধু তার সঙ্গে যোগ হয় বাড়তি চাপ। বাসার বাইরে ছোট বাচ্চা প্রায়ই একসঙ্গে কয়েকটা কারণের মুখে পড়ে:
- একসঙ্গে অনেক কিছু: জোরে গান, ঝলমলে আলো, ভিড়, আর অচেনা মানুষের গাল টিপে দেওয়া।
- অপেক্ষা: লাইন, যানজট, দাওয়াতে খাবারের জন্য লম্বা অপেক্ষা।
- খিদে আর ক্লান্তি: দুপুরে না ঘুমানো, দেরিতে রাতের খাবার, সারাদিনের কেনাকাটা।
- চোখের সামনে লোভনীয় জিনিস: খেলনা, চিপস আর বেলুন, ঠিক বাচ্চার চোখের উচ্চতায় সাজানো।
- আপনার মনোযোগ অন্যদিকে: কেনাকাটার তালিকায়, আত্মীয়দের দিকে, বা মোবাইলে।
- আপনার চাপ: সবাই দেখছে বলে আপনি যে অস্বস্তিতে আছেন, বাচ্চা প্রায়ই তা টের পায়, আর এতে ওর অস্থিরতা বাড়তে পারে।
ভিড় আর হইচইয়ের জায়গায় কিছু কান্নাকাটি আসলে কিছু পাওয়ার জন্য নয়; বাচ্চা তখন সবকিছুর চাপে দিশেহারা। জেদের সাধারণত একটা লক্ষ্য থাকে; দিশেহারা বাচ্চার দরকার নিরিবিলি জায়গা, কম কথা আর আদর।
মানুষের সামনে বাচ্চা জেদ করলে কী করবেন: ধাপে ধাপে
লক্ষ্য দর্শকদের জন্য তাড়াতাড়ি জেদ থামানো নয়; লক্ষ্য হলো বাচ্চাকে নিরাপদে এর মধ্য দিয়ে পার করা, আর ওকে এটা না শেখানো যে লোকের সামনে চিৎকার করলেই কাজ হয়।
- আগে নিরাপত্তা। রাস্তা, সিঁড়ি, চলন্ত সিঁড়ি, লিফট বা দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেলের কাছে বাচ্চাকে শক্ত করে ধরুন বা কোলে নিন। ভাঙতে পারে এমন জিনিস নাগাল থেকে সরিয়ে দিন।
- সম্ভব হলে একটু নিরিবিলি জায়গায় যান: দোকানের এক কোণে, দরজার বাইরে, পাশের একটা ঘরে বা একটা বেঞ্চে। টেনে-হিঁচড়ে নয়, শান্তভাবে কোলে করে নিয়ে যান।
- নিজের শরীরটা শান্ত করুন: একবার ধীরে শ্বাস নিন, গলা নামান, কাঁধ আলগা করুন। ভাবুন, এখানে শুধু আপনি আর আপনার বাচ্চা।
- ওর সমান উচ্চতায় বসুন, অল্প কথায় অনুভূতিটার নাম বলুন, তারপর চুপ করুন।
- সীমাটা ধরে রাখুন। খেলনা বা মিষ্টির জন্য জেদ হলে উত্তর ‘না’-ই থাকবে; এখন কিনে দিলে বাচ্চা শেখে, পরের বার লোকের সামনে আরও জোরে জেদ করতে হবে।
- কয়েক মিনিটে না কমলে শান্তভাবে চলে আসুন। দরকার হলে বাজারের ঝুড়ি রেখেই আসুন, বা আয়োজকদের বলুন একটু বাইরে যাচ্ছেন। চলে আসা শাস্তি নয়; নতুন করে শুরু করার সুযোগ।
- থেমে গেলে আবার কাছে টেনে নিন: জড়িয়ে ধরুন, একটু পানি দিন, আর কী হয়েছিল তা নিয়ে একটা নরম কথা বলুন। তারপর পারলে কাজটা শেষ করুন, নয়তো বাসায় ফিরুন।
বাচ্চাকে যা বলতে পারেন
- বেলুনটা তুমি খুব চাইছিলে। খুব রাগ হচ্ছে, না?
- আমি এখানেই আছি। একটু শান্ত না হওয়া পর্যন্ত আমরা এখানেই থাকব।
- উত্তর এখনো ‘না’। কিন্তু আমি তোমার সঙ্গেই আছি।
- ভেতরে অনেক শব্দ। চলো, একটু বাইরে যাই।
- গাড়ি থেকে নিরাপদ রাখতে তোমাকে কোলে নিচ্ছি।
- অনেক বড় রাগ হয়েছিল, আর তুমি সামলে নিয়েছ। একটু পানি খাবে?
লোকের সামনে যা করবেন না
অন্যরা দেখছে বলে চিৎকার করা, মারা, ভয় দেখানো বা কোনোমতে একটা চুক্তি করে দৃশ্যটা শেষ করার ইচ্ছা হয়। এর প্রতিটাই পরের বার লোকের সামনে জেদের সম্ভাবনা বাড়ায়। দুটো চেনা হুমকি একেবারে বাদ দিন: ‘তোমাকে এখানে রেখে চলে যাব’ আর ‘ওই আঙ্কেল তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে’। এতে বাচ্চা হয় শেখে আপনার কথার কোনো মানে নেই, নয়তো সত্যিই ভীষণ ভয় পায়। শিক্ষা দেওয়ার জন্যও ছোট বাচ্চাকে কখনো একা রেখে যাবেন না, এক মুহূর্তের জন্যও না। শান্তভাবে শাসনের উপায় পাবেন মারধর না করে শাসন লেখায়।
বাচ্চার জেদে লজ্জা পেলে: চাহনি আর মন্তব্য সামলাবেন যেভাবে
বাচ্চার জেদে লজ্জা পাওয়া স্বাভাবিক, আর অনেক সময় এটাই সবচেয়ে কঠিন অংশ। যাঁরা তাকিয়ে থাকেন, তাঁরা সাধারণত তিন রকম: যে বাবা-মায়েদের নিজেদের কঠিন দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে, যাঁরা শুধু কৌতূহলী, আর অল্প কয়েকজন যাঁরা বিচার করছেন। এই মুহূর্তে আপনার মনোযোগ দরকার শুধু আপনার বাচ্চার।
আমাদের দেশে মন্তব্যের সঙ্গে প্রায়ই উপদেশও আসে: ‘একটা চড় দিলেই ঠিক হয়ে যাবে’, ‘দিয়ে দাও না, বাচ্চা মানুষ’, ‘মা হয়ে ছেলেকে সামলাতে পারো না?’ তর্ক করার বা ব্যাখ্যা দেওয়ার দরকার নেই। ছোট্ট একটা ভদ্র কথা বলে আবার বাচ্চার দিকে ফিরুন, এটুকুই যথেষ্ট। আত্মীয়রা বারবার এমন বললে পড়ুন আত্মীয়স্বজনের মন্তব্য আর অযাচিত উপদেশ।
অন্য বড়দের যা বলতে পারেন
- ধন্যবাদ, আমরা ঠিক আছি। ওর একটু সময় লাগবে।
- জানি আপনি ভালো চেয়েই বলছেন। আমি আমার মতো করে সামলাচ্ছি।
- খালা, আমরা মারি না। শান্ত না হওয়া পর্যন্ত ওকে একটু বাইরে নিয়ে যাচ্ছি।
- এখন দিয়ে দিলে পরের বার আরও জোরে কাঁদবে। আমরা একটু অপেক্ষা করছি।
- ব্যাগটা একটু ধরবেন? খুব উপকার হয়।
বাইরে যাওয়ার আগে পরিকল্পনা: জেদের সম্ভাবনা কমানোর উপায়
মানুষের সামনে বাচ্চা জেদ করলে কী করবেন, তা জানা জরুরি; তবে থামানোর চেয়ে আগে থেকে ঠেকানো অনেক সহজ। ৬ বছরের কম বয়সী বাচ্চাকে নিয়ে কোথাও যাওয়ার আগে এই তালিকাটা একবার মিলিয়ে নিন:
- সময়টা ঠিক করুন: দুপুরের ঘুম আর খাওয়ার পরে, লম্বা দিনের শেষে নয়।
- ছোট রাখুন: পাঁচ জায়গা নয়, এক-দুই জায়গা। বড় কেনাকাটা ছোট বাচ্চাকে ছাড়া করলেই সাধারণত ভালো।
- বের হওয়ার আগেই পরিকল্পনাটা বলে দিন: ‘আমরা চাল আর ডিম কিনব। আজ খেলনা কিনব না। তারপর মাছ দেখব।’
- বাচ্চাকে একটা কাজ দিন: তালিকাটা ধরে রাখা, টমেটো বাছা, লিফটের বোতাম চাপা।
- ছোট একটা ব্যাগ গুছিয়ে নিন: পানি, নাশতা, ছবির বই বা প্রিয় একটা খেলনা, ভেজা টিস্যু আর এক সেট বাড়তি জামা।
- চলে আসার উপায় আগেই ঠিক করুন: জেদ শুরু হলে কে বাচ্চাকে বাইরে নিয়ে যাবেন, আর কখন বাসায় ফিরবেন।
| জায়গা | কেন কঠিন | যা প্রায়ই কাজে দেয় |
|---|---|---|
| দোকান, সুপারশপ বা বাজার | চোখের সামনে খেলনা আর চকলেট, লাইনে দাঁড়ানো | আগেই পরিকল্পনা বলা, একটা কাজ দেওয়া, তাড়াতাড়ি শেষ করা বা বাইরে গিয়ে দাঁড়ানো |
| বিয়ে বা গায়েহলুদ | জোরে গান, দেরিতে খাবার, শক্ত নতুন জামা | আগে খাইয়ে নেওয়া, মাঝে মাঝে নিরিবিলিতে বিরতি, আরামের জামা, একেবারে ক্লান্ত হওয়ার আগেই ফেরা |
| আত্মীয়ের বাসা বা দাওয়াত | অনেক বড় মানুষ, অন্য বাচ্চার খেলনা, ভিন্ন নিয়ম | নিরিবিলি একটা ঘর, চেনা একটা খেলনা, বাচ্চার দায়িত্বে নির্দিষ্ট একজন বড় মানুষ |
| রিকশা, সিএনজি, বাস বা যানজট | গরম, অপেক্ষা, এক জায়গায় আটকে থাকা | পানি, নাশতা, ছড়া আর ‘বলো তো কী দেখছি’ খেলা, পুরো পথ শক্ত করে ধরে রাখা |
| ডাক্তারের চেম্বারে অপেক্ষা | লম্বা অপেক্ষা, শরীর খারাপ লাগা | বই, নাশতা, করিডরে একটু হাঁটা, সম্ভব হলে ভিড় কম এমন সময়ে যাওয়া |
দোকানের বেশির ভাগ জেদ যদি কাউন্টারের খেলনা আর চকলেট নিয়ে হয়, ‘না’ ধরে রাখা সহজ করার কথাগুলো পাবেন বাচ্চা বায়না করলে কী করবেন লেখায়।
রাস্তা আর ভিড়ে বাচ্চাকে নিরাপদ রাখা
জেদের মাঝখানে বাচ্চা দৌড় দিতে পারে, পেছন দিকে নিজেকে ছুড়ে ফেলতে পারে, বা হাত ছাড়িয়ে নিতে পারে। ভিড়ের জায়গায় সবার আগে নিরাপত্তা, শেখানোরও আগে:
- রাস্তার কাছে বাচ্চার হাত বা কবজি ধরে রাখুন, বা কোলে নিন। চিৎকার করা বাচ্চাকে কখনো গাড়ি বা রিকশার পাশে ফুটপাতে নামিয়ে দেবেন না।
- রিকশা বা সিএনজিতে পুরো পথ ছোট বাচ্চাকে শক্ত করে ধরে রাখুন; পেছন দিকে নিজেকে ছুড়ে দিলে বাচ্চা পড়ে যেতে পারে।
- বাচ্চা অস্থির থাকলে চলন্ত সিঁড়ি, সিঁড়ি, বারান্দা আর খোলা ছাদ থেকে দূরে থাকুন।
- জমায়েতে একজন নির্দিষ্ট বড় মানুষ ঠিক করুন, যিনি সবসময় বাচ্চার দিকে চোখ রাখবেন, কারণ ভিড়ের মধ্যে সবাই ভাবে অন্য কেউ নিশ্চয়ই দেখছে। গ্রামের বাড়ির কাছে পুকুর বা নদী থাকলে মন খারাপ করে ছুটে যাওয়া ছোট বাচ্চা কয়েক মিনিটেই পানির কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
- ভিড়ের বাজার, মেলা বা বড় বিয়েতে যাওয়ার আগে সেদিনের পোশাকে বাচ্চার একটা ছবি তুলে রাখুন, আর ওর পকেটে আপনার ফোন নম্বর লেখা একটা কার্ড রাখুন।
- হারিয়ে গেলে কী করবে, সহজ করে শিখিয়ে দিন: ‘আমাকে দেখতে না পেলে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে, আর কোনো দোকানদার বা বাচ্চাসহ কোনো মাকে বলবে।’
- বাচ্চাকে খুঁজে না পেলে সঙ্গে সঙ্গে দোকানের লোক বা নিরাপত্তাকর্মীদের জানান, আর ৯৯৯-এ ফোন করুন।
আমাদের পরিবারে: বিয়েবাড়ি, দাওয়াত, ঈদের ভিড় আর লম্বা যাত্রা
আমাদের দেশে মানুষের সামনে সবচেয়ে বড় জেদগুলোর অনেকটাই হয় পারিবারিক অনুষ্ঠানে: লম্বা, শব্দে ভরা, অনেক রাত পর্যন্ত, আর চারপাশে কয়েক ডজন আত্মীয়। প্রতিটার জন্য কয়েকটা পরিকল্পনা:
বিয়েবাড়িতে বাচ্চা কান্নাকাটি করলে
বিয়েবাড়িতে খাবার প্রায়ই আসে অনেক রাতে, গান বাজে জোরে, আর নতুন জামা গায়ে কুটকুট করতে পারে। বের হওয়ার আগেই বাচ্চাকে খাইয়ে নিন, জমকালো জামার নিচে নরম কিছু পরান, আর কোলে একটু ঘুমানোর জন্য হালকা একটা শাল নিয়ে যান। শুরুতেই সবচেয়ে নিরিবিলি কোণটা খুঁজে রাখুন, মোটামুটি ঘণ্টাখানেক পরপর বাচ্চাকে নিয়ে একটু বাইরে যান, আর একেবারে ক্লান্ত হওয়ার আগেই ফিরে আসুন, খাবার পরিবেশন না হলেও।
আত্মীয়ের বাড়িতে বাচ্চার জেদ, বা দাওয়াতে
আত্মীয়ের বাসায় জেদ হলে সবার সামনে না সামলে বাচ্চাকে নিরিবিলি একটা ঘরে নিয়ে যান, তারপর একসঙ্গে ফিরে আসুন। চেনা একটা খেলনা সঙ্গে রাখুন, আর কোন ঘর আর কোন জিনিস ধরা যাবে না, তা গৃহকর্তার কাছ থেকে আগেই জেনে নিন। দাদি বা খালা যদি এগিয়ে এসে বাচ্চা যেটার জন্য কাঁদছিল সেটাই দিয়ে দেন, তাঁকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ দিন, আর পরে আলাদা করে কথা বলুন।
ঈদের কেনাকাটা আর মেলা
ঈদের বাজার আর মেলায় ভিড়, গরম, আর চাওয়ার মতো জিনিসে ভরা। পারলে সবচেয়ে ছোটটাকে ছাড়া ঈদের জামা কিনুন, বা দিনের শুরুতে যান। মেলায় বাচ্চা কী বাছবে, যেমন একটা খেলনা, তা আগেই একসঙ্গে ঠিক করুন, আর সেটাই মেনে চলুন।
গ্রামের বাড়ির লম্বা পথ
ঈদের আগে বাস, লঞ্চ বা ট্রেনে বাড়ি যাওয়া মানে লম্বা অপেক্ষা আর ঠাসাঠাসি জায়গা। পানি, নাশতা, বাড়তি জামা, আর একটা একটা করে বের করার মতো কয়েকটা নতুন জিনিস, যেমন ছবির বই বা রং করার খাতা, নিয়ে নিন। লঞ্চে ছোট বাচ্চাকে সবসময় কোলে রাখুন বা হাত ধরে রাখুন, রেলিং থেকে অনেক দূরে। মোবাইলটা রাখুন যখন আর কিছুতেই কাজ হয় না তখনের জন্য, প্রতিটা কান্নার প্রথম উত্তর হিসেবে নয়।
শান্তভাবে বাইরে যাওয়ার ৭ দিনের পরিকল্পনা
একটা পরিবর্তন বেছে নিন, প্রতিদিন কী হলো লিখে রাখুন, আর এক সপ্তাহ পরে মিলিয়ে দেখুন।
- দিন ১: গত কয়েকবারের লোকের সামনে জেদের কথা ভাবুন: কোথায়, কখন, বাচ্চা কতটা ক্ষুধার্ত বা ক্লান্ত ছিল, আর ঠিক আগে কী হয়েছিল। লিখে রাখুন।
- দিন ২: নিয়মিত একটা বাইরে যাওয়া বেছে নিন, যেমন মোড়ের দোকান বা স্কুল থেকে আনা।
- দিন ৩: বাসায় ‘দোকান-দোকান’ খেলুন: অপেক্ষা করা, ‘না’ শোনা আর একটা জিনিস বাছার অনুশীলন।
- দিন ৪: খাওয়ার পরে ছোট একটা অনুশীলনের যাত্রা করুন, পরিকল্পনাটা মুখে বলে, আর বাচ্চার জন্য একটা কাজ রেখে।
- দিন ৫: পরিবারের অন্য বড়দের সঙ্গে চলে আসার পরিকল্পনা আর অন্যদের বলার মতো একটা কথা ঠিক করে নিন।
- দিন ৬: আরেকটু লম্বা কোথাও যান, আর যা ভালো হলো মুখে বলুন: ‘তুমি পুরো রাস্তা আমার হাত ধরে ছিলে।’
- দিন ৭: দিন ১-এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন: কতবার জেদ হলো, কতক্ষণ চলল, কত তাড়াতাড়ি শান্ত হলো, আর আপনার কেমন লাগল। যা কাজে দিয়েছে তা রাখুন।
বাচ্চা আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে না; সবার সামনে ওর নিজেরই কষ্ট হচ্ছে।
লোকের সামনে জেদ নিয়ে কখন সাহায্য নেবেন
লোকের সামনে বেশির ভাগ জেদ একটা পর্যায়, সময়ের সঙ্গে কেটে যায়। তবে নিচের কোনোটা হলে বাচ্চার ডাক্তার বা শিশুর বিকাশ নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন:
এমন হলে সাহায্য নিন
- ৫ বছরের পরও প্রায় প্রতিদিন জেদ হয়, বা প্রায়ই ২৫ মিনিটের বেশি চলে।
- শব্দ, ভিড় বা নতুন জায়গায় বাচ্চা এত অস্থির হয় যে আপনি বাইরে যাওয়াই এড়িয়ে চলেন, বা প্রায়ই সে কান চেপে ধরে, লুকিয়ে পড়ে, বা কিছুতেই শান্ত হয় না।
- বাচ্চা প্রায়ই রাস্তা বা পানির দিকে ছুটে যায়, বা জেদের সময় নিজেকে বা অন্যকে আঘাত করে।
- শ্বাস আটকে রাখতে রাখতে বাচ্চা ফ্যাকাশে বা নীল হয়ে যায়, বা অজ্ঞান হয়ে যায়। প্রথমবার এমন হলেই ডাক্তারকে জানান, আর মোটামুটি এক মিনিটের মধ্যে জ্ঞান না ফিরলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
- জেদের সঙ্গে আরও কিছু চিন্তার বিষয় থাকে: একই বয়সী অন্য বাচ্চাদের চেয়ে কথা বলায় অনেক পিছিয়ে থাকা, আগে পারত এমন কিছু ভুলে যাওয়া, বা মানুষের প্রতি আগ্রহ কম।
- আপনার মনে হচ্ছে বাচ্চাকে আঘাত করে ফেলতে পারেন, বা আর পারছেন না। বাচ্চা নিরাপদে আছে কি না নিশ্চিত করুন, সম্ভব হলে অন্য একজন বড় মানুষের কাছে দিন, কয়েক মিনিটের জন্য সরে যান, আর নিজের জন্য সাহায্য নিন। কেউ এখনই বিপদে থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
মানুষের সামনে জেদ একটা কঠিন মুহূর্ত মাত্র, আপনার পরিবারের ওপর কোনো রায় নয়। ParentMind আপনাকে প্রতিদিন কী হলো তা নোট করতে সাহায্য করে, যেমন কোথায় আর কখন জেদ হয়, আর কী কাজে দিল, যাতে পরের বার বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে পারেন; ParentMind কীভাবে কাজ করে দেখুন।
বাবা-মায়েরা যা জানতে চান
দোকানে বাচ্চা জেদ করলে কি দোকান থেকে বেরিয়ে আসব?
কয়েক মিনিটে না কমলে প্রায়ই হ্যাঁ। শান্তভাবে বেরিয়ে আসা মানে হার মানা নয়, যতক্ষণ বাচ্চা যেটার জন্য চিৎকার করছিল সেটা পাচ্ছে না। বাইরে বা নিরিবিলি এক কোণে চলে যান, শান্ত না হওয়া পর্যন্ত পাশে থাকুন, তারপর কেনাকাটা শেষ করুন বা বাসায় ফিরুন। কয়েকবার আগেভাগে বেরিয়ে এলে পরের বারগুলো প্রায়ই সহজ হয়।
লোকের সামনে জেদ করলে কি পাত্তা না দেওয়াই ভালো?
চাওয়াটাকে পাত্তা দেবেন না, বাচ্চাকে নয়। কাছে আর শান্ত থাকুন, বাচ্চাকে নিরাপদ রাখুন, খুব কম কথা বলুন; কিন্তু দূরে চলে যাবেন না বা এমন ভাব করবেন না যেন ও নেই। কিছু পাওয়ার জন্য জেদ হলে কম মনোযোগ দেওয়া প্রায়ই কাজে দেয়। আর বাচ্চা ভয় পেলে, শব্দে দিশেহারা হলে বা অসুস্থ থাকলে ওর দরকার আদর আর নিরিবিলি জায়গা।
অচেনা মানুষ তাকালে বা মন্তব্য করলে কী বলব?
খুব কম। ‘ধন্যবাদ, আমরা ঠিক আছি, ওর একটু সময় লাগবে’, এমন ছোট একটা ভদ্র কথাই যথেষ্ট, তারপর আবার বাচ্চার দিকে ফিরুন। কাউকে ব্যাখ্যা দিতে আপনি বাধ্য নন। কোনো আত্মীয় চড় দিতে বা দিয়ে দিতে জোর করলে নরমভাবে বলুন, আপনি অন্যভাবে সামলান, আর পরে আলাদা করে কথা বলুন।
লোকের সামনে জেদ থামাতে কি বাচ্চার হাতে মোবাইল দেওয়া ঠিক?
মাঝে মাঝে হয়ে যায়, কিন্তু অভ্যাস না বানানোই ভালো: বাচ্চা তাড়াতাড়িই শিখে ফেলে, জেদ করলেই মোবাইল আসে। অপেক্ষার সময় পানি, নাশতা বা বই সাধারণত বেশি কাজে দেয়। শিশু-স্বাস্থ্য নির্দেশনা বলে, ১৮ মাসের কম বয়সে পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কল ছাড়া কোনো স্ক্রিন নয়, ১৮–২৪ মাসে শুধু ভালো মানের কিছু, বড় কারও সঙ্গে বসে, আর ২–৫ বছরে দিনে বড়জোর ১ ঘণ্টা ভালো মানের কিছু।
বাসার চেয়ে বাইরে গেলে বাচ্চা বেশি জেদ করে কেন?
বাইরে একসঙ্গে অনেক কারণ জমা হয়: বেশি শব্দ, অপেক্ষা আর লোভনীয় জিনিস, প্রায়ই কম ঘুম, আর মা-বাবার অস্বস্তি, যা বাচ্চা টের পায়। কিছু বাচ্চা নিজের সবচেয়ে বড় অনুভূতিগুলো জমিয়ে রাখে সবচেয়ে ভরসার মানুষটার জন্য। ছোট সময়ের জন্য বাইরে যাওয়া, বের হওয়ার আগে খাওয়া, স্পষ্ট পরিকল্পনা আর শান্তভাবে চলে আসার একটা উপায় সাধারণত কাজে দেয়।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন; কেউ বিপদে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করুন।







